স্বজনের জন্য খোলা থাকুক বন্ধুত্বের দোয়ার
আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি অনেকে তার পরিচিত ব্যক্তিকে বন্ধু বলে পরিচয় দেন। যেমন কোন অ-পরিচিত ব্যক্তির সাথে পরিচয় হল বা পরিচিত কোন ব্যক্তির সাথে মাঝে মধ্যে অথবা প্রায়ই কথা-বার্তা হল, দেখা সাক্ষাত হল। কিন্তু তাই বলে কি ঐ ব্যক্তি বন্ধু হয়ে গেলেন? সত্যিকার অর্থে বন্ধু শব্দের অর্থ কি, বন্ধুত্ব কেমন করে হয়? বন্ধুত্বের কি কোন রঙ আছে, যদি থাকে তা হলে সে রঙ সাদা, কালো, নীল না বাদামী ? বন্ধুত্ব কি আগে থেকে প্রস্তুতি নিয়ে তৈরী করতে হয়, না এটা নিজ থেকেই তৈরী হয়।
অনেকের বেলায় এই প্রশ্নগুলোর হিসেব মিলানো বেশ কঠিন, আবার অপর দিকে অনেকের ক্ষেত্রে বন্ধু নির্বাচন বা প্রকৃত বন্ধুর স্বার্থহীন হাতছানি বুঝে নিতে মোটেই কষ্টকর হয় না । কিন্তু যাদের বেলায় প্রকৃত বন্ধু নির্বাচন করতে ভুল হয় বা যারা আবেগের কাছে হার মেনে অপরের সাজানো কথা মরুভুমির বুকে এক ফুটো বৃষ্টির মত অমৃত সুধার মনে করে না জেনে না বুঝে বন্ধুত্বে হাত বাড়ান, তারাই কিন্তু প্রতারণার স্বীকার ও ধোকায় পড়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েন । তাদের বিশ্বাসের আয়নায় এমন ভাবে মরিচিকা পড়ে যাতে নতুন বা পরিচিত কোন ব্যক্তির চেহারা তো দূরের কথা মুখের আদলও ষ্পষ্টভাবে দেখা যায় না। তাদের হৃদয়ের আকুতি, ভালোবাসার আর্তি শাদা কাফনে এমন ভাবে ঢাকা পড়ে যেখানে নতুন কারো প্রবেশাধীকার দূরের কথা, পরিচিতজনদের সাথেও ঘনিষ্টভাবে মেলামেশার আগ্রহটুকু মেরুদন্ডহীন হয়ে পড়ে। অবশেষে ভুলের মাশুল হিসেবে বুকবন্দী প্রতারণা আর দীর্ঘশ্বাসই হয় বাকী জীবনের সঙ্গী।
স্বার্থহীন ব্যক্তিকে যারা বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেন তারা কিন্তু জীবনে পরাজিত হন না। কারণ, তারা জানেন প্রকৃত বন্ধু বসন্তে কোকিল ডাকলে বা আকাশে কালো মেঘের পরিন্দা উড়ে গিয়ে রোদ্রের ঝলক উঁকি দিলে অথবা কষ্টের দিন সীমানা পেরিয়ে চলে গেলেও বন্ধুর চোখের রঙ বা কথা বলার বচন-ভঙ্গি, চাওয়া পাওয়ার আগ্রহ মরে না। আর এ জন্যই এরিষ্টটল বলেছেন- ”বন্ধু হচ্ছে- দু’টি দেহের মধ্যে এক আত্মার বাস”। আর সেটা একজন প্রকৃত বন্ধু তার নিজের মধ্যে ধারণ করার ক্ষমতা রাখেন। রঙহীন, স্বার্থহীন যে বন্ধুত্ব তৈরী হয় সেটা-ই খাঁটি বন্ধুত্ব। অনেকের মতে, একজন ভালো বন্ধু আছে যার তার মতো ভাগ্যবান না কি আর কেউ হয় না। তবে প্রশ্ন হলো, এ কথা সব বন্ধুর বেলায় কি প্রযোজ্য? আমার মনে হয় সবার ক্ষেত্রে এ বাক্যটি প্রয়োগ করা যাবে না। শুধুমাত্র তাদের বেলায় প্রয়োগ করা যাবে যারা লোভ লালসার উর্ধ্বে বন্ধুকে লালন এবং ধারণ করেন। বন্ধুত্ব কখনো টাকা, পয়সা, ধন-সম্পদ আর কাঁচা মাংসের লোভে তৈরী হয় না। এটা নিজ থেকেই তৈরী হতে হয়, একে অন্যের প্রতি অদৃশ্য টান ও সফেদ ভালোলাগার মাধ্যেমেই বন্ধৃত্বের চারাগাছ জন্মায়। হেনরি এডামস ও একই কথা বলেছেন- ’বন্ধু কখনো তৈরি হয় না, জন্ম নেয়”। যে বন্ধু নিজ স্বার্থে বন্ধুকে এভয়েড করে, সুযোগ বুঝে ডাষ্টবিনে ছুড়ে দেয় এবং তার অবদান অস্বীকার করে সে কখন বন্ধুর আওতায় পড়ে না। প্রস্তুতি নিয়ে যারা বন্ধুত্বে হাত বাড়ান তারা স্বার্থপর এবং অনেকটা অমাবশ্যার মতো ক্ষণস্থায়ী, যা ভোর হবার পূর্বেই আকাশে মিলিয়ে যায়। এ জাতীয় মনোভাবের বন্ধু কোন সময়ই সৎ মানুষেরর অন্তরে দীর্ঘদিন স্থায়িত্ব পান না।
