আমার মা আর আমার ছবি।
আমার মা একটা কথা প্রায়ই বলে। তবে জন্মদিনের দিন কথাটা বেশী বলে। কথাটা হলো, আজ শুধু তোর জন্মদিন না। আজ আমারও জন্মদিন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, আজ শুধু তুই না আজ পৃথিবীতে আমারও মা হয়ে জন্ম হয়েছে।
এই হচ্ছে আমার মা। আমার সব জন্মদিনগুলোতে বন্ধুদের সাথে একটা দীর্ঘ সময় আমি কাটাই। সকালে বের হই আর রাতে ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি। তখন ঘুমে চোখটা ভেঙে আসে। খেতেও পারিনা। পরদিন সকালে উঠে খুব অপরাধবোধ হয়। যে মা আমাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসলো। দশটা মাস যিনি কষ্ট করে আমাকে গর্ভে ধারণ করলেন তার সাথে রাতের খাবারটা পর্যন্ত খেতে পারলাম না।
তাই বলে কি মা কষ্ট পেয়েছেন? হয়তো পায়নি। হয়তো পেয়েছেও। ছেলের ফূর্তির কথা ভেবে হয়তো বলেনি।
আজ স্বন্ধ্যায় আমার মা আমাকে প্রশ্ন করেছিল, জন্মদিনের উপহার হিসেবে কি চাও?
বললাম,বন্ধুদের খাওয়ানোর জন্য টাকা।
মা হয়তো তাতেও কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু বলেনি। হঠাৎ রাত ১০টার কিছু পর আমার হাতে কয়েকটি কাগজের টুকরো দিয়ে বললেন, এই নাম জন্মদিনের উপহার। বলে চলে গেলেন। আবার রাত ১২ পর এসে প্রশ্নও করলেন, লেখা পছন্দ হয়েছে। অবেগ কিংবা অনুভূতি কিছুই দেখাতে পারিনি। কারণ তখন আমার কানে ফোন। বন্ধুদের উইশ এক্সসেপ্ট করছি।
আজব আমি। সব বুঝি। সব টের পাই। তাও কেন জানি পারি না। তাই জন্মদিনের পরের দিন সকালে অপরাধবোধ নিয়ে নিজেকে নিজেই বলি, যে মা আমাকে পৃথিবী দেখালো সে মায়ের জন্য আমি কিছুই করতে পারলাম না।
আমার মায়ের লেখাটা আপনাদের সাথে শেয়ার করলাম। হয়তো আমাকে নিয়ে মায়ের লেখাটা অতিরঞ্জিত। কিন্তু বিশ্বাস করুন মায়ের লেখা। সেটা সন্তানকে নিয়ে। সব মায়ের কাছে তার সন্তানই সেরা। আমার মাও তো ব্যতিক্রম নয়। আমার মায়ের কাছেও আমিই সেরা। যদি সেরাদের কাছে যাওয়ারও বিন্দু মাত্র যোগ্যতা আমার নেই। শুধু মা'কেই বলতে পারি, মা আমাকে পৃথিবীর সৌন্দর্য তোমাকে ধন্যবাদ। তুমি দোয়া করো, তোমার এই ছেলে যেনো পৃথিবীর নির্মমতার সময় তোমার আশ্রয় পায়। তোমাকে ধন্যবাদ মা।
----------------------------------------------
৬ নভেম্বর। আজ আমার ছোট্ট ছেলেটার জন্মদিন। দেখতে দেখতে আমার ছোট বাবুটার ২৬ বছর হয়ে গেলো। কিন্তু আমার কাছে মনে হয় ও এখনো ছোট। এইতো সেদিনের কথা। ওর বাবার তখন পাকশীতে পোষ্টীং। ইতিমধ্যে আমার শরীর খুবই অসুস্থ। ডাক্তার বলেছে, শরীরে হেমোগ্লোবিন খুবই কম। প্রতিমাসে চেক-আপে গেলেই নানানরকম ওষধ দিচ্ছে। তবুও বাড়ছে না। আমি তখন ডাঃ লৎফুন্নাহারের অধিনে। মগবাজারে ওয়্যারলেস এর উল্টোদিকের গলিতে উনার ক্লিনিক। উনি আমাকে খুবই আদর করে যতেœর সাথে চেকআপ করতেন। আমার বড় ছেলের বয়স তখন ৯ বছর কিন্তু আমার মেয়ের বয়স দুই। তাড়াতাড়ি বাচ্চা নেয়ার জন্য আমার শরীর খুবই দূর্বল হয়ে পড়েছে। তার উপর চাকরী করি। প্রতিদিন ফার্মগেট থেকে টঙ্গী জার্নি!
