somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্প: ফ্রেম

৩০ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৯:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেজুতী মা'র ঘর থেকে ড্রেসিং টেবিলটা দখল করলো বিয়ের দিনই। আসলে দখল বলা যাবে না। এটা অবশ্য ওর দোষও না। আমাদের যেদিন বিয়ে হলো সেদিন সকালে মা বলে উঠলো, আরে! আমার বউটা ঘরে এসে সাজবে কোথায়! ওর রুমে ড্রেসিং টেবিল দরকার।
আব্বু দুষ্টুমী করে বলেছিল, কেন? তোমার গাধা ছেলেটা কি যৌতুক পাচ্ছে না?
মা অভিমানী স্বরে বলে, যৌতুক? আমার ছেলেকে পড়াশুনা করিয়েছি কি যৌতুক নেবার জন্য?
আব্বু হাসতে হাসতে বলতো, আরে তুমি এতো ক্ষেপ কেন? এখন হচ্ছে আধুনিক যুগ। আর তাছাড়া শিক্ষিত সমাজের যৌতুক প্রথা হয় যথেষ্ট মার্জিত। যেমন, আমাদের সময় চেয়ে নেয়া হতো। বলত, খাট দিতে হবে, সোকেইজ দিতে হবে, আলমারী দিতে হবে, মোটরসাইকেল দিতে হবে। কিন্তু আমাদের মার্জিত সমাজে বলবে, কিচ্ছু দেয়া লাগবে না। শুধু ঘরটা একটু সাজিয়ে দিবেন। যদিও বা অনেকে মুখ ফুটে কিছুই বলে না। কিন্তু মনে মনে ঠিকই ওত পেতে থাকে যৌতুক পাবার জন্য। না দিলেই বেজার।
আব্বু বলতো আর হাসতো। আব্বুর এই এক স্বভাব। কিছু থেকে কিছু হলেমই খোঁচানো মার্কা কথা বলবে।
যাইহোক। ৪০ বছরের সংসার জীবনে মা'র এসব বোঝা হয়ে গেছে। নিজের স্বামীকে তিনি ভালো মতই চিনেন। স্বামীর সাথে সপ্তাহের অধিকাংশ দিনই তিনি অভিমানে মুখ ভার করে রাখেন। আর বলেন, আমার সারাটা জীবন কুরে কুরে খাচ্ছে লোকটা। আর জ্বালাতন ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনটা চায় কোথাও চলে যাই।
আব্বু তখন চুপ করেই শুনতো। চেচামেচির মাত্রা অতিরিক্ত হলে দিব্বি এক ঘুমে দিন কাবার।
তবে মজার বিষয় হলো, আমাদের ছোটকাল থেকে শুনতে হয়েছে, তোরা বড় হয়ে তোর বাবার মতো হবি। সৎ। ন্যায়বান মানুষ। সরল। পৃথিবীর জঞ্জাল থেকে তোরা দূরে থেকে শান্তির জীবন পার করবি।
আমি এখন চিস্তা করি। স্বামীর প্রতি হাজারো অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও মা চাইতেন আমরা যেন বাবার মতই হই।
আমরা বাবার মতো হয়েছি কি মা'র মতো হয়েছি তাও জানা নেই। তবে আমার অন্য ভাই বোন বলে, আমি মা ঘেষা ছেলে। যাকে বলা চলে মা নেউটা।
তো, সেই মা নেউটা ছেলেটার বিয়ে হচ্ছে। এতে যে মা'র খুশীটা আকাশচুম্বী তা আমি বুঝি। বউমার জন্য তার সব কিছুতে ভিন্নতা থাকতেই হবে। শাড়ী-গয়না থেকে সব কিছু। আমার ঘরটাও সুন্দর করে সাজানো হয়েছিল। নতুন খাট, নতুন আলমারি, নতুন টেবিল চেয়ার। বাদ ছিল শুধু ড্রেসিং টেবিল। এতো বড় প্রয়োজনীয় একটি জিনিস যে কিভাবে নজরের আড়ালে চলে গেলো তা মাও চিন্তা করে!
