প্রথমেই জানাচ্ছি যে, লেখাটি লিখেছেন "আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব" লেখাটি কিছুটা পরিবর্তন করা হয়েছে। কারণ তখন পিস টিভির বাংলা ভার্সন চালু হয় নি। শুধু সেটুকুই পরিবর্তন করা হয়েছে।
ডা. জাকির আব্দুল করীম নায়েক ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর বর্তমান বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম গবেষক ও বাগ্মীদের অন্যতম। অনন্যসাধারণ প্রতিভাধর ‘দাঈ ইলাল্লাহ’ হিসাবে তিনি সারাবিশ্বে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছেন। গত শতকের মধ্যভাগে ভারতীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আফ্রিকান নাগরিক শায়খ আহমাদ দীদাত (১৯১৮-২০০৫) বিভিন্ন ধর্ম ও বস্ত্তগত বিজ্ঞানের সাথে তুলনামূলক আলোচনার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ইসলাম প্রচারের এক নতুন ধারার প্রয়াস শুরু করেন। ডা. জাকির নায়েক এই ধারার সফল পরিণতিই কেবল দান করেননি; বরং মুসলিম সমাজে প্রচলিত নানাবিধ কুসংস্কার ও নবাবিষ্কৃত আচার-আচরণ তথা শিরক-বিদ‘আতের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ গড়ে তোলার সুন্দর ও কার্যকর একটি ধারার সূচনা করেছেন। অতি অল্প সময়ে তিনি ‘পীস টিভি’র মত আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট প্রচারমাধ্যম ও একদল দক্ষ, নিষ্ঠাবান আলিম ও চিন্তাবিদের সমন্বয়ে ইন্ডিয়ার বুকে যে বহুমুখী ইসলামী দা‘ওয়াহ সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন তা এককথায় অভূতপূর্ব। নিম্নে তাঁর পরিচিতি ও দা‘ওয়াতী কার্যক্রম সম্পর্কে আলোকপাত করা হল-
১৮ অক্টোবর ১৯৬৫ সালে ভারতের মুম্বাই শহরে এক কনকানি মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন একজন মেডিকেল ডাক্তার। সেই সুবাদে মুম্বাইয়ের সেন্ট পিটারস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা ও কিষাণচাঁদ কলেজে মাধ্যমিক শিক্ষা লাভের পর চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য টপিওয়ালা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। অতঃপর ১৯৯১ সালে এম.বি.বি.এস ডিগ্রী লাভ করে ডাক্তার হিসাবে কর্ণাটকে কর্মজীবন শুরু করেন। ছাত্রজীবনে তিনি বিখ্যাত শৈল্যবিদ ক্রিস বার্নাডের মত সার্জন হবার স্বপ্ন দেখতেন। শৈশব থেকে তোতলামিতে (stammering) আক্রান্ত থাকায় মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার কোন পরিকল্পনা তাঁর মোটেই ছিল না। কিন্তু ১৯৮৭ সালে ২২ বছর বয়সে একটি কনফারেন্সে তৎকালীন শ্রেষ্ঠ তুলনামূলক ধর্মতাত্ত্বিক আলোচক আহমাদ দীদাতের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হলে তিনি গভীরভাবে প্রভাবিত হন। ফলে তাঁর মাঝে ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রবল স্পৃহা জাগ্রত হয়। এক নাগাড়ে তিনি পবিত্র কুরআনসহ বর্তমান বিশ্বের প্রধান প্রধান ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহ যেমন- খৃষ্টধর্মের কয়েক প্রকার বাইবেল, ইহুদী ধর্মের তাওরাত ও তালমূদ, হিন্দু ধর্মের মহাভারত, বেদ, উপনিষদ, ভগবতগীতাসহ অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ গভীর মনোযোগ সহকারে পাঠ করা শুরু করেন এবং কয়েক বছরের মধ্যেই সেগুলো আয়ত্ব করে ফেলেন। অতঃপর ১৯৯১ সাল থেকে তিনি দাওয়াতী কর্মকান্ডে মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে ডাক্তারী পেশা ছেড়ে দিয়ে একজন ফুলটাইম ধর্মপ্রচারক হিসাবে মুম্বাইসহ ইন্ডিয়ার বিভিন্ন প্রদেশে বক্তব্য প্রদান করতে শুরু করেন। আল্লাহ্র অশেষ রহমতে তাঁর মুখের জড়তা অর্থাৎ তোতলামীর ভাবও দিনে দিনে কেটে যায়। অতি দ্রুতই তিনি জনমনে বিপুল প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হন। ইন্ডিয়ার বাইরে বিভিন্ন দেশ থেকে তাঁর ডাক আসতে থাকে। আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে তাঁর দাওয়াতী কার্যক্রম বিস্তৃত করার লক্ষ্যে বক্তৃতার ভাষা হিসাবে ইংরেজী বেছে নেন। ইতিমধ্যে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, ইতালী, সঊদী