আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের দ্বৈরথ দেখতে চান? আপনি যে দলের সমর্থকই হোন না কেন, এর জন্য আপনার শুভকামনা থাকতে হবে দুই দলের জন্যই। কারণ ফাইনাল ছাড়া এই দুই শীর্ষ দলের দেখা হওয়ার সম্ভাবনা নেই। অবশ্য তার আগে দুই দলকেই গ্রুপ পর্যায়ের থাকতে হবে শীর্ষে । লাতিন আমেরিকার এই দুটি দলের একটি গ্রুপ পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থানে চলে গেলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের মোলাকাত সেমিফাইনালেই হয়ে যেতে পারে। আর দুই দলই যদি গ্রুপ পর্যায়ের শীর্ষ স্থানটি হারায়, তাহলেও তাদের দেখা হবে ফাইনালে। তবে এ বিষয়ে এখনই বাজি লাগতে পারেন যে সেমিফাইনালের আগে দেখা হচ্ছে না ব্রাজিলÑআর্জেন্টিনার । আসুন একবার চোখ বুলিয়ে নেই ব্রাজিল- আর্জেন্টিনার মহারণের গাণিতিক সম্ভাবনায়।
বিশ্বকাপ ২০১০ এর গ্রুপ এ তে এবার রয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্স, উরুগুয়ে আর মেক্সিকো। বড় কোনো অঘটন না ঘটলে গ্রুপের শীর্ষস্থানটি ফরাসিদের আয়ত্তেই থাকার কথা। আফ্রিকার জাদু কাজে না লাগলে দ্বিতীয় স্থানটি মেক্সিকো আর উরুগুয়ের মধ্যে কোন এক দল পাবে। গ্রুপ এ-র চ্যাম্পিয়নরা খেলবে গ্রুপ বি-এর রানার আপের সঙ্গে। গ্রুপ বি-তে রয়েছে আর্জেন্টিনা, নাইজেরিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া আর গ্রিস। সাধারণ অনুমান কাজে লাগিয়েও বলা যায় যে ম্যারাডোনা-মেসিদের দল আর্জেন্টিনার পর এই গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানটি কে পাবে এটা নিয়েই আলোচনা হওয়া উচিত। তাই ফরাসিদের মোকাবেলা করতে হবে আফ্রিকার সিংহ নাইজেরিয়া কিংবা এশিয়ার ব্রাজিল জাপানের সঙ্গে। আর্জেন্টিনা বি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হলে এ পর্যায়ে তাদের লড়তে হবে কাছের প্রতিবেশী উরুগুয়ে বা উত্তর আমেরিকার দেশ মেক্সিকোর সঙ্গে।
ইংল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, আলজেরিয়া আর স্লোভেনিয়া গ্রুপ সি এর দল ঘোষিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে মেতে উঠেছিল ব্রিটিশ প্রেস। আর যা-ই হোক, প্রথম রাউন্ডে বাদ পড়তে হচ্ছে না তাদের। কোন বিরাট অঘটন না ঘটলে এই গ্রুপের শীর্ষস্থানটি ফ্যাবিও ক্যাপোলো বাহিনীরই থাকার কথা। আর তাদের আটলান্টিক পাড়ের বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও দ্বিতীয় স্থানটি একরকম নিশ্চিত। সবকিছু ঠিক থাকলে ইংল্যান্ডকে খেলতে হবে অস্ট্রেলিয়া বা ঘানার সঙ্গে। কারণ জার্মানি আছে বলে গ্রুপ ডি-তে অস্ট্রেলিয়া আর ঘানাকে দ্বিতীয় স্থানটি নিয়েই লড়তে হবে। আর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনা করলে সার্বিয়াকে এই দৌড়ের বাইরেই রাখা যায়। ডি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে তাই খেলতে হচ্ছে সি গ্রুপের রানার আপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে।