আমার বিয়ের দিন সকালে আমার ঘরে চলে আসলো মায়ের ড্রেসিং টেবিল। অসাধারণ এই ড্রিসিং টেবিল বাবা সুন্দর বনের থেকে কাঠ আনিয়ে বানিয়ে দিয়েছিল। বাবার আঁকা ডিজাইন। বাবার কাছে এই কাঠের গল্প বহুবার শুনেছি। মা-বাবার ২৫ তম বিবাহ বার্ষিকীতে বাবা এই ড্রেসিং টেবিলটি উপহার হিসেবে দিয়েছিল।
উপহারটা কেন ড্রেসিং টেবিল সেটারও একটা গল্প আছে। বাবা বলতো গল্পটা।
যেদিন আমাদের বিয়ে হলো সেদিন আমি মনে মনে মহা বিব্রতকর অবস্থায় আছি। ঘরে আমার খাট নেই, চেয়ার-টেবিল কিচ্ছু নেই। আমি মাটিতে বিছানা পেতে শুই। আসলে এসব কেনার দরকারও হয়নি। একা একা ব্যাচেলার জীবন। সেখানে এতো সব কেনারও বা কি দরকার। কিন্তু যখন হুট করে তোর মা’র সঙ্গে আমার বিয়েটা হয়েই গেলো তখন আমি লজ্জার সাগরে। আহারে! না জানি মেয়েটা কি ভাববে। ফকির একটা ছেলের কাছে বিয়ে বসছে। মজার বিষয় হলো, তোর মা আমার ঘরে আসলো। একটা অগুছালো ঘর। কিচ্ছু নেই ঘরে। সেখানে আসলো। আমি রাতে প্রশ্ন করলাম, তুমি কিচ্ছু চিন্তা করো না। আমি ধীরে ধীরে সব কিনে দেবো। তোর মা লাজুক হাসি দিয়ে বলল, শুরুতেই কিন্তু একটা ড্রেসিং টেবিল কিনবেন। শুনেই আমি আশ্চর্যের হাসি দিয়ে বসলাম। হায়রে! মেয়ে মানুষ!! নিজেকে প্রতিদিন দেখতেই হবে তাদের।
আমরা বাবার এ গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। বাবা গল্পের শেষে বলতো, সেদিন সকালেই আমি ড্রেসিং টেবিল কিনে আনি। তবে মনে মনে চিন্তা করি, আমি আমার বউয়ের জন্য পৃথিবীর সব চাইতে ভিন্নগোছের ড্রেসিং টেবিল বানিয়ে দেবো। আর তাই এতো বছর শুধু সন্ধান করছিলাম ভিন্নতাটা কি হতে পারে! কি করে ড্রেসিং টেবিল কিনে দিলে সবাই ভাববে সেটা ভিন্ন গোছের। আর তখনই বের করলাম সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে। আমি সুন্দরবন থেকে কাঠ আনালাম। আর এই ড্রেসিং টেবিল বানালাম। আমি তোর মাকে বললাম, পৃথিবীর অন্যতম বন সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরী এটি। বুঝলা! নাক দিয়ে শুকে দেখো, বাঘের গন্ধ পাবা। হা হা হা

যাইহোক। আমি মনে হয় আমার গল্প থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। কথা হচ্ছিল সেজুতীকে নিয়ে। সেজুতীর সাথে আমার বিয়ের দিনই সুন্দরবনের কাঠ দিয়ে তৈরী ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে ঢুকলো। যেই ড্রেসিং টেবিলটি আমার একমাত্র বোনটাও কখনও দখর করতে পারেনি। সেটি এখন সেজুতীর দখলে চলে আসবে। সেই অভিমানী কথাটা আমার বোন বলতে একদমই ভুলেনি। সে সাথে সাথে মাকে খোঁচা মেরে বলেছে, ও! তাহলে আমার কোন মূল্য নেই তোমাদের কাছে? এতো বছর ধরে চাইলাম তুমি দিলে না আর এখন বউ না চাইতেই দিয়ে দিলে। ভালো ভালো।
মা তখন মুচকি মুচকি হাসছিল।

২.