আরব, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, ওমান, দক্ষিণ আফ্রিকা, বোতসোয়ানা, মৌরিশাস, গায়ানা, ত্রিনিদাদ, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, মালদ্বীপসহ বিশ্বের অনেকগুলো দেশে ১৩০০-এরও অধিক লেকচার প্রদান করেছেন। ২০০টিরও বেশী দেশের টিভি চ্যানেলে তাঁর বক্তব্যসমূহ প্রচারিত হয়েছে। এ দিক দিয়ে বর্তমান বিশ্বে ইসলামী আলোচকদের মধ্যে তাঁর অবস্থান প্রশ্নাতীতভাবে শীর্ষে। ২০০৯ সালে ইন্ডিয়ার সর্বাধিক প্রভাবশালীদের তালিকায় তার নাম ছিল ৮২তম স্থানে ও ১০ জন শীর্ষ ধর্মবেত্তাদের তালিকায় বাবা রামদেব ও শ্রী শ্রী রবিশংকরের পরই ছিল তার অবস্থান।
ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের উপর খ্যাতিমান বক্তা আহমাদ দীদাত ১৯৯৪ সালে জাকির নায়েককে "Deedat plus" উপাধিতে ভূষিত করেন। দাওয়াতী ময়দানে অসাধারণ সফলতা অর্জনের জন্য তিনি তাঁকে ২০০০ সালে একটি স্মারক প্রদান করেন যেখানে তাঁর খোদাইকৃত বক্তব্য ছিল "Son what you have done in 4 years had taken me 40 years to accomplish, Alhamdulillah”. ‘বৎস! চার বছরেই তুমি যা করেছ, তা করতে আমার চল্লিশ বছর লেগেছে, আলহামদুলিল্লাহ।’
তিনি বিভিন্ন ধর্মের প্রখ্যাত পন্ডিতগণের সাথে বিতর্ক অনুষ্ঠানেও অংশ নেন। ইতিমধ্যে তিনি ছোট-বড় শতাধিক বিতর্ক অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। ২০০০ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে প্রখ্যাত খৃষ্টান পন্ডিত ড. উইলিয়াম ক্যাম্পবেলের সাথে ‘বিজ্ঞানের আলোকে পবিত্র কুরআন ও বাইবেল’ বিষয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠান খৃষ্টান বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ২০০৬ সালে ব্যাঙ্গালোরে লক্ষাধিক শ্রোতার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত শ্রী শ্রী রবিশংকরের সাথে তাঁর আন্তঃধর্ম সংলাপ ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। ২০০৭ সাল থেকে প্রতিবছর নভেম্বর মাসে মুম্বাইয়ের সুবিশাল সুমাইয়া গ্রাউন্ডে ১০ দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক পীস কনফারেন্সের আয়োজন করে থাকেন। ইন্ডিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে খ্যাতনামা ইসলামী পন্ডিতগণ এখানে আলোচক হিসাবে উপস্থিত থাকেন। সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও সুসজ্জিত ডেকোরেশনে আড়ম্বরপূর্ণ এ আয়োজনে প্রতিবছর কয়েক লক্ষ শ্রোতার আগমন ঘটে। পীস টিভির মাধ্যমে যা সরাসরি সম্প্রচার করা হয় ।
তাঁর বক্তব্যসমূহ সিডি-ভিসিডি এবং বই আকারেও প্রকাশিত হয়েছে এবং বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে তা বিশ্বের নানা জায়গায় প্রচারিত হচ্ছে। বাংলাদেশে ইতিমধ্যে ‘ইসলামিক টিভি’র সৌজন্যে তাঁর অধিকাংশ বক্তব্য বাংলায় ডাবিং করে সিডি-ভিসিডিতে ধারণ করা হয়েছে এবং কয়েকটি প্রকাশনী থেকে তা বই আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
তাঁর প্রতিষ্ঠিত মুম্বাইয়ের Islamic Research Foundation (IRF) নামক বহুমুখী ইসলামিক সেন্টারটি ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকে সারাবিশ্বে অমুসলিম সমাজে ইসলামের বার্তা পৌঁছানো, ইসলাম সম্পর্কে ভুল ধারণাসমূহ নিরসন এবং মুসলমানদের মাঝে আত্মসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে একনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রতিষ্ঠানে মহিলাদের মাঝে বিশুদ্ধ জ্ঞানসম্পন্ন দক্ষ দাঈ সৃষ্টির জন্য পৃথক শাখা রয়েছে। শিশুদেরকে অংকুর থেকে ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে সুশিক্ষিত করার লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক মানের ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এছাড়া সেখানে ইসলামী গ্রন্থাবলীসহ বিশ্বের অধিকাংশ ধর্মের পবিত্র গ্রন্থাবলীর এক বিশাল লাইব্রেরী গড়ে তোলা হয়েছে। বলা যায়, বিভিন্ন ধর্মের উপর তাঁর প্রতিষ্ঠানের সংগ্রহ বর্তমান বিশ্বে সর্বাধিক সমৃদ্ধ।
