অবিভক্ত ভারতে সর্বপ্রথম ১৯৩৯ সালে মোটরযান আইন প্রণয়ন করা হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর সর্বশেষ ১৯৮৩ সালে মোটরযান অধ্যাদেশ আইন পাস করা হয়। এই মোটরযান আইনে গাড়ির চালকের যোগ্যতা, গাড়িতে কর্মরত শ্রমিকের যোগ্যতা, এমনকি গাড়ি রাস্তায় চলাচলের উপযুক্ততা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এসব আইন মানা হয় না। বেশিরভাগ চালকই মোটরযান আইনের ধারা এবং প্রয়োগ সম্পর্কে অবহিত নন। যে কারণে দুর্ঘটনার সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। মোটরযান আইন বাস্তবায়ন করার যেন কেউ নেই !
মোটরযান আইন ১৯৮৩-এর গুরুত্বপূর্ণ ধারা
মোটরযান আইন, ১৯৮৩-এ চালকের যোগ্যতা, গাড়ির শ্রমিক, নিবন্ধন, গাড়ির নির্ধারিত গতি নিয়ে বিস্তারিত অনেক কিছুই বলা আছে। যেমন কোনো ব্যক্তিকে সর্বসাধারণের ব্যবহার্য স্থানে গাড়ি চালাতে হলে তার বয়স ১৮ বছর হতে হবে। আর পেশাদার চালক হিসেবে গাড়ি চালাতে হলে তার বয়স ২০ বছর হতে হবে। চালকের লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো যাবে না এবং লাইসেন্সে নির্দিষ্ট অধিকার না দেওয়া হলে বেতনভোগী কর্মচারী হিসেবে কোনো মোটরযান চালানো যাবে না। লাইসেন্স নেই এমন ব্যক্তি অথবা মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্সধারী ব্যক্তিকে বাস চালাতে দেওয়া যাবে না। লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে চার মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে হবে চালককে। মোটরযান আইন অনুযায়ী মোটরযান নিবন্ধন করা অবশ্যই প্রয়োজন। নিবন্ধিত না হয়ে থাকলে এবং নিবন্ধন চিহ্ন যথাযথভাবে গাড়িতে লাগানো না থাকলে ওই মোটরযানে যাত্রী বা মাল পরিবহন বা অপর কোনো স্থানে চালানো যাবে না। এ ক্ষেত্রে নিবন্ধন ছাড়া গাড়ি চলাচল নিষিদ্ধ করতে হবে। সর্বোচ্চ গতিসীমার চেয়ে অধিক গতিতে গাড়ি চালালে প্রথমবার অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ এক মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বাধিক ৩০০ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং তৎপরবর্তী অনুরূপ অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড কিংবা সর্বাধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং অনধিক এক মাসের জন্য লাইসেন্স স্থগিত হবে। এছাড়া যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো যাবে না বা যাত্রী ওঠানামা করানো যাবে না। নিষিদ্ধ এলাকায় ছাড়া গাড়ি দাঁড় করালে জরিমানা এবং নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া অন্য স্থান থেকে যাত্রী ওঠালে জরিমানা দিতে হবে। নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলে ৫০ টাকা এবং সময়সীমা প্রদর্শন না করে গাড়ি চালালে ৩০ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
তবে বাংলাদেশে অন্যান্য সব কিছুর মতোই চালকের বিরুদ্ধে এ আইনের প্রয়োগ সাধারণত চোখে পড়ে না। অভিযোগ আছে, পুলিশ মাঝেমধ্যে চালকের লাইসেন্স না থাকার অপরাধে গাড়ি আটক করলেও শেষ পর্যন্ত চালক মাফ পেয়ে যায়। লাইসেন্সবিহীন চালকরা অর্থের লেনদেনের মাধ্যমে গ্রেপ্তার এড়াতে সক্ষম হয়। মোটরযান আইনের ৫১ ধারা অনুযায়ী, পারমিট নেই এমন মোটরযান ব্যবহার বা ভাড়া দেওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ। এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষও অভিযুক্ত হবে। এমনকি যথাযথ পরিদর্শন করা ছাড়াই উপযোগিতা সনদ দেওয়ার পর দুর্ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি অবহেলার জন্য দায়ী হবে বলেও ওই ধারায় বলা হয়েছে। এ ছাড়া নিষিদ্ধ হর্ন বা শব্দ উৎপাদনকারী যন্ত্র লাগানো ও ব্যবহার, আদেশ অমান্য করা, নির্ধারিত গতির চেয়ে বেশি গতিতে গাড়ি চালানো, মাতাল অবস্থা ও শারীরিকভাবে অনুপযুক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানোও মোটরযান আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
বিধিনিষেধ ও সাজা
