আব্দুল্রাহ রায়হান ॥ ক্রসফায়ারের কথা মনে হলেই মনে অজানা ভয় ও সংশয় জেগে ওঠে। অপরাধীদের মতো নিরপরাধীরাও কখনও কখনও ক্রসফায়ারের কবলে পড়েন তা আমরা সবাই কম বেশি জানি। এ অবস্থার শিকার হতে হয়েছিল আমাকেও। আরিচা দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে এমনই এক পরিস্থিতি আমাকে যেমন ভীত করেছে তেমনি করেছে সন্ত্রস্ত। প্রতিটি মুহূর্ত তখন খুবই অচেনা মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল এ দেশটি আমাদের নয়, অন্য কারও।
যখন ফেরিঘাটে নামি তখন রাত প্রায় এগারোটা। রোডের বাঁ দিকে লাইন করে দাঁড়ানো রয়েছে পণ্য বোঝাই ট্রাকগুলো। প্রায় চার কিলোমিটার লম্বা সে লাইন। বাসগুলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে পড়লেও ট্রাকগুলো পার হচ্ছে দ্রুততার সঙ্গেই। বিষয়টি চোখে পড়তেই দেখি একটি ফেরি ঘাটে ভিড়ল। কিন্তু তাতে যাত্রীবাহী কোন বাস ওঠাতে ব্যর্থ হচ্ছেন চালকরা। আমার গাড়িতে একজন রোগীও ছিলেন। তাঁর কষ্ট অনুভব করে যাত্রীরা বাসটিকে আগে আগে ফেরিতে তুলতে কিছু একটা করার জন্য পরামর্শ করছিলেন। খানিক পরে আরেকটি ফেরি ঘাটে ভিড়ল। সেটিও ছেড়ে গেল। কিন্তু ওঠানো হলো না বাসটিকে।
এমন পরিস্থিতিতে যাত্রীরা সবাই হতবাক। নিতান্তই নিরুপায় হয়ে সেখানে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্য মোহাম্মদ কবিরকে রোগীর বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করার জন্যও যাত্রীরা অনুরোধ করেন। পুলিশ সদস্য যাত্রীদের কথায় কোন প্রকার ভ্রূৰেপই করলেন না। তিনি যথারীতি ট্রাকগুলোর কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করছিলেন। আর হুইসেল বাজিয়ে ট্রাকগুলোকে ফেরিতে ওঠার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। তাঁর নির্দেশ পেয়ে ট্রাকগুলো বাড়তি টাকা দিয়ে ফেরিতে উঠে যায়। এরপর আবার যাত্রীরা পুলিশ সদস্য কবিরের কাছে যায়। গাড়িতে একজন অসুস্থ রোগীর কথাও জানানো হয়। এর ফলে পুলিশ সদস্য রীতিমতো ৰেপে যান। সবাইকে ধমক দিয়ে বলেন, রোগীকে কেন প্রাইভেটকার বা এ্যাম্বুলেন্সে নিচ্ছিস না! রোগীর নিকটাত্মীয় জানান, কোন এ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ায় বাসেই আনা হয়েছে। এ্যাম্বুলেন্স না পাওয়ার কথা জানালে তিনি আরও ৰেপে যান। এ সময় তিনি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন।
দীর্ঘৰণ এ অবস্থা চলে। শেষ পর্যনত্ম অন্য যাত্রীর মতো আমিও বিষয়টির সুন্দর সমাধানের জন্য পুলিশ সদস্যকে বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করি। বলি, যা হবার হয়ে গেছে। আপনি দয়া করে এর একটা ব্যবস্থা করেন। এতে ফল হয় উল্টো। তিনি আমার কথা শুনে তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন। এক পর্যায়ে আমার ওপর মারাত্মকভাবে চড়াও হয়। আমাকে বলতে থাকেন তুই কে, তুই গাড়িতে গিয়ে বস। আমি তাঁকে শানত্ম হতে বলি। এবং গালাগালি না দিতে অনুরোধ করি। কিন্তু তিনি না শুনে বরং আমাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়িতে উঠতে বলেন। সেই সঙ্গে পুনরায় অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন। আমাকে তিনি বলেন, তুই কে? তোকে গালি দিলে কি করবি? এ অবস্থায় আমি তখন নিজের পরিচয় দেই এবং বলি আমি জনকণ্ঠের সাংবাদিক।
সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি আরও ৰিপ্ত হয়ে ওঠেন। আমাকে ধাক্কা দিয়ে গাড়ির কাছে নিয়ে যান। তখন কয়েকজন যাত্রী প্রতিবাদ করলে তাদেরও তিনি গালি দিয়ে বাসে উঠতে বলেন। অন্যথায় সবার পরিণতি খুব খারাপ হবে বলেও জানান। আমরা গাড়িতে চলে যাই। পরিস্থিতি কিছুটা শানত্ম হলে অবৈধভাবে যানবাহন থেকে বাড়তি টাকা আদায়ের কিছু ছবিও তুলি। এর মধ্যে বিষয়টি পুলিশ সদস্য কবির বুঝতে পারেন। এ সময় কবির ও উপস্থিত অন্য পুলিশ সদস্যরা আমাকে বাস থেকে কলার ধরে টানা হেঁচড়া করতে করতে নিয়ে যায় একটি হোটেলের আড়ালে।
একপর্যায়ে তারা আমার কাছ থেকে মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ক্যামেরাসহ সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় মালামাল কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করে। আমি বাধা দিলে তারা আমাকে কিল ঘুষি মারতে থাকে। পরে ঘাটের এক পাশ্বর্ে অন্ধকারে নিয়ে আমার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। আমি বিষয়টি অফিসকে অবহিত করি। মারধরের পর এসআই নজরম্নলসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা আমার সঙ্গে থাকা মালামাল নিয়ে যায়। এসআই নজরম্নল এসে আমাকে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে থানায় নিয়ে যেতে উদ্যত হয়। আমি তখন বলি আমার কি অপরাধ! আমি কি চোর না ডাকাত! আমি তাঁর কাছেও সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ঘটনার বিবরণ শোনালে তিনি বলেন তুমি সাংবাদিক হয়েছ তাতে কি? ঘাটে সাংবাদিকতা চলে না। চলে পুলিশের শাসন। তিনি আরও বলেন, তোমার মতো সাংবাদিককে ক্রসফায়ারে দিলে কিছুই হবে না পুলিশের। আমি তখন নিশ্চুপ হয়ে যাই। কেউ কেউ বলেন আইসি স্যার (আইসি ফিরোজ) আসলে বুঝবে কেমন মজা। সাংবাদিকতা তিনি ছুটিয়ে দেবেন।
এভাবে বেশ কিছু সময় কেটে যায়। খানিক পরে খবর পেয়ে পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজ (আইসি) ঘটনাস্থলে হাজির হন। তিনি এসে আমাকে হোটেলে নিয়ে বসান এবং যাত্রীদের সবাইকে লাঠিচার্জ করে যার যার গাড়িতে তুলে দেন। সেখানে তখন পুলিশ সদস্য এবং তাদের দালালদের দৌরাত্ম্য দেখা যায়। সেখানে তিনি আমার পরিচয় নিশ্চিত করতে চান। আমি আইডি কার্ড দেখালে তিনি কার্ডটি জব্দ করার কথাও বলেন। তবে কার্ডটি তিনি ফেরত দেন। পরে পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজ আমাকে বলেন কে মেরেছে তোমাকে? আমি সবাইকে দেখিয়ে দিলে তাঁরা তাঁর কাছে অস্বীকার করেন। এরপর পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজসহ অন্য পুলিশ সদস্যরা আমাকে একটি হোটেলে বসিয়ে 'পুলিশ আমাকে মারধর ও গালিগালাজ করেনি' মর্মে আমার কাছ থেকে সাদা কাগজে স্বাৰর নেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু শেষ পর্যনত্ম তা হয়নি। এছাড়া তাঁরা সেখানে কিছু স্বাৰী জোগাড় করেন এবং তাদের দিয়ে বলান পুলিশ আমাকে মারেননি। আমিই তাঁদের হুমকি দিয়েছি। তখন পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজ বলেন, আমি তোমার চাকরি খেয়ে ফেলতে পারি। বড় সাংবাদিক আমার চাচা। তাছাড়া বহু রাজনীতিবিদ আমার কাছে ধরা আছে।
পরে ফিরোজের মাধ্যমে মোবাইল ফোন ফেরত পেলে আমি ঘটনাটি জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদককে অবহিত করি। তিনি উর্ধতন কর্মকর্তাদের জানান। সেখানে তাঁর সঙ্গে কথা হয় আইসি ফিরোজের। পুলিশ কর্মকর্তা ফিরোজ তাঁর পুরো পরিচয় জানতে পেরে একটু নমনীয় হন। এবং আমাকে ছেড়ে দেয়ার কথা বলেন। এরপর গাড়িযোগে রাত সাড়ে তিনটায় ফেরি পার হয়ে আমি ঢাকায় আসতে সমর্থ হই।
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জানুয়ারি, ২০১১ সকাল ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


