শুরুতে খুব কষ্ট পেতাম। ভাবতাম, যে মানুষটির জীবিত থাকার সম্ভাবনা নাই সে মানুষটি অন্যের কাছে কতটা অবহেলার পাত্র হয়ে যায়। সেই অবহেলাটা আমার মনের একদম গভীরে গিয়ে আঘাত দিতো। যখন ওয়ার্ডের লাইটগুলো বন্ধ হয়ে যেতো আমি তখন ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতাম। এই অবহেলা শুরুতে কষ্ট দিলেও এখন খুব হাসি পায়। মনে মনে বলি, আরে প্রতিটা মানুষই তো আ পেষেন্ট ফর ডেথ। এটা মনে হয় সবাই ভুলে যায়। রোগীদের দিকে সবাই যেভাবে করুণার দৃষ্টিতে তাকায় তাতে মনে হয় মৃত্যু যেনো শুধু এই মানুষগুলোর জন্যই; তাদের যেনো মৃত্যু বলে কিছু নেই। তারা ভুলে ভাবেও না যে, হয়তো এই রোগীটার আগেও তার মৃত্যু হতে পারে। এই তো সেদিন, আমার পাশের বেডে একটা ছেলে ছিল। তারও ক্যান্সার। ধীরে ধীরে সে মৃত্যুর দিকেই এগুচ্ছে। সেই ছেলেটির নাম ছিল সবুজ। সবুজকে ওর চাচা সেদিন দেখতে আসলো। সে কি কান্না লোকটার। বার বার শুধু বলছিল, কেন তুই আমাগো ছাইরা এত সকাল চইলা যাবি। দূর্বল সবুজ চুপচাপ শুনছিল। সবুজের কোন বিকার ছিল না। তো, সেই লোকটি হাসপাতালের সিড়ি দিয়ে নামার সময় হঠাৎ বুকে ব্যাথা হয়। সাথে সাথে অজ্ঞানও হয়ে যায়। পরে দৌড়া-দৌড়া করে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো ডিউটি ডাক্তারের কাছে। দেখা গেলো লোকটির পাল্স পাওয়া যাচ্ছে না। তার কিছুক্ষণপর বলা হয়, উনি মারা গেছেন। সবুজ সংবাদটি শোনার পর মিষ্টি একটি হাসি দিয়ে আমাকে বলছিল, দেখছেন রাশেদ ভাই, এহন কে কারে ছাইরা গেলো।
কি অদ্ভুদ মানুষের মৃত্যু! মৃত্যু হয়তো এমনই হয়। আকষ্মাত হামলে পড়ে। কখন কিভাবে কোথায় আসবে তাও কারও জানা নেই।
তবে মৃত্যু ব্যপারটার সাথে আমার পরিচয় অনেক পুরাণ। একে আমি দেখতে দেখতে অভ্যস্থ হয়ে গেছি। মৃত্যুর আক্রমণে আমি ভয় নামক বস্তুটাকেও হারিয়ে ফেলেছি।
শুরুতেই এর সাথে পরিচয় করিয়ে দেন আমার বাবা। বাবা। শব্দটা কেমন যেনো! তাই না? বাবা মানেই যেনো কোন ভয়! অনেক বাধা। বাবা মানে বট গাছ। জীবনের নিশ্চিত নিরাপত্তা। বাবা মানে পৃথিবীর সমস্ত বাধাকে ডিঙিয়ে পাড়ি দেওয়ার প্রেরণা। বাবা মানেই বুকে বল।
আর আমি সেই বাবা নামক বটগাছটাকে ভেঙে যেতে দেখেছি। এক ভয়ঙ্কর সত্ত্বাকে আমি দেখেছি জীবনের কাছে পরাজিত হতে। এক শক্তিশালী সাহসী মানুষকে আমি দেখেছি তিলে তিলে মৃত্যুর কাছে পরাজিত হতে। বাবার কথা মনে হলে, একটা চাপা অপরাধবোধ জেগে ওঠে।
বাবাকে আমি প্রচন্ড ভয় পেতাম। বাবা যখন হাসপাতালের বেডে শরীর এলিয়ে শুয়ে থাকতো। তখন আমাকে পাশে পেলেই বলত, এই ছাগল, দাড়িয়ে আছিস কেন? আমার পাশে বস। ভয়ের কারণে বাবার থেকে একটু দূরে দূরে থাকাটা আমার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। বাবা কাছে ডাকলে আমার বুকটা ধক ধক করা শুরু করতো। তাই বাবার পাশে বসতেও আমার অস্তস্থি লাগত। তারপরও বাবা বলেছে তাই বসতে হবে। তাই একটু বসতাম। বাবা তখন আমার হাতটা তার ঠোটের সাথে লাগিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকতো। আর বাবার গরম নিশ্বাসটা আমার হাতে এসে লাগতো ব্যপারটা আমার মোটেও ভালো লাগতো না। তারপরও বসে থাকতাম। উঠে গেলে বাবা যদি রাগ করে!
