বেশকিছুদিন আগে এক মানবতাবাদী শুভাকাংক্ষীর কাছ থেকে কিছু ভালো মুভি দেখার একটা লিস্ট পাই। আর সেই লিস্টের মাঝে একটা মুভি ছিলো “হোটেল রুয়ান্ডা”। অনেক দিন থেকেই ভাবছিলাম মুভিটা দেখবো কিন্তু যোগাড় এবং সময় করে ঊঠতে পারছিলাম না। সৌভাগ্যক্রমে গতকাল রাতে মুভিটা দেখে ফেললাম। আসলেই মুভিটা মানব প্রেমের এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছিবি। “"হোটেল রুয়ান্ডা”" মানবতার গল্প, মানুষকে ভালোবাসার গল্প। মৃত্যুর মুখে পড়া মানুষকে বাচাতে নিজের জীবনকে তুচ্ছ করার গল্প।

হোটেল রুয়ান্ডা (ইংরেজি ভাষায়: Hotel Rwanda) ১৯৯৪ সালের রুয়ান্ডার গণহত্যার উপর ভিত্তি করে নির্মীত চলচ্চিত্র। সিনেমাটি পরিচালনা করেছেন উত্তর আয়ারল্যান্ডীয় পরিচালক টেরি জর্জ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ প্রযোজনায় নির্মীত এই ছবিটি ২০০৪ সালে মুক্তি পেয়েছিল। দুই প্রতিযোগী স্বাধীন চলচ্চিত্র স্টুডিও লায়ন্স গেট ফিল্ম্স ও ইউনাইটেড আর্টিস্ট্স যৌথভাবে এই ছবির জন্য কাজ করেছে। ছবির শুটিং হয়েছে মূলত দক্ষিণ আফ্রিকাতে। অবশ্য কিছু দ্বিতীয় ইউনিট শুটিং রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালিতে করা হয়েছে।
হোটেল রুয়ান্ডাকে অনেকেই আফ্রিকান শিন্ডলার্স লিস্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ছবিটি মুক্তি পাওয়ার ঠিক ১০ বছর আগে রুয়ান্ডাতে মানব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা নানান ধরণের খবরের ভিড়ে এই গণহত্যার সংবাদ আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে খুব কমই স্থান পেয়েছিল। এই সুযোগেই গণহত্যা বিভৎস রূপ ধারণ করেছিল। মাত্র তিন মাসে ৮০০,০০০ লোককে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল। হুটু গোষ্ঠীর আগ্রাসী লোকেরা বিদ্রোহী টাট্সি গোষ্ঠীর মানুষদের হত্যা করে। সে সময় কিগালির এক সাধারণ হোটেল কর্মকর্তা পল রুসেসাবেগিনা প্রায় ১২৬৮ জন হুটু ও টাট্সি শরণার্থীকে রক্ষা করেন। তিনি অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে এদের সবাইকে নিজের হোটেলে (হোটেল মি কোলিন) আশ্রয় দিয়েছিলেন। সম্পূর্ণ সত্য এই ঘটনা অবলম্বনেই ছবিটি নির্মীত হয়েছে। রুসেসাবেগিনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন Don Cheadle।

চরিত্রসমূহ :
Don Cheadle - পল রুসেসাবেগিনা
Sophie Okonedo - টাটিয়ানা রুসেসাবেগিনা
Nick Nolte as কর্নেল অলিভার (বাস্তবে Roméo Dallaire)
Fana Mokoena - জেনারেল অগাস্টিন বিজিমংগু
Joaquin Phoenix - সাংবাদিক জ্যাক ড্যাগলিশ
জঁ রেনো - স্যাবিনা এয়ারলাইন্সের সভাপতি মিস্টার টিলেন্স
Desmond Dube - ডুবে
Hakeem Kae-Kazim - জর্জ রুটাগান্ডা

