somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ধারাবাহিক: পর্ব -১ “এসএম হলের ডায়েরি”

০২ রা জুন, ২০১৪ বিকাল ৫:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


এসএম হলের ডায়েরি
হোসাইন সাজ্জাদ

এসএম হলের এক আবাসিক ছাত্রের লেখা দৈনিক ডায়েরি।
অনেক বাস্তবতাই অবিশ্বাস্য বলে মনে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের নানা ঘটনার প্রতিবিম্ব এ ডায়েরি।
ভর্তি-যুদ্ধে জয়, হলের ক্যান্টিন, মাঠ, মসজিদকে ঘিরে স্মৃতিচারণ।
বারান্দায় থাকা কষ্টের সে দিনগুলি...
একটি প্রেম, অতপর...হৃদয়ের অতল জলে অবগাহন।
নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার।
ভালবাসার শিশিরে সিক্ত হওয়া দু’টি মন।
পহেলা বৈশাখ আর বসন্ত উৎসবের নতুন আমেজে মন ভাসানো।
সেন্ট্রাল লাইব্রেরি, হাকিম চত্বরের আদা-চা’য়ে জিব ভেজানো।
টিএসসি, ফুলার রোড, ভিসি চত্বরের রাঙা সেই দিনগুলি।
প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের সুখ ছাড়তেই মন চায় না।



উৎসর্গ:
এসএম হল’কে যেখানে আমি আশ্রিত





যে কথা না বললেই নয়

সকল মানুষের স্বপ্ন থাকে, সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে সবাই। এসএম হল-কে নিয়ে আমার স্বপ্ন অনেক। এসএম হলের ডায়েরি বইটি আমার সে স্বপ্নের লিখিত রূপ। বইটি লিখতে পেরে আমি আমার স্বপ্নকে সার্থক করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হলে থাকা একজন আবাসিক ছাত্রের না বলা কথার প্রতিধ্বনি হিসেবে কাজ করবে এ বইটি। বইটি লিখতে গিয়ে আমার রুমমেটদের অনুপ্রেরণা পেয়েছি অনেক। বইটির প্র“ফ দেখে দিয়েছেন আমার রুমমেট সিরাজ ভাই, সাঈদ ভাই, মানিক ভাই। তাঁদের শ্রমের ফসল আমার এ বইটি। বইটি লেখার ব্যাপারে উৎসাহ দিয়েছেন শ্রদ্ধেয় মোশাররফ স্যার। আমার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো টিউশনির টাকায় বইটি প্রকাশিত হল। রাবিতা আক্তার ডলি; আমার ছাত্রী। তার অবদানকে অস্বীকার করে অকৃতজ্ঞ হতে চাই না। আমার বাবা বইটি প্রকাশ হওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত জানেন না যে, আমি আর শুধু সাজ্জাদ নই, লেখক সাজ্জাদ। বাবার জন্য এটা একটা সারপ্রাইজ।

হোসাইন সাজ্জাদ
১৫৯, এসএম হল
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
+৮৮০১৭২৯৩৯৭৯৭৯



এসএম হল পরিচিতি:

