বাংলা সাহিত্যের সপ্ন পুরুষ মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁকে নিয়ে লেখার দুঃসাহস করেছি। নিজের মনের গভীর থেকে এই মহান লেখককে স্বরণ করি শ্রদ্ধার সঙ্গে।
“শহরে, গ্রামে, রেলস্টেশনে ও জাহাজঘাটে শান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। শেষ রাতে ভাঙা ভাঙা মেঘে ঢাকা আকাশে ক্ষীণ চাঁদটি উঠে। জেলে নৌকার আলো গুলি তখনো নেভে না।”
এভাবেই জেলে পাড়ার জেলেদের জীবন সংগ্রামকে সাহিত্যের পাতায় তুলে এনেছিলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর পদ্মানদীর মাঝি উপন্যাসে। কুবের মাঝিকে দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে নিুবিত্ত এই মানুষগুলোর দুঃখ-দুর্দশার গভীরত্বে পৌছে গিয়েছিলেন মানিক। তাঁর বর্ণনায় যেন পাঠকের চোখের সামনে ভেসে উঠে জেলে পল্লির চিত্র। অতীতে কেউ কখনো এই অন্ধকারে থাকা মানুষগুলোর দিকে তাকিয়েছিলেন কিনা আমার জানা নেই। তবে মানিক তাকিয়েছিলেন। তাঁর সৃষ্ট এই অনবদ্য উপন্যাসে তাদের কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন,
ক্ষুধাতৃষ্ণার দেবতা, হাসিকান্নার দেবতা, আত্মার দেবতা, ইহাদের পূজা কোনদিন সাঙ্গ হয় না। এ দিকে গ্রামের ব্রাক্ষ্মণ ও ব্রাক্ষ্মণেতর ভদ্রমানুষগুলি তাহাদের দূরে ঠেলিয়া রাখে, ও দিকে প্রকৃতির কালবৈশাখী তাহাদের ধ্বংস
করিতে চায়, বর্ষার জল ঘরে ঢোকে। শীতের আঘাত হাড়ে গিয়ে বাজে। আসে রোগ, আসে শোক।
আর তাই মানিক ঈশ্বরকে কটাক্ষ করে বলেছেন,
ঈশ্বর থাকেন ঐ ভদ্র পল্লীতে।
মানিকের লেখায় ফুটে উঠেছে গ্রাম্য চিত্র। এবং সেখানকার কিছু চরিত্র। অনেক চরিত্রের জটিলতাও তুলে ধরেছেন আপন দক্ষতায়। তাঁর লেখায় পাওয়া যায় জীবনের বাস্তব রূপ। উচ্চবিত্ত থেকে নিুবিত্ত সব স্তরই উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। তুলে ধরেছেন প্রতিটি স্তরের মাঝে সামাজের টেনে দেয়া রেখা। আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন সমাজের ব্যবধানকে। যুক্তি-তর্কে আবার সেই ব্যবধানকে খন্ডন করতেও পিছপা হননি মানিক।
যেমন, তাঁর আরেক উপন্যাস শহরবাসের ইতিকথা। সেখানে তিনি গ্রাম ও শহরের মানুষের পার্থক্য তুলে ধরেছেন। ইন্ডাইরেক্টলি গ্রামের শিক্ষিত মানুষগুলোর শহরে ভিড় করাকে কটাক্ষ করেছেন। এই উপন্যাসটিতে মূল চরিত্র মোহন এবং জগদানন্দের আলাপচারিতা পড়লেই বোঝা যায়।
লোকে বলে শুনতে পাই শিক্ষিত আর ধনীরা গ্রাম ছেড়ে চলে আসে বলে গ্রামের আরও অবনতি হয়। তার মানে বুঝতে পারি না ভাই।
এখানে, সমাজের শিক্ষিত মানুষগুলোর গ্রামে অবস্থান না করার জন্য তাদের সরাসরি না বলে মানিক একটু চালাকির আশ্রয় নিয়েছেন। তাই শুরুতেই উল্লেখ করে নিয়েছেন “লোকে বলে”। আবার সাথে সাথেই গ্রামে না থাকার যুক্তিও দিয়েছেন।
শিক্ষিত আর ধনীরা গ্রামে থেকে গ্রামের এতটুকু উন্নতি করে? কোনো দেশ করেছে? শিক্ষিতেরা বেকার বসে থাকে, ধনীরা টাকা খরচ করতে না পেরে টাকা আটকে রাখে। ওরা শহরে এলেই বরং শহরের উপকার বেশী। শহরের উন্নতি না হলে গ্রামের কখনো উন্নতি হয়?
যুক্তিগুলো মানিক তুলে ধরেছেন ঠিকই। কিন্তু তা ভাববার দায়িত্ব তিনি যেন তাঁর পাঠকের কাছেই ছেড়ে দিয়েছেন। মানিক তাঁর এই উপন্যাসটিতে বাস্তবতা তুলে ধরেছেন নিখুঁত ভাবে। মানিক বার বার মানুষের স্বার্থপরতা স্বভাবে আঘাত করেছেন। বিশেষ করে শহরের মানুষের স্বার্থপর হয়ে উঠা উল্লেখ করেছেন বার বার।
শহরের লোক যে যার নিজেকে নিয়ে থাকে, কেউ কারো দিকে ফিরেও তাকায় না। পাশাপাশি বাড়ি, এক বাড়ির লোক জানেও না আরেক বাড়ির লোকেরা কি করে বেঁচে আছে, কেয়ারও করে না। মড়াকান্না শুনলেও একবার উকি মেরে দেখতে যায় না কে মরল। কেবল তাই নয়, বছরের পর বছর ধরে যাদের মধ্যে মেলামেশা ঘনিষ্ঠতা চলেছে তাদের মধ্যেও শুধু থাকে একটা বাইরের সম্পর্ক। বন্ধুত্ব হয় না, হ্রদয়ের যোগাযোগ হয় না।
এরও যুক্তি সঙ্গে বর্ণনায় এনেছেন তিনি। আমি একটি লাইন উল্লেখ করতে পারি।
বিশ্বপ্রেমিক সমষ্টিগতভাবে পৃথিবীর সব মানুষকে ভালোবাসতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে ক’জনের জন্য নিজের মনকে কাঁদাবার ক্ষমতা রাখে?
