সুস্থ্য ও সুন্দরভাবে বাচ্চা প্রসব হলে মা নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেন। নতুন জীবন নিয়ে নিজ সন্তান দুনিয়ার আলো-বাতাস দেখছে ভেবে খুব আনন্দিত হন। অতএব ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মা তার বাচ্চাকে কাছে টেনে নিবেন এবং নিজ বুকের সাথে জড়িয়ে ধরবেন। অনেকে বলেন, মা-সন্তানের সম্পর্কের মাঝে এর বিরাট প্রভাব রয়েছে। এর ফলে বাচ্চা সুন্দরভাবে বেড়ে উঠতে সক্ষম হয়, উভয়ের মাঝে মধুর ঘনিষ্টতার সৃষ্টি হয়। অন্যথায় মা-সন্তানের মাঝে সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা ভিন্ন প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর করণীয় :
১. সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পিতা ও নিকট আত্মীয়দের সুসংবাদ প্রদান করা, সন্তানের জনক-জননীকে মোবারকবাদ দেয়া ও তাদের খুশিতে অংশগ্রহণ করা ইসলামের আদর্শ। যেমন, আল্লাহ তাআলা ইবরাহিমের স্ত্রীকে ইসহাক ও ইয়াকুবের সুসংবাদ প্রদান করেন এবং জাকারিয়া আ.-কে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ প্রদান করেন সঙ্গে তার নামও চয়ন করে দেন, ফেরেশতাগণ ইবরাহিমের স্ত্রীকে সন্তান জন্মের সুসংবাদ প্রদান করেন ইত্যাদি। লক্ষ্য করুন কুরআনের আয়াত : আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তার (ইব্রাহীমের) স্ত্রী দাঁড়ানো ছিল, সে হেসে উঠল। অতঃপর আমি তাকে সুসংবাদ দিলাম ইসহাকের ও ইসহাকের পরে ইয়া‘কূবের।’ (হুদ : ৭১) অন্যত্র বলেন, 'অতঃপর ফেরেশতারা তাকে ডেকে বলল, সে যখন কক্ষে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিল, 'নিশ্চয় আল্লাহ তোমাকে ইয়াহইয়া সম্পর্কে সুসংবাদ দিচ্ছেন’। (আলে ইমরান : ৩৯) আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেন, 'হে যাকারিয়্যা, আমি তোমাকে একটি পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিচ্ছি, তার নাম ইয়াহইয়া। ইতিপূর্বে কাউকে আমি এ নাম দেইনি’। (মারইয়াম : ৭) অন্যত্র বলেন, 'এতে তাদের (ফেরেশতাদের) সম্পর্কে সে (ইবরাহিমের স্ত্রী) মনে মনে ভীত হল। তারা বলল,'ভয় পেয়োনা, তারা তাকে এক বিদ্বান পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিল’। (জারিয়াত : ২৮)
অতএব এসব আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হল যে, ছেলে বা মেয়ে সন্তান জন্মের পর খুশি হওয়া, আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা, নবাগত সন্তানের ব্যাপারে সবাইকে সুসংবাদ প্রদান করা ইসলামের একটি আদর্শ, বরং সওয়াবের কাজ। ইবনুল কাইয়ূম রহ. বলেন,'যার পক্ষে সুসংবাদ দেয়া সম্ভব হবে না, সে জানার পর সন্তানের জন্য কল্যাণ ও বরকতের দোয়া করবে।’ (তুহফাতুল মওদুদ)
হাসান ইবনে আলী রা. কারো সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সংবাদ শুনলে এ বলে দোয়া করতেন।
(بورك لك في الموهوب، وشكرت الواهب، وبلغ أشده، ورزقت بره) [النووي في الأذكار].
২. সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডান কানে আজান দেয়া।
সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডান কানে আজান দেয়া সুন্নত। আবুরাফে রা. বর্ণনা করেন, 'আমি রাসূল সা.-কে হাসান ইবনে আলীর কানে আজান দিতে দেখেছি, যখন সে ফাতেমার ঘরে ভূমিষ্ট হয়।’ (আবুদাউদ, তিরমিজি-সহিহ সূত্রে) বাঁ কানে একামত দেয়ার ব্যাপারে যে বর্ণনা পাওয়া যায় তা বিশুদ্ধ সনদে রাসূল সা. থেকে প্রমাণিত নয়, তাই এর ওপর আমল করা বা একে সুন্নত জ্ঞান করা শুদ্ধ নয়।
৩. তাহনিক করা।
ইমাম নববি রহ. বলেন, 'সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খেজুর দিয়ে তাহনিক করা সুন্নত। অর্থাৎ খেজুর চিবিয়ে নবজাতকের মুখের তালুতে আলতোভাবে মালিশ করা এবং তার মুখ খুলে দেয়া যাতে তার পেটে এর কিছু অংশ প্রবেশ করতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, কতক আলেম বলেছেন, খেজুর সম্ভব না হলে অন্য কোন মিষ্টি দ্রব্য দিয়ে তাহনিক করা। তিনি আরো বলেন, আমার জানামতে সব আলেমই তাহনিক করা মুস্তাহাব বলেছেন, এ ব্যাপারে কারো দ্বিমত সম্পর্কে আমার বলে জানা নেই। (শরহে মুহাজ্জাব : ৮/৪২৪)
আনাস রা. বলেন,'আব্দুল্লাহ ইবনে আবুতালহা ভূমিষ্ট হওয়ার পর আমি তাকে রাসূল সা. এর নিকট নিয়ে যাই, তিনি বললেন, 'তোমার সঙ্গে কি খেজুর আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। রাসূল সা. খেজুর চিবালেন, অতঃপর তা বের করে বাচ্চার মুখে দিলেন। বাচ্চাটি জিব্বা দিয়ে চুসে ও ঠোটে লেগে থাকা অংশ চেটে খেতে লাগল। রাসূল সা. এ দৃশ্য দেখে বললেন, 'দেখ, আনসারদের খেজুর কত প্রিয়! (মুসলিম)
আবুমুসা রা. বলেন, 'আমার একটি সন্তান জন্ম হয়, আমি তাকে রাসূল সা.-এর নিকট নিয়ে আসি, রাসূল সা. তার নাম রাখেন ইবরাহিম অতঃপর খেজুর দিয়ে তার তাহনিক করেন, তার জন্য বরকতের দোয়া করেন ও আমার কাছে ফিরিয়ে দেন, এটা আবুমুসার বড় সন্তানের ঘটনা। (বুখারি-মুসলিম)
৪. সপ্তম দিন মাথা মুণ্ডন করা ও চুলের ওজন বরাবর রুপা সদকা করা।
আনাস ইবনে মালেক রা. বলেন, 'রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সপ্তম দিন হাসান ও হুসাইনের চুল কাটার নির্দেশ দেন এবং চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সদকা করেন। ছেলে বা মেয়ে সব সন্তানেরই সপ্তম দিন চুল কাটা সুন্নত। সাহাবি সামুরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, 'প্রত্যেক সন্তান তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক হিসেবে রক্ষিত। অতএব সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে আকিকা করা, তার চুল কাটা ও তার নাম রাখা।’ (আহমদ, তিরমিজি-সহিহ সূত্রে)
