somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্মৃতির পাতা থেকে..........নটরডেম কলেজ (অম্ল মধুর নানা অভিজ্ঞতা)- কিছু টুকরো স্মৃতি। (শেষ পর্ব)

১৬ ই আগস্ট, ২০১১ দুপুর ২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্মৃতির পাতা থেকে-নটরডেম কলেজ...অম্লমধুর নানা অভিজ্ঞতা-মুখতার স্যারের কথা।....পর্ব ৭

এই লেখাটিই আমার নটরডেম নিয়ে স্মৃতিকথার শেষ পর্ব। এর আগের পর্ব গুলোতে বিভিন্ন টিচারদের স্মৃতি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম, এবার করব আমার ও আমার বন্ধুদেরকে নিয়ে কিছু স্মৃতি।

কলেজের প্রথম ক্লাসেই সবার সিট ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। আমার সিট পড়েছিল ১ম সারির শেষের দিকে, জনালার পাশে। আমার একটা ব্যাপার খারাপ লেগেছিল যে কলেজ লাইফ পুরোটা একই জায়গায় থাকতে হবে। এই পদ্ধতির সবচেয়ে বাজে দিক হচ্ছে ক্লাসের সবার সাথে ভালভাবে পরিচিত হতে না পারা, শুধু হাতে গোনা কয়েকজনের সাথেই ভালভাবে পরিচয় হয়।

আমার আরেকটা আকর্ষন ছিল বাস্কেটবল কোর্ট। আমরা ব্রেকের সময় মাঝে মাঝে খেলতাম। বাস্কেটবল ছাড়াও, ফুটবল, ক্রিকেট ব্যাট, ফ্রিসবি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এসবের জন্য পুরানো বিল্ডিং এর নিচতলায় একটা ঘর ছিলো। সবচেয়ে বেশী ডিমান্ড ছিল বাস্কেট বলের, সবসময় পাওয়া যেত না। ওটা না পেলে আমি ফ্রিসবি নিয়ে বন্ধুদের সাথে খেলতাম।

ব্রেকটাইমে কিছু খাবার জন্য ক্যান্টিনে যাওয়া হতো। ক্যান্টিনে বসার যায়গাগুলো ছিল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। ক্যান্টিনে অনেক কিছুই পাওয়া যেত, তবে আমার পছন্দের আইটেম ছিল “হটডগ” লম্বা রুটির মাঝখানে একটু ঝাল ঝাল লম্বা চপ দেয়া থাকত। ক্যান্টিনে একটা জিনিষ মজা লাগত, সেটা হচ্ছে “টমেটো সস”। সেই সস কোন বোতলে থাকতো না, থাকতো গামলার মধ্যে। আমরা ডাল নেয়ার মত সস চামচ দিয়ে বাটিতে নিতাম। টেরেন্স স্যার একবার আমাদের নিষেধ করেছিলেন সেই ক্যন্টিনের খাবার না খেতে, তিনি বলেছিলেন, “তোমরা বাসা থেকে এনে খেও কেননা যেভাবে রান্না করা হয় তা মোটেও ভালনা। তবে আমার কেন যেন সেই ক্যন্টিনের খাবারই বেশি মজা লাগতো।


ক্যন্টিনে আমার এক ফ্রেন্ড মজার কান্ড কারখানা করত, তখন “স্লাইস” ম্যাংগো জুসের উপর একটা হালকা ইরোটিক টিভি অ্যাড দেখাতো। ওই অ্যাডে দেখাতো, একটা মেয়ে স্লাইস এর বোতল দু হাতে ধরে পুরো মুখে দিয়ে দেয়, সাথে সাথে তার দুই হাত বোতলের গায়ে মোচড়াতে থাকে। আমার এক ক্লাসমেট সেটি বেশ সুন্দর করে অভিনয় করে অভিনয় করে দেখাতো আর আমরা তালি দিয়ে উৎসাহ দিতাম!