সলিমুল্লাহ মুসলিম হল সাধারণত এসএম হল নামে অধিক পরিচিত। খাজা আবদুল গনির ষষ্ঠ পুত্র, খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ’র (১৮৪৬-১৯০১) জ্যেষ্ঠ পুত্র নওয়াব সলিমুল¬াহ ১৮৭১-এর ৭ জুন জন্মগ্রহণ করেন। ১৯০৩ সালের ১ জানুয়ারি সপ্তম অ্যাডওয়ার্ড দিলি¬র দরবারে মুকুট পরিধান অনুষ্ঠানে তাঁকে ‘নওয়াব বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯১২ সালের ২৯ জানুয়ারি দিলি¬র দরবারে বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণার পরে, ৩০ জানুয়ারি ঢাকার কার্জন হলে বড়লাটের আগমন উপলক্ষ অনুষ্ঠানে নওয়াব সলিমুল্লাহ পূর্ব-বাংলার অনগ্রসর মুসলিমদের শিক্ষার সুযোগ করে দেয়ার লক্ষ্যে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১২ সালের ২৭ মে রবার্ট নাথানের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয়। এরপরে সলিমুল্লাহ’র অব্যাহত দাবির প্রেক্ষিতে ১৯২০ সালের ২৩ মার্চ নাথান কমিটির রিপোর্টটি বিশ্ববিদ্যালয় অ্যাক্ট হিসেবে অনুমোদন লাভ করে। ১৯২০ সালে ১৫ নম্বর অ্যাক্টের মাধ্যমে মুসলিম হল প্রতিষ্ঠিত হয়, যার কার্যক্রম ১৯২১ সালে শুরু হয়। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯২৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম হলের নামকরণ করা হয় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল।
সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ভবনের পরিকল্পনা ও নকশা প্রস্তুত করেন স্থপতি মি. গাইথার। বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর স্যার স্ট্যানলি জ্যাকসন ১৯৩১ সালের ১১ আগষ্ট আনুষ্ঠানিকভাবে সুরম্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ভবনের উদ্বোধন করেন। ১৯৩১-৩২ শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ১৯২৮ সালে ডিসেম্বর মাসের শেষ ভাগে তদানীন্তন গভর্ণর জেনারেল এবং ভারতবর্ষের ভাইসরয় ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনের কথা থাকলেও তা আর হয়ে ওঠেনি, একারণে ১৯২৯ সালে ২২ আগষ্ট ভিত্তিপ্রস্তর আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপন করা হয়। সমাজ সংস্কারক, জনদরদী, সমাজসেবী, শিক্ষানুরাগী, নওয়াব বাহাদুর স্যার সলিমুল্লাহ ১৯১৫ সালে ৫ জানুয়ারি ইহলোক ত্যাগ করেন। ঢাকার বেগম বাজারস্থ পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।





যেভাবে সাজানো আমার ডায়েরির পাতা...