একদিন ঠিক একই ভাবে বাবা আমাকে কাছে ডাকলেন। আমার হাত বাবার ঠোটের সাথে লাগানো। আমি তখন অস্বস্তি নিয়েই বসে আছি। হঠাৎ অনুভব করলাম, বাবার নিশ্বাস আমার হাতে এসে পড়ছে না। আমি সাথে সাথে তাকালাম বাবার দিকে। দেখি, বাবা চোখ বন্ধ করে মরার মতো ঘুমাচ্ছে। অপেক্ষা করলাম, বাবার নিশ্বাস আমার হাতে এসে লাগবে। কিন্তু না। লাগছে না। চিৎকার করে নার্সকে ডাকি। নার্সকে বলি, দেখেন বাবা কেমন মরার মতো ঘুমাচ্ছে। নার্স পালস চেক করে বলল, মরার মতো ঘুমাচ্ছে না বাবা। উনি একদমই ঘুমিয়ে গেছেন।
সেদিন থেকে বাবার সামনে সেই অস্বস্তিবোধের জন্য অপরাধবোধ হয়। পিতা একমাত্র সন্তানের হাত ধরে বসে মৃত্যুর সাথে লড়তে চাইতো। মৃত্যুকে বলতে চাইতো, দেখ আমাকে নিলেও আমি আমার রক্ত রেখে যাচ্ছি। আমি পরাজিত হবো।
অথচ আমি নালায়েক সন্তান বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখতে পারলাম না। বাবা আমার হাত ধরেই মৃত্যুর কাছে পরাজিত হলো। এই প্রথম দেখলাম মৃত্যু।
স্বামীর মৃত্যুর খবর তার স্ত্রীকে দিতে হবে। একমাত্র সন্তান হিসেবে আমার এই বিরাট দায়িত্বটা নিতে হয়েছিল। এই দায়িত্বটা যখন আমি কাধে নেই তখন আমার বয়স ছিল ১৬। আমি দায়িত্ব পালন করি। বাবাকে কবরে নিজ হাতে শোয়ানোর মতো আরেকটি দায়িত্ব পালন করি। বাবাকে একাকী একটি মাটির ঘরে রেখে তার উপরে বাশের ছাউনি দেয়া থেকে শুরু করে তার উপরে মাটি চাপা দেয়ার মতও অস্বাভাবিক কাজটা করি। হ্যা। অস্বাভাবিক। আমার কাছে অস্বাভাবিক। আমার বাবা! আমার বাবাকে আমি মাটি চাপা দিয়েছি। আজও চোখের সামনে ভেসে বেড়ায় সে দৃশ্য। আজও। আজও দেখি সাদা কাপড়ের ভিতর বাবার নিথর চিমসে যাওয়া দেহ।
এই ছিল মৃত্যুর সাথে আমার প্রথম পরিচয়।
দ্বিতীয় পরিচয়টাও খুব বেশী সময় নেয়নি। যখন আমার মা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে তখনও আমি আমার মায়ের পাশে। আমার মা আমার দিকে তাকিয়ে অসহায় হয়ে বলেছিল, বাবা তুই এতো অভাগা কেন?
