আইজ্যাক বাড়ই। লেখক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী। ড. মুহাম্মদ ইউনুসের গ্রামীণ ব্যাংকের তহবিল সরানোর ঘটনা নিয়ে ডেনিস সাংবাদিক টিম হেইনম্যানের ডকুমেন্টারি নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে তোলপাড় চলছে, ঠিক সে সময়ই উইকলি ব্লিটজ-এ লেখা কলামে নিজের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আর মতামত তুলে ধরেছেন তিনি। কলামটি ৯ ডিম্বের প্রকাশিত হয়। কলামের কিছু চুম্বক অংশ বাংলায় অনুবাদ করেছেন বাংলানিউজের সিনিয়র এডিটর আব্দুল হালিম সুমন।
গ্রামীণ ব্যাংকের `দেবতা' খ্যাত ড. মুহাম্মদ ইউনুসকে নিয়ে ডেনমার্কের সাংবাদিক টম হেইমানের সাম্প্রতিক ডকুমেন্টারি দেখে কেউ যদি হতবুদ্ধি হয়ে পড়েন তাহলে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু, দয়া করে কেউ খুব বেশি হতবুদ্ধি হবেন না, কারণ তার প্রতিবেদনটি সত্য। তবে সত্যটা প্রমাণে আরও অনুসন্ধান দরকার। কারণ কিছু বিতর্কের অবসান ঘটাতেই ডকুমেন্টারিগুলো তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল অর্থনীতিকে প্রশান্তিদায়ক একটা অবস্থানে আনার প্রক্রিয়াটা গত দশ বছরে বেশ পিছিয়ে পড়েছে। আর দরিদ্রের ব্যাংক হিসেবে খ্যাত গ্রামীণ ব্যাংকের এখন যে অবস্থা তা থেকেই উত্তরণের জন্য কম করে হলেও ২০ থেকে ২৫ বছর সময় লাগবে। দেশের ভাবমূর্তি এবং বিচার ব্যসস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে গ্রামীণ ব্যাংকের আচরণের প্রতিবাদ না করলে বাংলাদেশের সরকার এবং জনগণকে এখন চরম মূল্য দিতে হবে। প্রামীণ ব্যাংকের প্রতারণার সর্বশেষ প্রমাণ হচ্ছে টম হেইনেমানের এই ডকুমেন্টারি।
আমেরিকায় বসে ড. ইউনুসের মিথ্যাচারের খবর শুধু ইউরোপ থেকেই ভিডিও, সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে দেশটির বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ধারাবাহিকভাবে এসব প্রচার গ্রামীণ ব্যাংকের এতদিনের অর্জন মলিন করে দিয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারাজীবন ঔপনিবেশিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত `মহাজনী' ও `জমিদারী' প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। পুরো বাংগালি জাতিও তাঁর নেতৃত্বে অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিল। বঙ্গবন্ধুই ছিলেন এশিয়ার প্রথম প্রগতিশীল নেতা, যিনি জাতিকে ঔপনিবেশিকতার শৃংখল থেকে মুক্ত করেছিলেন। এশিয়ার রাজনীতিতে এনেছিলেন নতুন চিন্তাধারা আর পরিবর্তন। বাংলাদেশ এখন নতুন একটা বাস্তবতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিস্তু, ুদ্রঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক কেলেংকারি বাংলাদেশকে নতুন করে পরীক্ষর মুখে ফেলে দিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্র ঋণ নিয়ে সাম্প্রতিক বিতর্ক কিছু পরষ্পর বিরোধী বিষয়কে আলোতে নিয়ে এসেছে। এরই মধ্যে নোবেল কমিটি তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে বড় ধরণের সংকটে পড়ে গেছে।