গাড়ির নিবন্ধন, ফিটনেস অথবা রুট পারমিট ছাড়া গাড়ি ব্যবহার করলে প্রথমবার অপরাধের জন্য তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড অথবা দুই হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন মালিক বা চালক। পরবর্তী সময়ে অনুরূপ অপরাধ করলে সর্বাধিক ছয় মাস কারাদণ্ড অথবা সর্বাধিক পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে। যেখানে ওভারটেকিং নিষিদ্ধ সেখানে ওভারটেক করলে চালককে ১০০ টাকা জরিমানা দিতে হবে।
মোটরযান অধ্যাদেশ পাল্টে আসছে নতুন আইন
সড়কে নিরাপত্তা রক্ষায় বারবার অভিযান শুরু হলেও দুর্বল আইন, সমন্বয়ের অভাব ও জনবল সঙ্কটের কারণে তা ভেস্তে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সড়কে নিরাপত্তার পাশাপাশি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মোটরযান অধ্যাদেশ পাল্টে ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রাফিক অ্যাক্ট’ নামে নতুন আইন আসছে। এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন আইনটি চূড়ান্ত হতে পারে। মোটরযান অধ্যাদেশ ১৯৮৩-এ লেন মেনে গাড়ি না চালালে কী ধরনের শাস্তি হবে, তা স্পষ্ট নয়। অনেক অপরাধের জরিমানার পরিমাণও কম। যেমন ফুট ওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস ব্যবহার না করলে পথচারীদের মাত্র পাঁচ টাকা জরিমানা দেওয়ার বিধান রয়েছে। আইন প্রয়োগকারীদের মতে, এ ক্ষেত্রে জরিমানা খুবই সামান্য। তা পাল্টাতে হবে। জানা গেছে, এই আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে রিকশাসহ সব ধরনের অযান্ত্রিক যানবাহনও। নতুন আইনে চালকের গাড়ি চালনার লাইসেন্স করার পদ্ধতি ও বিভিন্ন ট্রাফিক বিধি যুগোপযোগী করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন অপরাধের শাস্তি ও জরিমানায়ও পরিবর্তন আনা হচ্ছে। পাল্টে যাওয়া আইনের নাম হবে ‘রোড ট্রান্সপোর্ট অ্যান্ড ট্রাফিক অ্যাক্ট’। ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের অর্থায়নে কেইস প্রকল্পের অংশ হিসেবে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড এই আইন তৈরি করছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) অনেক দিনের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
চাই যুগোপযোগী আইন
মোটরযান আইনের সঠিক প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন বিষয়ে সংসদ সদস্য ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন কর্মী তারানা হালিম বলেন, ‘বর্তমান মোটরযান আইনকে আরও কঠোর ও যুগোপযোগী করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ আইনে পর্যাপ্ত শাস্তির ব্যবস্থা না থাকায় এবং জামিনযোগ্য ধারায় ঘাতক চালকরা পলাতক থাকায় স্বজনহারা বিপর্যস্ত পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।’ তিনি বলেন, বিদ্যমান আইনের ফাঁক-ফোকরে ঘাতকরা বেরিয়ে যাওয়ায় এবং সহজেই জামিন পাওয়ায় তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। এর ফলে দুর্ঘটনার হার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০/১২ জন মানুষকে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ দিতে হয়। পথচারীদের অসচেতনতার পাশাপাশি ৯৫ শতাংশ সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকদের অসতর্কতা, অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন না মানাই দায়ী বলে তারানা হালিম উল্লেখ করেন। তিনি এ জন্য চালকদের সচেতনতার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
যুগোপযোগী মোটরযান আইন প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস পেতে পারে। এ ছাড়া গাড়িচালক ও হেলপারের সাবধানতা, ক্রটিমুক্ত সড়ক যোগাযোগ ও পথচারীদের সতর্কতা সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে পারে। সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে হলে ট্রাফিক আইন যথাযথ বাস্তবায়ন, হাইওয়েতে অবৈধ যানবাহন চলাচল বন্ধ, মফস্বল ও জেলা শহরগুলোতে চালকদের প্রশিক্ষণের জন্য ড্রাইভিং স্কুল প্রতিষ্ঠা, রাস্তায় ডিভাইডার স্থাপন ও চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশের জনবল বাড়ানো প্রয়োজন।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ রাত ১২:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


