হুট করে সীদ্ধান্ত নিয়ে চট করে ভ্রমনে বেরিয়ে পড়া আমার একটা বদ অভ্যাস বলা চলে। পরিকল্পনা করে এ যাবৎ কালে কিছু করতে পেরেছি বলে আপাতত মনে পড়ছে না । ২০০৬ সালের ৫ নভেম্বর এরকমই হুট করে বেরিয়েছি বাংলার রুপসী কন্যা রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। পরিকল্পনাটা অবশ্য করাই ছিল আমি ছাড়া বাকি আটজনের মধ্যে। তারা ট্রেনের টিকেটও কনফার্ম করে রেখেছিল। ঠিক ঘন্টা খানেক আগে আটজনের সাথে যোগ হলাম আমি আর আমার আরেক বন্ধু মাসুদ। এক হলাম ১০ ইডিয়ট।
আমাদের বন্ধুদের ট্যুরগুলো খুব মজার হয়। অবশ্য সব বন্ধুদেরই তাই হয় বলে আমার ধারণা। তবে এবারের ট্যুরটা অন্যরকম মজা হবে কারণ ব্যাচের বিটলা র্যাঙ্কিং এ শীর্ষে অবস্থান করা প্রতিটাই এই ১০ জনের মধ্যে রয়েছে আর তাই বাকি যেই বন্ধুরা বিভিন্ন কারণে এই ট্যুর মিস করছে তারা হইলো চরম আফসোসিত ।
ট্রেন ছিল রাত এগারোটার। আমরা যথা সময়ে সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কমলাপুর স্টেশনের দিকে রওনা দিলাম। যদিও টিকেট ২ টা কম তবুও অতিরিক্ত টাকা আর খরচ কর্লাম্না। ১০ জনে আট টিকেট মানে বিশাল ব্যপার এর চেয়ে কম টিকিটেও যাওয়া হয়। গিয়েছিও বেশ কয়েকবার, এটা কোন বিষয় না। সবাই উঠে বসলাম ট্রেনে। ট্রেন ছাড়লো ১১.৩০ টায় আর সেই সাথে শুরু হল ননস্টপ বিটলামি। আমাদের সাথে পেয়ে গেলাম আরো কিছু ভক্তকূল। কিন্তু যারা চিন্তা করেছিল ট্রেনে উঠে একটা লম্বা ঘুম দিবে তাদের পুরো জার্নিটাই মাটি হলো। ঘুমতো দূরে থাক এতটুকু স্বস্তি দেওয়া হয়নি- দুর্ভাগ্যক্রমে যারা আ্মাদের বগিতে ছিল । হয়তো মনে মনে সেদিন আমাদের অনেক গালাগালও করেছিল তারা। কিন্তু তাতে কার কি এসে যায়?? হেরে গলায় গান। যাত্রাপালা আরো কত কি...।
চলে এলাম চিটাগাং। ট্রেন থেকে নেমেই সবাই বাড়িতে ফোন দিয়ে জানালাম, আমরা ঠিকঠাক মত পৌছেছি। স্টেশন থেকে বেড়িয়ে সবাই নাস্তা পর্ব সাড়লাম। তারপর বিলম্ব না করে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আঁকাবাঁকা পথ ধরে বাস চলছে রাঙ্গামাটির উদ্দেশ্যে। গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ। আমার মন ভুলায় রে...।
রাঙ্গামাটি এসে পৌছালাম দুপুর ১২.০০ ঘটিকায়। মোটামোটি একটা হোটেলে উঠলাম এবং রুমে প্রবেশ করেই সবাইকে ৩০ মিনিট সময় দেওয়া হল তৈরী হয়ে নেওয়ার জন্য, গোসলটা সারবো কাপ্তাই লেক এ। হোটেল থেকেই ট্রলার ভাড়া করে ফেললাম। যেহেতু যাচ্ছি গোসল করতে তাই সবাই মোবাইল রেখে গেলাম হোটেইলেই আর সকলেই গোসলের পোশাক পড়েই রওনা দিলাম। হালকা পাতলা খাবার কিনে ট্রলারে চড়ে যাত্রা শুরু কর্লাম। ঘন্টাখানেক ট্রলারে চড়ে যখন জীবতলি দিয়ে যাচ্ছি তখন হঠাৎ আমাদের ট্রলারের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে গেল এবং ট্রলার ঘুরে গেল। মূহুর্তেই ছৈ এর ভেতর থেকে সবাই বেড়িয়ে আসলাম কি ব্যাপার মাঝি নৌকা ঘুড়ালেন কেন? মাঝি বললো আপনাদের সাথের একজন লাফ দিয়েছে। এক পলক সবাই সবার দিকে তাকিয়েই, হ্যা মাসুদ। মাসুদ ছৈ এর উপরে বসা ছিল মাঝির সাথে। খুবই বিরক্ত হলাম চলন্ত ট্রলার থেকে লাফিয়ে পড়ার মানে কি? কিন্তু সবাই পানির দিকে তাকিয়ে আছি পানি একেবারে স্থির একটুও টলটল করছেনা। ২০ সেকেন্ট ২৫ সেকেন্ড ধপ করে উঠলো বুকের ভেতরটা ঝাপিয়ে পড়লাম পানিতে। সাথে সাথে যে কজন সাঁতার জানতো সবাই নেমে গেল। কিন্তু মাঝি ঠিক করে বলতেই পারছিল না সে কোন জায়গাটায় পড়েছে। ৫ মিনিট ১০ মিনিট, উঠে এলাম নৌকায়। কাছেই একটা টিলার মত জায়গা পেলাম । চারিদিকে পানি অথচ মাঝখানে একটুখানি শুকনো জায়গা। কি অদ্ভুত! সবাই দাড়ালাম সেই টিলার উপরে। এতক্ষনে কারোরই বুঝতে বাকি নেই কি ঘটতে যাচ্ছে। কিন্তু কি করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিনা। একটা মোবাইল ও নেই কারো কাছে। আর থাকলেই বা কি হত? এখানেতো নেটওয়ার্ক নেই। মাঝি বললো কাছেই নৌ-বাহিনীর ক্যাম্প আছে। ট্রলার নিয়ে ৪ জন গেলাম ক্যাম্পে বাকিরা দাঁড়িয়ে রইলো টিলায়। ক্যাম্পে সব খুলে বলার সাথে সাথে আমাদের ট্রলারেই ২ জন নৌ-বাহিনীর ডুবুরি চলে আসলো।