যুগ যুগ ধরে সারা বিশ্বে প্রেম, ভালবাসার স্মারক হয়ে আছে ভ্যালেন্টাইনস ডে'র উৎসব। ভ্যালেন্টাইনস ডে বলতে চোখের সামনে ভেসে ওঠে হৃদয় আকৃতির মাঝে পাখাযুক্ত শিশুর চেহারার গ্রিক প্রেমের দেবতা কিউপিডের ছবি। আজকের এই ভালবাসার দিনটির শুরুর ইতিহাস অনেক পেছনের। আবার এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক কাহিনীও। ঐতিহাসিকরা বলছেন ৩৮১ সালেও এ উৎসব চালু ছিল। তখন জেরুজালেমে চালু ছিল এ উৎসব। পরবর্তীতে ৪৯৬ সালে পোপ প্রতিবছর ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টানস ডে হিসেবে চালুর ঘোষণা দেন। এবং সেই থেকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন উৎসব চালু হয়। ১৭১২ সালের একটি সুইডিশ ক্যালেন্ডারে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ভ্যালেন্টানস ডে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আর ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে ভালবাসা- ও উৎর্বরতার সম্পর্কের ইতিহাসও অনেক পুরনো।
ভ্যালেন্টাইন্স ডে র ইতিহাস যতটুকূ জানতে পারা যায়, পৌত্তলিক(অগ্নি উপাসক রোমের পৌরাণিক কাহিনীতে রোমিউলাস নামক এক ব্যক্তি ছিল। একদা রোমিউলাস নেকড়ের দুধ পান করায় অসীম শক্তি ও জ্ঞানের অধিকারী হয়ে প্রাচীন রোমের প্রতিষ্ঠা করেন। রোমানরা এই পৌরাণিক কাহিনীকে কেন্দ্র করে ১৫ই ফ্রেব্রুয়ারী উৎসব পালন করত। উৎসবের দিন তারা একটি কুকুর ও একটি পাঠা বলি দিত। দুজন শক্তিশালী যুবক বলির রক্ত সারা গায়ে মাখতো এবং পরে তা দুধ দিয়ে ধুয়ে ফেলত। অত:পর সেই দুই শক্তিশালী যুবকের নেতৃত্বে শহরে প্যারেড অনুষ্ঠিত হতো। সেই দুই যুবক তাদের হাতে থাকা চামড়ার রশি দিয়ে সম্মুখে আগত যে কাউকে আঘাত করত। রোমান নারীরা এই আঘাত আনন্দচিত্তে গ্রহণ করতো। কেননা তারা বিশ্বাস করত, এর ফলে তারা ভবিষ্যতে বন্ধ্যাত্ব থেকে রক্ষা পাবে, আর বন্ধ্যা মহিলারা তাদের অনুর্বরতা থেকে মুক্তি পাবে। তাদের উৎসবের আরেকটি অংশ ছিল বিবাহযোগ্যা নারীদের নাম লিখে কতগুলো কাগজের টুকরো রাখা হবে। অত:পর, যে ব্যক্তি, যে নামের টুকরো তুলত সেই মেয়েটির সাথেই পরবর্তী এক বছর কাটাতো । এই এক বছর তারা পরস্পরকে যাচাই করার সময় পেত।পরবর্তী বছরের এই একই দিনে হয় তারা বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতো নতুবা একই নিয়মে নতুন সঙ্গী গ্রহণ করত। পরবর্তীতে রোমানরা খ্রীস্টানদের দখলে আসে এবং তাদের অনেকেই খ্রীস্টধর্ম গ্রহণ করে। খ্রীস্টান ধর্মযাজকরা এই অনৈতিক, অশ্লীল বিবাহ-বহির্ভূত ব্যবস্থা বাতিল করেন।
অন্য ইতিহাসে বলা হয় তিনজন খ্রিস্টান শহীদের নাম অনুসারে দিনটি পালন শুরু হয়। এখন পর্যন্ত যত জন সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম জানা যায় তাদের মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন আলেকজান্দ্রিয়ার সেন্ট ভ্যালেন্টাইন। তিনি সম্ভবত ১০০-১৫৩ সময়ে ছিলেন। বিশপ আব রোম পদের জন্য সে সময় তিনি ছিলেন শক্তিশালী প্রার্থী। তিনি মনে করতেন অর্থের বিনিময়ে পরকালে দায়মুক্তির চেয়ে বাসর ঘর অনেক ভাল। তবে প্রকৃত ভ্যালেন্টান কে ছিলেন এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে। এবং সেই তর্কের মীমাংসা এখনও হয়নি।