মায়ের প্রশ্ন শুনে আমি তখন হেসে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, কারণ তোমরা। তোমরাই আমাকে অভাগা করে দিয়েছ। মা চুপচাপ হয়ে চোখের পানি ঝরিয়েছিল। একদিন মা আমাকে বলল, তুই বলেছিলি তোর বাবা নাকি তোর হাত ধরে চলে গিয়েছিল।
আমি তখন মাথা নাড়াই। মা আবার বলে, তোর হাতটা একটু দিবি?
আমি বললাম কেন?
- তোর হাতটা একটু শুকে দেখি তোর বাবার নিশ্বাসের গন্ধটা পাওয়া যায় নাকি!
হায়রে বাঙালী নারী। মৃত্যুর সামনে দাড়িয়েও স্বামীকে ভুলতে পারে না। হাতটা মার নাকের সামনে বাড়িয়ে দেই। মাও ঠিক বাবার মতই আমার হাত জড়িয়ে ধরে বসে ছিল। মা'র কমল স্পর্শে আমি আবেগের কাছে হারতে বসেছিলাম। চোখ দিয়ে পানি অবারিত ধারায় ঝরা শুরু করলো। মা মিষ্টি মুখ করে আমার হাতকে ধরে রাখল। আর হঠাৎই অনুভব করলাম বাবার মত মাও একি কাজটা করল। স্বামীর নিশ্বাসের গন্ধ খোজার জন্য মাও পাড়ি জমালেন অন্ধকার জগতে।
এভাবেই আমাকে একা করে সবাই চলে গেলো। আর আমি অসহায় হয়ে দেখেছি। সব দেখেছি। তাই বললাম আপনাদের, আমার সাথে মৃত্যুর একটা পুরাণ সম্পর্ক আছে।
এখন সেই মৃত্যুর মুখোমুখি আমি স্বয়ং। তাই মৃত্যুকে চুপিচুপি বলি, আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। আমি তোমাকে ভয় পাই না। নিজের মৃত্যুর চেয়েও বড় কষ্টকর আপন মানুষের মৃত্যু। আর আমি তা সহ্য করেছি। সেই ব্যথা আমি বুকে বহন করে চলেছি অনেকগুলো বছর। আর তাছাড়া তো আমি আমার মৃত্যু দেখবো না। আমিতো শুধু মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছি মাত্র।
২.
হাসপাতাল করিডোর ভরা মানুষ। তারা নাকি আমাকে দেখতে এসেছে। ওহ। আপনাদের তো বলা হয়নি। আমি এখন এ শহরের অত্যন্ত জনপ্রিয় মানুষ। শহরের অলিতে গলিতে আমার পোষ্টার। টিভিতে আমাকে নিয়ে একটা নিউজও হয়েছে। অনেগুলো পত্রিকাতেও আমার ছবির সাথে কলাম লেখা হয়। এমনকি একজন জনপ্রিয় মিডিয়া ব্যক্তিত্বও আমাকে নিয়ে কলাম লিখেছে।
না না। আপনারা আবার ভাববেন না আমি মহা কোন কাজ করে ফেলেছি। আমি নগন্য মানুষ আর কিই বা করতে পারি। শরীরে একটা রোগ বাধিয়ে আমি মানুষের সাহায্য চাইছি। সব জায়গায় একই সুর। একজন ক্যান্সার রোগীকে সাহায্যর জন্য এগিয়ে আসুন। অথবা, একজন এতিম অসহায় ছেলেকে জীবন দান করুন। এধরনের বহু লাইন ব্যবহার হচ্ছে। একজন দরিদ্রর ছেলের