সাধারণ একজন হোটেল পরিচালক ১২শ মানুষকে বাচাঁতে প্রতিমুহূর্তে যে প্রতিকূলতার মুখে পড়েছেন তারই বর্ণনা দেয়া হয়েছে ছবিতে। সন্তানদের জীবন বিপন্ন জেনেও তার পরিবার তাকে প্রতিমুহূর্তে প্রেরণা দিয়েছে টিকে থাকার জন্য। এক একটা বিপদ পার হয়ে নিশ্চিত হয়েছে সে যে, এ যাত্রায় রক্ষা পাওয়া গেল , স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলার আগেই আরো বড় ঝুঁকি এসে সামনে দাঁড়িয়েছে। ১২১ মিনিটের এই ছবির কাহিনী সত্যি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। ২০০৪ সালে ছবিটি তিনটি ক্ষেত্রে একাডেমি পুরস্কার মনোনয়ন লাভ করে ছবিটি। বেশিরভাগ সমালোচকই ছবিটিকে ইতিবাচক হিসেবে মনোনীত করেছেন। অ্যামেরিকার ফিল্ম ইনস্টিটিউট ছবিটিকে সর্বকালের সেরা ‘প্রেরণাদায়ক চলচ্চিত্রের’ তালিকায় রেখেছে।
মূল ইতিহাস ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে। ছবির বর্ণনার আগে রুয়ান্ডার গণহত্যা নিয়ে কিছু কথা বলা প্রয়োজন। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় সংখ্যালঘু টাটসি এবং সংখ্যাগুরু হুটু জনগোষ্ঠীর মধ্যে গণহত্যার যে নৃশংস ঘটনা ঘটেছিল তাতে খুব অল্প সময়ে নিহত হয়েছিল প্রায় ১০ লাখ মানুষ। পৃথিবীর ইতিহাসে এই জঘন্যতম গণহত্যার ঘটনা মিডিয়ায় খুব কম প্রচারিত হয়েছিল বলেই নিহত’র সংখ্যা বেড়েছিল কয়েকগুন। রুয়ান্ডায় ঔপনিবেশিক কালের অবসান ও হুটু ক্ষমতার সংস্কৃতির ফলে সেখানে যে গোষ্ঠিগত ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল তারই চূড়ান্ত ফলাফল ছিল এই গণহত্যা। সরকারি নির্দেশেই এই হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে ভূমিকা পালন করেছে দুটি হুটু রাজনৈতিক দল, একটি এমআরএনডি অন্যটি সিডিআর। তবে গণহত্যার সময় নির্যাতিত টাটসিদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছিল উগান্ডা। আর হুটুদের প্রতি সমর্থন ছিল ফ্রান্স ও আফ্রিকার কিছু ফ্রাংকোফোন রাষ্ট্রের। ১৯৯০ সালে হুটুরা সরকার গঠন করলে টাটসিরা বিদ্রোহী হয়ে উঠে। ১৯৯৩ সালে বৈদেশিক সহায়তায় হুটু ও টাটসিদের মধ্যে একটি শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি স্বারিত হয়। এতে প্রাথমিকভাবে সংঘাতের অবসান হচ্ছে বলে মনে করা হলেও মূলত তা ঘটেনি। ভেতরে ভেতরে শুরু হতে থাকে গৃহযুদ্ধের প্রস্তুতি। এর ফলে পরের বছরই ১৯৯৪ সালে ঘটেছিল রুয়ান্ডার গণহত্যা।

ছবিটির মূল চরিত্রে পল রুসেসাবেগিনার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন ডন শিডেল এবং টাটিয়ানা রুসেসাবেগিনার ভূমিকায় ছিলেন সোফি ওকেনদো। পরিচালক ও প্রযোজক টেরি জর্জ ছবিটি তৈরি করেছেন ইংরেজি ও ফরাসি ভাষায়। ছবির মূল শূটিং হয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি ও দক্ষিণ আফ্রিকার যৌথ প্রযোজনায় তৈরি এই ছবিটি মুক্তি পেয়েছে ২০০৪ সালে অর্থাৎ মূল ঘটনার ঠিক ১০ বছর পর। হুটু গোত্রের পল রুসেসাবেগিনা রুয়ান্ডায় ব্রাজিলিয়ান মালিকানাধীন হোটেল