আর ক্যাম্প থেকে ফেরার আগেই ঢাকায় খবরটা পোছে দিলাম এক বন্ধুকে। ডুবুরি আসলো। পানিতে নেমে একবার ডুব দিয়েই বললো আপ্নারা একটু ধৈর্য্য ধরুণ এভাবে হবে না। আমরা প্রিপারেশন নিয়ে এখনি আসছি। আর আপ্নারা দেখেন একটা জাল জোগার করতে পারেন কিনা। মাঝির সহায়তায় কয়কজন গেলো জেলেদের কাছে কিন্তু তারা কিছুতেই জাল দিতে রাজি হলোনা। যে জাল দিয়ে তারা মাছ ধরে সেটা দিয়ে নাকি লাশ তুললে অকল্যান হবে। লাশ! বুকের ভেতরটা নিমিশেই মনে হলো শূন্য হয়ে গেল। মাসুদ।। একটু আগেও যে আমাদের সাথে হাসি তামাশা করেছে সে এখন লাশ। আমরা আর স্থির থাকতে পারলাম না চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি ঝরতে লাগলো। জেলে রাজি হল। হয়তো বা আমাদের মনের অবস্থা বুঝতে পেরেই রাজি হল।
সম্ভাব্য স্থানটা অনুমান করে চারদিকে বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে জাল ছড়িয়ে ফেলা হল গোল করে। জালের মাঝখানে দুজন ডুবুরি তাদের প্রয়োজনী সরঞ্জামাদি নিয়ে নামলো। জালটাকে টেনে সঙ্কচিত করতে বলা হল। জেলেরা জালের রশি টানছে সাথে আমরাও টানছি। মনে হচ্ছে অনন্তকাল ধরে টানছি। জাল টানতে টানতে সবার হাতে ফোসকা পড়ে যাচ্ছে তবু থামছিনা প্রানপনে টানছি। ধীরে ধীরে জাল কাছাকাছি ছোট হয়ে আসলো। ডুবুরীও উঠে এল। বলা হল জাল ছেড়ে দিন আর টানতে হবেনা। ডুবুরীর হাতে থাকা দড়িটা উপরের দিকে তুলতে লাগলো। আমরা নির্লিপ্ত তাকিয়ে আছি।
হ্যা দড়ির সাথে উঠে এল আমার ছোটবেলার বন্ধু। প্রাইমারি থেকে যার সাথে আমার বন্ধুত্ব তারপর কলেজ লাইফ দুজন দুই কলেজে কাটালেও ইউনিভার্সিটেতে আবারও দুজন একই সাথে এ্যডমিশন নিলাম। কিন্তু সেই প্রাইমারির পর থেকে আমরা একসাথে একই এলাকায় বড় হয়েছি। তার নিথর দেহ তুলে আনতেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো সবাই। তার দেহটা এনে রাখা হলো শুকনো সেই টিলায়। কিছুক্ষন ডুবুরী চেষ্টা করলো তাকে কৃত্তিম দম দেওয়ার। আমাদের কারোরই আর বুঝতে বাকি রইলো না, আমাদের মাসুদ আর নেই। এখন যা কিছু করা হচ্ছে সবই স্বান্তনা। মাঝে মাঝে এই স্বান্তনাটাও মানুষের আহত হৃদয়ে কিছুক্ষনের জন্য হলেও আশার সঞ্চার করে। শেষ পর্যন্ত তারা নির্মম সত্যটাকে প্রকাশ করলো। মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো মূহুর্তেই সবকিছু ফাকা মনে হল। আমাদের বলা হল লাশ নিয়ে কাপ্তাই চলে যেতে সেখানে পুলিশ থাকবে। এখান থেকে তারা পুলিশকে সব ঘটনা খুলে বলবে এবং আমাদের কোন সমস্যা হবে না। সাথে আমাদেরকে একটা সাধারণ পানিতে ডুবে মারা যাওয়ার ক্লিয়ারেন্স দেওয়া হল। আমরা আমাদের বন্ধুকে নৌকায় শুইয়ে দিয়ে রওনা দিলাম কাপ্তাইয়ের উদ্দেশ্যে। ধীরে ধীরে অন্ধকার নেমে আসছে সবাই চুপচাপ বসে আছি চারদিক থেকে অন্য কোন শব্দও পাচ্ছিনা শুধু ট্রালারের খট খট আওয়াজ ছাড়া। আমরা জানিনা আমাদের সামনে আর কি বিপদ অপেক্ষা করছে। পুরোপুরি অন্ধকার নেমে এলো আর আমরাও পৌছে গেলাম ঘাটে।
চলবে...।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০১২ রাত ১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