পাশে এখন দেশবাসী দাড়িয়েছে। কারণ হচ্ছে, আমি এতিম। আমার কেউ নাই। বাবা নাই। মা নাই। ভাই-বোনও নাই। এ পৃথিবীতে অবশিষ্ট মানুষগুলোর কাছেই আমার জীবন নির্ভর। তাই আমি অসহায়। তবে এ জনতার কাছেও আমি কৃতজ্ঞ। তারা আমাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য সাহায্য করছে। আমি অপরিচিত একজন মানুষ। তাও সাহায্য আসছে। ব্যপারটা কেমন না! এদেশের মানুষতো আসলে খারাপ না। দলে দলে এগিয়ে আসে।
আমার জন্য নাকি কনসার্ট আয়োজন করা হচ্ছে। যদিও ছোট খাটো অনেক কনসার্ট হয়েছে। তবে এবারেরটা নাকি অনেক বিরাটাকারের কনসার্ট। আশা করা হচ্ছে, এই কনসার্টেই নাকি ১৫ লাখ টাকা আসবে। বড় বড় ব্যন্ড দলগুলো এতে অংশগ্রহণ করবে। একটি বেসরকারী টিভি চ্যানেল এই অনুষ্ঠান লাইভ দেখাবে। টিভি চ্যানেলের নাকি এই অনুষ্ঠানের জন্য অনেক স্পন্সর জোগাড় করে ফেলেছে। বাহ কি মজার ব্যপার। কতগুলো মানুষের আমার জন্য অনেকগুলো পয়সা কামাতে পারবে। আবার টিভি চ্যানেলটি এই কনসার্টের প্রচারণার জন্য বিজ্ঞাপন সংস্থার সাথেও যোগাযোগ করছে। ঢাকা শহরের সর্ব বৃহৎ কনসার্ট বলে কথা। সেই কনসার্টে সুযোগ পাওয়ার জন্য ছোট ছোট অজনপ্রিয় ব্যন্ডদলগুলোও নাকি লবিং চালাচ্ছে।
যাইহোক। এতো ভিড় ভাট্টা ঠেলে একটা ছেলে আমার দিতে এগিয়ে আসলো। আমার বেডের পাশে এসে দাড়ালো। ছেলেটি দেখতে কেমন যানি উদ্ভট। চুলগুলো দুপাট দিয়ে ছোট আর সামনের মাঝখান বরাবর খাড়া করা। ছেলেটির চুলের দিকে তাকানো মাত্র আমার মুরগীর পাছার কথা মনে করিয়ে দিল। একদম যেনো মুরগীর পাছা। তো, ছেলেটি এগিয়ে এসে খুব বিনয় নিয়ে বলল, বস ভালো আছেন?
আমি একটু বিব্রতবোধ করলাম। আরে! আমার মতো এক হতদরিদ্র অসহায় ছেলেকে কেন ও বস বলছে। আমি চুপ করে মাথাটা নাড়লাম। ছেলেটি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ভাইয়া, আসলে আমি আপনার কাছে একটা রিকোয়েস্ট নিয়ে এসেছিলাম। আপনি কিন্তু না বলতে পারবেন না। আগামীকাল ঢাকায় আপনার জন্য ফান্ড রেইস করার জন্য একটা কনসার্ট আয়োজন করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় অনেক জনপ্রিয় ব্যন্ড দলগুলো আসবে। হাজার হাজার মানুষের সমাগম হবে। আমি সেই কনসার্টে অংশ নিতে চাই। আমাদের বন্ধুদের একটা ব্যন্ড দল আছে। আপনি বললে ওরা মানা করতে পারবে না। প্লিজ আপনি যদি একটু বলে দিতেন......