মি. কোলিন-এর ম্যানেজার। পলের বাড়ির আশের পাশের বেশিরভাগ প্রতিবেশিই টাটসি সম্প্রদায়ের। হুটু সম্প্রদায়ের হাতে টাটসিদের নিহত হওয়ার ঘটনা শুরু হওয়ার পরও প্রতিবেশি টাটসিরা বিশ্বাস আর আস্থা নিয়ে পলের বাড়িতে আশ্রয় নেয়। হোটেলের ম্যানেজার হওয়ার ফলে পলেরও কর্নেল, সাংবাদিক , সরকারি কর্মকর্তাদের সাথে বেশ ভালো একটা পরিচিতি তৈরি হয়। আর হুটু সম্প্রদায়ের পল তার আশ্রয় নেয়া অসহায় টাটসি মানুষগুলোর প্রাণ বাচাঁতে এই উর্ধ্বতনদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে নিজেও অনেকটা বিপন্ন অবস্থায় পড়ে যায়। প্রথম দিকে তার ভেতরেও চাকুরি এবং পরিবারের নিরাপত্তার জন্য টাটাসিদের আশ্রয় দেয়ার জন্য কিছুটা দ্বিধাদন্দ্ব দেখা গেলেও ছবি যত মূল ইতিহাসের কাছাকাছি যেতে থাকে ততই দেখা যায় পল টাটসি শরণার্থীদের আশ্রয়ের জন্য নিজেকে আরো বেশি উৎসর্গ করছে। প্রথমে প্রতিবেশীরা তার বাড়ীতে আশ্রয় নেয় এরপর এ সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরে তার হোটেল মি. কোলিনের কয়েকটি ঘরে গোপনে আশ্রয় দেয় টাটসিদের, হোটেলে থাকা অন্য বিদেশি অতিথিদের সাহায্য নেয়ার চেষ্টা করে সে । কিন্তু একপর্যায়ে এই বিদেশি অতিথিদের অন্য হোটেলে সরিয়ে নেয়ার নির্দেশ আসে তখন শরণার্থীদের নিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে পল। ছবির এই অংশে সাংবাদিকতার ওপর রাজনৈতিক বিধিনিষেধ ও তার ফলাফল দেখানো হয়। হোটেলে থাকা এক বিদেশি সাংবাদিক জ্যাক ড্যাগলিশ যখন হুটুদের হাতে টাটসি হত্যাযজ্ঞের কিছু ভিডিওচিত্র ধারণ করে নিয়ে আসে পল সেটা দেখে কিছুটা আশ্বস্ত হয় যে বিশ্বে এই ভিডিও চিত্র প্রকাশিত হলে মানুষ অন্তত জানবে রুয়ান্ডায় কী হচ্ছে, তাতে অন্যান্য দেশ থেকে এই গণহত্যা বন্ধের জন্য চাপ তৈরি হবে এবং শরণার্থীরা নিশ্চয়ই সাহায্য পাবে। কিন্তু এই ভিডিও প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ আছে জানানোর পর আশাহত হয় পল।

পরিচালক এই সুযোগে এই সত্য প্রকাশ করেছেন যে, রুয়ান্ডার গণহত্যার ঘটনা গণমাধ্যমে চেপে রাখা হয়েছিল, যার ফলে এত ভয়াবহভাবে দাঙ্গা ছড়িয়ে যায়। ছবিতে জাতিসংঘের কর্মীদের সাহায্যের একটি বড় ভূমিকা দেখানো হয়েছে। যদিও তখন রুয়ান্ডায় খুব অল্প সংখক সাহায্য কর্মী পাঠানো হয়েছিল তবে তারা চেষ্টা করেছে হুটুদের সাথে সমঝোতায় এসে অসহায় টাটসিদের রক্ষার জন্য। এর মধ্যে কর্নেল অলিভার গাড়ির সামনে বসে থেকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে টাটসি শরণার্থীদের সীমানা পার করে দিতে চেষ্টা করেছে। কর্নেল পুরো ছবিতে নানাভাবে চেষ্টা করেছেন পলকে সাহায্য করতে। এর মধ্যে বিদেশি শরণার্থীদের ওই হোটেল থেকে সরিয়ে নেয়ার পর হোটেল মালিক সিদ্ধান্ত নেয় হোটেলটি বন্ধ করে দেবে। এসময় আবারো বিপদে পড়ে পল। একসময় বন্ধ হয়ে যায় হোটেলের