এসএম হলকে ঘিরে আমার স্বপ্ন
১০/০২/২০০৮

রুমের স্বপ্ন সার্থক হল আমার
১৩/১২/২০০৯

আমার রুমমেট ও আমি
২০/০২/২০১০

সেরা কলেজের অসার ছাত্র
২২/০২/২০১০

বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির হাতছানি...
২৫/০২/২০১০

অক্সফোর্ড দ্বীপে আমি
২০/০৩/২০১০

রুস্তম আলীর ক্যান্টিন
১০/০৪/২০১০

প্রেমের পরিসংখ্যান
১২/০৪/২০১০

রিডিং রুম
১৫/০৪/২০১০

শাহবাগের ফুলের মেলা
১৬/০৫/২০১০

ইভটিজিং
১৮/০৬/২০১০


রক্তচোষা
২০/০৬/২০১০

এসএম হলের মেস
২১/০৬/২০১০

প্রেমের বিভিন্নতা:
কিশোর প্রেম
৩০/০৬/২০১০

যুবক বয়সের প্রেম
০২/০৭/২০১০

আমাকে লেখা রবির প্রথম প্রেমের চিঠি
১৮/১০/২০১০

বিয়ে পরবর্তী প্রেম
৩০/১০/২০১০

বয়স্ক প্রেম
১/১১/২০১০

বাবাকে লেখা তাঁর চাকরি জীবনের শেষ চিঠি
২৭/১২/২০১০













এসএম হলকে ঘিরে আমার স্বপ্ন
১০/০২/২০০৮

একটা তালা যুক্ত টিনের ট্রাঙ্ক। মশা নিরোধক মশারী। চার ফিট প্রস্থ আর আট ফিট দৈর্ঘ্যরে অতটুকুন জায়গায় তার বাস। কোন আসবাবপত্রের বালাই নেই। আমি কোন মিসকিন বা মুসাফিরের থাকার ঘরের কথা বলছি না। জামাই হল হিসেবে খ্যাত এসএম হলের রাজপ্রাসাদের রাজবারান্দায় থাকা, ছারপোকাদের সাথে বসবাসরত রাজপুত্রদের কথা বলছি। কী কঠিন কষ্টের জীবন-যাপন এই মেধাবীদের, তা স্বচক্ষে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। শরনার্থী শিবিরের সদস্যরাও এর থেকে ভাল অবস্থানে থাকে। ভর্তিযুদ্ধ বা মেধার মহাযুদ্ধে জয় হয়ে কী লাভ হয়েছে, যদি মাথা গোঁজার আশ্রয়টুকু বৃষ্টি এলেই ভিজে যায়। ঘুমের মাঝে বৃষ্টির পানি ভিজিয়ে দেয় বিছানার তোষক, বালিশ আর চাদর।
এই মেধাবী মাথাগুলো আট বা দশ সিটের রুমের সাধ করতে পারে না। এদের মধ্যে তৃতীয় বর্ষের ছেলেও আছে। প্রথম বর্ষের আনাড়ি ছেলের সাথে তৃতীয় বর্ষের জ্যেষ্ঠদের পাশাপাশি সহাবস্থান, সত্যি বেমানান আর অস্বস্তিকর। একটি রুমের স্বপ্ন ওদের কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। বড় ভাইদের নক্ষত্রপুঞ্জ, স্বর্গছেড়া, বার্ডনেস্ট নেমপে¬টধারী নামকরণের রুমে গেলে কান্নার জলে চোখ ভিজে যায়। সাজানো গোছানো, কার্পেট দিয়ে মোড়ানো, নতুন রং করা রুমে গেলে নিজেকে অসহায় ছাড়া কিছু ভাবতে ইচ্ছে করে না।

বিশ্ববিদ্যালয় লাইফের আমার আর একটা বছর বাকি।
এখন আমি নামি-দামি ডিপার্টমেন্টের তৃতীয় বর্ষে পড়–য়া বেশি নাম্বার পাওয়া ছাত্র। আমি বড় অফিসার হব, বিসিএস ক্যাডার হব, এরকম স্বপ্ন দেখে আমার পরিচিত জনেরা। আমি স্বপ্ন দেখি ডাবলিং বেডের একটা সিট; যেখানে আমি ক্লাস শেষে ক্লান্ত হয়ে অবশ দেহ নিয়ে মনের মত করে ঘুমাব। পূর্ব আকাশের সূর্যের আলো লেগে অথবা বারান্দায় পাশ দিয়ে যাওয়া কারো পা লেগে, আমার কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যাবে না। অত সাজানো গোছানো রুমের দরকার নেই আমার। রুম হলেই হল, সেটা গণরুম আর জনরুম যাই হোক। শুধু একটা বিছানা আর বালিশ হলেই হল। শরীরটা মাঝে মাঝে বিছানায় শোয়ার বায়না ধরে। অগত্যা বড় ভাইদের রুমে গিয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে মনকে প্রবোধ দেই। বাড়ি গেলে অতবড় বিছানায় আমি একা ঘুমাই, কিন্তু ঘুম আসে না। এসএম হলের বায়ু না হলে আর পানি দিয়ে গোসল না করলে আমার দেহ ও মন জুড়ায় না। এ বাতাসের অক্সিজেন আমার দেহের সাথে মানিয়ে গেছে।
এসএম হল ছাড়া বনানীর বড় চাচার বড় ফ্লাটেও আমার ঘুম আসে না। প্রায়ই ভাবি এসএম হলের জীবন আমার আর বছর-দুই, তারপর কীভাবে থাকব মশা-মাছির এই শহরে। ভাবতেই মনটা মোচড় দিয়ে ওঠে। রুম আর বিছানার স্বপ্ন তখন বাদ দিয়ে ভাবি বারান্দাতেই ভাল আছি; শহরের পাকা বাড়ির স্যাঁতসেঁতে বদ্ধ রুমের চেয়ে। বাবা সেদিন ফোনে বলল, বাসার পূর্ব পাশের বড় আম গাছটি কেটে বাংলোর জন্য খাট বানাচ্ছেন কাঠমিস্ত্রি দিয়ে। খাটের কথা মনে হতেই মনে হল ইস! যদি একটা খাট এসএম হলের বারান্দায় আনা যেত। অন্তত রুম আর বিছানার অর্ধেক স্বপ্ন পূরণ হত আমার, পূরণ হত অর্ধেক শূন্যতা। বাসাতে বড় দুটি খাট আমি আর বড় ভাইয়ের জন্য সবসময় খালি পড়ে থাকে। আর বিছানা ছাড়া কী বিরক্তির জীবন যাপন করছি রাজপ্রাসাদের এই রাজ বারান্দাতে।