বাচ্চার চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা করা সুন্নত। আলী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. হাসানের পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা দিয়েছেন এবং বলেছেন,'হে ফাতিমা, তার মাথা মুণ্ডাও ও তার চুলের ওজন পরিমাণ রূপা সদকা কর।’ (তিরমিজি) হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. বলেন, 'সব বর্ণনাতেই রুপার কথা এসেছে।’ (তালখিসুল হাবির) হ্যাঁ, কতক বর্ণনাতে রুপা বা স্বর্ণ সদকার কথা বলা হয়েছে।
৫. আকিকা করা।
আকিকার অর্থ : আল্লাহর দরবারে নজরানা পেশ করা, শুকরিয়া আদায় করা, জানের সদকা দেয়া ও আল্লাহর নেয়ামতের মোকাবেলায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। ইসলামি পরিভাষায় আকিকা হচ্ছে, নবজাতকের পক্ষ থেকে পশু জবেহ করা। অধিকাংশ আলেমদের নিকট আকিকা সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ।
ইবনে আব্বাস রা. বলেন,'রাসূল সা. হাসান এবং হুসাইনের পক্ষ থেকে একটি করে বকরি জবেহ করেছেন।’ (আবুদাউদ-সহিহ সূত্রে) আনাস রা.-এর বর্ণনায় রয়েছে, দুটি বকরি জবেহ করেছেন। খায়সামি বলেছেন আনাসের বর্ণনাটি বুখারি-মুসলিমের সমতুল্য।
ইমাম মালেক রহ. তার মুয়াত্তায় বর্ণনা করেন, রাসূল সা. বলেছেন,'যার কোন সন্তান হয় সে যদি তার সন্তানের পক্ষ থেকে কুরবানি পেশ করতে চায়, তবে তা করা উচিত।’ তিনি আরো বলেন, 'প্রত্যেক সন্তান তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক হিসেবে রক্ষিত। সপ্তম দিন তার পক্ষ থেকে আকিকা করা, নাম রাখা ও চুল কাটা কর্তব্য।’ (আহমদ ও সুনান গ্রন্থসমূহ, তিরমিজি হাদিসটি সহিহ বলেছেন)
ছেলের পক্ষ থেকে দু'টি ও মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা করা সুন্নত। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'ছেলের পক্ষ থেকে প্রতিদান হিসেবে দু’টি বকরি ও মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি আকিকা দেয়া।’ তবে সুন্নত হচ্ছে সপ্তম দিন, তা সম্ভব না হলে ১৪তম দিন বা ২১তম দিন আকিকা করা। বুরায়দা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন,'সপ্তম দিন, অথবা চতুর্দশ দিন অথবা একুশতম দিন আকিকা করা। কোন কারণে কেউ এসব দিনে আকিকা করতে সক্ষম না হলে, যখন সম্ভব তখনই করবে, এর জন্য কোন নির্দিষ্ট সময়-সীমা নেই। তবে, যথা সম্ভব দ্রুত করাই হচ্ছে উত্তম।
রাসূল সা. কথা ও কাজের মাধ্যমে আকিকার প্রমাণ রেখেছেন। সালমান দাব্বি থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, 'বাচ্চার সঙ্গে আকিকা রয়েছে। সুতরাং তোমরা তার পক্ষ থেকে আকিকা কর এবং তার শরীর থেকে কষ্টদায়ক জিনিস হটিয়ে দাও।’ (বুখারি)
উম্মে কুরজ আল-কাবিয়া বলেন, আমি রাসূল সা.-কে আকিকা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছি, তিনি বলেন,'ছেলের পক্ষ থেকে দুটি আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি পশু, নর-মাদি যে কোন প্রকার হলেই চলে, এতে কোন সমস্যা নেই।’ (আবুদাউদ, নাসায়ি)