২০০৬ সালের ২১ জানুয়ারী এ প্রতিষ্ঠানটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ Peace TV নামক একটি ইসলামী টিভি চ্যানেল চালু করে। মুসলিম বিশ্বে এটাই ছিল তখন সর্বপ্রথম এবং একমাত্র ইসলামিক টিভি। ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে দক্ষিণ আমেরিকা ব্যতীত আমেরিকা ও কানাডাসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে চ্যানেলটির সম্প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে চ্যানেলটি ১৫০টিরও বেশী দেশে সম্প্রচারিত হচ্ছে। এর দর্শক ৫০ মিলিয়নেরও অধিক। ‘The Solution for humanity’ শ্লোগান নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই ব্যাপকভিত্তিক টিভি চ্যানেলটিকে পবিত্র কুরআন ও হাদীছের প্রামাণিক শিক্ষা অনুসারে ইসলামী আক্বীদা ও নীতি-বিধান প্রচার এবং বিশ্বমিডিয়ায় ইসলামের বিরুদ্ধে প্রচারিত ভুলধারণাগুলোর জবাবদানের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্রে পরিণত করতে প্রতিষ্ঠানটি দৃঢ় প্রত্যয়ী। ইতিমধ্যে এর কার্যক্রম সারাবিশ্বে সাড়া জাগিয়েছে।
এই টিভি চ্যানেলে প্রতিদিন ডা. জাকির নায়েক সহ বিভিন্ন দেশের অর্ধশতাধিক খ্যাতনামা ওলামায়ে কেরাম ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ ইসলামের বিশ্বজনীন আদর্শকে পৃথিবীবাসীর সামনে পরিপূর্ণভাবে উপস্থাপন করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। একদল নও-মুসলিম ব্যক্তিত্ব এর বৈচিত্র্য বৃদ্ধি করেছেন। এখানে নিয়মিত যাদের বক্তব্য প্রচারিত হয় তারা হলেন- শায়খ আহমাদ দীদাত (দক্ষিণ আফ্রিকা), আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপস (জ্যামাইকা), ডা. ইসরার আহমাদ (পাকিস্তান), আব্দুর রহীম গ্রীন (ইংল্যান্ড), আব্দুল হাকীম কুইক (কানাডা), হুসাইন ইয়ে (মালয়েশিয়া), ইউসুফ এস্টেস (যুক্তরাষ্ট্র), ড. জামাল বাদাভী (কানাডা), শাবিবর আলী (কানাডা), ড. মামদূহ মুহাম্মাদ (সঊদী আরব), জাফর ইদরীস (সুদান), ইউসুফ ইসলাম (ইংল্যান্ড), শায়খ ফয়যুর রহমান (ইন্ডিয়া), আব্দুল করীম পারেখ (ইন্ডিয়া), ডা. শুআইব সাঈদ (ইন্ডিয়া) প্রমুখ। এছাড়া প্রতি বছর অনিয়মিতভাবে বিশ্বের শতাধিক আলোচক এখানে উপস্থিত হন। যাদের একটা বড় অংশই হল নও-মুসলিম।
শিশু ও মহিলাদের জন্যও এখানে বিশেষ প্রোগ্রাম সম্প্রচারিত হয়। এর প্রায় ৭৫ ভাগ প্রোগ্রাম ইংরেজীতে এবং বাকীগুলো উর্দূ ও হিন্দীতে সম্প্রচারিত হয়। জুলাই’০৯ উর্দূ বিভাগ চালুর পর সম্প্রতি বাংলা বিভাগ চালু করেছে চ্যানেলটি।
২৪ ঘণ্টা সম্প্রচারিত মুম্বাই ভিত্তিক এই টিভি চ্যানেলের অন্তত ৫০ ভাগ সময় তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব তথা ইসলাম ও খৃষ্টধর্ম, ইসলাম ও হিন্দু ধর্ম, ইসলাম ও ইহুদী ধর্ম, ইসলাম ও শিখ ধর্ম ও অনুরূপ বিষয়বস্ত্ত নিয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া ইসলাম ও বিজ্ঞান ইত্যাদিসহ শারঈ আহকামসমূহ যেমন ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ সমস্ত আলোচনার অধিকাংশই পাবলিক লেকচার তথা অডিটোরিয়ামে উপস্থিত জনসমাবেশ থেকে প্রচারিত হয়। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সব ধর্মের লোক এই সমাবেশগুলোতে ব্যাপক আগ্রহের সাথে উপস্থিত হচ্ছে। বিতর্ক, সাক্ষাৎকার, ঐতিহাসিক ফিচার ইত্যাদি প্রোগ্রাম মুসলিম-অমুসলিম সকল দর্শক-শ্রোতাকে আকর্ষণ করছে। জাকির নায়েক চ্যানেলটিকে "edutainment channel" অর্থাৎ ‘শিক্ষাবিনোদন চ্যানেল’ বলে আখ্যায়িত করেন। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি একটি আন্তর্জাতিক ইসলামী নিউজ চ্যানেল সম্প্রচারের উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। এছাড়া প্রচলিত সূদী ব্যাংকিং ব্যবস্থার বিকল্প হিসাবে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিন্যান্স ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠার জন্যও এই প্রতিষ্ঠান চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



