শান্তনু দে
‘বিশ্বজুড়ে কমিউনিজম যখন মৃত, তখন সি পি আই (এম)-র কিং মেকার হওয়া ভারতের জন্য হবে বিপর্যয়।’
সেদিন টেলিভিশন চ্যানেলে দেশের শীর্ষ বনিকসভা ফিকি’র সেকেটারি জেনারেলের গলায় যখন সি পি আই (এম) সম্পর্কে সহজাত ক্রোধের আগুন, তখন সঞ্চালকের মুখে তৃপ্তির হাসি, সঙ্গে বাছাই দর্শকদের মধ্যে ‘একচেটিয়া পুঁজির’ প্রতি আনুগত্যের অনুপুঙ্খ প্রকাশ।
ফিকি’র কর্তাকে বলবে, দু’মাস হয়েছে কী হয়নি, মার্কিন টাইম পত্রিকার ইউরোপীয় সংস্করনের একেবারে প্রচ্ছদে জায়গা করে নিয়েছেন কার্ল মার্কস। পাতাজোড়া শিরোনাম, ‘হোয়াট উড মার্কস থিঙ্ক?’ পাশাপাশি নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে প্রকাশিত ডাকসাইটে সাপ্তাহিক নিউজউইকে কভার স্টোরি, ‘উই আর অল সোস্যালিস্ট নাও।’ সরব ঘোষণা, আমার এখন সবাই সোস্যালিস্ট।
দুনিয়া বামপন্থার দিকে। বাড়ছে সমাজতন্ত্রের প্রতি আস্থা।
নাহলে খোদ মার্কিন মুলুকে মাত্র, মাত্রই ৫৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন পুঁজিবাদ সমাজতন্ত্রের তুলনায় ভালো। এই এপ্রিলে করা জনমত সমীক্ষা। কুড়ি শতাংশ সরাসরি জানিয়েছেন সমাজতন্ত্রের কথা। বাকি ২৭ শতাংশ দোলাচলে। অথচ, ক’দিন আগেও ৭০ শতাংশ মার্কিন নাগরিকের অগাধ আস্থা ছিল খোলা বাজার অর্থনীতিতে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের মতো পত্রিকাতেও দস্তুরমতো ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ নিয়ে সম্পাদকীয়। ‘দ্য গভর্নমেন্ট অ্যান্ড দি ব্যাঙ্ক।’ সমাজতন্ত্রের ভূত দেখছেন মার্কিন অভিজাতরা! নাহলে রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামাকে পর্যন্ত শুনতে হয় ‘আপনি কী একজন সোস্যালিস্ট ?’
পয়লা এপ্রিল লন্ডনে জি-২০-বিরোধী বিশাল জমায়েত বিলকুল ‘এপ্রিল ফুল’ করে দিয়েছে ব্রাউন প্রশাসনকে। ন্যাটো বিরোধিতায় উত্তাল গোটা ইউরোপ। ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ শহরে বসেছিল ন্যাটো’র শীর্ষ বৈঠক। কড়া নিরাপত্তার বলয়কে উড়িয়ে দিয়ে তিরিশ হাজারের ঢল। লাগোয়া জার্মানির দুই শহর খেল ও বাদেনেও একই ছবি।
‘দ্য ল্যান্ড অব রাইজিং ক্যাপিটালিস্ট’, জাপান দেখছে বামপন্থার উত্থান। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশে কোনঠাসা বাজার অর্থনীতি। ‘তারুণ্যের অভিমুখ বামপন্থায়’, পাতাজোড়া শিরোনাম টোকিও’র দৈনিকে। জাপানের কমিউনিস্ট পার্টি জানাচ্ছে, প্রতি মাসে অন্তত এক হাজার তরুণ জাপানের কমিউনিস্ট পার্টিতে নাম নথিভূক্ত করছেন। বর্তমানে পার্টি সদস্যের সংখ্যা ৪ লক্ষ পনের হাজার।
এই দুনিয়ায় নিজের খিড়কির উঠোনেই কোনঠাসা আমেরিকা। এই লাতিন কিউবার।