জমহুর ফুকাহায়ে কেরাম আকিকার গোস্ত পাকানোকে মুস্তাহাব বলেছেন, এমনকি যা সদকা করা হবে তাও। হ্যাঁ, পাকানো ব্যতীত বণ্টন করে দেয়াও বৈধ। আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, 'ছেলের পক্ষ থেকে সমমানের দু’টি আর মেয়ের পক্ষ থেকে একটি বকরি জবেহ করা।' (আহমদ, তিরমিজি, তিরমিজির নিকট হাদিসটি হাসান ও সহিহ) অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূল সা. আমাদেরকে মেয়ের পক্ষ থেকে একটি এবং ছেলের পক্ষ থেকে দুটি বকরি জবেহ করার নিদের্শ দিয়েছেন।’ (তিরমিজির নিকট হাদিসটি সহিহ ও হাসান) সমমানের অর্থ বয়স, জাত, লিঙ্গ ও গোস্তের দিক দিয়ে সমমানের হওয়া। উল্লেখ, ওলামায়ে কেরাম ইয়াতিম সন্তানের আকিকা তার সম্পদ থেকে দিতে নিষেধ করেছেন।
কুরবানির পশুর জন্য যেসব শর্ত রয়েছে আকিকার পশুর জন্যও তা প্রযোজ্য। এর কোন অংশ মজদুরি হিসেবে দেয়া যাবে না, এর চামড়া বা গোস্ত বিক্রি করা যাবে না বরং এর গোস্ত খাবে, সদকা করবে ও হাদিয়া হিসেবে দেবে।
তবে একদল আলেম বলেছেন, 'কুরবানিতে যেমন অংশিদারিত্ব বৈধ এখানে সে অংশিদারিত্ব বৈধ নয়। যদি কেউ গরু বা উটের মাধ্যমে আকিকা করতে চায়, তাকে একজনের পক্ষ থেকে পূর্ণ একটি পশু জবেহ করতে হবে। রাসূল সা.-এর আমল ও বাণী থেকে এ মতটি সঠিক মনে হয়।
ইবনে হাজম রহ. বলেন, 'আকিকার পশুর হাড় ভাঙতে কোন অসুবিধা নেই। যেসব বর্ণনায় আকিকার পশুর হাড় ভাঙতে নিষেধ করা হয়েছে তা রাসূল সা. থেকে প্রমাণিত নয়। অধিকন্তু তিনি আবুবকর ইবনে আবুশায়বা রহ.-এর সূত্রে বর্ণনা করেন, ইমাম জুহরি রহ. বলেছেন, 'আকিকার পশুর হাড় ও মাথা ভাঙা যাবে কিন্তু তার রক্তের কোন অংশ বাচ্চার শরীরে মাখা যাবে না।’ (মুহাল্লা : ৭/৫২৩)
আকিকার উপকারিতা : (ক) আকিকা একটি এবাদত, এর দ্বারা বাচ্চা দুনিয়াতে আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর এবাদত করার সৌভাগ্য অর্জন করে। (খ) এর ফলে বাচ্চা বন্ধক মুক্ত হয় ও মাতা-পিতার জন্য সুপারিশ করার উপযুক্ত হয়। (গ) এটা জানের সদকা। এর মাধ্যমে বাচ্চা তার জানের সদকা পেশ করে, যেমন আল্লাহ তাআলা ইসমাইলের পক্ষে বকরি ফিদইয়া পেশ করেছেন।
৬. নাম রাখা।
ভূমিষ্ট হওয়ার প্রথম দিন বা সপ্তম দিন নব জাতকের নাম রাখা সুন্নত। রাসূল সা. বলেন, 'আজ রাতে আমার একটি সন্তান ভূমিষ্ট হয়েছে, আমি তার নামকরণ করেছি ইবরাহিম, আমার পিতা ইবারিহেমর নামানুসারে।’ (মুসলিম)
ইমাম আবুদাউদ, আহমদ, দারামি, ইবনে হিব্বান ও আহমদের বর্ণনাকৃত হাদিসের ভাষ্যমতে নবজাতকের নাম সুন্দর রাখা সুন্নত। রাসূল সা. বলেন 'কিয়ামতের দিন তোমাদেরকে তোমাদের নিজ নামে ও তোমাদের বাপ-দাদাদের নামে আহ্বান করা হবে, অতএব তোমরা তোমাদের নাম সুন্দর করে নাও।’
মুসলিমের হাদিসে রয়েছে, আল্লাহর পছন্দনীয় ও সর্বোত্তম নাম হচ্ছে'আব্দুল্লাহ’ ও'আব্দুর রহমান।’ আবুদাউদের হাদিসে রয়েছে, সবচেয়ে সত্য নাম হচ্ছে'হারিস’ ও'হাম্মাম’ আর সব চেয়ে ঘৃণীত নাম হচ্ছে হারব’ ও'মুররাহ’।’