বন্ধুত্ব হলো একটা পবিত্র বন্ধন। এই সোনালি বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে কারো তো কষ্ট পাবার তো কথা নয়। যেখানে এক বন্ধুর কষ্ট, দুঃখ ও বেদনায় অন্য বন্ধুর হৃদয়ে হাহাকার ও রক্তক্ষরণের কথা। সেখানে দেখেছি বেশির ভাগ ক্ষেত্রে বাজে বেদনার সুর আর বিদ্রুপ হাসির ঝংকার। ইসাবেলা নরটন তার জীবদ্দশায় বলেছিলেন, ’বন্ধুর মধ্যে তুমি খুঁজে পাবে দ্বিতীয় জীবন’। এ কথার রেশ ধরে একটি প্রশ্ন বারবার ঘুরপাক খায় সেটা হল- সত্যিকার অর্থে বাস্তবে ক’জন বন্ধু খুঁজে পান তার অপর বন্ধুর মধ্যে দ্বিতীয় জীবন? খোঁজ নিলে হয়তো হাজারের মধ্যে হাতে গোনা মাত্র কয়েকজন পাওয়া যাবে। তবে ইসাবেলা নরটনের কথা মনোযোগ দিয়ে পড়লে আমরা আমরা বুঝতে পারি তিনি কিন্তু সব বন্ধুর কথা বলেননি, বলেছেন তাদেরকে যাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে খাঁটি বন্ধুত্বের শক্ত বন্ধন রয়েছে।
সুতরাং বন্ধু কেমন হওয়া চাই? বন্ধু হিসেবে কাকে গ্রহণ করা যায় বা কোন ধরণের মানুষের ডাকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দেওয়া যায়, সেটা নির্ভর করে একান্ত নিজের উপর। না জেনে না বুঝে শুধু মুখের কথা বিশ্বাস করে বন্ধুতের ডাকে সাড়া না দেওয়াই ভাল। এতে ইমোশনালি ব্লাকমেইলের সম্ভাবনা থাকে বেশি। প্রতিটি মানুষেরই বন্ধুর প্রয়োজন হয়। তাই বলে আবেগের বশিভুত হয়ে বা ক্ষণিকের মোহে পড়ে অন্ধের মত বন্ধু নির্বাচন করা ঠিক নয়। আমরা লক্ষ্য করেছি, অনেকেই বন্ধুত্ব তৈরী হওয়ার পূর্বে এমন ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করেন, যা ঐ মুহুর্তে অপর ব্যক্তির কাছে মনে হয় স্বর্গীয় দেবতার মতো । কিন্তু কিছুদিন পর যখন স্বর্গীয় দেবতার কথাবার্তা ভাব ভঙ্গি, কাজকর্মের অমিল খুঁজে পান তখনই ফাঁটল ধরে মধুর বন্ধুত্বে। যার ফলশ্রুতিতে এক সময়ের হৃদয় কাঁপানো মানুষটি হয়ে উঠে বেদনার উৎস এবং সময়ের সাথে ধীরে ধীরে বন্ধুত্বের ও ঘটে অপমৃত্যু ।
বন্ধুত্ব এমন এক সম্পর্ক যেটা ধারণ বা বহন করার ক্ষমতা সবার মধ্যে থাকে না। আমার মতে, বন্ধুত্ব হওয়া চাই শাদা গ্লাসের মতো ঝকঝকে পরিষ্কার। আর একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ভালবাসা, পছন্দ, অপছন্দ ও মন-মানসিকতা বোঝার ক্ষমতার মধ্যেই নিহিত থাকে বন্ধুত্বের মূল শিকড়। আর সে জন্যই আমাদের উচিত বন্ধু নির্বাচনে যথেষ্ট সাবধানতা অবলম্বন করা এবং উড়াল হাওয়াকে বিশ্বাস না করে প্রকৃত মানুষের অপেক্ষায় বন্ধুত্বের দোয়ার খুলে রাখা।
২০/০৮/২০১১
লন্ডন
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই এপ্রিল, ২০১৮ ভোর ৪:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