নেদারল্যান্ড, ক্যামেরুন, ডেনমার্ক ও জাপানের গ্রুপ ই-এর শীর্ষস্থানটি ফিফা র্যাঙ্কিং অনুযায়ীই দেওয়া যাক। ওই হিসেবে ই গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন নেদারল্যান্ডকে খেলতে হবে এফ গ্রুপের রানার আপ প্যারাগুয়ের সঙ্গে। ইতালি ছাড়া এফ গ্রুপের অন্য তিন দল প্যারাগুয়ে, স্লোভাকিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটিই ফিফা র্যাংকিং অনুযায়ী শক্তিশালী। চোখ বুজে বলে দেওয়া যায় যে নেদারল্যান্ড সহজেই পেয়ে যাচ্ছে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট। গ্রুপ পর্যায়ে দুর্বল দলের সঙ্গে খেললেও ষোলো দলের প্রতিযোগিতায় শক্ত প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এবারের চ্যাম্পিয়নরা। তা ই গ্রুপের রানার আপ যে-ই হোক ক্যামেরুনই বা ডেনমার্ক।
এবার আসি গ্রুপ জি এর কথায় । গ্রুপ জি কে যে ডেথ গ্রুপ বলা হচ্ছে এর বড় কারণ এখানে ব্রাজিলের সঙ্গী পর্তুগাল, আইভরি কোস্ট আর উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়াকে বাদ দিয়ে রাখলেও পরের রাউন্ডে যাওয়ার লড়াইয়ে যে-কোনো দুই দলই পেয়ে যেতে পারে পরের রাউন্ডের টিকিট। তবে কঠিন এ লড়াইয়ে শীর্ষে থাকতে পারলে পরের পর্যায়ে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ চিলি বা সুইজারল্যান্ডকে পাচ্ছে তারা। গ্রুপ এইচ-এর গল্পটা একটু ভিন্ন। হেসে খেলেই এইচ গ্রুপ এর শীর্ষ স্থানটি দখল করা গেলেও পরের রাউন্ডেই স্পেনকে পড়তে হবে জি গ্রুপের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী রানার আপ পর্তুগাল বা আইভরি কোস্টের। এছাড়া এইচ গ্রুপের অন্য দল হন্ডুরাস কে বাদ দেওয়াই যায়।
এবার চলুন দেখে নেই পরের রাউন্ড অর্থাৎ কোয়ার্টার ফাইনালের হিসাব নিকেশ। ফরাসি কোচ রেমন্ড ডমেনেখ এখনই নিশ্চয়ই কোয়ার্টার ফাইনালের ছক কষে রাখছেন। কারণ ষোলো দলের যুদ্ধে নাইজেরিয়া বা দক্ষিণ কোরিয়া যে দলেরই দেখা হোক না কেন, ফরাসিরাই ফেভারিট। অবশ্য নিজের দিনে যে কাউকেই হারিয়ে দিতে পারে নাইজেরিয়া। গ্রুপ পর্যায়ে শীর্ষ স্থানটি পেলে ডিয়েগো ম্যারাডোনার প্রতিবেশী উরুগুয়ে বা মেক্সিকোর দুঃখের কারণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আর ফুটবল পাড় সমর্থকেরাও নিশ্চয়ই তা চাইবেন না। আর্জেন্টিনা এ পর্যায়ে বাদ পড়লে বিশ্বকাপ তার রং হারাবে অনেকখানি।
সি গ্রুপের শীর্ষস্থান পেলে ইংল্যান্ড সামনে পাবে ডি গ্রুপের রানার আপ ঘানা বা অস্ট্রেলিয়াকে। কোচ ফ্যাবিও ক্যাপেলোর হিসাব বলছে, তারাও আসলে কোয়ার্টার ফাইনালের কৌশলই ঠিক করে নিতে চাচ্ছেন। আর কূটনীতি, সমর, শান্তি আর বাণিজ্যে ইংরেজদের বড় মিত্র আমেরিকানরা এ পর্যায়ে দ্বিতীয় জায়গাটি নিয়ে মুখোমুখি হতে পারে ডি গ্রুপের শীর্ষস্থানে থাকা জার্মানির। যাদের সম্পর্কে এক ফুটবলবোদ্ধা একবার বলেছিলেন, ফুটবল এমন একটি খেলা, যা দুনিয়ার সবাই খেলে আর জার্মানরা জেতে।