ইউনুসের বেশ কয়েকটি কনফারেন্সে আমার প্রতিনিধিত্ব করার সৌভাগ্য হয়েছিল। অধিকাংশ সময়ই আমি নিরব থেকেছি আর ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে তার অর্জন সম্পর্কিত বক্তব্য আর বাস্তবতার মিল খোঁজার চেষ্টা করেছি। অধিকাংশ সময়ই আমি বুঝতেই পারতাম না যে, এই চতুর মানুষটি কীভাবে তার নিজের দেশের সঙ্গে প্রতারণা করছে? কিন্তু, তৃণমূলে ইউনুসের সততা সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার সময় কিংবা সুযোগ খুব কম মানুষই পেয়েছেন।
ইউনুস তার কথাবার্তা, আচার-আচরণেই নিজেকে চিনিয়ে দিয়েছেন। এসবের মধ্য দিয়েই প্রমাণ হয়েছে তিনি কখনোই জনগণের মতায়ন, জনগণের উন্নয়নে বিশ্বাস করতেন না।
তার সব বক্তৃতাতেই বলতেন, `আমি এটা করেছি, ওটা করেছি, আমি ঋণ দিয়েছি--- আমি, আমার--- আমার ব্যাংক'-এভাবেই তিনি বলতেন। অনেকটা ছোটখাটো একজন ঈশ্বরের মতো।
এই মানুষটি এখন নিজেকে আত্মতৃপ্ত, গর্বিত একজন মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছেন। বাংলাদেশের মানুষ কি তার সম্পর্কে কিছুই ভাবছে না? একজন মানুষ কীভাবে তার দেশের সঙ্গে, তার জন্মভূমির সঙ্গে এই কাজ করতে পারে? তাকে সবসময়ই আমার কাছে মনে হয়েছে একজন নিষ্ঠুর মহাজন কিংবা জমিদারের মতো।
তিনি যে শ্রমজীবী মানুষের কাছে সবময়ই অশ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন তার কিছু প্রমাণও আমি পেয়েছি।
গত আগস্টে জর্জিয়ার অ্যাগনেস স্কট কলেজে মুহাম্মদ ইউনুসের দেওয়া বক্তৃতাকে এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়। সেখানে তিনি বলেছিলেন, সেপ্টেম্বরে পাঁচ হাজার জুতা বাংলাদেশে আমদানি করা হবে। বিশ্বখ্যাত এডিডাস কোম্পানি এই জুতা রপ্তানি করবে। উদ্দেশ্যটা ছিল ঐতিহাসিক, এই জুতা ব্যবহারে বাংলাদেশের মানুষ বেশ কয়েক ধরণের জীবাণু এবং কৃমির সংক্রমণের হাত থেকে রা পাবে।
গ্রামীণের তত্বাবধানে ভিটামিনযুক্ত দই তৈরির আগেও বাংলাদেশের হাড্ডিসার, অপুষ্ট শিশুদের আট মাসের মধ্যে স্বাস্থ্যবান করে তোলার মতো যেসব কথা বলা হয়েছিল, জুতা আমদানির ক্ষেত্রেও তাই করা হলো।
এরপর তিনি জানান, পানিতে আর্সেনিক থাকায় বাংলাদেশের মানুষ প্রতিনিয়তই বিষ খাচ্ছে। তার সংগঠন ১৫টি গ্রামে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মধ্য দিয়ে কি অসাধ্য সাধন করেছে তারও বর্ণনা দেন তিনি। এসবই তিনি করেছিলেন শ্রতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করতো।
ইংরেজিতে দেওয়া বক্তৃতায় তিনি যেসব শব্দ ব্যবহার করতেন, তা শুনে শ্রতা সহজেই বোকা বনে যেত। তার চতুরতাপূর্ণ এসব কথা শুনে দৃর্বলচিত্তের মানুষ খুব সহজেই কথার ফাঁদে পা দিত। বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলার অসাধারণ দতা ছিল তার।
যাই হোক, এডিডাসই বা কীভাবে ভাবলো যে বাংলাদেশের মানুষ আগে কখনই জুতা ব্যবহার করেনি? ব্যাপারটা অনেকটাই জুতা আবিস্কারের মতই!