রাতে সারা শহর যখন ঘুমিয়ে থাকে এসএম হলকে তখন প্রাচীন ঐতিহ্যের কোন দূর্গ বলে মনে হয়। আমরা সেই দূর্গের দূর্গাধিপতি হই বছর পাঁচেকের জন্য। এত স্মৃতি জমা হয় এসএম হলের মাঠ, বারান্দা, ক্যান্টিন, মসজিদ আর রিডিং রুম নিয়ে; সে স্মৃতিচারণ করতে কেটে যাবে পরবর্তী চাকরি ও সংসার জীবন। আমার স্মৃতি ভাণ্ডারে কোন রুমের স্মৃতি থাকবে না, থাকবে দীর্ঘ পাঁচ বছরের বৃষ্টি, ঝড় আর ধূলার ধূসর থেকে নিজেকে রক্ষার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। সকালে আধা সেকা রুটি
রুস্তম আলীর ক্যান্টিনে বাসি ভাজি দিয়ে খাই। দুপুরে খাবার খাই ডাকসু’তে। রাতের খাবারের ভিন্নতা আনতে যাই নীলক্ষেতের মামা হোটেলে বা বুয়েট ক্যান্টিনে। খাওয়ায় মন নেই আমার। খেয়ে পেট পুরলেও মন জুড়ায় না। বার বার মায়ের রান্না মাছের ঝোল অনুভব করি ক্যান্টিনের ঝাঁঝালো ঝোল মুখে দিয়ে।
রাত বারটা নাগাদ কাজ শেষ করে ফুলার রোডে বসি গা মেলে। ফুলার রোডে ফুল নেই, সারি সারি করে জোড়া বাঁধা প্রেমিক যুগলের হাতে হাতে গুচছফুল। ফুলার রোডের নামের সার্থকতা এখানেই। উদয়ন স্কুল পার হয়ে পলাশীর এক কাপ গরম চায়ের নেশা মাথায় জেঁকে বসে। চায়ের নেশা তাড়াতে পলাশীর মোড়ে যাই আদা-চায়ে জিব ভিজাতে। হলের মাঠের নরম সবুজ ঘাস আমাকে চরমভাবে টানে।
মিনিট পাঁচেক পরেই হলে ফিরে আসি।
আমার পঁচা-বাসি খাওয়া পাঠান দেহ এলিয়ে দেই সবুজ ঘাসের বিছানার উপর। ভিজা গায়ে শীতল বাতাসে চরম শিহরণ জাগে। মাঝ রাত অবধি খালি গায়ে ঘুমিয়ে থাকি সবুজ ঘাসের উপর। নরম ঘাস আমাকে ওদের আপন ভেবে অক্টোপাসের মত আঁকড়ে থাকে। বারান্দায় আমার বিছানার উপর ধূলার আস্তরণ ঘুমুতে শরীর সায় দেয় না। ঝেড়ে ঝুড়ে বালির বিছানায় বাধ্য হয়ে ঘুমাতে যাই, কিন্তু ঘুম আসে না। টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে পড়তে বসি স্বরযন্ত্রকে শব্দহীন করে, পাছে সহপাঠী কারো ঘুম ভেঙ্গে যায়। ভোর হবার আগেই কাঁচা ঘুম ভেঙ্গে যায়। চোখ কাঁটা কাঁটা লাগে ঘুমের অভাবে। ঘুম ভাঙ্গে বারান্দার পাশে থাকা পাখ-পাখালির অতিচিৎকার আর পাশের টেবিলে বড় ভাইটির উচ্চস্বরে পড়ার ভঙ্গিতে। কিছুই করার নেই আমার আফসোস করে। আফসোস করব সেটাও আবার সবার কাছে নয়, পাত্রভেদে। বড়বাবুদের সিটের কথা বললে সায় দেয়, কিন্তু সিট দেয় না। গেস্ট রুমের লিস্টে সপ্তাহে দুই-তিন দিন না থাকলে বড় বাবুদের গলা গরম হয়ে যায়। মনটা তখন আরো বিষিয়ে যায়। কী করুন আর কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েছি এই আবেগী আমি। কষ্ট করতে করতে হৃদয় কাঠ হয়ে গেছে যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রেম হয় নাই কারো সাথে। নাওয়া খাওয়ার কষ্ট সহ্য করা গেলেও, শোয়ার কষ্ট আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়।


