১.
আজ ১৪ ডিসেম্বর। আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। জাতির জীবনে এক আবেগঘন দিন; এক গভীর শোকময় অধ্যায়। ঢাকায় ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর হতে ১৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয় তাদের স্মরনেই এই দিবসটি পালন করা হয়। ২৫শে মার্চ রাতে যে নিধনযজ্ঞ শুরু হয়েছিল তার ধারাবাহিকতায় খুন করা হয় জাতির মেধাবী সন্তানদের। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের প্রথম প্রহরে হানাদার বর্বর পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নিহত দেশের সকল বুদ্ধিজীবীর প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
জাতি শ্রদ্ধায় এবং শোকে পালন করবে এই দিবসটি। কারন, আমাদের পরম সৌভাগ্য যে কর্পোরেট কোম্পানী আর কর্পোরেট মিডিয়ার কালো থাবা এখনও দিনটিকে উৎসবের মোড়কে আবদ্ধ করতে পারে নাই। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, মহান স্বাধীনতা দিবস আর বাংলা নববর্ষ অনেক আগেই কর্পোরেটদের বাণিজ্য উপকরণে পরিণত হয়েছে। বিশেষত মহান ভাষা আন্দোলনকে গ্রামীন ফোন আর দৈনিক প্রথম আলো - এই দুই কর্পোরেট প্রতিস্ঠান মিলে কয়েক মিনিটের একটি আন্দোলন হিসেবে প্রদর্শন করতে চেয়েছে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বর্বর হানাদার বাহিনী নরপিশাচের মত বাঙালী নিধন শুরু করেছিল । সেই ভয়াল রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষক, ছাত্র এবং অন্য কর্মচারীরা মৃতুবরণ করেন। রোকেয়া হলও তাদের পৈশাচিক আক্রমন থেকে রক্ষা পায়নি। তবে বাঙালি এই নিধনযজ্ঞ দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়নি। ভীত হয়ে পরাজয় মেনে নেয়নি। বরঞ্চ নির্মম নৃশংস এই নিধন বাঙালীর দ্রোহের আগুনকে দারুনভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সেই দ্রোহী আগুনের আলোয় বীর বাঙালী অল্প সময়ের মাঝেই সুসংগঠিত হয়ে বর্বর হানাদার বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করে। প্রশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনীর বর্বরতাকে অগ্রাহ্য করে তাদের পর্যদুস্ত করে তোলে।
২.
পূর্বেই উল্লেখ করেছি, শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস মূলত ঢাকায় ১০ ডিসেম্বর থেকে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখের মধ্যে যে সকল মেধাবী সন্তানদের হত্যা করা হয় তাদের স্মৃতির প্রতি স্মরন করে পালিত হয়। কিন্তু যুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসে অসংখ্য মেধাবী শিক্ষক, ডাক্তার, প্রকৌশলীসহ বহু দক্ষ পেশাজীবীদের হত্যা করা হয়েছে। যাদের হত্যা করা হয়েছে তাদের প্রতি অভিযোগ ছিল তারা আওয়ামী লীগ সমর্থক অথবা মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাকারী। কেউ কেউ ছিলেন অন্ধ আক্রোশের শিকাড়। অনেককে হত্যা করা হয়েছে বিদ্বেষবশত বা উন্মত্ত প্রতিহিংসায়। প্রকৃতপক্ষে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরা যখন যাকে হত্যা করার প্রয়োজন মনে করেছে তাকেই হত্যা করেছে। লাশ গুম করেছে অথবা গনকবর বা নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে। পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরা যুদ্ধের শেষভাগে আক্রোশ, প্রতিহিংসা আর একটি নতুন জাতিকে মেধাশূণ্য করার জন্য পরিকল্পিতভাবে বুদ্ধিজীবীদের খুন করেছে। এই হত্যাকান্ডও যুদ্ধাপরাধ বা বর্তমান সরকারের সংশোধিত ভাষ্য যুদ্ধকালীন সময়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
স্বাধীনতার পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি শস্তা রাজনৈতিক কৌশল আর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে এবং বর্তমানেও ব্যপকভাবে হচ্ছে। মাননীয় আইনমন্ত্রী বলেছেন যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে এই মাসেই তিনি একটি চমক দিবেন। তিনি নতুন কি চমক দিবেন তিনিই জানেন। কারন মন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তিনি শুধু চমক দিয়েই যাচ্ছেন। কাজের কাজ কি হচ্ছে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তার এক তথ্যের সাথে পরবর্তী তথ্যের মিল বা ধারাবাহিকতা নেই বললেই চলে। ক্ষমতাগ্রহনের পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম পরিচালনার বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহন এবং পরবর্তীতে ইউটার্নে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন এখন তার স্বাভাবিক আচরন বা চমকে পরিণত হয়েছে। তার এই সকল চমক যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে সরকারের আন্তরিকতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে বারবার।
৩.
আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের বিভিন্ন অনুস্ঠানে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং সরকারী দলের নেতারা আবার নতুন করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করবেন। তাদের এই দৃঢ় অবস্থান লোক দেখানো কর্মকান্ডের বেশী কিছু নয়। কারন যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে আন্তরিকতা থাকলে ক্ষমতা লাভের এক বছরের মধ্যেই বিচার কার্যক্রম শুরু করা যেত। অন্তত বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় জড়িতদের সাধারন আইনেও বিচারের আওতায় আনা যেত। সেটা করা হয় নাই, কারন মৃত বুদ্ধিজীবী এবং মুক্তিযোদ্ধা অপেক্ষা পার্টি পালিত বুদ্ধিজীবী এবং ভোটের রাজনীতি আজ অনেক বেশী গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তব প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি এখন এক উর্বরা বাণিজ্য ক্ষেত্র। বাণিজ্যে লাভই মূলকথা। তেমন রাজনীতিতে যে কোনভাবেই ক্ষমতাসীন হওয়া মূল লক্ষ্য। ব্যবসার ক্ষেত্রে যেমন আপোষ আর হিসাব করতে হয় তেমনই রাজনীতির ক্ষেত্রেও আজ আপোষ আর হিসাবই মূল ভূমিকা পালন করে। তাই আজ সফল ব্যবসায়ীরা রাজনীতিবিদ আর জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ বা তাদের স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যগন সফল ব্যবসায়ী।
অত্যন্ত কষ্টকর সত্য এই যে, স্বাধীনতার পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন সরকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানের সরকার এবং তাদের দু'জনের উত্তরসূরীদের কোন সরকারই যুদ্বাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে এবং বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকান্ডের বিচারের বিষয়েও আন্তরিক ছিলনা এবং এখনও নাই। তারা শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসকে কিছু শোকাচ্ছন্ন কথামালা আর দৃপ্ত শপথ গ্রহনের আনুস্ঠানিকতার ব্রাকেটে আবদ্ধ রাখতে সচেষ্ট ছিলো এবং আছে। বুদ্ধিজীবী হত্যার সহযোগীদের বিচারের জন্য বিশেষ আইনের প্রয়োজন ছিলনা। হত্যা এবং লাশ গুমের বিচারের আইনেই রাস্ট্র মামলা দায়ের, পরিচালনা এবং দোষীদের শাস্তি প্রদান নিশ্চিত করা যেত।
৪.
১৯৭১ সালে সাধারন থেকে অসাধারন হয়ে ওঠা মুক্তিযোদ্ধারা প্রশিক্ষিত এক ভয়ংকর সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন । অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পক্রিয়া, আসামী বা সন্দেহভাজনদের তালিকা, সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য মন্ত্রীদের বক্তব্য পর্যলোচনা করলে এই ধারনা জন্মাতে বাধ্য যে নিজামী, গোলাম আজম আর দেলোয়ার হোসেন গং বা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিলেন। ইতিহাস বিকৃতির এই ধারাবাহিক প্রচারনার বিরুদ্ধে যাদের সোচ্চার হওয়া উচিত ছিল তাদের অধিকাংশই আজ কোন না কোন বৃহদ রাজনৈতিক দলের অনুগত এবং বাধ্যগত সুবিধাভোগী কর্মী, পদলেহনে আজ তারা পান যথার্থ তৃপ্তি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ১৯৭৩ সালে উপমহাদেশে শান্তি রক্ষার লক্ষ্যে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত পাকিস্তানি সৈনিকদের ক্ষমা করে দিয়েছিল। এই শান্তিরক্ষার ধারনার সাথে বর্তমানে যোগ হয়েছে ভোট আর ক্ষমতালাভের হিসাব। সেই হিসাবের আলোকেই চলছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সকল কার্যক্রম। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়টি বর্তমান ডিিসরকারের প্রধান এজেন্ডাগুলোর অন্যতম ছিল। কিন্তু ভোট, বাণিজ্য, ক্ষমতালাভ আর স্বার্থসিদ্ধির এক জটিল গোঁজামিলের হিসাব মিলাতে গিয়ে সরকারের বয়স বাড়ছে। কাজের কাজ কিছুই হচ্ছেনা।
মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তি ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী সংগঠন আওয়ামী লীগ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত ও শাস্তি বাস্তবায়নে পাশে নিয়েছে হোমো এরশাদকে। আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের সবচাইতে শক্তিশালী দল এরশাদের জাতীয় পার্টি। অথচ ১৯৭১ সালে এরশাদ-এর ভূমিকা ছিল বিতর্কিত। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি সকল আনুগত্য নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানেই ছিলেন । মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে চাওয়া এবং যোগ দেয়া সেনাসদস্যদের বিচারের জন্য যে মার্শাল ল কোর্ট গঠন করা হয়েছিল তিনি সেই কোর্টের সদস্য হওয়ার সৌভাগ্য(!) অর্জন করেছিলেন। বাস্তবতা হল আজ নীতিহীন ভোটের হিসাব আওয়ামীলীগকে বাধ্য করেছে বিতর্কিত এক লোককে নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে এগিয়ে(?) যেতে।
৫.
আমি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাই। খন্ডিত বিচার নয়। দলীয় বিচার নয়। নয় প্রতীকী বিচার। আমার ধারনা এই স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আপনিও বিচার চান। আপনিও আমার মত খন্ডিত, দলীয়, প্রতীকী বিচার চাননা। আসুন আমরা একতা বদ্ধ হই। আমরা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাকিস্তানী সেনা এবং তাদের এদেশীয় দোসরসহ সকল যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে নিজনিজ অবস্থান থেকে লড়াই চালিয়ে যাই। আমরা সকলে সোচ্চার না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহৃত হবে। ভোটের হিসাব আর ক্ষমতায় যেয়ে ফায়দা লোটার শস্তা বাক্যে পরিণত হবে আমাদের পরম চাওয়া "যুদ্ধাপরাধীদের বিচার" শব্দযুগল।
৬.
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সকলের নিকট আবেদন, আসুন আমরা খোলস ছেড়ে বের হয়ে আসি। আমরা পোষা বেড়াল নই। আমরা উচ্চকিত হলেই আমার গলা থেকে আর মিউ মিউ শব্দ বের হয়না। আমরা সম্মিলিত হলেই আমাদের কণ্ঠস্বর মিউ থেকে হালুমে পরিণত হয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