তবে ক্যন্টিন নিয়ে সবচেয়ে মজার ঘটনা হয়েছিল ২য় বর্ষের শুরুর দিকে। একদিন ব্রেকটাইমে দেখলাম যে মেইন গেইট বন্ধ। আমরা খুবই সমস্যায় পড়লাম, কেননা প্রায় অর্ধেকের চেয়ে বেশী ছাত্র বাইরে খেতে যেত, তাছাড়া সব ছাত্রের একসাথে ক্যান্টিনে জায়গা হওয়া অসম্ভব। হলোও তাই, আমি ক্যান্টিনে ঢুক্তে গিয়ে দেখি বিশাল এক সমুদ্র, ক্যন্টিনের বাইরেও অনেক ছাত্র অপেক্ষা করছে। আমরা বুঝতে পারলাম ব্রেক টাইমের মধ্যে কোন ভাবেই সুস্থমত খাবার পাওয়া ও খাওয়া সম্ভব না। হঠাৎ একজন ছাত্র চিৎকার উঠলো “বিমল!!!”। অ্য্যাকশন সিনেমায় দেখেছি একটা ডিনামাইট জ্বালিয়ে কয়েক বাক্স ডিনামাইটের দিকে ছুঁড়ে দিলে ভয়াবহ বিস্ফোরণ হয়। ঠিক সেরকমই কিছু একটা হল। সারা কলেজের ছাত্র একসাথে চিল্লাছে “বিমল.......বিমল.......বিমল”। আমাদের আর কোন স্লোগান ছিল না, কোন হাত পা ছুড়াছুড়ি নেই খালি একটাই স্লোগান “বিমল”। আমি নিরিহ মুখ করে হাটতে হাটতে স্লোগান দেই, “বিমল......বিমল”, সারা কলেজ তখন গলা ফাটিয়ে “বিমল....বিমল” করে চিল্লাচ্ছে! কিছু টিচার বললেন “ছেলেরা তোমরা চুপ কর”, আমরা আরো দ্বিগুন উৎসাহে “বিমল....বিমল” করে চিল্লাছি। কিছু স্যার আমাদেরকে অনু আরেক দল দেখলাম স্লোগানে নতুন কিছু যোগ করল- “বিমল....হোমো.....বিমল হোমো”। কিছুক্কন পর আমরা সবাই যে আর ক্লাসে ফিরে গেলাম। পরদিন দেখলাম মেইন গেইট খোলা, একটা তিন অক্ষরের শব্দ যে এত শক্তিশালী হতে পারে তা ভালভাবেই প্রত্যক্ষ করলাম।

কলেজের ক্লাবকার্যক্রমের সাথে আমি তেমন ভাবে জড়িত ছিলামনা, শুধু “বিজনেস ক্লাবে” নামে মাত্র সদস্য ছিলাম। এইক্লাবের উল্লেখযোগ্য কার্যক্রমের মধ্যে আমি শুধু একবার সোনারগাঁয়ে পিকনিকে গিয়েছিলাম। আরেকটা ক্লাব সম্পর্কে আমার আকর্ষণ তৈরী হয়েছিল, যেটা ছিল “অ্যাডভেঞ্ছার ক্লাব”। নাম শুনে মনে করেছিলাম পাহাড়ে ওঠা বা জঙ্গল ট্র্যাকিং এর মত কোন অ্যাডভেঞ্চার হবে, পরে দেখলাম অ্যাডভেঞ্চার বলতে সোনারগাঁয়ে ট্যুরে যাওয়া তাও আবার সেই ট্যুরে নাকি সবাইকে রুটি ভাজি খেতে দেয়া হয়েছিল।

আমার মতে নটরডেম কলেজের সবথেকে উল্লেখযোগ্য ক্লাব ছিলো সাইন্স ক্লাব, ডিবেটিং ক্লাব ও নেচার স্টাডি ক্লাব। সাইন্স ক্লাবের সবথেকে আকর্ষনিয় কার্যক্রম ছিল সাইন্স ফেয়ার আয়োজন করা।

একবার সাইন্স ফেয়ারে বিভিন্ন স্কুল কলেজের অনেক ছাত্র ছাত্রী এসেছিল। রুমের ভেতরে ঢুকে টেবিলের সামনে যেতেই তারা হড়বড় করে তাদের প্রজেক্ট বর্ননা করছে, ২য় তলায় আরো অনেক প্রজেক্ট। আমি এমন গম্ভীর মুখ নিয়ে সব টেবিলের সামনে গিয়েছিলাম যে তারা মনে করেছিল যে আমি একজন বোদ্ধা। আইডিয়াল কলেজের এক মেয়ে দেখলাম যে সে মঙ্গলগ্রহে বসবাসের উপর প্রজেক্ট বানিয়েছে!! ওইদিন সায়েন্স ক্লাবের মেম্বার না হবার জন্য খুব আবসোস হয়েছিল। আমার কিছু বন্ধু দেখলাম সেখানে ভলান্টিয়ার হয়েছে এবং তারা মেয়েদের সাথে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।

