
(নতুন বসা শিখতে শুরু করেছে। গলের অদূরে উনাবানটুনা বিচে সমুদ্রের ঢেউ দেখে অবাক নিহিম। )
প্রতিটি মানুষের জীবনেই সন্তান অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। এর মাধ্যমে এগিয়ে চলে মানব জাতির ক্রমবিকাশের ধারা। একটি মানুষ যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকে তার সন্তানের মাধ্যমে। আর প্রথম সন্তানের আগমন সত্যিকার অর্থেই একটি বিস্মযকর ঘটনা। যাদের জীবনে এটা ঘটেনি তারা হয়তো ব্যাপারটি ঠিক উপলব্ধি করতে পারবে না। কেননা এটি নিজের জীবনে না ঘটলে এর ব্যাপকতা বুঝা অনেক কঠিন।
এমন একটি অবিস্মরণীয় ঘটনা আমার জীবনেও এসেছিল। তবে আমারও ভাগ্য পূর্ণ মাত্রায় অনুকূলে ছিলনা। বিশাল দুরত্বের কারণে সেই অবিস্মরনীয় ঘটনার এক বঞ্চনার স্বীকার ছিলাম আমি। ২০০৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর আমাদের বিয়ের পর ২০০৭ এর ৯ ফেব্রুয়ারি জীবিকার প্রয়োজনে আমি আর আমার স্ত্রী দু’জনেই দেশ ছাড়ি। শ্রীলংকার রাজধানী কলম্বোতে শুরু হয় আমার জীবনের সংগ্রাম। বেঁচে থাকার জন্য কি প্রাণান্তকর প্রয়াস আমাদের। বাংলাদেশী কমিউনিটি বিহীন এই শহরে আমার বসবাস যেন একটা জেল জীবনের মতো । অনেক কষ্টে কেবল মাত্র বাঁচার প্রয়োজনে এই জেল জীবন সয়ে গিয়েছি। অন্য কোন উপায় থাকলে আমি কবেই চলে যেতাম এখান থেকে।
২০০৮ সালের এপ্রিলে আমরা আমাদের প্রথম সন্তানের প্রত্যাশা করি। কলম্বোর এক জন বিখ্যাত গাইনী ডাক্তার হলেন ড: নলিনী প্রসাদ। অ্যাপলো হসপিটালে (বর্তমানে লংকা হসপিটাল) তার কর্মস্থল, নিবাস ভারতে। তার কাছে কাছে চেক আপের জন্য গেলে তিনি আমাদের বললেন, কোন কাজ করা যাবে না। সব সময় রেস্টে থাকতে হবে। হাসিখুশী থাকতে হবে। এখানে কোন কাজের লোক ম্যানেজ করতে পারলাম না। যদিও পাওয়া যায় তার বেতন দেয়া আমার সাধ্যের বাইরে। দেশ থেকে যে কাউকে আনবো এমন কেউ নেই। শেষ পর্যন্ত কোন উপায়ন্তর না দেখে সে দেশে চলে গেল। কোন ঝুঁকি নেয়া যাবে না। অনাগত আত্নজার নিরাপত্তার খাতিরে সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম আমরা।
কলম্বো থেকে সরাসরি কোন বিমান বাংলাদেশে যায় না। বিভিন্ন জায়গা ঘুরে তবে যেতে হয়। সব চেয়ে সুবিধার ছিল ঐ সময় কলম্বো-সিঙ্গাপুর-ঢাকা সেক্টর। ঢাকা থেকে কলম্বোর দূরত্ব মাত্র ১৩৫৬ মাইল বা ২১৮৩ কিমি । এই সামান্য পথ যেতে সময় লাগে প্রায় একদিন! ভাবা যায়? সেই মোতাবেক আমার স্ত্রী ২০০৮ সালের ২৪ অক্টোবর ঢাকা চলে যায় । আমার একাকীত্ব আরো বেড়ে যায়। আগে দু’জনে কলম্বোর পথে পথে কত ঘুরাঘুরি করতাম। এখন আমার