সবচেয়ে সত্য বলা হয়েছে এ হিসেবে যে, এ নামগুলোর অর্থের সঙ্গে মানুষের কর্ম ও প্রকৃতির শতভাগ মিল রয়েছে। কারণ, 'হারিস’ শব্দের অর্থ হচ্ছে কর্মজীবি ও উপার্জনকারী আর'হাম্মাম’ শব্দের অর্থ হচ্ছে আকাঙ্খি ও ইচ্ছা পোষণকারী। প্রত্যেক মানুষের প্রকৃতির মধ্যে এ স্বভাবগুলো বিদ্যমান, তাই এগুলো হচ্ছে সবচেয়ে সত্য নাম। পক্ষান্তরে হারব শব্দের অর্থ হচ্ছে যুদ্ধ-বিগ্রহ আর মুররাহ শব্দের অর্থ হচ্ছে তিক্ততা-বিষাক্ততা। যেহেতু এসব শব্দ থেকে অশুভ লক্ষণ বুঝে আসে তাই এসব নামকে সবচেয়ে ঘৃণীত নাম বলা হয়েছে।
এর দ্বারা বুঝে আসে যে, অর্থ ভাল এমন শব্দ দ্বারা নামকরণ করা মুস্তাহাব। যেমন, নবিদের নাম, ফেরেশতাদের নাম, জান্নাতের নাম ও যেসব শব্দের অর্থ ভাল।
তবে যেসব শব্দের মধ্যে আত্মপ্রশংসা, বড়ত্ব, অহমিকা ও অহংকারিত্বের অর্থ রয়েছে, সেসব শব্দের মাধ্যমে নাম রাখা ঠিক নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, 'কাজেই তোমরা আত্মপ্রশংসা করো না। কে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, সে সম্পর্কে তিনিই সম্যক অবগত।’ (নাজম : ৩২) অতএব এমন শব্দ দ্বারা নাম রাখা ঠিক নয়, যার মধ্যে আত্মপ্রসংশা রয়েছে। রাসূল সা. বাচ্চাদের'রাবাহ’ ও'নাজীহ’ শব্দের মাধ্যমে নাম রাখতে বারণ করেছেন। সহিহ মুসলিম শরিফে সামুরা বিন জুনদুব থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেছেন,'তোমরা বাচ্চাদের ইয়াসার, রাবাহ, নাজীহ ও আফলাহ নাম রেখ না। (রাবাহ শব্দের অর্থ লাভ, নাজীহ শব্দের অর্থ শুদ্ধ-সুস্থ্য, ইয়াসার শব্দের অর্থ সহজতা ও আফলাহ শব্দের অর্থ সফলতা) কারণ, যখন তুমি এ নামে কাউকে ডাকবে আর সে ওখানে উপস্থিত না থাকলে উত্তর আসবে নেই।’ এ থেকে কুলক্ষণ বুঝে আসে, অর্থাৎ ওখানে লাভ নেই, যা আছে ক্ষতি আর ক্ষতি ... ইত্যাদি।
তদ্রুপ রাসূল সা.'বাররাহ’ নাম রাখতেও নিষেধ করেছেন। (যার অর্থ পূণ্যবান নারী) জয়নব বিনতে আবুসালামা বলেন, তার নাম ছিল বাররাহ বিনতে আবু সালামা। রাসূল সা. বললেন,'তোমরা নিজদেরকে নিষ্পাপ ঘোষণা কর না। আল্লাহই ভাল জানেন কে নিষ্পাপ আর কে পূণ্যবান। তারা বলল, আমরা তাকে কি নামে ডাকব? তিনি বললেন, জয়নাব বলে ডাক।’ (মুসলিম)
এ কারণেই রাসূল সা. তার কতক স্ত্রীর নাম পরিবর্তণ করে দিয়েছেন। যেমন জয়নাব বিনতে জাহাশের নাম, জয়নাব বিনতে উম্মে সালামার নাম এবং জুয়াইরিয়া বিনতে হারেসের নাম। মুসলিমের বর্ণনা মতে তাদের প্রত্যেকের নাম ছিল বাররাহ।
আল্লাহর নামে নামকরণ করাও হারাম। যেমন, খালেক, রহমান, কুদ্দুস, আওয়াল, আখের, জাহির, বাতেন ইত্যাদি।
আল্লাহর এমন সব নামের সঙ্গে মিলিয়ে নাম রাখাও নিষেধ, যার মাধ্যমে বড়ত্ব বা অহমিকার প্রকাশ পায়। যেমন নুরুল্লাহ, নুরুল ইলাহ ইত্যাদি। এসব নামের মাধ্যমেও নিজের পূণ্যতা ও আত্মপ্রশংসার প্রকাশ ঘটে, অথচ বাস্তব তার বিপরীত হওয়া অসম্ভব নয়।