এই সায়েন্স ক্লাবের পক্ষ থেকে একবার আমাদের সাইন্স ফিকশন সিনেমা দেখানোর ব্যাবস্থা করা হয়েছিল। তিনট সিনেমা দেখানো হয়েছিল “এ.আই”, “ফাইনাল ফ্যান্টাসি” ও “জ্যুরাসিক পার্ক ৩”। আমি “জুরাসিক পার্ক” সিনেমাটা দেখেছিলাম। মার্টিনের হলের অডিটোরিয়ামে প্রজেক্টরে দেখানো হয়েছিলো, সামনে ফাদার ও টিচাররা বসেছিলেন, পেছনে আমরা, বন্ধুদের সাথে সিনেমা দেখার মজাই ছিল আলাদা। এক সিনে দেখানো হয়েছিল যে, নায়িকা কাপড় বদলানো জন্য তার শার্ট খুলে ফেলে। এই সিন দেখে আমরা সবাই হোওওওও করে চেঁচিয়ে উঠি, আমার এক ক্লাসমেট বলে উঠলো “অ কুবির, আজ কি জার রে কুবির!!” এর পরের বছরও সিনেমা দেখানো হয়েছিল, এইচ,এস,সি’র প্রস্তুতির জন্য দেখতে পারিনি। সেবার “স্করপিয়ন কিং” দেখানো হয়েছিল। সেখানে একটি রগরগে সিন কাটার কথা ছিল, কিন্তু সিনেমা দেখানোর সময় নাকি দেখা যায় সেই সিনটি ঠিকই রয়ে যায় তার বদলে সেই সিনের আগের সিন কাটা হয়!

আমার কলেজ জীবনের একটি স্বরনীয় ঘটনা ছিল জেমস এর লাইভ কন্সার্ট উপোভোগ করা। ক্লাব-ডে’র শেষ আকর্ষন ছিল সেই কন্সার্ট। অনেক ছাত্র আগে ভাগেই সামনে জায়গা দখল করে বসে যায়। আমি আমার বন্ধু জাহিদ সহ পেছনে বসলাম। কোন চেয়ারের ব্যাবস্থা না থাকাতে সবাই মাটিতেই বসেছে। কন্সার্ট শুরু হবার আগে “ফাদার বিমল” ঘোষণা করলেন, “তোমরা বসে বসে গান শুনবে, কেউ দাঁড়াবে না, ভলান্টিয়ার যারা আছ তারা সবাই মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাও”। আমরা সবাই হই হই করে উঠলাম, ভলান্টিয়াররা আর মাঝখানে দাঁড়াতে সাহস পেল না। কিছু কিছু গান বসেই শুনলাম। একটু পরে জেমস গান শুরু করল “যান্ত্রিক নগরে.......তখন মাঝরাত পেরিয়ে গেছে” আমরা আর বসে থাকতে পারলাম না সবাই দাঁড়িয়ে উদ্দাম নাচ শুরু করলাম। কন্সার্টের মাঝখানে আসরের আযানের জন্য বিরতি দেয়া হয়েছিল, পরে আমার এক বন্ধুর কাছে শুনেছি ওইসময় জেমস গাঁজা টেনেছিল! এই জন্য আসরের আজানের অনেক পড়ে কন্সার্ট আবার শুরু হয়েছিল।

কলেজ ছেড়েছি প্রায় ১০ বছর। কিন্তু এখনও সেই ১০৩ নম্বর রুম, বাস্কেটবল কোর্ট, বিশাল মাঠ, ক্যান্টিন চোখের সামনে ভাসে, মনে হয় এই কয়েকদিন আগেই কলেজ থেকে বের হয়েছি। আমার চোখে এখনো কলেজের সবুজ গাছগাছালির দৃশ্য চোখে ভাসে। বামার বাসা থেকে কলেজ খুব কাছে, কিন্তু এখন আমাদের জন্য কলেজে ঢোকা সহজ নয়, পুলিশি জেরার মুখে পড়তে হয়। কেন এসেছি, কার কাছে যাব। আমার হৃদয় দেখে এই দুই বছরের স্মৃতি কখনই মুছে যাবেনা, সবসময় মনে থাকবে এই কলেজ জীবনের কথা। আমাদের স্যাররা প্রায়ই একটা কথা বলতেন, “একজন নটরডেমিয়ান সারা জীবনের জন্য নটরডেমিয়ান”।.....(সমাপ্ত)




সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১১ দুপুর ২:২৭
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×