চলছে...
ভালো খারাপের মধ্যে দিয়ে চলছিলো সময়। শরীরটা একটু ভালো হলো মাঝে মাঝে কলেজে যাচ্ছি। মনের মধ্যে একটা খুশি একটা ভাবনা ঘুরপাক খেতো কবে বাবু হবে কবে আদর করবো।
আম্মার বাসায় যখন থাকতাম সারাদিন মেশিনে সেলাই করতাম, কখোনোই আমি চুপচাপ বসে থাকতে পারি না। আম্মা বকা দিতো আর আব্বা বলতো সারাদিন সেলাই করলে তোমার ছেলে দরজী হবে!
আমি রাগ হতাম আব্বার উপর বলতাম ছেলে কেনো বলছো আব্বা, আমার মেয়ে হবে। আমি মেয়ে পছন্দ করি।
আব্বা হাসতো ঠিক আছে মেয়েই হবে।
রানাদের বাসায় সবাই ছেলেই চেয়েছিলো তথাকথিত নিয়মে।
শরীর পুরোপুরি ভালো হলো, শুরু হলো আমার আবার লাফ ঝাপ, দৌড়ে ছয়তলায় উঠা নামা, আমি ভুলেই যেতাম আমি প্রেগনেন্ট।
বাবু হওয়ার পর পরীক্ষা দিতে পারবো তো তা নিয়েও মাঝে মাঝে চিন্তা, আমার শাশুড়ীতো একদিন বলেই ফেললেন আর পড়ার দরকার কি?
কথাটা শুনে অনেক ভয় পেয়েছিলাম, মনে হয়েছিলো পড়াশুনাটা বোধ হয় বন্ধই হয়ে গেলো, কিন্তু যত কষ্টই হোক পড়া আমি বন্ধ করার কথা ভাবতেও পারিনি।
সবার অমতেই কলেজ যাচ্ছি, এমনিতেই কেউ দেখতে পারতো না, এসব কারণে আরও যেনো অসহ্য হয়ে উঠলাম।
এতো কিছুর পরও বাসায় কাজ করতে হতো, শবেবরাত আসলো অনেক কাজ রুটি বানাতে হবে, বাবু পেটে নিয়ে বসে থাকতে অনেক কষ্ট হতো তারপরও করতেই হবে অনেকগুলো রুটি বানাতে হয়েছিলো, পরদিন হাতে ফোস্কা পরে গেলো, বাবার আহলাদী মেয়ের আজ এই অবস্থা।
কাজের মেয়েকে কোনো রকম অর্ডার করা আমার নিষেধ ছিলো।
একদিন আমি কিছু অর্ডার করেছিলাম মেয়েটা শোনেনি বলে আমি বকা দিয়েছিলাম, রানার মা সেদিনই সরাসরি আমাকে বলেছিলো ওকে তুমি কিছু বলতে পারবে না, এবাসায় থাকতে হলে তোমাকে এভাবেই থাকতে হবে। চুপ করে ছিলাম বলার কিছু ছিলো না। প্রতিবাদের ভাষা একটু কমই জানি আমি। হয়তো তা আমারই দোষ। হঠাৎ করে কাজের মানুষটা বাড়িতে বেড়াতে গেলো, মেয়েটা বাড়ি যাওয়াতে আমার কাজের চাপ আরও বেড়ে গেলো, সব কাজ করতে হতো এমনকি প্রচুর হাড়িপাতিল সবই ধুতে হতো।
আমার শাশুড়ী কখোনো আমাকে রেস্ট নিতে দিতো না, বলতো এসময় বেশী হাটাহাটি করতে হয়।
কেমন যেনো ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কখোনো যদি দুপুরে একটু শুতাম, একটু শব্দ পেলেই ভয়ে লাফ দিয়ে উঠতাম, রানার মা আসলো বোধ হয়। মাঝে মাঝে কেমন সিনেমার মত মনে হতো, সত্যি চরম বাস্তবতার সাথে আমার কোনো পরিচয়ই ছিলো না। একটু একটু করে জানতে শুরু করলাম জীবনের বাস্তবতা।
