somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুগে যুগে ইসলামের পরিবর্তনশীল দর্শন- ০১

০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

যে কোন কিছুর জন্ম হলে তার পেছনে থাকে দীর্ঘ ইতিহাস। যুগে যুগে তাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য কিছু মানুষ পৃথিবীতে তাদের নিজ জীবনকে ত্যাগ করেন। তারাই মূলত দর্শনতত্ত্ব দিয়ে সমস্ত কিছুর ব্যাখ্যা করার প্রয়াসে লিপ্ত হন। আবার পরবর্তী যুগে সেই তত্ত্ব থেকে ছিটকে গিয়ে তৈরী হয় নতুন দর্শনের। এভাবে আজকে পৃথিবীতে সব-কিছুই একটি দীর্ঘ পরিবর্তন এর মধ্য দিয়ে এসেছে। ধর্মও এর বাইরে নয়। ইসলাম ধর্ম তাঁর বিভিন্ন মত ভেদ নিয়ে এখনো পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত ধর্ম। নানা ধরনের দার্শনিক চিন্তা, যক্তি- তর্কের ভেতর দিয়ে, নানা শাখা প্রশাখার উদ্ভব করে, একটি পরিপূর্ণ পরিবর্তনশীল সিস্টেমের মধ্য দিয়ে আজকের ইসলাম ধর্ম। সেই পরিবর্তন, সেই সকল দর্শন নিয়ে আমি ধারাবহিক ভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করবো আমার পোষ্টগুলো। যার শেষ হবে সূফীবাদের মধ্য দিয়ে।

ইসলাম ধর্মের কথা শুরু করতে গেলে ফিরে যেতে হয় তার জন্মস্থান আরবে। যা ছিল বালিময় একটি শূণ্যস্থান। থাকার মতো স্থান ছিল একমাত্র উপকুলীয় অঞ্চল। এই অঞ্চলেই সুপ্রাচীন কাল হতে সংস্কৃতির চর্চা হয় এবং তারা বিশ্ব-বানিজ্যে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু সমস্যাটা দেখা দেয় ষষ্ঠ শতকে আরবের জনগণ প্রাচীন লোককাহিনী দ্বারা আক্রান্ত হয়ে বর্বর জীবন শুরু করে। দেশের অন্যতম প্রধান স্থান মক্কা তখন বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে প্রাধান্য পায়, মদ, নারী, জুয়ার আসর ইত্যাদি। যতোসব অনৈতিক কর্মকান্ডে লিপ্ত হয়ে পড়ে তারা। ধর্ম সেখানে হয়ে পড়ে আক্রান্ত। তারা দেব-দেবী, মূর্তি পূজা শুরু করে।
তবে আরবের কোথাও কোথাও মহান চিন্তার মানুষের বসবাস ছিল। উন্নত দর্শন চিন্তায় তারা মগ্ন থাকতো। এসকল জ্ঞানী ব্যক্তিরা মাঝে মাঝে মরুযাত্রীদের সঙ্গে ক্ষুধার তাড়নায় জনবহুল স্থানে চলে আসেন। তাদের সংস্পর্শে এসে একদল উচ্চ-ভাবনা সম্পন্ন সংস্কারকদের উদ্ভব হয়। ইতিহাসে তাদের হানীফ নামে পরিচয় দেয়া হয়েছে। তারা মানুষদের পরিশুদ্ধ করতে ও মানবচিত্তকে ঈশ্বরাভিমুখী করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যান।
এই পরিস্থিতিতে পৃথিবীতে আসেন ইসলাম ইতিহাসের শেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করে তিনি মানুষের দুঃখ-দুর্দাশাকে খুব কাছ থেকে দেখেন। যা তাঁর হৃদয়ে রেখাপাত করে। এবং চারপাশের মানুষগুলোর অধঃপতন নিয়ে তিনি বেশ চিন্তিত হয়ে হেরা পর্বতে তাঁর নির্জন তপস্যা ও ধ্যানে মগ্ন হন। যা তাঁর মরমী চিত্তে এক গভীর ধর্মানুভূতি সৃষ্টি করে। এতে তিনি এক মহান অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। জীবন সম্পর্কে তিনি ধর্মীয় এক নতুন দর্শনের সূত্রপাত করেন।
তাঁর প্রচারিত ধর্মমত কোনো জটিল কিছু ছিল না। পবিত্র কোরআনে আছে, আল্লাহপাক মানুষের উপরকার ভারকে সহজ ও লঘু করতে চান। নবী প্রচার করতে শুরু করেন, আল্লাহ এক এবং অদ্বিতীয়। এবং মুসলমানের দৈনন্দিন প্রধান কাজ নামায। ধর্মের প্রধান স্তম্ভ বলতে তিনি বলেন, রোজা, যাকাত, হজ্ব, এবং আল্লাহর শেষ নবী হিসেবে মোহাম্মদ (সাঃ) কে বিশ্বাস করা।
তিনি সমাজে সমতা ও ভাতৃত্ববোধ ঘোষনা। যা সকলের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠে। তিনি আল্লাহর কাছে সকল মানব জাতিকে আত্মসমর্পন করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার সমস্ত মহিমাকে তিনি তুলে ধরছেন সারা বিশ্বের কাছে। আস্তে আস্তে সারা বিশ্বে নবীর জনপ্রিয়তা ছড়াতে থাকে। তাঁকে আল্লাহর বার্তা বাহক হিসেবে স্বীকৃতকারীদের সংখ্যা দিন দিন বাড়তে থাকে। আর তাই নবী (সাঃ) শুধু একটি ধর্মের প্রবর্তকই ছিলেন না তিনি ছিলেন একটি জাতির স্রষ্টা ও নেতা।