সেজুতীর সাথে বিয়ের পরদিন থেকেই মা একটু গম্ভীর হয়ে গেলো। মাকে আমি আড়ালে গিয়ে প্রশ্ন করলাম। মা তুমি কি কোনো কারণে আমার উপর রাগ?
মা বলল, কই? নাতো...
- তাহলে মুখটা এমন করে রাখছো কেন?
মা গম্ভীরভাবে বলল, আসলে ব্যাপারটা আমার কেমন যেনো লাগছে। আমার ছেলের বউ। তাও মনে হচ্ছে সব কিছু আমার হাত থেকে ফসকে যাচ্ছে।
আমি হাসতে হাসতে বললাম, কি যে বলো মা। আর তাছাড়া তো তোমার বয়সও হয়েছে। ফসকে গেলে গেলো। তাতেও বা কি!
আসল বিষয়টা কিন্তু আমি ঠিকই ধরতে পারছিলাম। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় মায়ের একটা পাসপোর্ট সাইজ ছবি আটা ছিল। ঐ ছবিটা সেজুতী খুলে ফেলেছিল। আমি সেজুতীকে কিছুই বলিনি। ভেবেছিলাম, ওকে বললে ওর মধ্যে শাশুড়ীর প্রতি রাগ জন্মাবে। আর তাছাড়া ছবিটা খুললেই বা কি! মা’র ছবি সরালে কিই বা হবে!
কিন্তু যখন মা আমাদের রুমে ঢুকে প্রশ্ন করলো, আয়নার ছবিটা কোথায়?
সেজুতী তখন ড্রয়ার থেকে ছবিটা বের করতে করতে বলল, মা, আয়নায় কেউ কি ছবি লাগায়? আমার কাছে ব্যাপারটা গেয়ো গেয়ো মনে হয়েছে। তাই খুলে ফেলেছি।
মা'র মুখটা তখনই গম্ভীর হয়ে গেলো।
এটাতো একদিনের ঘটনা। আরও বহু গল্প আছে।
মা’র জন্য বাবার কেনা সখের ড্রেসিং টেবিল আমার রুমে স্থানান্তরিত হলেও মা একবারও ভাবেনি এটার উপর থেকে মা’র কর্তৃত্ব হারাবে। সত্যটা হলো, কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলল। মা আর ওটা ব্যবহার করতে পারেনা।
হুটহাট কিছু কিনে ফেলার ক্ষমতা আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের নেই। তাই মাকে সান্তনা দিলাম, মা তোমাকে সামনের মাসেই একটা ড্রেসিং টেবিল কিনে দেবো।
বাবা উদাস হয়ে বলল, সামনের মাস! যেই মানুষ একদিনও নিজেকে দেখা ছাড়া থাকতে পারেনা সে একমাসেরও বেশী সময় নিজেকে না দেখে থাকবে!
মা একদিন আপুকে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, আমার স্বামীর কত্ত ভালোবাসা ওটাতে।

এসবই আমার আর সেজুতীর আড়ালে হয়। আমার কানে যাতে না আসে সে ব্যপারে আমার পরিবারের সবাই খুবই সচেতন। কিন্তু আমি বুঝতে পারি। এ বাড়ীর সকলের চেহারা দেখলেই আমি বুঝে ফেলি কে কি ভাবছে আর কি বলতে চায়। জন্মের পর থেকে এই মানুষগুলোর সাথেই তো থাকছি। বুঝবো না!