আর যে কাহিনীটি প্রচলিত আছে তা হলো, রোমান একজন ক্রিশ্চিয়ান সেন্টের (পাদ্রি) কাহিনী অনুসারে। তার নাম সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন চিকিৎসক। কিন্তু সে সময় রোমানদের দেব-দেবী পূজার বিষয়টি ছিল মুখ্য। তারা ক্রিশ্চিয়ান ধর্মে বিশ্বাসী ছিল না। ক্রিশ্চিয়ান ধর্ম প্রচারের অভিযোগে ২৭০ খ্রিস্টাব্দে রোমের সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের আদেশে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদ- দেয়া হয়।কারো কারো মতে, তিনি যখন বন্দি ছিলেন তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে তাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে জেলের জানালা দিয়ে চিঠি ছুড়ে দিত। বন্দি অবস্থাতেই জেলারের অন্ধ মেয়ের দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন চিকিৎসা করে। মেয়েটির সঙ্গে তার যোগাযোগ ঘটে। মৃত্যুর আগে মেয়েটিকে লেখা এক চিঠিতে তিনি জানান, ফ্রম ইয়োর ভ্যালেন্টাইন। এ ঘটনায় বিশ্বাসীদের মতে, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নাম অনুসারেই পোপ প্রথম জুলিয়াস ৪৯৬ খ্রিস্টাব্দে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন। আরো একজন ভ্যালেন্টাইনের নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে। যুবকদের বিয়ে করতে রোমান সম্রাট ক্লডিয়াস নিষেধ করেন যুদ্ধের জন্য ভালো সৈন্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। কিন্তু এ ভ্যালেন্টাইন নিয়ম ভেঙে প্রেম করেন। তারপর আইন ভেঙে বিয়ে করেন। ফলে মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হন এক প্রেমিক যুগল।
আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মিস্ এস্থার হাওল্যান্ড প্রথম ভালেন্টাইন কার্ড পাঠানোর প্রচলন করেন। ১৮০০ সাল থেকে দিনটি বাণিজ্যিকভাবে উদ্যাপন শুরু হলেও বর্তমানে এটি বিশ্বের অনেক দেশেই বাণিজ্যিকভাবে উদ্যাপিত হয়। বিশেষ করে ১৪ ফেব্র“য়ারিকে ঘিরে লাভল্যান্ড ও কলারাডো সবচে বেশি ব্যবসায়িকভাবে লাভবান হয়। আজ থেকে শতবর্ষ আগে ব্রিটেনে ছোট শিশুরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে দিনটি উদ্যাপন করত। ওয়েলেসে কাঠের তৈরি চামচের ওপর হৃৎপি-, তালা, শেকল প্রভৃতির নকশা খোদাই করে এ দিনে উপহার দেয়া হতো। এর মানে ছিল ‘ইউ আনলক মাই হার্ট’। কোথাও আবার এ দিনে তরুণীরা রোদে একটি বাটিতে পরিষ্কার পানি রেখে তার ওপর চেয়ে থাকত। ধারণা করা হতো, যার ছবি ওই পানিতে ভেসে উঠবে সে-ই হবে তার কাঙ্ক্ষিত ভ্যালেন্টাইন। কোথাও ফেব্র“য়ারির ১৪ তারিখে তরুণ-তরুণীরা তাদের জামার হাতায় কাঙ্ক্ষিত ভালোবাসার মানুষটির নাম লিখে সপ্তাহজুড়ে ঘুরে বেড়াত। তারা ধরেই নিতো, এর ফলে সহজেই কাছে পাবে তার ভালোবাসার মানুষটিকে।