আর কেউ রইল না। অবসর সময় কলম্বোর অলিতে-গলিতে ঘুরে বেড়াই। সাগরতীরে বসে বসে ভারত মহাসাগর থেকে ছুটে আসা ঢেউযের সাথে সখ্যতা গড়ার চেষ্টা করি। জীবন এক ঘেয়ে হয়ে উঠে। সময় আর যেন কাটতে চায় না। কথা বলব এমন মানুষ পাইনা। বাসায় ইন্টারনেট থাকার সুবাধে রাতে কোন কোন বন্ধুর সাথে চ্যাট করতাম। মনের কষ্ট লাঘব করার ব্যর্থ চেষ্টা করতাম।
২০০৯ সালের ০৬ জানুয়ারির অলস দুপুরে পৃথিবীতে আসে আমাদের প্রথম সন্তান সেই দিন সকালে ভেলাকে কল দিতেই সে বলল, অনেক খারাপ বোধ করছে। খুব কষ্ট হচ্ছে তার । হাসপাতালে যেতে হবে। এই ধরনের সমযে স্ত্রীরা দারুণভাবে তাদের স্বামীকে মিস করে। সেই দারুন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমি আমার স্ত্রীর পাশে থাকতে পারিনি। এটা আমার জীবনের অন্যতম একটা ট্র্যাজেডি। আজ আমি বুঝতে পারি আমার মতো আরো কত জন যারা প্রবাসে আছেন তারা এই বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছেন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশ গুলোতে যে সব মানুষ আছেন তারা ব্যাপারটি বেশী বুঝতে পারবেন। দুপুরের শেষের দিকে কল করতেই মোবাইল ধরলেন আমার শাশুড়ি আম্মা। তিনি আবেগ জড়িত কণ্ঠে বললেন- অভিনন্দন, তোমার মামণি চলে এসেছে------------------।
নাম জোগাড় করা অনেক কঠিন একটি ব্যাপার। নেট থেকে এবং বই দেখে অসংখ্য নাম দেখার পরও নাম ঠিক করা গেল না। যে কোন নামকেই মনে হয় পুরাতন। মনে হয় এই নাম তো আরেক জন রেখেছে। অনেক ঝামেলার কাজটি শেষ করা ছিল আরো কঠিন। সেই ঝামেলার কাজটি শেষ করল নিহিম-এর মা। তার নাম রাখা হল- নিহিম তাজরিয়ান। যার অর্থ-ঝরনা ধারা বহমান।
৬ মাস বযস হবার পর ২০০৯ সালের ২৯ জুলাই তারা আবার কলম্বোতে আসে। অন্যরকম এক জীবন শুরু হয় আমার। ব্যস্ততা বেড়ে যায়। পৃথিবীতে আসার পরপর আমাকে না দেখতে পেলেও কেন জানি তার সাথে খুব তাড়াতাড়ি আমার সখ্যতা গড়ে উঠল। বিমানের বোর্ডিং ব্রিজ থেকে নেমেই সে আমার কোলে আসে। কোন কাঁন্না করেনি। আঁকড়ে ধরে থেকেছে আমাকে। এর পর চলেছে তার যত কান্ড। কত যে আনন্দ তাতে। এই আনন্দ কি আর টাকায় কিনতে পাওয়া যায়? শিশুদের এই সব কান্ডের সাথে আগে কখনো নিবিড়ভাবে পরিচিত ছিলাম না।