যাইহোক। ৫ নভেম্বর রাতে ওর বাবা সব ওষুধ পত্র কিনে দিয়ে রাতের ট্রেনে চলে গেলেন। কিন্তু শরীর ভালো লাগছে না। সারারাত ঘুমও হলো না। আমার ছোট বোনটা সারা-রাত আমাকে পাহারা দিলো। ভোরবেলা উঠেই আমার ভাইটাকে আমি ক্লিনিকে চলে গেলাম। কিন্তু আমার বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিল। স্যালাইন চলছে হঠাৎ আমার ডাক্তার বললো, বাচ্চাটা খুবই সমস্যায় আছে। নড়াচড়া করছে না। শুনেই আমি কান্নাকাটি শুরু করে দিলাম। আল্লাকে ডাকতে থাকলাম। আল্লাহ আমার সন্তানটা যাতে সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে পৃথিবীতে আসে। আমার কান্নায় আমার মা-ভাই-বোন সবাই অস্থির হয়ে গেলো। সবাই দোয়া দুরুদ পড়তে লাগলো। স্বন্ধ্যার আগে ডাক্তার বলল, সিজার করতে হবে। তাই অন্য হাসপাতালে নিতে হবে। এজন্য অ্যাম্বুল্যান্স কল করা হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্স আসছে।
আল্লাহর কি রহমত। অ্যাম্বুল্যান্স আসার আগেই আমার সন্তান পৃথিবীতে চলে আসলো।
আল্লাহর কাছে লাখ লাখ শোকর। আমার সন্তার সুস্থ স্বাভাবিকভাবে পৃথিবীতে আসতে পেরেছে।
সেই দিনটি আমি আজও ভুলতে পারিনাই। এখনও ঐ ঘটনা আমার সমস্ত অনুভূতিকে অবশ করে দেয়। কি যে কষ্টের ছিল ৬ই নভেম্বর।
দুইদিন পর আমার সোনামনিকে নিয়ে বাসায় আসলাম। সবাই খুব আনন্দিত। ওর বাবাও আসল ঢাকায়। সবার মাঝে মিষ্টি বিলি হলো। তখন আমরা তেজগা রেওয়ে কলোনীতে থাকি। তাই আসে-পাশের বাসাগুলোতেও মিষ্টি বিতরন হলো। কিন্তু ৭/৮ দিন পর আমার জন্ডিস ধরা পড়লো। বাচ্চারও জন্ডিস। সবাই আবারও বিমর্ষ হলে গেলো। আসলে আমাকে আগের মাসে রক্ত দেয়া হলেছিল এক ব্যাগ। সেই জন্যই হয়তো জন্ডিস।
চিকিৎসা চলতে থাকলো। কিন্তু আমার ছুটি শেষ। আমাকে জয়েন করতে হলো অফিসে। ঐটুকু ছেলেকে ঘরে রেখে আমাকে ছুটতে হয়েছে জীবিকার জন্য। যখন ওকে বাসায় রেখে যেতাম তখন কষ্টে আমার বুকটা ফেটে যেতো। কেনো জানি না, ও জন্মের পর থেকে আমার মায়াটাও বেড়ে গিয়েছিল। খুব নরম হয়ে গিয়েছিলাম।
ভোরে উঠে ওকে তেল মালিশ করে জামাকাপড় পরিয়ে আমার মা আর বোনের কাছে ওকে রেখে যেতাম। আর যাওয়ার আগে একশ-একটা সতর্কবাণী শুনাতাম।
এরপর আকীকা হলো। নাম রাখা হলো, শেরিফ আল সায়ার। ডাক নাম সায়ার। কিন্তু আমার মনটা খচখচ করতে থাকলো। বড় ছেলের নাম চমক। সবাই চমকে যেতো নামটা শুনে। তাই আমার পিচ্চিটারও এমন চমকানো রাখতে হবে। ভাবতে ভাবতে সময় যায়। হঠাৎ সিন্ধান্ত নেই আমার পিচ্চির নাম হবে সুনাম। কল্পনা করি ওকে ছোট থেকেই বলবো, বাবা নামের গুন রাখতে হবে। জীবনেও কেউ যেনো দুর্নাম করার সুযোগ না পায়। চোখের সামনে মনের সামনে একটাই আশা-কল্পনা ঝুলিয়ে আমি। করলামও তাই। আজও আমি বলি, সব সময় ভালো থাকার।