বিরোধের জন্ম ছিল ড্রেসিং টেবিল। এরপর বহু পানি গড়িয়েছে। ঘরের সকল ছবির ফ্রেমগুলোও দখল করেছে সেজুতী। সেখানে কোন কোনটাতে আমাদের বিয়ের ছবি। কোনটাতে সেজুতী একা। কোনটাতে সেজুতী আর আমি কোথাও ঘুরতে যাওয়ার ছবি।
মা শুধু একদিনই প্রশ্ন করলেন যখন দেখলেন তার প্রবাসী বড় ছেলের ছবির ফ্রেমটাও দখল হয়ে গেলো। মা সাথে সাথেই বলল, হাসানের ছবিটা সরালে কেন?
সেজুতীর সহজ উত্তর। আরে মা, ভাইয়াকে এই ছবিতে একটুও ভালো লাগছে না। তারচেয়ে আমি ভাইয়াকে বলবো, যাতে সুন্দর দেখে একটা ছবি তুলে পাঠায়। আমরা তখন সেটাকে বড় করে ফ্রেম বন্দি করবো।
সোনালী একটি ফ্রেমে মায়ের সুন্দর একটা ছবি ছিল। যুবতী বয়সের ছবি। সবাই দেখে বলত, সুবর্ণা মোস্তফার মতো লাগছে। মা তখন খুব খুশী হয়ে যেতো। সেই ফ্রেমের ছবিটাও সেজুতী সরিয়ে ফেলেছে। এর কারণ হিসেবে সে বলেছে, মার এই ছবিটা কেমন যেনো ঘোলাটে। তাই সরিয়ে ফেলেছি।
সোনালী সেই ফ্রেমে আমার বউ তার কলেজ জীবনের একটা ছবি লাগিয়েছে। খুব সুন্দর লাগছে ওকে।

৩.
সেজুতী। সেজুতী ইসলাম। মা-বাবার একমাত্র আদরের মেয়ে। ওর কোন ভাই বোন নেই। ও একাই রাজত্ব করেছে ওর পরিবারে। নিজের যত চাহিদা যত আবদার তা সে একাই করেছে। আশেপাশে কেউ আবদার করেনি। অসম্ভব জেদী, ইমোশনাল মেয়ে সেজুতী। ওর পৃথিবীটা ওর কাছে একদম রঙিন। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে ও দেখে ওর মতো করে। কারও ভাবনা কিংবা কারো বাস্তবতা ওর কাছে মূল্যহীন। সেজুতীর কাছে তার নিজস্ব ভাবনাটাই সবচাইতে বড়। ও ভাবে ও যা করছে তা সঠিক। সেজুতী তার ভুবনকে সাজাতে চায় স্বপ্নের মতো করে। সেজুতী ভাবে, স্বপ্ন দেখেছিলাম আমার জামাই আমাকে প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা সময় দিয়ে যাবে। সুতরাং জামাইকে সেটাই দিতে হবে। তা না হলে ভাবতে হবে আমার জামাই আমাকে ভালোবাসে না। এটা সেজুতী বিশ্বাসও করে। ও চায় ওর জামাই পৃথিবীর সমস্ত সুখ-দুঃখ শুধু ওর সাথেই ভাগাভাগি করবে। ওখানে আর কারও অধিকার থাকতে পারে না। ও চায় শুধু সুখ আর সুখ। যেখানে কোন দুঃখ দেখলেই ও আতকে ওঠে। ও ভাবে এই বুঝি সব ভেঙে পড়লো। এই বুঝি ওর অধিকার ছুটি নিলো।
সেজুতীর বর্ননা দিলাম। সেজুতী এমনই। আমাকে সবসময় ও আকড়ে ধরে থাকতে চায়। আর ও সব কিছু করতে চায় ওর মতো করে। সেখানে বাধা আসলেই ও ভাববে অন্যকিছু। নতুন করে অন্য এক বিশৃঙ্খল ভাবনায় আবার নিজেকে জড়িয়ে ফেলবে।
