শিক্ষক ক্লাসে এসে প্রথম যে কথাটি বললেন তা হল, “ রাজু বেতন এনেছিস?” রাজু নিরবে মাথা নাড়ে। শিক্ষক কিছুক্ষন নিরব থেকে বলেন,“আমি নিরুপায়, বুঝলি। তিন মাসের বেতন বাকী। যা হেড সারের সঙ্গে দেখা করে আয়। তিনি কি বলেন জানা দরকার।” রাজু জানে হেডসার তাকে স্কুল থেকে বের করে দেবেন। কিছু শুনবেননা। তবু সে হেডসারের রুমে যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাকে আজ স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হল।
মাথা নিচু করে বাড়ি ফিরে আসে রাজু। বাড়িতে ওর বাবাকে বসে থাকতে দেখে অভিমানে ফেটে পড়ে সে,“বাবা তুমি আজও কাজে যাওনি?” ছেলের প্রশ্ন শুনে বাবা বিষন্ন হাসি হাসলেন। আসলে তিনি হাসলেন নাকি কান্না ঢাকার চেস্টা করলেন স্বয়ং সৃষ্টি কর্তা ছাড়া কারও বোধগম্য নয়। কিছুক্ষন নিরব থেকে তিনি বললেন,“কি করব বল আমরা তো কাজে যেতেই চাই। কেউ কি না খেয়ে মরতে চায় বল।” “তো কাজে যাচ্ছনা কেন?” রাজু চিৎকার করে উঠে। কিন্তু তার বাবা শান্ত কন্ঠে জবাব দেয়, “শ্রমিক লিডাররা যে ধর্মঘট করেছে আর করবেইবা না কেন? আমরাতো আমাদের নায্য অধিকার চেয়েছি। আথচ মালিকরা তা মানছেনা।” “কিন্তু আমাকে যে স্কুল থেকে বের করে দিল। আমি আরও লেখাপড়া শিখতে চাই।” নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনা, রাজু অঝরে কেদে ফেলে। ছেলের দেহটাকে বুকে চেপে ধরে ওর বাবা বলে, “লেখাপড়া গরিবদের জন্য নয়রে বাবা।” কথাটা বলতে গিয়ে রাজুর বাবার কন্ঠটা কেপে উঠল, হয়ত কান্নাটা ঢাকার জন্যই ছেলেকে বুকে চেপে ধরলেন তিনি।...আর এভাবেই বোধহয় তৃতীয় বিশ্বের গরিব পিতারা তাদের সন্তানদের সান্তনা দেন।
চারদিন পর
কোম্পানিতে খুব উত্তেজনা। শ্রমিকরা তাদের নূন্যতম বেতন নির্ধারনের জন্য সবাই মিলে মালিককে ঘেরাও করবে। আজ তারা নিজেদের অধিকার সমন্ধে সচেতন। রাজুর বাবা একটু অসুস্থ হলেও মিছিলে চলে গেলেন। দুপুরে খবর এল মিছিলে পুলিশ হামলা করেছে। রাজুর বাবা মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন, এখন তিনি হাসপাতালে। রাজু ও তার মা ছুটে গেল হাসপাতালে।
ব্যাপারটা নিয়ে বেশ মাতামাতি শুরু হল। খবর ওয়ালারা ছুটে এল। ছুটে এল রাজনৈতিক নেতারা। তারা সান্তনার বাণী শুনাতে লাগল বিভিন্নভাবে। সেই সাথে অধিকার আদায়ের এই পবিত্রতম আন্দোলনটাকে রাজনৈতিক আন্দোলনে পরিনত করার হীন প্রয়াস করতে লাগল। রাজু ওর বাবার বেডের পাশে বসে চুপচাপ এসব দেখছিল। নেতারা যখন রাজুর বাবাকে মিথ্যে সান্তনার বাণী শুনাতে এল তখন রাজুর মনে জেগে উঠা প্রশ্নটা সে ছুড়ে দিল,“যদি আজও শ্রমিকদের আহত হতে হয় অধীকার আদায়ের জন্য, তবে আমরা শ্রমিক দিবস পালন করি কেন?”
কালের চক্রে রাজুর প্রশ্নটা পুনরাবৃত্তি হয়, তবু উত্তর মেলেনা কোন!
(১৪ জানুয়ারী ২০০৮ তারিখে মিরপুরে গার্মেন্টন্স শ্রমিকদের ওপর পুলিশী হামলার প্রেক্ষিতে এই গল্পটি লিখা। এরপর থেকে এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই আছে)
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০১০ রাত ১০:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