ছোটবেলা থেকেই ও একটু মা ঘেষা। সারাদিন সবার সাথে থাকলেও আমি অফিস থেকে আসলেই ও আর কাউকে চিন্তো না। সারাদিন দেখা যেতো ওর বোনের সাথে ও খেলছে, ঝগড়া করছে কিন্তু যখনই আমাকে সামনে পেতো তখন শুধু আমার সাথেই থাকবে। আমার কোলেই থাকবে। আমার মেয়ে ওর চেয়ে দুই বছরের বড়। ওরও আমার কোলে থাকার বয়স। কিন্তু বোনকে সে কিছুতেই আমার কাছে আসতে দিতো না। সে-ই শুধু থাকবে আমার কোলে।
ধীরে ধীরে যখন ও বড় হতে থাকলো তখন একটা বিষয় খুব মজার ছিল। সেটা হলো, সারাদিনের বাসায় ঘটে যাওয়া সব খবর বলতো। আর সবার নামে বানিয়ে বানিয়ে নালিশ দিতো। আবার কোন জায়গায় যদি আমরা বেড়াতে যেতাম বাসায় এসে ও সব কিছুর বর্ণনা দিতে পারতো। আমরা সবাই খুব হাসাহাসি করতাম ওর এই স্বভাব নিয়ে। ইচ্ছে মতো নিজের মতো করে গল্প জুড়ে দিতে ও ওস্তাদ ছিল।
এখন যখন দেখি ও গল্প লিখে। আবার বিভিন্ন পত্রিকায় ওর লেখা ছাপে তখন আমার মনে পড়ে ওর সেই ছোট্ট বেলার দিনগুলোর কথা।
যখন মাত্র সাড়ে চার বছরে ওকে স্কুলে ভর্তি করানো হলো। তখন আমার মন খুব খারাপ। আমি চাইনি ওকে স্কুলে ভর্তি করতে। আমার অতটুকুন বাচ্চা ছেলেটা কি বুঝবে পড়াশুনার! আমি রাগও হয়েছিলাম ওর বাবার উপর। আমি ভেবেছিলাম ওর স্কুলে গিয়ে এডজাস্ট হতে অনেক সময় লাগবে। কিন্তু দেখলাম উল্টা। প্রতিদিন স্কুলে যেতো। আর আমি অফিস থেকে আসলেই ওর স্কুলের গল্প শুনতে হতো। একঘন্টা লাগতোই ওর গল্প শুনতে। এতো সুন্দর করে গল্পগুলো বলতো! রসালো করে। বেশীরভাগ সময় অভিনয় করিয়ে দেখাতো। তখন ভাবতাম হয়তো আমার ছেলে অভিনয় শিল্পী হবে। কিন্তু তা না হয়ে ও যাচ্ছে গল্পকারদের দলে। এসবই আমাকে ভালো লাগায়। আমার ছেলের ধীরে ধীরে আমার সামনে বড় হয়ে উঠছে। এখন ও বড় হয়েছে। পড়াশুনার প্রেসার বেড়েছে। এখন কি আর মায়ের জন্য গল্প আছে!
এই হচ্ছে আমার ছোট ছেলে। ও! ওর আরেকটা মজার বিষয় হলো ওর মধ্যে একটা মুরুব্বীয়ানা স্বভাব আছে। একদম ছোটবেলা থেকেই। এই স্বভাব এখনও। এখনও ওর বড় ভাই-বোনকে ও বুদ্ধি দিয়ে পরামর্শ দিয়ে মাতাব্বরি করে। তবে আরেকটা বিষয় হলো সবাই আবার সেটাকে এক্সসেপ্টও করে। একটা সময় ছিল যখন ও কিছু বললেই অন্য ভাই-বোনরা ক্ষেপে যেতো। বলতো তুমি ছোট-মানুষ এতো কথা বলো কেন? কিন্তু এখন আর সেটা নেই। এখন সবাই ওর মতামতকে প্রাধান্য দেয়। ওর একটা বিষয় আমাকে খুব ভালো লাগে সেটা হলো, আমার বড় ছেলে কিংবা আমার মেয়ের উপর আমি কোন বিষয়ে একটু বেশী রাগ করলাম। তখন ও ওদের পক্ষ নিয়ে আমাকে বকা দেয়। তখন রাগ হলেও পরে ভালোও লাগে। এগুলো আমি প্রায়ই হাসতে হাসতে বলি, বাবা তোর তো পৃথিবীতে আসতে দেরী হয়ে গেছে।
সুনামের আমার কাছে সবচাইতে বড় সেটা হলো, ছোট থাকতে থেকেই আমি দেখেছি ও কারও বাধা মানে না। যে কোন কাজ ওর কাছে সঠিক মনে হয়ে ও করতেই থাকবেই। সেখানে হাজারও বাধা থাকলে তা থেকে দূরে সরবে না। অটল থাকবে নিজের সিদ্ধান্তে। যদিও অনেকক্ষেত্রে এই স্বভাব ভালো না।
আর এ নিয়েই আমার পরিবার। আমার তিন সন্তান আমার পৃথিবী। আর সুনাম আমার পৃথিবীর একটি অংশ।
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।