কথাগুলো যখন বলছিল তখন আমার প্রচন্ড হাসি পাচ্ছিল। হাসিটা আমি চাপা দিয়ে রেখেছিল। আহা! কি অনুনয়। আজ আমার হাতে কত্ত ক্ষমতা। একটা কনসার্ট হচ্ছে সেখানে কত মানুষের ক্যারিয়ারও নির্ভর করছে। ব্যপারটা ভাবতেই ভালো লাগে। আমি তাহলে এখন অনেক ক্ষমতাধর মানুষ। সেই ক্ষমতার দম্ভে আমি বলি, আসলে আমার কিছুই করার নাই। আমি যতটুকু জানি সব কিছু ফাইনাল হয়ে গেছে।
ছেলেটি মোটেও নিরাশ না। সে আবার বলে, না ভাইয়া। ফাইনাল হলেও বা কি! আপনি বললে ওরা দিতে বাধ্য।
আমি চুপ থেকে বললাম, আপনার নাম কি?
ছেলেটি সাথে সাথে যেনো জীবন ফিরে পেলো। ভাইয়া, আমার নাম দিয়ে কাজ নেই। আপনি শুধু বলবেন, রকিং মিউজিককে যাতে পারফর্ম করতে দেয়।
আমি শুধু মাথা নাড়লাম।
ও চলে গেলো। তার কিছুক্ষণ পর একগাদা সাংবাদিক এসে ভিড় জমালো। তাদের একটাই প্রশ্ন, আপনার কি অনুভুতি? আপনাকে ঘিরে এভাবে জনগন মাঠে নেমেছে। আপনি কি মনে করেন? তারা কেন করছে? বলা হচ্ছে এই ফান্ড থেকে টাকা আসবে ১০ লাখেরও উপর। আর সাথে সাথেই আপনাকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হবে। আপনার কি মনে হয়? আপনি কি সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে পারবেন? আর দেশবাসীর জন্য আপনি কি কিছু বলতে চান?
যখন এতো প্রশ্নের মুখে আমি জর্জরিত তখন আমি চোখটা বন্ধ করে শুনছিলাম ওদের কথা। কারণ, শরীরে আর জোর নেই। শরীরটা দিনকে দিন নিস্তেজ হয়ে আসছে। প্রতিদিন রাতে পেটে একটা প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়। পরদিন সকাল অবদি তা থাকে। শুরুতে বিকট চিৎকার দিতাম। কিন্তু ব্যথাটার সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেছে। ওকে আমি সহ্য করতে পারি। ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা এমনিতেই বিধাতা আমাকে দিয়েছেন। বুকেও মাঝে মাঝে প্রচন্ড ব্যথা হয়। তবে আজকে আমার সর্ব শরীরে ব্যথা করছে। মনে হচ্ছে, কেউ মনে হয় আমার সব কিছুকে ঠুকরে ঠুকরে খাচ্ছে। বুকের একটা নতুন অনুভুতিও সৃষ্টি হচ্ছে। কেমন যানি, চিন চিন ব্যথা। মনে হচ্ছে, বুকে অনেক বড় একটু কিছু আটকে আছে। আর পায়ের আঙুলগুলোও মনে হচ্ছে নাই নাই। আমার জীর্ণ শরীরটা যেনো আমার কাছেই অপরিচিত। এতো অপরিচিত যে সেদিন টয়লেটের ঘোলা আয়নায় নিজেকে দেখে আমি নিজেই ভড়কে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল ওপারে আমি না অন্য একজন মানুষ।
যাইহোক। সেই সব সাংবাদিকদের আমি শুধু একটু বাক্য বলেই বিদায় দিয়েছি। বলেছি, আমি সমস্ত দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ।
সন্ধ্যা হয়েছে। জানালা দিয়ে একটা ঠান্ডা বাতাস বইছে। ঐ বাতাসটা ওয়ার্ডের সব অসুস্থ গন্ধটাকে যেনো সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে। আর ঠিক এমন সময় এক দম্পতি আমার সামনে দাড়িয়ে। সাথে আমার বন্ধু সাবের। সাবের বলল, রাশেদ মিনু তোর সাথে দেখা করতে এসেছে। আমি জানি মিনু এসেছে। মিনু আমাকে বলেছিল, তুমি মৃত্যুর আগে একবার হলেও আমাকে দেখবে।