সমস্যাটি হয় তাঁর পরলোকগমনের পর। তিনি চলে যাওয়ার কিছুকাল পরেই ইসলাম ধর্মে একাধিক স¤প্রদায়ের উদ্ভব হয়। বলা বাহুল্য ইসলাম ধর্মে তিনি চলে যাওয়ার পরই প্রবেশ করে রাজনীতি। রাজনীতির কারণে বিভাজন শুরু হয় ইসলামে। প্রথম দিকে খারিজি, শীয়া, মুরজিয়া, কাদিরিয়া ইত্যাদি স¤প্রদায়ের উদ্ভব হয়। সাথে সাথে বিভিন্ন স¤প্রদায়ের মতাদর্শও তৈরী হয়।
এগুলোর মধ্যে এই পর্বে আমি শীয়াদের নিয়ে আলোচনা করবো।

শীয়ারা খুব দ্রুত পারস্যে বিস্তার লাভ শুরু করে এবং তাদের মতাদর্শ অবলম্বন করতে শুরু করে অনেকে। তারা মূলত ঘুলুব ও তাকসীরে বিশ্বাস করতো। ঘুলুব বলতে তারা বোঝাতো, মানুষ ঈশ্বরের মর্যাদায় উন্নিত হতে পারে। এবং তাকসীর বলতে বোঝাতো, ঈশ্বরও মানোবায়িত হতে পারেন। এসব তত্ত্বের প্রভাবে তারা তাদের আধ্যাত্বিক নেতাকে দিব্যমর্যাদা দিতো।
শীয়াদের মধ্যেও বিভিন্ন উপস¤প্রদায়ের তৈরী হয়। যেমন, আলী-ইলাহিয়া ছিল একটি চরম শীয়া উপস¤প্রদায়। এরা আলীকে নেতা মানতো। এরা কোনো আনুষ্ঠানে বিশ্বাস করতো না, তারা বহুবিবাহ ও তালাক সমর্থন করতো না, তবে বিবাহৎসবে নারী-পুরুষের মিশ্র নৃত্য অনুমোদন করতো। তাদের মানুষ সম্পর্কে দর্শন ছিল, মানুষ যুক্তি এবং লালসা এ দুই প্রবণতা দ্বারা চালিত। তাদের দর্শন চিন্তা মধ্যমণী থাকতেন একজন পীর।
অনেক শিয়ারা কোরআনের প্রকাশ্য সরল অর্থ বিশ্বাস করতো না। তারা মূলত কোরআনকে রূপক অর্থে ব্যাখ্যা করতো। তাদের দর্শনে প্রার্থণা বলতে বোঝাতো, ইমামের কাছে প্রার্থনা, যাকাত বলতে বোঝাতো, ইমামকে দান, তীর্থগমন (হজ্ব) বলতে বোঝাতো ইমাম দর্শনে যাওয়া। কারণ, শিয়ারা প্রচন্ডভাবে ইমামমতে বিশ্বাসী ছিল। হযরত আলী (রাঃ) এর দুই পুত্র ইমাম হাসান ও ইমাম হোসেন এর মৃত্যুর পর ইসলামে রাজনৈতিক আধিপত্য একটু কমে যায়। শীয়ারা তখন নেতৃত্বের আশা দেখে। তাই হযরত আলীর বংশ উত্তরাধিকার সূত্রে স্বীকৃত পেয়ে যায়।