সয়ে যাবার একটা অভ্যাস ছোটবেলা থেকে গড়ে উঠেছিলো। সেটাই আমার জীবনটা এলোমেলো করেছিলো। কিছু অবস্থার প্রতিবাদ করতে হয়, কিছু অধিকার আদায় করে নিতে হয়...কিন্তু সবাই কি তা পারে? সেই না পারাই জীবনের কমতি...পরাজয়
যাক অনেক বাধাবিপত্তির মধ্য দিয়ে সময়টা শেষ হলো- বাবু হওয়ার সময় হয়ে গেলো, শরীর শেষের দিকে ভালোই ছিলো। ১৬মার্চ বাবু হওয়ার তারিখ, কিন্তু ১৫ তারিখ রাতেও রানা আমাকে ছাড়েনি, তার কথায় রাজি হতে হয়েছিলো অনেক ভয় মনের ভিতর নিয়ে, যদি বাচ্চার কোনো সমস্যা হয় আমি শুনেছিলাম বাবু হওয়ার আগে মাস খানেক গ্যাপ দিতে হয়। হয়তো সেটাই হওয়া উচিত ছিলো। তবে তা হয়নি।
পরদিন বাচ্চা হবার তারিখ কিন্তু আমার ব্যাথা উঠলো না, বিকালে ডাঃ এর কাছে গেলাম, বসে আছি সময় যাচ্ছে না বিশাল লাইন, রানাকে বললাম আমার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে- পেটিস খাবো, কাছেই একটা দোকানে গেলাম পেটিস আর কোক খেলাম। সময়মত ডাঃ দেখে বললো ভর্তি হতে বাবু হওয়ার সময় হয়ে গেছে।
ভর্তি হলাম ক্লিনিকে সারারাত গেলো কোন লক্ষণ নাই, সকালে ড্রিপ দিলো তারপর ব্যাথা শুরু হলো অসহ্য ব্যাথা চিৎকার শুরু করলাম আমি, ডাঃ অনেক ট্রাই করলেন নরমাল বাচ্চা হওয়াবার জন্য কিন্তু হচ্ছে না, আমি চিৎকার করেই যাচ্ছি। সত্যি কষ্ট সইবার ক্ষমতা তখনও তৈরি হয়নি। হসপিটালের অনেকে ছুটে এলো এত চিৎকার শুনে- সবাই এসে বলছে এ যুগে এত অল্প বয়সে বাচ্চা হচ্ছে...?
ডাক্তাকে বার বার বলছি অপরেশন করে বাচ্চাটা বের করে ফেলেন, তারপরও তারা বিকাল পর্যন্ত চেষ্টা করলো, শেষ পর্যন্ত অপরেশন করতেই হলো। অপরেশন থিয়েটারে নিয়ে গেলো ভয় করছিলো, জ্ঞান ফিরে জানলাম ছেলে হয়েছো ওজন ৮ পাউন্ড।
১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, ভালো লাগলো এই ভেবে আমার ছেলেরও জন্মদিন এমন একটা দিনে।
সবাই খুশি কারণ ছেলে হয়েছে, যদিও আমি মেয়ে চেয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু বাচ্চা দেখার পর আর কিছু মনে ছিলো না খুব ভালো লেগেছিলো, জীবনে অন্য অধ্যায়ের সূচনা। পরম আনন্দে বুকে জড়িয়েছিলাম ওকে। কিছুটা সময়ের জন্য জীবনের ছোট খাটো কষ্টগুলো ভুলে গিয়েছিলাম।
চারদিন হাসপাতালে ছিলাম-তারপর চরম আনন্দে বাচ্চা নিয়ে বাসায় ফিরলাম, ওকে নিয়ে তখন আমার জগৎ খেলনার মত ওকে নিয়ে এটা করছি সেটা করছি, অদ্ভূত সে ভালোলাগা....
চলবে....
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মে, ২০১০ দুপুর ১:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