ভেনেজুয়েলা, চিলি, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে, বলিভিয়া, প্যারাগুয়ে, নিকারাগুয়া, ইকুয়েদর, এল সালভাদোর — একের পর এক দেশে মার্কিন অনুগামী দক্ষিণপন্থী সরকারকে পরাস্ত করে এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী বামপন্থা ঘেঁষা সরকার।
দু’বছর আগে গুয়েতেমালা নির্বাচিত করেছে বামপন্থা ঘেঁষা রাষ্ট্রপতিকে। ১৯৫৪-তে সি আই এ’র মদতে নির্বাচিত সরকার অপসারনের ৫৫ বছর পর এই প্রথম। গত সেপ্টেম্বরে হন্ডুরাসের রাষ্ট্রপতি দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়েছেন সাভেজ, মোরালেসের পাশে, যখন তাঁরা দু’জনেই মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করছেন। মনে রাখুন, এই হন্ডুরাসেই রয়েছে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি।
দীর্ঘ ৪৭ বছর পর কিউবার সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কে আগ্রহী কোস্টারিকা।
নিউ ইয়র্ক টাইমস পত্রিকায় অসহায় আর্তনাদ, ‘অধিকাংশ বিশ্বের জন্য বার্লিন প্রাচীরের পতনের সময়েই অবসান হয়েছিল ঠান্ডা যুদ্ধের। হয়নি শুধু ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। এখানে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে ঠান্ডা যুদ্ধের পুরনো অবাধ্য, অদম্য যোদ্ধারা এবং তাদের সঙ্গে প্রায় সমান নাছোড় কিউবা ও ভেনেজুয়েলার বামপন্থী সরকার ঠান্ডা যুদ্ধের ক্ষুদ্র প্রতিরূপকে জারি রেখেছেন।’
‘ফিরে এসেছেন কার্ল মার্কস। আর্থিক সঙ্কট যখন দাঁত বসাচ্ছে জার্মানিতে, বইপ্রেমীরা তখন মুখ লুকোচ্ছেন কার্ল মার্কসে।’ শিরোনাম ব্রিটিশ গার্ডিয়ান পত্রিকায়। প্রতিবেদনে জার্মান ‘প্রকাশক ও বই দোকানের মালিকরা জানিয়েছেন, তাক থেকে হু হু করে উড়ে যাচ্ছে তাঁর বই।’ কারণ, মানুষ ‘অভিজ্ঞতায় বুঝেছেন, সুখের নয়া-উদার প্রতিশ্রুতি আদৌ সত্যি বলে প্রমাণিত হওয়ার নয়।’
সঙ্কট ওয়াল স্ট্রিটে, আর বার্লিনের রাস্তায় হুহু করে বিকোচ্ছে মার্কসের ‘দাস ক্যাপিটাল’। বিক্রি বেড়েছে এক ধাক্কায় তিনগুণ।
এমনকী জার্মানির অর্থমন্ত্রী পির স্টেইনবার্ক পর্যন্ত যথেষ্ট বিরক্তি আর হতাশার সঙ্গে স্বীকার করেছেন, ‘মার্কসের তত্ত্বের কিছু অংশ সত্যিই ততটা খারাপ নয়।’
মে থেকে অক্টোবর — এই ছ’মাসে কমিউনিস্ট ইশ্তেহারের বিক্রি বেড়েছে ৯০০ শতাংশ। চীনের সিনহুয়া, কিংবা কিউবার প্রেনসা লাতিনা নয়, এখবর জানিয়েছে ব্রিটেনের সংবাদ সংস্থা বি বি সি।
রাইন নদীর শাখা মাসেলের কোলে জার্মানির সবচেয়ে পুরনো শহর ত্রিয়ের। এই শহরেই ১৯১ বছর আগে কার্ল হাইনরিখ মার্কসের জন্ম। এখন সেই জন্মস্থান দেখতে উপচে পড়া ভিড়।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে এপ্রিল, ২০০৯ বিকাল ৪:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



