ছেলেটির বয়স ৭~৮ , নাম রাব্বী থাকে কমলাপুর স্টেশনে। খুব মায়াবী মুখ, দেখলেই মনে হয় একটু আদর করি। বাবার সাথে সাথে নিউজ পেপার ফেরি করে বেচে, হয়ত যে সময়টা ওর স্কুলে থাকার কথা সে সময়টা ও ব্যয় করে আমাদের মত মানুষদের তথ্য বিনোদনের খোরাক যোগানোর কাজে। ট্রেন আসলেই ওর ব্যস্ততা বেড়ে যায় চলন্ত ট্রেনে ও লাফ দিয়ে উঠে যায় যাতে ওর পেপারটা সবার আগে বিক্রি হয়, এভাবে চলছিল সবকিছু কিন্তু গোল বাঁধে যেদিন ও একটা খেলনা মোবাইল সেট পছন্দ করে ফেলে ওর কাছে খুব অবাক লাগে জিনিসটা দেখে, কি সুন্দ র !! বোতামে চাপ দিলেই ভিন্ন ভিন্ন গান বাজে ও জানতে পারে জিনিসটার দাম ৬০~৭০ টাকা ,বাবাকে বলার সাহস পায়না আর সৎ মাকে তো নয়ই। কিন্তু কিভাবে এটা পাওয়া যায় এটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে ওর ছোট মাথা আর কাজ করেনা শেষ পর্যন্ত ও ওর বাবাকে বলে, বাবা আমল দেননা ছোট ছেলেপেলে তাদের আবদার শুনলে তো আর জীবন চলেনা । কিন্তু রাব্বীর মন ভাল থাকেনা, থাকবেই বা কি করে , ওর মনটা তো পড়ে থাকে ঐ দোকানে। রাতে ও আবার ওর আব্বাকে বলে, আব্বা একটু বিরক্ত হয়ে বলে "যদি বেশি পেপার বিক্রি করতে পারস তাইলে তোরে একটা অই খেলনা কিইন্যা দিমু", রাব্বী খুব খুশী হয়ে ওর আব্বার গলা জড়িয়ে ধরে, সেই রাতে ওর ভালমত ঘুম হয়না, ভোর হতে না হতে ও চোখ ডলতে ডলতে উঠে পড়ে, কারণ ওর যে আজকে অনেক পেপার বিক্রি করতে হবে।
সকাল থেকেই রাব্বী ওর ছোট্ট পায়ে আর ও দৌড়া দৌড়ি বাড়িয়ে দেয় আর প্রতিটা পেপার বিক্রির পর বারবার টাকা গুলো গুণে দেখে কখন ৬০ টাকা হবে । বেলা বাড়তে থাকলে রাব্বী ছটফট করতে থাকে কখন সে কিনতে পারবে তার শখের মোবাইল । সেই দুপুরে ভাত খায়না রাব্বী বাসী পাউরুটি আর কলা খেয়ে থাকে ,সারাদিন ঘোরাঘুরিতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে ওর ছোট্ট শরীর। একটু জিরানর জন্য থেমে থাকা একটা ট্রেনে উঠে হাতটা জানালায় রেখে পেছনের ছিটে একটু এলিয়ে পড়ে , কতক্ষণ হয়েছে ও বলতে পারেনা আচমকা ওর হাতে কিছু যেন একটা হয়ে যায় ও চিৎকার করে ওঠে তাকিয়ে দেখে ট্রেনের ইঞ্জিন লাগানোর জন্য ট্রেনটা নড়ে ওঠায় ভারী জানালাটা ওর হাতের ওপর পড়েছে ও হাতটা একটু টান দেয়, পারেনা। ব্যাথায় ওর শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে । যখন ওর বন্ধুরা ওর হাতটা জানালা থেকে বের করে ততক্ষণে ওর দুটা কচি আঙ্গুল হাড় ভেজ্ঞে কাটা পড়েছে, রক্তে ভেসে যায় ওর অন্য হাতে ধরে থাকা পেপার গুলো ওর জামার পকেটে রাখা টাকা গুলো , রক্তে ভেসে যায় ওর খেলনা মোবাইল কেনার স্বপ্ন !!