পানি সরবরাহ, শেষ হয়ে আসে খাবারের মজুদ। নিজের পরিবারসহ ১২০০ শরণার্থী নিয়ে চলতে থাকে বিরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর মানুষের প্রাণ বাঁচাতে পলের লড়াই। এখানে একটি দৃশ্য বর্ণনা না করলেই নয়, খাবারের মজুদ শেষ হয়ে যাবার পর পল জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হুটু সম্প্রদায়ের আর এক পূর্ব পরিচিত ব্যবসায়ীর কাছ থেকে খাবার কিনতে যায়। ভোরের রাস্তায় প্রয়োজনের তুলনায় খুব সামান্য খাবার সংগ্রহ করে যখন ফিরে আসছে তখন ছবিতে দেখানো হয় কুয়াশা, পুরো প্রকৃতি নীল রঙের, সূর্য পুরো উঠেনি তাই আধো অন্ধকার, পাশের পুকুর থেকে ঠাণ্ডায় জমা পানির ধোঁয়া উঠছে। বেশ কিছুক্ষণ ধরে পলের ড্রাইভার গাড়ি বেশ বাজে ভাবে চালাচ্ছিল। এই চালক আবার পূর্বে ছিল পলের বিরোধী। পলের সন্দেহ হতে থাকে। এই রাস্তা এতটা উঁচু নিচু নয় যে এতটা খারাপভাবে চালাতে হবে। একসময় বাধ্য হয়ে পল নেমে পড়ে রাস্তায়। দরজা খুলে নেমে পল প্রথমে বুঝে উঠতে পারেনি সে কি দেখছে- ফিরে এসে কাউকে বলতে পারে না তার দেখা দৃশ্য, কিন্তু মানসিকভাবে অনেকটা অসুস্থ হয়ে যায় সে। আবার শরণার্থীদের দিকে তাকিয়ে সাহস জমায়, সংযত করে নিজেকে, অনুভব করে যে ভাবেই হোক এই বিপন্ন মানুষের প্রাণ রক্ষার দায়িত্ব তার একার।

সমালোচনা / প্রতিক্রিয়া :
প্রায় সব সমালোচকই ছবিটির প্রশংসা করেছেন। রটেন টম্যাটোস-এ শতকরা ৯২ জনই ইতিবাচক সমালোচনা করেছেন। মেটাক্রিটিক-এ রেটিং ৭৯% এবং সেখানে দর্শকরা ১০ এর মধ্যে ৮.৫। আইএমডিবি রেটিং ৮.৪। যুক্তরাষ্ট্রে এটা প্রথমে "R" রেটিং পেয়েছিল। কিন্তু এটি গুটিকয়েক ছবির একটি যেগুলো পুনরায় আবেদনের মাধ্যমে এই রেটিং এড়াতে পেরেছে। কিছু নৃশংস দৃশ্যের জন্য শেষে একে "PG-13" রেটিং দেয়া হয়। ছবিটি তিনটি ক্ষেত্রে একাডেমি পুরস্কার মনোনয়ন লাভ করে: সেরা অভিনেতা, সেরা পার্শ্ব অভিনেতা এবং সেরা মৌলিক চিত্রনাট্য। অবশ্য কোনটিই জিততে পারেনি।
অ্যামেরিকান ফিল্ম ইনস্টিটিউট ছবিটিকে সর্বকালের সেরা "প্রেরণাদায়ক চলচ্চিত্রের" তালিকায় এটিকে ৯০তম স্থান দিয়েছে। চলচ্চিত্র সমালোচক রিচার্ড রোপার বলেন, এটা তার জীবনে দেখা সেরা প্রেরণাদায়ক ছবিগুলোর একটা এবং তিনি একে ২০০৪ সালের সেরা ছবি হিসেবে মনোনীত করেন। রজার ইবার্ট ছবিটিকে ৪ তারকা দিয়েছেন এবং ২০০৪ সালের সেরা ছবির তালিকায় ৯ নম্বরে স্থান দিয়েছেন।
হোটেল রুয়ান্ডা এক মানবতার প্রতিকৃতি ছবি। যেখানে মানবতাবাদ, মানুষের সাথে মানুষের প্রেম ভালোবাসা উঠে এসেছে।
সূত্র :
http://en.wikipedia.org/wiki/Hotel_Rwanda
Click This Link
Click This Link
Click This Link
Click This Link
http://www.samowiki.net/details.php?id=166
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৯:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