কোনো কোনো দেশে ১৪ ফেব্রুয়ারিতে অবিবাহিত ছেলেরা মেয়েদের নতুন পোশাক উপহার হিসেবে পাঠাত এবং মেয়েটি ওই পোশাক গ্রহণ করলে ধরে নেয়া হতো, মেয়েটি তাকে বিয়ে করতে রাজি আছে। ওইসব দেশে কিছু লোকদের ভ্যালেন্টাইনের ওপর বিশ্বাস আরো একধাপ এগিয়ে। তারা বিশ্বাস করত, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে যদি কোনো মেয়ে তার মাথার ওপর একটি ফিতা উড়ে যেতে দেখে তাহলে তার বিয়ে হবে কোনো নাবিকের সাথে, যদি সে একটি চড়ুই পাখি দেখে তবে তার বিয়ে হবে একজন দরিদ্র লোকের সাথে, কিন্তু সে হবে খুবই সুখী। আর যদি সে সোনালি রঙের মাছ দেখে তবে তার বিয়ে হবে একজন প্রভাবশালী ধনাঢ্য লোকের সাথে।
ভ্যালেন্টাইন ডে বা ভালবাসা দিবস এখন আর কেবল যুবক-যুবতীদের প্রেম-ভালবাসার ধারক হয়ে নয় বরং বিশ্ব মানবতার প্রতীক হিসেবেই বেশি সমাদৃত। তবে স্বাভাবিকভাবেই তরুণ হৃদয়ের উষ্ণতায়, উচ্ছ্বাসে এ দিনটা বর্ণিল হয়ে উঠে। সার্বজনীন এক ভালোবাসা উৎসব হলেও শুধু প্রেম নিবেদনের মধ্যে এটি আর সীমাবদ্ধ নেই। মমতা, প্রীতি, স্নেহ এবং যত্ন প্রকাশের এবং বিনিময়ের দিন এটি। যার মাধ্যমে দৃঢ় হয় সম্পর্ক, গড়ে উঠে নতুন আত্মীয়তা বা বন্ধুত্ব। ইদানিংকার ভ্যালেন্টাইন’স ডে একেবারে অন্যরকম, যেমন-
=> উপহার বিনিময়ে খরচ হয় প্রায় ২২ মিলিয়ন ডলার
=> প্রায় সাত মিলিয়ন গোলাপ বিনিময় করা হয়
=> প্রায় ১২ মিলিয়ন কার্ড বিনিময় করা হয় এ দিন উপলক্ষে।
২০০১ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সারা বিশ্বে ‘ভালোবাসা দিবস’ উপলক্ষে প্রায় ৩০ মিলিয়ন মোবাইল টেক্সট মেসেজ আদান প্রদান করা হয়েছে। সুতরাং বুঝতেই পারছেন, কার্ড বা চকোলেটের দিন শেষ। টেলিফোন বা মোবাইলই হয়ে উঠছে ভ্যালেন্টাইন ডে’র প্রধান অনুসংগ।
স্বকীয় সংস্কৃতি অনুযায়ী দেশে দেশে বিভিন্ন ভাবে ভালবাসা দিবস পালিত হয়। যেমনঃ
=> আমেরিকানদের মন মেজাজ বিচিত্র রকমের। কার্ড আদান প্রদান তাদের সাধারণ রীতি। তারা বন্ধুর সাথে বেড়িয়ে, পার্টি আয়োজন করে, হুল্লোড় করে এদিনটি পালন করে। আরও কতো কি যে পালন করে তারা। তবে কোন রীতি বা প্রথা নেই। যার যেমন ইচ্ছে তেমনি করে দিনটি উদযাপন করে।
=> ব্রিটেনের বিভিন্ন অংশে নিজস্ব ঢংয়ে ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করা হয়। তবে সারা দেশব্যাপী বিভিন্ন কার্ড, উপহার, চকোলেট বিনিময় একটি সাধারণ রীতি। ছেলে যুবাদের মুখে মুখে এদিন একটি গান সমস্বরে উচ্চারিত হয়। এদিন কেওরা বিচি, আলুবোখারা ও কিসমিস দিয়ে তৈরি একপ্রকার রুটি বানিয়ে তারা মজা করে খায়।
=> স্পেনে প্রেমিক-প্রেমিকারা এ দিন বিভিন্ন উপহার সামগ্রী বিনিময় করে আর স্বামী-স্ত্রীরা লাল গোলাপের তোড়া বিনিময়ের মাধ্যমে তাদের ভালবাসা ঝালাই করে নেয়।
=> স্কটল্যান্ডে ভ্যালেন্টাইন’স ডে একটি জাঁকালো উৎসব। এ উৎসবের একটি পর্ব এমন যে, সমান সংখ্যক নারী এবং পুরুষ টুকরো কাগজে যার যার নাম লিখে দুটি টুপিতে নেয়। একটি মেয়েদের জন্য অন্যটি ছেলেদের জন্য। মেয়েটি যে ছেলের নাম তুলেছে, সেই একই মেয়ের নাম যদি ছেলেটি তুলে তাহলে তো কথাই নেই। তবে সে রকম হয়না বললেই চলে। অবশেষে ছেলেদের তোলা নাম অনুসারেই মেয়েরা তাদের সঙ্গী হয় এবং তারা পরস্পর উপহার বিনিময় করে এবং নাচ গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।