অল্প সুদে ঋণ দেওয়ার জন্য সবসময়ই গর্ববোধ করেন ইউনুস। দরিদ্রদের খাদ্য আর বাসস্থান আছে, দারিদ্র্য এখন জাদুঘরে-এমন দাবিও করেন তিনি। কেন তাহলে দ জনশক্তির একটি দেশ বাংলাদেশে ইউনুস এডিডাসের জুতা আমদানি করেন? এরমধ্য দিয়ে দরিদ্র মুচিদের বেকার করে দেওয়া হবে। অথচ আমেরিকার শ্রতারা ভাবছের জুতা আমদানি করে ইউনুস বাংলাদেশকে কৃমির সংক্রমণ থেকে বাঁচাবেন।
আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে এমন অনেক নারী-পুরুষ আছেন যারা বিশ্বমানের শিল্প প্রতিষ্ঠানে জায়গা করে নেওয়ার মতা রাখেন। এডিডাসের জুতা আমদানি করে অসহায় মুচিদের বেকার করা, তাদের ব্যবসার তি করার কোনো প্রয়োজন নেই গ্রামীণ ব্যাংকের। কেন তারা মুচিদের স্বল্পসুদে ঋণ দেয় না? কেন তাদের ঐক্যবদ্ধ করে না? কেন তাদের তৈরি জিনিস ইউরোপে রপ্তানি করে না।
ইউনুস প্রায় গর্বভরে বলেন, `আমরা আইনজীবীমুক্ত ব্যাংক করেছি। যদি সেটাই হয়, তাহলে সেখানে ক্ষুদ্রঋণ দর্শন থাকে কি করে? যা বাংলাদেশের মতো গরিব দেশের ক্ষদ্র ব্যবসাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এটি কি ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থাপনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি নাকি নির্জলা প্রতারণা?
গ্রামীণ ব্যাংক সূত্রমতে, প্রতিমাসে দশ কোটি ডলার ঋণ বিতরণ করা হয়। কেন তাহলে দরিদ্রদের ঐক্যবদ্ধ করা হয় না? কোনো সন্দেহ নেই ড. ইউনুস অল্প কিছু ডলারকে শতকোটি ডলার বানিয়েছেন।
ক্ষুদ্র ঋণের ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকারের বিষয়টিকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাহলেই সত্যিকার অর্থে উন্নতি আসবে। যারা টাকা দেয় তারা কেন আইনের ঊর্ধ্বে থাকেন? কারণ তারা টাকা দেন। এটা কি অন্যদের জন্য ভালো? এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। শঙ্কার কথা হচ্ছে এই জানার কাজটিই হচ্ছে না। প্রশ্ন উঠতে পারে না জানাটা কি অন্যায় হচ্ছে? মানুষের টাকার নিরাপত্তা এবং সততার কি হবে?
এটাও আমাদের বুঝতে হবে যে, আমরা যখন টাকা এবং জনগণকে নিয়ে কাজ করি তখন সব সময়ই ভালো কিছু হয় না। আমরা যদি জনগণের টাকার প্রতি বিশ্বাসী হই তাহলে অনেক সময় ব্যর্থতাও বড় ধরণের সাফল্য বয়ে আনতে পারে।
আমেরিকার মত মুক্তবাজার অর্থনীতির দেশে জনগণ যে কোনো বড় ধরণের দুর্নীতি নিয়ে প্রশ্ন তোলে এবং মানবাধিকার আইনের পরিবর্তন দাবি করতে পারে। যদিও পুঁজিবাদী আমেরিকার ইতিহাসে শ্রম আইনই হচ্ছে মূল চাবিকাঠি।
বাংলাদেশের সরকারের জনগণের এসব ভোগান্তির কথাগুলো দলিল হিসেবে সংরণ করা উচিত। বাংলাদেশের গনগণকে দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলতে হবে, তা না হলে এই দেশ বারবার ইন্টারন্যাশনাল মানি গেম, লুকোচুরির শিকার হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