এই যে মায়ের ড্রেসিং টেবিলের আয়না থেকে মায়ের ছবি সরিয়ে ফেলা আমি জানি এটা ও এতো কিছু ভেবে করেনি। ওর কাছে ভালো লাগেনি তাই সরিয়ে ফেলেছে। হয়তো মা ভেবেছে ঘরের সব কিছুতে নিজের দখলদারিত্ব দেখানোর জন্যই সেজুতীর এই কান্ড। কিন্তু আমিতো জানি ও এতো সাত-পাচ চিন্তা করেনি।
আবার ঘরের সকল ছবির ফ্রেমগুলো দখল করা। এগুলোও ওর কাছে বড় কিছু না। নিজের মা-বাবার ঘরে ও নিজের মতো করে সব কিছু করবার অধিকার ছিল। বলার মতো কেউ ছিল না। ঘরের একার অধিপত্ব ও ভোগ করে এসেছে।
কিন্তু এখানে প্রতিপদে চিন্তা করতে হয় অনেক কিছু। এখানে চিন্তা করতে হয়, ঘরের আরও দুই সন্তানের কথা। বড় ছেলে ও তার পরিবার। মেঝ মেয়ে ও তার পরিবার। সবাই এই ঘরে না থাকলেও এই ঘরে সবার অধিকার আছে। ঠিক যেমনটা সেজুতীরও আছে। সবাই এই ঘরের ঠিক ততটাই পরিবর্তন করতে পারবে যতটা সেজুতী পারবে। তবে সকল পরিবর্তনই হতে হয় কথাবর্তা বলে। সবার ইচ্ছার দিকে। সবার মতামতের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সেজুতীর তো আর সে বালাই নেই। ও ভাবে যেহেতু এ ঘরে শুধু ওর বিচরণ তাই এই ঘরের সমস্ত ক্ষমতা ওর দখলেই থাকবে।
তবে একটি কথা হলো। অদৃশ্যভাবে এ ঘরের সমস্ত ক্ষমতা আমাদের মা-বাবার হাতে। আমরা কখনও কেউ কোনদিন তাঁদের মতামতের বাইরে কথা বলিনি।
তাই যখনই আমার মা-বাবা দেখছে চোখের সামনে তাদের তোয়াক্কা না করে ঘরের ছোট বউ ঘরে একটার পর একটা পরিবর্তন আনছে ঠিক তখন তাদের মাঝে কালো মেঘের সঞ্চার হচ্ছে।
এ অভিযোগ আমার বোন এসেও আমাকে করে গেছে। বলেছে,তুই কিছু বলছিস না?
আমি বললাম, ঠিক এভাবেই ও বড় হয়েছে। ওর পরিসরটাকে ওর ভাবনাগুলোকে আমি কিভাবে হত্যা করবো? আর ওতো পর ভেবে করছে না। ও এটাকে ওর সংসার মনে করছে তাই করছে।
আমার বোন চুপ হয়ে ছিল। কিছু বলেনি।
আমি বলেছি, একজন মানুষের এতোদিনের স্বপ্ন তুমি চাইলে একদিনেই ভেঙে দিতে পারো না। ওকে সময় দাও। আস্তে আস্তে নিজেকে এ্যাডজাস্ট করে নিবে।
সেজুতীকে যে একদমই আমি কিছু বলিনি তাও কিন্তু না। ওকে বলেছি, তুমি শুধু শুধু কেনো ছবিগুলো সরাচ্ছ? মা মনে কষ্টে পাচ্ছে না?
সেজুতীর আবার সহজ উত্তর, এতো সিম্পল একটি বিষয় নিয়ে মা মন খারাপ করবে? এটা কি বললে?
আমি বললাম, সংসারে মন কষাকষির শুরুটা হয় সিম্পল বিষয় নিয়েই। এই সিম্পল বিষয়গুলোই ধীরে ধীরে বড় হতে থাকবে। তখন? তখন কি করবে?