ইয়াসিন শব্দ দ্বারাও নাম রাখা নিষেধ। কারণ, এটা কুরআনের একটি সুরার নাম। কেউ কেউ বলেছেন, ইয়াসিন আল্লাহর নাম। আশহাব রহ. ইমাম মালেক রহ.-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে, ইয়াসিন নাম রাখা কেমন? তিনি বলেন, আমি এটাকে অনুচিত মনে করি। যেহেতু আল্লাহ তাআলা বলেছেন,'ইয়াসিন, অলকুরআনিল হাকীম, ইন্নাকা লামিনাল মুরসালিন।’
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেছেন,'আরো যেসব শব্দের মাধ্যমে নাম রাখা নিষেধ যেমন, কুরআনের নামে নাম রাখা, কুরআনের সুরার নামে নাম রাখা, যেমন, তাহা, ইয়াসিন, হা-মীম। পক্ষান্তরে জনসাধারণের মুখে প্রচলিত যে, ইয়াসিন, তাহা এগুলো নবিদের নাম, তার কোন শুদ্ধ ভিত্তি নেই।
তাই, আমাদের উচিত হবে নবিদের নামে নাম রাখা, নেককার লোকদের নামে নাম রাখা, সাহাবাদের নামে নাম রাখা ইত্যাদি।
রাসূল সা. খারাপ অর্থের নামগুলোকে ভাল অর্থের শব্দের দ্বারা পরিবতর্ণ করে দিতেন। আবুদাউদ শরিফে বর্ণিত, রাসূল সা. আসিয়া (যার অর্থ অবাধ্য) নামকে জামিলা (সুন্দর) শব্দ দ্বারা পরিবর্তণ করে দিয়েছেন।
নিষিদ্ধ নামের মূলনীতি :
১. যেসব নামের অর্থ দ্বারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো দাসত্ব বুঝে আসে, যেমন, আব্দুর রাসূল, আব্দুল মুত্তালিব ও আব্দুন্নবি ইত্যাদি।
২. যেসব নাম আল্লাহর জন্য খাস অথবা আলিফ-লাম সংযুক্ত আল্লাহর কোন গুণবাচক নাম। যেমন, আর-রহমান, আর-রহিম ইত্যাদি।
৩. যেসব নাম খারাপ অর্থ ধারণ করে। যেমন, হারব, মুররাহ ও হুজ্ন (চিন্তা) ইত্যাদি।
৪. যেসব নামের কোন অর্থ নেই বা অর্থহীন শব্দ দ্বারা নাম রাখা। যেমন, জুজু, মিমি বা খৃষ্টীয় কোন নাম রাখা যেমন নিকলু, তদ্রুপ পশ্চিমাদের নামে নাম রাখাও নিষেধ। যেমন, দিয়ানা, অলিজা, সিমুন, জর্জ, মার্কস, লেলিন। ইত্যাদি।
৫. যেসব শব্দের মধ্যে ব্যক্তির আত্মপ্রশংসা, নিষ্পাপতা, বড়ত্ব বা অহংকারিতার অর্থ রয়েছে, সেসব শব্দ দ্বারা নাম রাখাও নিষেধ। যেমন, শাহানশাহ, আলমগীর, জাহাঙ্গীর ইত্যাদি।
৭ : খাৎনা করানো।
এক ব্যক্তি রাসূল সা. এর নিকট এসে বলে, হে আল্লাহর রাসূল সা. আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি, তিনি তাকে বললেন,'কুফরির চুল মুন্ডিয়ে ফেল আর খাৎনা কর।’ (আবুদাউদ)
রাসূল সা. বলেছেন,'মানুষের প্রকৃতগত স্বভাব পাঁচটি। ক. খাৎনা করানো। খ. নাভির নিচের পশম পরিস্কার করা। গ. বগলের নিচের পশম উপড়ানো। ঘ. আঙ্গুলের নখ কর্তন করা। ঙ. মোচ ছোট করা। (বুখারি) ইমাম নববি রহ. বলেন, এখানে প্রকৃতগত স্বভাবের অর্থ সুন্নত।
খাৎনার সময় : সপ্তম দিন খাৎনা করানো সুন্নত। জাবের রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. হাসান এবং হুসাইনের সপ্তম দিন আকিকা দিয়েছেন ও খাৎনা করিয়েছেন।’ (তাবরানি ফিল আওসাত ও বায়হাকি)