গ্রামের বন্ধুরা বলে, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মত নামি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। অথচ আমার বড়ত্ব চার ফুট প্রস্থ আর আট ফুট দৈর্ঘ্যের বারান্দার ফ্লোর। সেই বন্ধুরা জানতে পারে আমার দৈন্যতা, যখন শামীম তার বড় বোনের বাসা আজিমপুরে আসে, রাতে আমার কাছে শোয়ার বায়না ধরে। নিজের কষ্টকে কষ্ট মনে করি না। কিন্তু বন্ধুর সামনে এ লজ্জা রাখি কোথায়? অবশ্য এ লজ্জা আমার না, এ লজ্জা বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় কর্তাদের। গ্রামে গিয়ে আমার দৈন্যতার কথা বন্ধুদের কাছে বলে দেয়, এ কথা ভাবতেই ওকে বুঝাই আমার রুম সংস্কার চলছে। প্রাচীন হল, বুঝিস তো সেই ১৯২১ সালে গড়া। মিথ্যা বাহানার গল্প ওকে বলি। শামীম আমার কথায় বিশ্বাস করে, বিশ্বাস না করে উপায় নেই। আমি বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় মিথ্যাবাদী। আমার কথার মারপ্যাঁচ আমার এ গ্রাম্য সহজ-সরল বন্ধুটির বুঝার কথা না। হলের প্রতি তারপরও আমার আবেগী টান; অজানা আদরের লোভে আমি বারান্দাতেই থাকি। সেদিন, বহুবছর আগে হলে থাকা এক বড় ভাই হলে এসে আবেগী হয়ে কেঁদে একাকার। তার চোখে জল দেখে আমি যাই কোথায়? তারপর থেকে হলের প্রতি আমি আরও বেশী আবেগী। বড়ভাই তার রুমে গিয়ে দিক-বেদিক চিন্তা না করে বিছানায় শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন। আমারও বিছানায় শুয়ে কাঁদার শখ আছে। তবে আমি কাঁদব কোথায়? এই বারান্দাতে! খুব কষ্ট হয়, আমি কাঁদতেও পারব না আমার মত করে। এসএম হলের স্মৃতিচারণ করতে এসে আজ থেকে বছর বিশেক পরে কর্তৃপক্ষ যেন আমার জন্য একটি বিছানার ব্যবস্থা করে। কী স্বার্থপর আমি, শুধু নিজের কথা বলে যাচ্ছি, বারান্দায় থাকা বাকী অনাথগুলোর কথা বলছি না। ওরা মায়ের আদর, বাবার শাসন পায় না। ভাইয়ের স্নেহ আর বোনের ভালবাসা পায় না। তবুও ওরা মেডিকেলের অজানা বারান্দার রোগীর মত পড়ে থাকে হলের বারান্দাতে।
ওদেরও আমার মত কাঁদতে মন চায় এ আমি বুঝি। কে করবে এই কাঁদবার ব্যবস্থা, কাকে আশ্রয় করে কাঁদব আমরা? ওরা একদিন বড় অফিসার হবে, বড় আমলা হবে, দেশের দিক নির্দেশনা দিবে।
স্প্রিং ম্যাট্রেজের নরম তুলার বিছানায় ঘুমাতে গিয়ে অবশ্যই বারান্দায় ঘুমের কষ্টের কথা মনে পড়বে। ওয়াশ রুমে গিয়ে কষ্টের চোখের জল মুছবে, পাছে স্ত্রী-সন্তানরা কান্নার কারণ জিজ্ঞাসা করলে জবাবহীন হয়ে যায়। স্মৃতিচারণ করতে অনেক নামি-দামি অফিসার এসএম হলে আসে সপরিবারে। স্ত্রীকে দেখান দেখ দেখ, এই মাঠ, এখানে বসে তোমাকে প্রেমপত্র লিখতাম। বাবু তোমাদের বাবা এই রুমে থাকত। ছেলে-মেয়েদেরকে এমএম হলের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন বড়লোক বাবা। ছেলে-মেয়েরা বাবার বিছানায় বসে ভাবে; আমাদের বাসার বিছানা কত নরম। তুমি এত শক্ত বিছানায় ঘুমাতে কি করে? ছোট মেয়েটি প্রশ্ন করে বাবাকে। আমরা বারান্দার অনাথরা যদি স্মৃতিকাতর হয়ে স্মৃতিচারণ করতে এসএম হলে আসি বাচ্চাদের কি বলব? তোমাদের চৌধুরী আর তালুকদার বাবা বারান্দায় বালির বিছানায় খোলা আকাশের নিচে ঘুমাত। এ লজ্জা পাওয়ার চেয়ে মরা কী ভাল হবে না!
তারা জানবে তাদের ‘বড় সাহেব’ নামধারী বাবা খালি ফ্লোরে বালির বিছানায় থাকত। তখন এ মুখ কি করে ঢাকব? আমাদের স্মৃতির পথেও লজ্জার ভয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের কাছে লজ্জা সেটা মেনে নেওয়া যায়। সন্তানের কাছে লজ্জায় ছোট হওয়া বাবাদের কি সাজে? আমার এ কান্না কারো শুনবার কথা নয়। কারণ এ কান্না প্রতিধ্বনিত হয় না। আমার এ কান্না বুঝতে পারি আমরা যারা বারান্দাতে থাকি, আর বুঝতে পারবে- অনাগত বারান্দায় আসা অভাগাগুলো ।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০১৪ রাত ৯:০৪
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপিপন্থী ব্লগারদের বাকস্বাধীনতা হরনের নমুনা