মৃত্যুর ঠিক আগেই আমি দাড়িয়ে আছি। আর মিনু আসবে এটাই স্বাভাবিক।
ওদের দেখে আমি একটু উঠে বসবার চেষ্টা করি। পারি না। শরীরে শক্তি নাই যে। মিনুর পাশে দাড়িয়ে থাকা লোকটি বলে, থাক থাক আপনি শুয়ে রেস্ট নেন।
আমি হেসে দেই। বলি, আরে ভাই, আমার কাছে রেস্ট নেওয়া মানেই হলো একটু উঠে বসতে পারা। ঐটাই হয়ে উঠছে না। সারাদিন এই পিঠ বিছানায় লেগে থাকে। এই পিটটা বিছানার কাছে ঋণি হয়ে গেছে। এই পিটটা সে কত্তদিন ধরে আকড়ে রাখছে।
মিনু তখন প্রথম কথা বলে উঠলো, এসব দার্শনিক কথার রোগ যায় নি এখনও?
এই প্রথম আমি মিনুর চোখের দিকে তাকাই।
সুখ। শুধু সুখে ভরা ওর চোখের অংশ।
বেশকিছুক্ষণ এরপর নিরবতার মধ্যে দিয়েই যায়। তারপর লোকটি আমার কাছে আসে। এসে আমার হাত ধরে। তারপর বলে, মিনুর কাছে শুনেছি আপনি অনেক ব্যক্তিত্ববোধ পরায়ণ মানুষ। সহজে কারও সাহায্য সহযোগিতা নেন না। তারপরও আপনি কিছু মনে না করলে আপনাকে কিছু সাহায্য করতে চাই।
আমিও বলি, আমি মনে করবো কেন? আমার চিকিৎসার জন্য এখন ৬০ লাখ টাকার দরকার। এতো টাকার কাছে আমার ব্যক্তিত্ব পরাজিত। আমার সব কিছুই হেরে গেছে।
সাথে সাথে লোকটি আমার হাতে একটা চেক ধরিয়ে দেয়। আমি আর কি বলব! বললাম, থ্যাংস।
তারপর কিছু সময় আবার নিরবতা। হঠাৎ লোকটি বলে, এবার তাহলে আমরা যাই। বলেই লোকটি আমার হাতে আবার তার হাত ধরলো। মনে হয়, সে খুব কষ্টে আছে। খুব আবেগ নিয়ে সে বার বার আমার হাত ধরছে।
আর মিনু পাশে চুপচাপ দাড়িয়ে। কোন কথা নেই। লোকটি বিদায় নিয়ে হেটে চলে যাচ্ছে। মিনু তখনও দাড়িয়ে। ওর চোখে বিষন্নতার ছাপ। আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি তখন মিনুর দিকে তাকিয়ে বলি, যাও মিনু। হি ইজ ভেরী নাইস ম্যান। আমার ওকে খুব পছন্দ হয়েছে।
বলার সাথে সাথে মিনু চলে গেলো। কিছুই বলল না।
ঠিক সেই আগের মতো। যেভাবে আজ থেকে ৫ বছর আগে চলে গিয়েছিল। আমার মতো উদাসীন, অপদার্থ একটা অহসায় ছেলেকে ফেলে ও চলে গিয়েছিল অনেক দূরে।
ঘটনাটা বলা যাক।
আমি খুব একটা পদের ছেলে ছিলাম না। সারাদিন আড্ডাবাজি। ঘুরাঘুরি। এসব করেই দিন যেতো। পড়াশুনাতেও ওতো মনোযোগ নেই। সেই অপদার্থ একটা ছেলের সাথেই মিনুর প্রেম হয়। প্রেম চলে। ঘাত সংঘাত সব পেরিয়ে প্রেম চলে। কত্ত কত্ত স্মৃতি। সে বিষয়ে আর কথা বাড়ানোর দরকার নেই। মিনুকে সেভাবে সময় দেয়া হতো না। সারাদিনের ভবঘুরে জীবন শেষে যখন ঘরে ফিরতাম তখন এ শরীরটা ক্লান্তিতে ভেঙে যেতো। তাই মোবাইল নামক যন্ত্রটাকেও কানের কাছে ধরে রাখতে এ শরীর সায় দিতো না। সারাদিন ভবঘুরে বলার পর আবার আপনারা ভাববেন না আমি একদমই বখাটে। তা কিন্তু না। আমি কিন্তু নানা কাজে ব্যস্ত সময় পার করতাম। কারণ মাসটাতো আমাকে চলতে হবে। তাই না?