=> ইটালিতে একদা ভ্যালেন্টাইন্স ডে পালন করা হতো বসন্ত উৎসব হিসাবে। এদিনে যুবক-যুবতীরা ছায়াবিথী বা সাজানো বাগানে জমায়েত হয়ে গান শুনে এবং কবিতা আবৃত্তি করতো। তবে শতাব্দিরও বেশী সময় ধরে এভাবে আর পালিত হচ্ছে না। ইতালির তুরিনে এ দিনে বাগদত্তা দম্পতিরা তাদের বাগদানের কথা ঘোষণা করতো। দেখুন তো ভ্যালেন্টাইন’স ডে’র জন্মস্থানে এ দিনটির পালন রীতি।
=> জার্মানীতে এদিন ফুল দেয়া-নেয়া খুব চলে। তবে প্রেমবাণী খচিত হৃদয় আকৃতির কোন কিছু দেয়াটা এখন প্রথা। এখানে এই সামান্য উপহার বিনিময় ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কোন কিছু অনুষ্ঠিত হয় না।
=> ডেনমার্কে ভ্যালেন্টাইন’স ডে কার্ডকে বলা হয় ‘লাভার’স কার্ড’। ডেনিসরা তাদের প্রেয়সি কে কবিতা বা ছড়া লিখে পাঠায়। তবে কার্ডে তাদের নাম না লিখে তার বদলে ‘. . .’ এ ধরনের ডট ডট চিহ্ন দেয়। যদি প্রেয়সী ধরতে পারে যে কে পাঠিয়েছে সে কার্ড, তবে সে পরবর্তীতে একটি ‘Easter Egg’ উপহার পায়।
=> জাপানের ভ্যালেন্টাইন’স ডে তে চকোলেট আদান প্রদানের রেওয়াজ একটু বেশি। আর জাপানি মেয়েদের ধারণা দোকান থেকে কেনা উপহারসামগ্রী প্রকৃত ভালোবাসার পরিচয় বহন করে না। তাই তারা প্রিয়জনকে নিজের হাতে তৈরি উপহার দিতে পছন্দ করে বেশি।
=> তাইওয়ানে বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন’স ডে পালন করা হলেও চৈনিক একটি উপকথা অনুযায়ী তাদের নিজস্ব দিনপঞ্জি অনুসারে ৭ জুলাই তারিখে তারা আবারও ভালোবাসা দিবস আঙ্গিকে আরেকটি অনুষ্ঠান পালন করে। এদিন তারা পরস্পর কে লাল গোলাপের তোড়া উপহার দেয়। তাইওয়ানে ফুলের তোড়াতে গোলাপের সংখ্যা অনেক অর্থবোধক। যেমন- একটি গোলাপ মানে ‘শুধু ভালোবাসি’ এগারটি গোলাপ মানে ‘তুমি আমার খুব পছন্দের মানুষ’, নিরানব্বইটি গোলাপ মানে ‘তোমার ভালোবাসা চিরদিন আমার মনে জাগরুক থাকবে’ এবং একশো আটটি গোলাপ দেয়া মানে ‘আমি তোমার সাথে বিয়েতে রাজি’।
পাশ্চাত্যের হাত ধরে বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে যোগ হওয়া উৎসবগুলোর মধ্যে প্রথম সারির দিবসটির নাম বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। ইংরেজিতে সেন্ট বা ওয়ার্ল্ড ভ্যালেন্টাইনস ডে। যে নামেই ডাকি না কেন, দিনটি এখন বাঙালি তরুণ-তরুণীদের আকাঙ্ক্ষা পূরণের অন্যতম দিবসে পরিণত হয়েছে। হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুলপ্রায় পেমপিয়াসীরা এই দিনকে বেছে নেয় রঙের ছটায়, গোলাপের শুভেচ্ছা জানাবে মনের মানুষকে। যদিও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে বাংলার ১৪ ফেব্রুয়ারী এক বেদনাময় দিন হিসাবে দেখা যায়। ভেসে ওঠে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো। বিনা রক্তপাতে সামরিক অভ্যুথানের মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণকারী জেনারেল এরশাদের সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল বাংলার সংশপ্তক ছাত্রসমাজ।