প্রশ্ন, প্রশ্নকে তীরের মত ছুড়ে দিয়েছেন সমাজের মানুষগুলোর বিবেকে। সমাজের স্বার্থপর, বিবেকহীন, সুযোগ সন্ধানী মানুষের চরিত্র গুলোকে অসাধারণ কৌশলে তুলে ধরেছেন তিনি। আবার সমাজের কিছু সরলমনা অন্ধবিশ্বাসী মানুষগুলোকেও তিনি বাদ দেননি। তাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে এই একই উপন্যাসে তিনি এক ম্যাজিশিয়ানের গল্পের উল্লেখ করেন। ম্যাজিশিয়ান ম্যাজিক দেখানোর পর তার ম্যাজিকের ফাঁকির তথ্য ফাঁস করে দেন। কিন্তু এক দর্শক জোর দাবি জানিয়ে বলেন, অলৌকিক শক্তি ছাড়া এ কাজ সম্ভব নয়। এই সব অন্ধ বিশ্বাসী মানুষের জন্য তিনি উপন্যাসে উল্লেখ করে বলেন,
ভুল হইলেও যা বিশ্বাসের জোরে ঠিক, মিথ্যা হইলেও যা বিশ্বাসের জোরে সত্য, যুক্তিতর্কের বিরুদ্ধে যা টিকিতে পারে।
অন্ধবিশ্বাস কিংবা কুসংস্কার তৈরী করে কিছু মানুষ। তাদেরও ছাড়েননি তিনি। তাঁর আরেক অনবদ্য উপন্যাস পুতুল নাচের ইতিকথায় একটি চরিত্র যাদব। সূর্যবিজ্ঞানে পারদর্শী যাদব দাবি করে যে রথের দিন তাঁর প্রাণ বিয়োগ হবে। আধ্যাতিক মানব হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম ছড়িয়ে পড়ে তার ক্ষ্যাতি। একটি মিথ্যা ঘোষনা পাগল করে দেয় মানুষকে। তখনই মানিক বলেছেন,
নির্লোভ সদাচারী শান্তিপূর্ণ নিরীহ মানুষ, মানুষের কাছে অপার্থিব ক্ষমতার অধিকারী হইয়া থাকিবার কামনাও পার্থিব কোন লাভের জন্য নয়। ও যেন একটা শখ যাদবের, একটা খেয়াল।
যাদবের নৈকট্য লাভ ও দেহ ত্যাগ দেখার জন্য গ্রামে মানুষের ভীড় জমে গেছে। এসব দেখেও যাদব বিচলিত হয় না। সেও রথের দিনের অপেক্ষায় মগ্ন হয়ে যায়। নিজ ইচ্ছায় দেহ ত্যাগ করবে যাদব। কিন্তু এতো গ্রামবাসীর জানা নাই। তারা জানে যাদব সূর্যবিজ্ঞানের জ্ঞান থেকে অলৌকিক ভাবে জেনেছে তার প্রাণ যাবে রথের দিন। এক পর্যায়ে যাদবের দেহ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। সেচ্ছায় দেহ ত্যাগ করা যাদবের ঘটনা সবার কাছে অলৌকিক হয়েই রয়ে যায়। তখনই মানিক উল্লেখ করেন এক অসাধারন বাক্য।
সত্য-মিথ্যার জড়ানো জগৎ। মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকাল সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা।
শ্রেনী বৈষম্য, শোষণ, সামাজিক অসঙ্গতি, কুসংস্কার সব কিছুর বিরূদ্ধে সোচ্চার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়। চরম বাস্তব সত্যরই স্বপ্ন পুরুষ মানিক। তাঁর লেখনীতে তাঁর মোনোভাব তিনি নিজ সৃষ্ট চরিত্র গুলো দিয়ে বর্ণনা করেছেন। এ সম্পর্কে মানিক তাঁর এক সাক্ষাতকারে উল্লেখ করেছেন, “লেখা ছাড়া অন্য কোন উপায়ে যে সব কথা জানানো যায় না সেই কথাগুলি জানানোর জন্যই আমি লিখি।”
অথচ এই মহান লেখক তাঁর সারাটা জীবন কাটিয়েছেন নির্জন, বন্ধুহীন, একাকী। আর তাই তাঁর কোন লেখা তিরি কারও উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করেননি। শুধুমাত্র “স্বাধীনতার স্বাদ” (১৯৫১) উপন্যাসটি তিনি আপামর জনসাধারণকে উৎসর্গ করে গেছেন।
মহান এই সাহিত্যিক, লেখকের জন্মবার্ষিকী ছিল ১৯শে মে। তাঁকে নিয়ে এই দিনটি নিয়ে বাংলার কয়টি ঘরে আলোচনা হয়েছে আমার জানা নেই। আমি শুধু এতটুকু বলতে পারি মহান এই সাহিত্যিকের কথা সাহিত্য জগতে যেন হারিয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে একাকী মানুষগুলোকে যে লেখক বার বার তুলে এনেছেন । সেই লেখক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় যেন এখন অন্ধকারে, একাকী।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


