সমাজ প্রগতির পরিবর্তনের সংগ্রামে ছাত্র-যুব সমাজের উলেখযোগ্য অবদান রয়েছে। দুনিয়াতে যতগুলো সমাজব্যবস্থা আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে মানবজাতি অতিক্রম করে বর্তমান যুগে প্রবেশ করেছে, তার পরতে পরতে রয়েছে যুব সমাজের আত্মবলিদান ও রক্তাক্ত সংগ্রামের ইতিহাস। দাস প্রথার বিরুদ্ধে প্রথম যে বিদ্রোহ করেছিল সেও ছিল যুবক 'স্পার্টাকাস'। এরই ধারাবাহিকতা চলে আসছে সমাজ বিপ্লবের ইতিহাসে।
মহান ভাষা আন্দোলনের রক্তাক্ত ইতিহাসের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচার, সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রগতিশীল ছাত্র আন্দোলন সংগঠিত করার আহবান নিয়ে ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল গঠিত হয় তৎকালীন 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন'। যার নেতৃত্বে ছিলেন মুহাম্মদ সুলতান, ভাষা সৈনিক কমরেড আবদুল মতিন, শহীদুলা কায়সার, গাজীউল হক, অলি আহাদ প্রমুখ। যাদের বেশিরভাগই সে সময়কার অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দিন আহমদ প্রমুখও ভাষা আন্দোলন ও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে শরিক ছিলেন।
ভাষার মর্যাদা রার জন্য রক্তদান পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। মায়ের ভাষা বাংলাকে রা করার জন্য ১৯৪৮ সালে এ দেশের ছাত্র সমাজ মহান ভাষা আন্দোলনের সূচনা করে। ভাষার জন্য ১৯৫২ সালে ছাত্রদের জীবনদানের মধ্য দিয়ে এ দেশের ছাত্র সমাজের গৌরবময় রক্তাক্ত ইতিহাস সৃষ্টি হয়। '৫২-এর ছাত্র আন্দোলন এ দেশের বাঙালী জাতির মুক্তি সংগ্রামের আকাঙ্খাকে জাগ্রত করে। ভাষা আন্দোলনের পাশাপাশি ছাত্রদের সমস্যাভিত্তিক দাবী, সিয়াটো-সেন্টো পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিল এবং স্বাধীন জোট নিরপে পররাষ্ট্রনীতির দাবীতে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার পিছনে নিরলসভাবে কাজ করেছে এ দেশের ছাত্র সমাজ।
'৫২-র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ছাত্র ইউনিয়নের জন্ম। আর এই '৫২-এর ভাষা আন্দোলনকে ধরা হচ্ছে স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনের শুরু এবং এরই পরিপ্রেক্ষিত ধরে ১৯৫৪’র নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয় এবং পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর দল মুসলিম লীগের ভরাডুবি ঘটে। পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠীর এ পরাজয়ের পর নানা ষড়যন্ত্রের পথে তারা পা বাড়ায় এবং এই ষড়যন্ত্রই পাকিস্তানি শাসকদের কর্মপদ্ধতিতে পরিণত হয়। ফলে নির্বাচিত যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেয়া হয় এবং নতুন সরকার গঠন করা হয়। এভাবে পাকিস্তান আর গণতান্ত্রিক পথে এগোল না। যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর ঐক্যে ভাঙন সৃষ্টি করল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। এরপর ১৯৫৮ সালে জেনারেল আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে সবরকম গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করে।
'৬০-এর দশকে অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে চলা 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন' থমকে দাঁড়ায় কমিউনিষ্ট আন্দোলনের আন্তর্জাতিক মহাবিতর্কে। বিভক্ত হয় পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন। দ্বিখন্ডিত ছাত্র ইউনিয়নের এক অংশের নেতৃত্ব দেন রাশেদ খান মেনন আর অপর অংশের নেতৃত্ব দেন মতিয়া চৌধুরী। এই দু’টি অংশ ব্র্যাকেটবন্দী হয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) আর পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া) নামে আলাদা দুটি সংগঠনে রূপ নেয়। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আপোষকামিতা ও সুবিধাবাদকে পরিহার করে সাম্রাজ্যবাদ, স্বৈরাচার এবং সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে আপোষহীনভাবে এগিয়ে নিয়েছিলেন যারা, তারাও পরবর্তীতে বহুধাবিভক্ত এমনকি সংগঠনের নাম পর্যন্ত বদল হয়েছে আর এখন তো ওই অংশ ক্ষয়িঞ্চু অবস্থার মধ্যেও বিকাশমান।