মজিদ খান প্রণীত বৈষম্যমূলক ও বাণিজ্যিকীকরণের শিক্ষানীতি প্রত্যাখ্যান করে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ধর্মঘট ও মিছিলের ডাক দেয়। সেই মিছিলে এরশাদের পেটোয়া পুলিশ বাহিনী হামলা চালায়। বেয়নট দিয়ে খুচিয়ে হত্যা করে ছাত্রনেতা জয়নালকে, গুলিতে নিহত হয় কাঞ্চন, ফারুক, আইয়ুব, প্রাণ হারায় দীপালি সাহা নামে এক অবুঝ শিশুর। এই দিন এরশাদ নিজের অজান্তে বারুদে আগুন দিয়েছিল, আর সেই বিদ্রোহের আগুন দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়েছিল জাতির সমস্ত চেতনায়। জয়নাল-কাঞ্চনদের দেখানো পথে হেঁটেছিলেন নূর হোসেন,ডাঃ মিলন সহ নাম না জানা আরো অনেকে।আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হয়, গণতন্ত্রের পতাকা শহীদের রক্তে স্নাত হয়ে আবার উড্ডীন হয়। গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ শুরু হয় ছাত্রজনতার প্রথম প্রতিবা্দ, প্রথম বিক্ষোভে ফেটে পড়া, প্রথম আত্মদান, সামরিক বেষ্টনী গুড়িয়ে গন তন্ত্রের সুবাতাস আহবান করা । বিশ্ব কাঁপানো সেই শহীদী আত্মদান ভ্যালেন্টাইন্স ডে”র আড়ালে চাপা পড়ে গেছে অনেকটা ।
বাংলা বসন্তের দ্বিতীয় ১৪ ফেব্রুয়ারী স্বপ্নীল সাজে প্রকৃতি সাজবে বাহারি রঙে। তেমনি বাহারি পোশাকে প্রিয় মানুষটির দৃষ্টি আকর্ষণে সাজবে কপোত-কপোতি। আর চোখে-মুখে আনন্দের নহর নিয়ে আসা প্রিয় মানুষটির মুখ থেকে ভালোবাসার প্রস্তাব শুনতেও ব্যাকুল হয়ে উঠবে যুবক-যুবতীরা। বসন্তের উতল হাওয়ায় আজ প্রেম দেব ঘুরে ফিরবেন হৃদয় বন্দরে। মনে মনে লাগবে দোলা, ভালোবাসার রঙে রাঙাবে হৃদয়।
পরিশেষেঃ যত বিতর্ক, ইতিহাস, উপাখ্যান থাকুক না কেন, ভ্যালেন্টাইনস ডে এখন আর কোন নির্দিষ্ট ক্ষেত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সারা পৃথিবীতেই এখন ছড়িয়ে পড়েছে এর শুভবার্তা। ভ্যালেন্টানস ডে মানেই ভালবাসা প্রকাশের আকুতি। প্রেমিক-প্রেমিকাদের মাঝে উপহার বিনিময়। আসুন আমরা কামনা করি যে, একটি দিন বা প্রেমিক-প্রেমিকা, বা তরুন-তরুনীর সীমাবদ্ধতা ভেঙ্গে, ভালবাসা বিস্তৃত হোক পরিবার, বাবা-মা, ভাই বোন, বন্ধু প্রতিবেশী সকলের মাঝে সারা বছর ব্যাপী। ভালবাসার স্বর্গীয় আভা ছড়িয়ে পড়ুক পৃথিবীর আনাচে কানাচে, যুদ্ধ বিদ্ধস্ত দেশগুলিতে যেখানে সুর্য উদিত হয় মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে, দরিদ্র ও খরা পিড়ীত আফ্রিকায় যেখানে পুষ্টিহীনতায় প্রতিদিন মারা যাছে অসংখ্য শিশু, অভাবে জর্জরিত ভারতে যেখানে অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন দুইজন কৃষক বেছে নেয় আত্মহননের পথ । মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে দৃঢ় হোক ভালবাসার বন্ধন, সুবিধা বঞ্ছিত মানুষেরর প্রতি এগিয়ে যাক ভালবাসাময় হাত। ভালবাসার প্লাবনে ভেসে যাক যুদ্ধের উন্মত্ততা , মুছে যাক যুদ্ধাহত শিশুর আর্তনাদ ।
তথ্যসুত্রঃ উইকিপেডিয়া, বিভিন্ন বাংলা ও ইংরেজী ব্লগ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