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ১০:১৬

বিএনপির মির্জা আব্বাস অসুস্থ হবার পর কিছু বিএনপি সমর্থক এর দায় খুবই ন্যক্কারজনকভাবে নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারীর উপড় চাপাতে চাইছে !! অসুস্থ মির্জা আব্বাসের ছবি দিয়ে এরকম... ...বাকিটুকু পড়ুন

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:২৯

মির্জা আব্বাস ও দায় এড়িয়ে যাওয়া



মির্জা আব্বাসের যদি কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে, তাহলে এর নৈতিক দায় এড়িয়ে যাওয়া সহজ হবে না। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে তাকে লক্ষ্য করে অসম্মানজনক... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১৪ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৩২

প্রিয় সামু ব্লগারদের কাছে খোলা চিঠি....

প্রিয় সহব্লগার,
আমার লেখা একটা পোস্টের তথ্য খুজতে অনেক দিন পর আজ আবার লগইন করলাম আমাদের প্রিয় সামুতে। লগইন করার পর প্রথমেই অভ্যাসবশত চোখ গেল প্রথম... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমরেড তারেক রহমান , লাল সেলাম ।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ১:৪৮


ভোটের কালি নখ থেকে মোছার আগেই তিনি কাজ শুরু করেছেন। এই কথাটা তিনি নিজেই বলেছেন, গতকাল, ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। আর এই কথাটা পড়ে আমার বুকের ভেতরে একটা উষ্ণতা অনুভব... ...বাকিটুকু পড়ুন

জয়তু এ আই: পৃথিবী বদলে যাচ্ছে

লিখেছেন কলাবাগান১, ১৫ ই মার্চ, ২০২৬ সকাল ৭:২৭


An Outstanding Scientific Odyssey:

আমরা যারা ল্যাবে কাজ করি, তারা খুব ভাল ভাবেই জানি একটা জীবন রক্ষাকারী ঔষুধ বা মানবজাতির জন্য উপকারী মেথড/ম্যাটেরিয়াল ডেভেলপ করতে কত বছর ধরে রিসার্চ, সাধনা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×