বুখারি-মুসলিমের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ইবরাহিম আ. আশি বছর বয়সে খাৎনা করেছেন। তার অনুসরণ করা আমাদের কতর্ব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,'তারপর আমি তোমার প্রতি ওহী পঠিয়েছি যে, তুমি মিল্লাতে ইবরাহীমের অনুসরণ কর, যে ছিল একনিষ্ঠ এবং ছিল না মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত।’ (নাহাল : ১২৩)
খাৎনার বিধানের ব্যাপারে ইমাম আবুহানিফা রহ. বলেন, খাৎনা সুন্নত। ইমাম শাফি, মালেক ও আহমদ রহ. বলেন, খাৎনা ওয়াজিব। এ ব্যাপারে ইমাম মালেক রহ. আরো কঠোর অবস্থান নিয়ে বলেছেন, যে খাৎনা করবে না তার ইমামত ও সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। কাজী আয়াজ রহ. বলেছেন, অধিকাংশ আলেমদের নিকট খাৎনা সুন্নত, যা পরিত্যাগ করা গোনাহ।
পরিশিষ্টি :
গর্ভবতী মা সন্তান প্রসবের পূর্বে, প্রসবের সময় বা পরে, যা ইচ্ছে তাই দোয়া করতে পারে। এ সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোন দোয়া নেই, আবার এ সময় দোয়া কবুল হয় এমনও কোন প্রতিশ্রুতি নেই। তবে, সন্তান প্রসব কঠিন হলে বলা যায় সে নিরুপায় বা মুসিবতগ্রস্থ। সে হিসেবে তার দোয়া কবুল হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদি। আল্লাহ তাআলা বলেন,'বরং তিনি, যিনি নিরুপায়ের ডাকে সাড়া দেন এবং বিপদ দূরীভূত করেন।’ (সুরা নামাল : ৬২)
উল্লেখ্য যে, প্রসব বেদনা সহজ হওয়ার জন্য কুরআনের আয়াত বা রাসূল সা. এর হাদিস দ্বারা নির্দিষ্ট কোন আমল প্রমাণিত নেই। এ ক্ষেত্রে সাধারণ দোয়াই সহজে প্রসব হওয়ার জন্য যথেষ্ট। যেমন, জাকারিয়া আলাইহিস সালাম সন্তানের জন্য দোয়া করেছিলেন,'হে আমার রব! আমাকে একা রেখো না, তুমি তো শ্রেষ্ঠ মালিকানার অধিকারী’। অতঃপর আমি তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলাম এবং তাকে দান করেছিলাম ইয়াহইয়া। আর তার জন্য তার স্ত্রীকে উপযোগী করেছিলাম।’ আম্বিয়া : ৮৯-৯০)
মরিয়ম আ.-এর প্রসব বেদনার সময় আল্লাহ তাকে খেজুর গাছ নাড়া দিতে, খেতে, পান করতে ও চক্ষু শীতল করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,'অতঃপর প্রসব-বেদনা তাকে খেজুর গাছের কাণ্ডের কাছে নিয়ে এলো। সে বলল,'হায়! এর আগেই যদি আমি মরে যেতাম এবং সম্পূর্ণরূপে বিস্মৃত হতাম’! তখন তার নিচ থেকে সে তাকে ডেকে বলল যে,'তুমি চিন্তা করো না। তোমার রব তোমার নিচে একটি ঝর্ণা সৃষ্টি করেছেন’।'আর তুমি খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে তোমার দিকে নাড়া দাও, তাহলে তা তোমার উপর তাজা-পাকা খেজুর ফেলবে’।'অতঃপর তুমি খাও, পান কর এবং চোখ জুড়াও।’ (মারইয়াম : ২৩-২৬)ি
এ থেকে সহজে প্রসব হওয়ার জন্য অনেকে বলেছেন, প্রসবের পূর্বে তাজা-পাকা খেজুর খাওয়া, পানীয় দ্রব্য পান করা ও আগত সন্তানের কথা স্মরণ করে শান্ত, শঙ্কা মুক্ত ও প্রসন্ন থাকা, অন্তরে কোন ধরণের ভয়-ভীতি বা পেরেশানী স্থান না দেয়া। সমাপ্ত
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মে, ২০০৯ রাত ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