ছাত্রসমাজ তথা ছাত্র ইউনিয়ন-ছাত্রলীগ ঐক্যবদ্ধভাবে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে এবং সৃষ্টি হয় '৬২-এর শিক্ষার আন্দোলন। তখন রাজনৈতিক দলের নেতারা জেলে আটক বা আত্মগোপনে থাকায় ছাত্রসমাজই আন্দোলনের মূল ভূমিকা পালন করে। ষাটের দশকে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলন আরম্ভ হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ছাত্রদের ওপর চলে নির্যাতন। এ সময় আন্দালনরত ছাত্র সমাজের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের নেতা রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, পঙ্কজ ভট্টাচার্য, রেজা আলীসহ বহু নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়। ছাত্র ইউনিয়নের নেতা ফরহাদের বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি হয়। ষাটের দশকের মাঝামাঝি মোর্শেদ আলী, মুজিবুল হক, ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকীসহ আরও অনেকে গ্রেফতার হন। গড়ে ওঠে স্বাধীনতার মুক্তির সনদ ১১ দফার আন্দোলন। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে সারা বাংলায় দুর্বার ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং রাশেদ খান মেনন, হায়দার আকবর খান রনো, সাইফউদিন মানিক, আসাদুজ্জামান আসাদ সে আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের শহীদ আসাদ আমাদের প্রেরণা।
ইতিমধ্যে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার 'আগরতলা' ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে এবং এর কিছুদিন পরেই আত্মগোপনে থাকা কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মণি সিংহ পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের হাতে গ্রেফতার হন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে একের পর এক আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়ল পাকিস্তানি শাসক আইয়ুব খানের গদির ওপর। সৃষ্টি হল ১৯৬৯-এর ২৪ জানুয়ারি গণঅভ্যুত্থান, ছাত্রদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল এদেশের শ্রমিক, কৃষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষের আন্দোলন। মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামী ছাড়া পাকিস্তানি শাসকদের পক্ষে আর কেউ ছিল না। নির্বাচনে পাকিস্তানি শাসকদের ভরাডুবি হল এবং মতা হস্তান্তর না করে বাংলার নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর পাকিস্তানি সেনাদের লেলিয়ে দিল। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা হল। কমিউনিষ্টদের প থেকে ঘোষিত হয় 'স্বাধীন জনগণতান্ত্রিক পূর্ববাংলা'র আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক বিপ্লবী কর্মসূচী।
শুরু হল মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্যায়। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (ভাসানী), ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ (মোজাফ্ফর), কমিউনিষ্ট পূর্ববাংলার সমন্বয় কমিটিসহ কমিউনিস্ট পার্টির বিভিন্ন গ্রুপ, ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) ও ছাত্র ইউনিয়ন(মতিয়া)-এর আলাদা ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা হয় এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা সারাবিশ্বে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে মতামত গড়ে তোলার জন্য বিশ্ব যুব ফেডারেশনের মাধ্যমে প্রচার কাজে অংশ নেয়। আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করা কম বড় কথা ছিল না।
তৎকালীন 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন(মেনন)'-এর সংগ্রামী ধারার বর্তমান উত্তরসুরী সংগঠনসমূহঃ
১· বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়ন
২· বাংলা ছাত্র ইউনিয়ন
৩· জাতীয় ছাত্র ইউনিয়ন
৪· ছাত্র ঐক্য ফোরাম
৫· জাতীয় ছাত্র দল
৬· গণতান্ত্রিক ছাত্র ইউনিয়ন
৭· বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী
৮· বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী
৯· বিপ্লবী ছাত্র সংহতি
তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন’ (মতিয়া)-এর বর্তমান উত্তরসুরী সংগঠনঃ
১· বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন
আজকে দেশ আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের জালে আবদ্ধ। ৩৭ বছরে বিশ্বের অবস্থা অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। দেশ আজ আবার স্বাধীনতাবিরোধীদের কবলে। এখান থেকে দেশ ও জাতিকে উদ্ধারের জন্য ছাত্রসমাজকে তৈরি হতে হবে। ছাত্রসমাজকে বুঝতে হবে, সাম্রাজ্যবাদের এককেন্দ্রিক বিশ্ব ও মুক্তবাজার অর্থনীতি আমাদের মতো গরিব দেশকে বিপর্যস্ত করে শুধু তাদের পণ্যের বাজার বানাতে চায়। 'ব্রেন ড্রেন' করে দেশকে মেধাশূন্য করতে চায়। এই বুঝ-বিবেচনা ছাড়া আমার দেশে সন্তানদের শিক্ষা জীবন অব্যাহত থাকবে না। যুবসমাজ আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে না। ফলে যে আন্দোলন শুরু করেছিল ছাত্র ইউনিয়ন '৫২ সালে তা শেষ হয়নি, অব্যাহত আছে। এভাবেই সমাজ পরিবর্তনের সংগ্রামী ধারাকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে হবে।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে এপ্রিল, ২০০৮ রাত ১১:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