ই গ্রুপের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে আগাম মন্তব্য করলে পরে আপনাকে একটু বেকায়দায় পড়তে হতে পারে। তবে আলোচনার সুবিধার্থে বলা যায়, গ্রুপ পর্যায়ে ওপরের জায়গাটা নিয়ে নিতে পারলে নেদারল্যান্ড এর এফ গ্রুপের রানার আপ প্যারাগুয়েকে হারাতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে বলে মনে হয় না । বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের জন্য এফ গ্রুপের শীর্ষস্থানটা একরকম বরাদ্দ হলেও ষোলো দলের রণে ইতালিকে মুখোমুখি হতে হবে আফ্রিকার অদম্য সিংহ ক্যামেরুন বা ইউরোপের কালো ঘোড়া ডেনমার্কের। ফলাফল? যে কোনোটিই অনুমান করে নিন আর অপেক্ষা করুন ৩ জুলাই পর্যন্ত।
গ্রুপ পর্যায়ে পর্তুগাল, আইভরি কোস্ট আর উত্তর কোরিয়াকে দমিয়ে রাখতে পারলেই ষোলো দলের রণে ব্রাজিল দেখা পাবে তুলনামূলক সহজ প্রতিপক্ষ এইচ গ্রুপের রানার আপ সুইজারল্যান্ড বা চিলির। অন্যদিকে এইচ গ্রুপের শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও স্পেনকে খেলতে হবে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিবেশী পর্তুগাল বা আইভরি কোস্টের সঙ্গে।
এ হিসেব নিকেশ এর সবই সত্যি হলে ২ জুলাই জোহানেসবার্গে কোয়ার্টার ফাইনালে আমরা পেতে যাচ্ছি আরেকটি ওয়াটারলু। ফ্রান্স আর ইংল্যান্ড মুখোমুখি হতে যাচ্ছে যে! ফ্রান্সকে তবুও নাইজেরিয়া হারিয়ে দেওয়ার একটি সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ইংল্যান্ডকে হারানোর সামর্থ্য ঘানা বা অস্ট্রেলীয়ার আছে বলে অতি আশাবাদীরাও নিশ্চয়ই মনে করবেন না। ২ জুলাই পোর্ট এলিজাবেথে আমরা পেতে পারি আরেকটি অবিস্মরণীয় ম্যাচ। টোটাল ফুটবলের জনক হল্যান্ড আর জোগো বনিতোর ব্রাজিল মুখোমুখি হতে পারে এই ম্যাচে! ৩ জুলাই কেপটাউনে হতে পারে গত বিশ্বকাপের পুনরাবৃত্তি। আর্জেন্টাইনদের সঙ্গে আবারও দেখা হয়ে যেতে পারে জার্মানির। একই দিনে জোহানেসবার্গে মুখোমুখি হতে পারে দুই পরাশক্তি ইতালি আর স্পেন।
এবার আসি সেমিফাইনালের হিসেব নিকেশে। ৬ জুলাই এর সেমিফাইনালে ব্রাজিলকে মুখোমুখি হতে হবে ইংল্যান্ডের। সত্যি সত্যি এটা হলে তা হবে সৌরজগতের তৃতীয় গ্রহটির জন্য এক দারুণ ব্যাপার। কারণ এক দল শুধু সুন্দর ফুটবল খেলে জয় করে নিয়েছে বিশ্বের সব ফুটবল ভক্তের মন। আরেক দল দাবি করতে পারে, পুরো বিশ্বে ফুটবলকে ছড়িয়ে দেওয়া আর জনপ্রিয় করে তুলতে তাদের দেশের লীগ আর বিপণন কৌশল নিয়েছে মুখ্য ভূমিকা। এরপর ৭ জুলাই এর সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হতে হবে স্পেনকে। এ ম্যাচ সম্পর্কে আগাম এতটুকুই বলা যায়, আমাদের জন্য দারুণ কিছু অপেক্ষা করছে ডারবানে।
১১ জুলাই জোহানেসবার্গেই হতে পারে ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার সেই মহারণ। আমরা অপেক্ষা করি আর দেখি, অনুমান কত দিন ছক আঁটা ঘরে থাকে। আর এটা তো নিশ্চয় আমাদের সবারই জানা আছে ফুটবল মানেই ঘটনা-অঘটন আর বিষ্ময় এর খেলা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