সেজুতী কিছুটা হয়তো বুঝেছিল। বুঝতে পেরেছিল বলেই আমাকে বলল, মার জন্য আমি কালকেই সুন্দর দেখে একটা ফ্রেম কিনে আনবো। তারপর আমাদের ঘরে মার যুবতী বয়সের ছবিটা ঝুলাবো।
এই বলে মিষ্টি হাসিও দিয়েছিল সেজুতী। সেই হাসিতে কোন রহস্য নেই। সরল হাসি।
পরদিন সকালে আমি যখন অফিসে চলে গেলাম। তখন আমার মোবাইলে সেজুতী ফোন দিলো। বলল, আমি একটু মার্কেটে যাচ্ছি। মায়ের জন্য ফ্রেম কিনতে।
আমি নির্বিঘ্নে কাজ করছি। অফিসের বসের একগাদা আবদার পালন করে চলেছি।
হঠা অফিস ছুটির কিছুক্ষণ আগে আমার মোবাইলে ফোন আসলো। ফোনটা দিলো মা। বলল, বাবা, কিছুক্ষণ আগে বাসার নাম্বারে ফোন এসেছে। সেজুতী নাকি এক্সিডেন্ট করেছে।
এরপর আর কিছু শুনিনি। হাসপাতালের সাদা চাদর মোড়ানো বিছানায় আমার সেজুতী রক্তাক্ত।
আমার লক্ষী সরল বউ সেজুতীর রিক্সা একটি বাস নাকি শূণ্যে তুলে দিয়েছিল।
আহ। কি ব্যাথা। কি যন্ত্রণাটা পাচ্ছে সেজুতী।
একটি অপরিচিত লোক আমার পাশে এসে দাড়ালো। আমার হাতে কাগজে মোড়ানো একটি ব্যাগ তুলে দিতে দিতে বলল, আমি তখন রাস্তার ওপারেই ছিলাম। আমার সামনেই ঘটনাটা ঘটেছে। মানুষজনের ভিড়ের মাঝে ওনার ব্যাগট্যাগ কিছুই পাইনি। শুধু হাতে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছিল এই ব্যাগটি। জ্ঞান সাথে সাথে গেছে। হঠাৎ জ্ঞান আসলো আর ধীরে ধীরে আপনাদের বাসার নাম্বারটা দিলো।
আমি লোকটিকে থ্যাংস বলে বিদায় দিলাম। আমি আমার মা, আমার বাবা, আমার বোন সবাই তখন নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছি ব্যান্ডেজে মোড়ানো সেজুতীর দিকে।
আমরা এখনও সেজুতীর মা-বাবাকে খবর দেইনি। বাবা বলল, কি বলবো ওনাদের? ওনাদের একমাত্র মেয়েকে আমরা সামলাতে পারলাম না।
বলতে বলতে বাবা কেঁদে দিলো। আমার মা একদম নিশ্চুপ। আমি হাসপাতালের বারান্দায় গিয়ে দাড়ালাম। হাতে আমার ব্যাগ। আমার মা আমার পিছু পিছু। আমার মা আমার পাশে এসে দাড়িয়ে আকাশে দিকে তাকিয়ে বলল, আমার সব কিছু আমি সেজুতীকে দিয়ে দেবো। তারপরও ওকে বল, ওর যাতে কিছু না হয়। ওকে বল ভালো হয়ে যেতে। ওকে বল......
মার নিস্তব্ধতা ভেঙে এক আর্তনাদ শুরু হলো। আমি তখন মাকে জড়িয়ে ধরে আছি। আর তখন আমার হাতে কাগজে মোড়ানো ব্যাগে একটি ফ্রেম। শূণ্যে উঠে যাওয়া রিক্সাটা যখন ভূমিতে এসে পড়লো তখন সেজুতী দুমড়ে-মুচড়ে গেলেও ফ্রেমটি আছে একদম অক্ষত।
পরদিন সকালে আমি বাসায় যাই। রাতেই মাকে পাঠিয়ে দিয়েছি বাসায়।
বাসায় গিয়ে দেখি নতুন ফ্রেমটি মা’র ঘরের দেয়ালে ঝুলানো। আর ছবির ভেতর ফ্রেম বন্দি আমার সেজুতী।
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×