একদিন এ সময় নিয়ে মিনুর সাথে প্রচন্ড ঝগড়া বেধে যায়। এ ঝগড়ায় সময় নিয়ে দরকষাকষি শুরু হয়। কারণ প্রেম তো সময় ছাড়া চলতে পারে না।
ঝগড়াটার স্থায়িত্ব চলে পরদিন পর্যন্ত। আর সরাসরি মিনু আমাকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলে। কারণ জানতে চাইলে বলে ওঠে, তোমার এমন কি আছে যে আমি তোমার সাথে থাকবো?
প্রশ্নটা আমাকে বিভ্রন্ত করে।
তারপর মিনু আবার বলে, না তোমার টাকা আছে.........না তোমার কোন কাজ তোমাকে জনপ্রিয়তা এনে দিতে পারবে..... কি আছে তোমার? একমাত্র ছিল সময়.....সেটাও তুমি আমাকে দাও না।
পৃথিবীর সমস্ত দুখ যেনো আমার উপর এসে পড়লো। আমার সেদিন কিছুই বলার ছিল না। কারণ সত্যটাতো কষ্টকর হবেই। সুতরাং কষ্টটাই আমার প্রাপ্য। কথাটা মেনে নিলাম। আর মিনুকে মুক্তি দিলাম।
৩.
রাতের আকাশে আজ পূর্ণিমার খেলা। অসাধারণ চাঁদ সারা অন্ধকারটাকে মায়াবী আলো ছেয়ে রেখেছে। জানালার পাশেই আমার খাটটা হওয়ায় সে আলোর ছটা আমার শরীরে। অপূর্ব দৃশ্য। আর আজ ব্যথাগুলোও মনে হচ্ছে নেই। মনে হচ্ছে, পূর্ণিমার আলোয় গোসল করে আমার ব্যথাগুলো চলে গিয়েছে। একটু আগে গতকালের কন্সার্ট আয়োজন কমিটি এসেছিল। তারা বলল, সমস্ত টিকিট সেল হয়ে গেছে। বিভিন্ন স্পন্সর থেকে আর টিকিটের টাকা মিলিয়ে জোগাড় হয়েছে ৯ লাখের কাছাকাছি। আর আগামীকাল কিছু কিছু ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান কন্সার্টে আমাকে অর্থ সাহায্যের কথা ঘোষনা করবেন। কারণ তারা প্র“ভ করতে চায় যে তারা শুধু ব্যবসায় করে না তারা মানুষের পাশেও দাড়ায়। আমি চুপচাপ তাদের কথা শুনলাম। হঠাৎ সকালে আসা সেই মুরগী চুল আলা ছেলেটার কথা মনে হলো। আমি তাদের বললাম, একটা ছেলে এসেছিল। নতুন ব্যন্ড দল। কালকের অনুষ্ঠানে পারফর্ম করতে চায়। ওদের ব্যন্ডের নাম, রকিং মিউজিক। ওদের কি কোন সুযোগ দেয়া যায়। কমিটির বেটে করে একজন লোক আছেন। তিনি সাথে সাথেই বললেন, অবশ্যই। আপনি বলেছেন আর আমরা রাখবো না! এটা কি বলেন।
আমি হেসে বললাম, জ্বি থ্যাংস। তারপর ওনারা চলে গেলেন।