প্রাচীন শীয়া স¤প্রদায় থেকে পরবর্তী সপ্তবাদী ও দ্বাদশবাদী স¤প্রদায়ের উদ্ভব হয়। প্রথমটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন আবদ আল্লাহ ইবনে মায়মূন। তিনি মুলত ছিলেন একজন সংশয়বাদী। ধর্মে আরব প্রাধান্য উচ্ছেদ ছিল তাঁর প্রধান লক্ষ। তাঁর দর্শনে সপ্তম সংখ্যার একটি বিশেষ রহস্যময় গুরুত্ব ছিল। তিনি প্রচার করতেন, প্রেরিত পুরুষ ছিলেন সাতজন ও প্রেরিত পুরুষের মধ্যে রয়েছেন সাতজন ইমাম। তিনি নিজেই ইমামদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ। তাঁর দর্শনে, ঈশ্বর পরমসত্তা, তিনি নির্গুনম, তিনি নিত্যবর্তমান, তাঁর চিন্তা থেকে দ্বিতীয় সত্তা বা ঈশ্বরের উদ্ভব হয়, যিনি জগৎ সৃষ্টি ও শাসন করেন।

এভাবেই প্রতিটি পর্যায়েই একজন করে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ক্ষমতায় গিয়ে নিজেস্ব দর্শন ও চিন্তার প্রতিফলন ঘটান নিজ নিজ গোষ্ঠীতে। এবং প্রতিটি ধাপ গুলোর মধ্যে মতভেদ থাকায় তারা একপক্ষ আরেক পক্ষ থেকে বিভাজিত হয়ে পড়ে।
অন্য স¤প্রদায়গুলোর মধ্যে মতভেদের কারণে বিভাজন ঘটে যেমন, একেক মুসলীম দার্শনিকগণ একেক প্রশ্নে আলোড়িত হতেন, সেসব হচ্ছে আল্লাহর স্বরুপ, সৃষ্টির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক, আত্মার প্রকৃতি ইত্যাদি। এবং এই প্রশ্নগুলোর উত্তর একেক জন একেক ভাবে দিতেন। তখনই তৈরী হতো দর্শনের মতভেদ।

শীয়াদের পাশাপাশি সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী যেই স¤প্রদায়; তারা হচ্ছে মুতাযিলা। এরা ইসলাম ইতিহাসে যুক্তিবাদী নামে খ্যাত। আমরা পরবর্তী পর্বে এই স¤প্রদায়ের দর্শন তত্ত্ব ও ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করবো।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১১:৪৫
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×