এর প্রায় ১৫ দিন পর আমার সাথে রাব্বীর দেখা হয় কমলাপুর স্টেশনে যেখানে আমরা প্রতি শুক্রবার কাজ করি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন "পথশিশু সেবা সংগঠণ"এর হয়ে, ওর ব্যান্ডেজটা ততদিনে অনেক নোংরা হয়ে গেছে এবং পেকে গিয়ে পুঁজের মত বের হচ্ছে , আমাদের ব্রাদার লুসিও আমাকে বললেন ওকে কাছে নিয়ে আসতে ড্রেসিং করানর জন্য, কিন্তু ওকে কোন ভাবেই কাছে নিয়ে আসতে পারছিলামনা শেষ পর্যন্ত আমাদের এক আপু অনেক আদর করে ওকে কাছে নিয়ে আসে কিন্তু যখনই ওর ব্যান্ডেজটাতে হাত দেওয়া যায় তখনই ও চিৎকার করে ওঠে, শেষে অনেক কলা কৌশল করে ড্রেসিং করান হয়। আমরা সবাই ওকে গোল করে দাঁড়িয়ে সাহস দিতে থাকি ও চিৎকার করে কাঁদে আর আমাদের ঐ আপুকে জড়িয়ে ধরে বলে, "আপুরে আমার বোনরে আমার নানী বেইচ্যা দিছে,আমার মা আত্মহত্যা করছে..আমি কার কাছে থাকবরে আপু"। রাব্বীর জন্য আমাদের প্রত্যেকের চোখে পা নি চলে আসে , আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি ওর দ্রুত সুস্হতার জন্য ।
এই ঘটনার পর, রাব্বী যখন আমাদের কাছে আসত প্রথম প্রথম ও হাতের দিকে কেমন ভাবে যেন তাকিয়ে থাকত এখন ও অনেকটাই মানিয়ে নিয়েছে দুটো আঙ্গুল ছাড়া হাত। মাঝে মাঝে ও শুধু বলে ভাল লাগছেনা, আমি বিভিন্ন রকম গল্প করি ওর সাথে কিন্তু কখনও ওর হাতের এ্যাকসিডেন্টের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করিনা ,আমরা চাইনা ওর দুঃসহ স্মৃতিটা আবার মনে পরুক। আমি ওর বন্ধুদের কাছ থেকে যা শুনেছি ওপরের বর্ণনাটুকু তার ওপর ভিত্তি করে লেখা।
এ শুধু একটা রাব্বীর গল্প, এমন অসংখ্য রাব্বী ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এই ঢাকা শহরে, যাদের খুব ছোট্ট স্বপ্নও পূরণ হয়না আর হবেই বা কিভাবে যেখানে বেঁচে থাকা নিয়েই টানাটানি সেখানে স্বপ্নপূরণ তো দূর অস্ত। আর এই শিশুদের ক্ষুধা এবং দারিদ্র্য কে পুঁজি করে এক শ্রেনীর মানুষ তাদেরকে নিয়ে যাচ্ছে নেশার পথে বাধ্য করছে মাদক পাচারকারী, সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করতে যা আমরা পেপার মিডিয়া তে নিয়মিত পড়ছি, দেখছি কিন্তু আমরা উপযুক্ত ব্যবস্হা নিচ্ছি কি ? শরীরে যেমন একটা ছোট ক্ষতকে লুকিয়ে রেখে আমরা সুস্হ শরীরের আশা করতে পারিনা ঠিক তেমনি এই শিশুদেরকে আড়ালে রেখে আমরাও তথাকথিত Civil সমাজ তৈরী করতে পারিনা।
পুনশ্চঃ রাব্বী ভাল আছে এবং এখন সে পড়াশোনা বেশ ভালই করছে এবং সবচেয়ে বড় কথা সে এখন তার খেলনা মোবাইলটা আচমকা আমাদের কানের কাছে বাজিয়ে চমকে দেয় আর আমাদের এই চমকে যাওয়া দেখে ও হেসে লুটোপুটি খায়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