এখন আমি পূর্ণিমা এনজয় করছি। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কাল আমার জন্য এতো আয়োজন। কাল ঢাকা শহরের মূল কেন্দ্র থাকবো আমি। আমাকে ঘিরে কালকে শহরে মেলা হবে। ঢাকার খেলা হবে। বিকট আওয়াজে গান বাজবে। নতুন প্রজন্মের উচ্ছৃঙ্খল ছেলে-মেয়েরা উদ্যাম নৃত্য দিবে। সবাই দেখবে। কেউ কেউ চুপিচুপি নৃত্যের সাথে মেয়েদের স্তন নড়াচড়ার ছবি তুলবে। তা আর বিভিন্ন ইন্টারনেট সাইটে চলে যাবে। কাল ব্যবসায়ীরা আমাকে অনুদান দিবে। তারা ভরা মজলিশে বলে প্রডাক্ট মার্কেটিং করবে। কাল কমিটির লোকজন লাখ টাকার হিসেব কষতে বসে একে অন্যের সাথে ঝগড়াতেও লিপ্ত হবে। আমার জন্য অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হবে।
আর এ সব কিছুর জন্য হচ্ছে আমি। আমি। কত জনপ্রিয় আমি। একদিনের জন্য ঢাকা শহর ব্যস্ত থাকবে আমার জন্য। আহ। কি আনন্দ আমার। এটাইতো জীবন। আমার জীবনের মূল্য নির্ধারণ হয়েছে ৬০ লাখ। এখন পর্যন্ত বিভিন্ন উপায়ে এসেছে ৩০ লাখ। কালকেই আমি বিমানে চড়বো। পৃথিবীর বিখ্যাত হাসপাতালে যাবো। বাহ। কি অসাধারণ আমার জীবন। আমাকে বাচানোর জন্য কত্ত মানুষের কত্ত চেষ্টা।
চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। ভেতরকার সব কথা কেন যানি মুখ দিয়ে অনবরত বের হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি আমার চারপাশে অনেক মানুষ এখন জটলা পেকেছে। আমি অস্পষ্ট শব্দ শুনতে পাচ্ছি। অনুভব করছি আমাকে জোরে জোরে ঝাকানো হচ্ছে। আমি নড়ছি। আমি শরীরের সমস্ত অংশ যেনো খুলে যাচ্ছে। আমি এখনও বলছি, মিনু। আমার এখন সব আছে। আমার টাকা আছে, আমার জনপ্রিয়তা আছে; এখন সব আছে আমার। সব কিছু। খালি সময় নেই। শুধু সময় নেই। সময় চলে গেলো। টাকা না থাকলেও আসে। জনপ্রিয়তা না থাকলেও আসে। কিন্তু সময়? সময় কি ফেরত আসে মিনু? সময়... হাতে সময় নেই.....একদম সময় নেই....
গল্পের শেষ: এভাবেই রাশেদ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। সে রাতেই রাশেদের মৃত্যু হলো। ওকে ঘিরে আয়োজিত কনসার্ট বন্ধ হলো না। কনসার্ট হলো। শুরুর আগে শুধু ১ মিনিট ওর জন্য নিরবতা পালন হলো। তারপর গান শুরু হলো। আর সবাই তখন রাশেদকে ভুলে গেলো। মনে রাখবেই বা কেন! সময়তো কাউকে কারও কাছে ধরে রাখতে পারে না। রাশেদকে যেই ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো সাহায্য করবে বলেছিল তারাও তাদের মার্কের্টি বন্ধ করেনি। তারাও সাহায্যের ঘোষনা দিয়েছে তবে নতুন কোন রাশেদের জন্য।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