৬/৭ মাসের বাচ্চারা সাধারণ ঘুম থেকে উঠেই জোরে কাঁন্না জুড়ে দেয়। আমাদের মেয়ে তেমন নয়। সে ঘুম থেকে ঘুম থেকে উঠেই আমাদের দেখতে চেষ্টা করত। আর দেখতে পেলেই এতো সুন্দর করে হাসত। সেই হাসি যে কারো মন কেড়ে নেয়ার জন্য যথেষ্ট। প্রতিদিন বেশীর ভাগ সময় আমি তাকে কাছে পেতাম না। সকালে উঠেই যেতে হতো অফিসে। ততক্ষণে বেশীর ভাগ দিনই সে ঘুম থেকে উঠত না । কোন কোন দিন যদি তার ঘুম আগে ভাগে ভাঙ্গত তাহলে কোলে উঠে আর নামতে চাইতো না। ততক্ষণে আমার অফিসে লেট হবার দশা। কত কষ্টে যে তাকে রেখে যেতে হত তা । ঘরের বাইরে যেতে তার অনেক আগ্রহ। কিন্ত গেটের বাইরে এলেই আমার কোলে সে ঘুমিয়ে পড়ত। এমন কি সি বিচ দেখতে গেলেও সে বাসার বাইরে বের হবার পরপরই ঘুমিয় পড়ত। সবটুকু ঘুরাঘুরির শেষে বাসায ফিরলে তারপর তার ঘুম ভাঙ্গত। তখন তার কত চঞ্চলতা । তার রাজ্যে সে ছিল এক নিভৃতচারী রাজকন্যা।

মাঝে আমি আমার রাতের ডিউটি থেকে ফিরতাম ভোরে ৪ টার দিকে। ফলে সেদিন সে আগেই ঘুম থেকে উঠে পড়ত। আর আমি অনুভব করতাম সে আমার বুকে তার নরম হাত দিয়ে থাপড় দিচ্ছে। যেন বলছে, অনেক বেলা হয়েছে এবার উঠো। ফলে যথারীতি ঘুম থেকে উঠে পড়তে হত। মায়ের শাসন তো মানতেই হবে।
প্রতিদিন তার জন্য ৫/৭ বার আমার পোশাক বদলাতে হত। মাঝে মাঝে একাধিক বার গোসল করতে হত। এটা হবেই। মায়া তো বাড়ে এভাবেই। তার প্রতি আমার মায়া দিনে দিনে বেড়েই চলল। মায়া বড় কঠিন জিনিস। পৃথিবী টিকেই আছে মায়ার বাঁধনে।
সে যখন হামাগুড়ি দিতে শিখল, ঘরের এখানে ওখানে যাতায়াত করতে শিখল তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কি যে কঠিন হয়ে পড়ল। ড্রয়ার টেনে খুলে ভেতরের সব কিছু ফেলে দেয়। যেন এগুলো সব ঝামেলা অহেতুক ওখানে রাখা ছিল। কোন বই বা ম্যাগাজিন থাকলে তার পৃষ্ঠা টেনে ছিড়তেই হবে। বই ছেড়া যেন বিদ্যার্জনের সর্বপ্রথম ধাপ। তারপরও তার এই কান্ডকারখানায় কত যে মধুর সময় কাটত আমার। মনে হত ওকে কেন্দ্র করেই ঘুরছে আমার বিশ্বজগত।
আমার মামণিটা এখন আর আমার কাছে নেই। গত ২৪ জানুয়ারি ২০১০ রাতের ফ্লাইটে সে বাংলাদেশে চলে গেছে। কত যে একা হয়ে গেছি আমি । মনে হয আমার যদি কোন উপায় থাকত তাহলে এই সব চাকরি বাকরি ছেড়ে কবে যে চলে যেতাম। প্রতি নিয়তই তাকে আমার মনে পড়ে। তার আধো আধো মুখের বাবা বাবা শুনতে কত যে ভাল লাগত! তার তুল তুলে হাতের স্পর্শ, তার আধো আধো বোল আমার মনকে কেবলই আকুল করে।
এখন প্রতি দিন কম্পিউটারে ওর ছবির স্লাইড শো দেখি। ভাল লাগে আর কষ্টে বুক ভরে যায়। মনে মনে বলি: মামণি,তোমাকে ছাড়া আমার আর একটুও ভাল লাগে না। কবে যে তোমাকে আবার দেখতে পাব। ততদিনে তুমি কি অনেক বড় হয়ে যাবে? তখন কি তুমি আমাকে চিনতে পারবে? মামণি, আমি তোমাকে অনেক, অনেক, অনেক ভালোবাসি।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা অক্টোবর, ২০১০ সকাল ১১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



