সিএনজিচালিত গাড়ির পাঁচ বছরের বেশি বয়সী সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করার আইনগত বাধ্যবাধকতা মানা হচ্ছে না। গাড়ি মালিকদের উদাসীনতায় সড়ক-মহাসড়কে পুনঃপরীক্ষার (রিটেস্টে) মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে সোয়া লাখের বেশি গাড়ি চলছে। সিএনজিচালিত গাড়ির সংখ্যার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে রাস্তার ঝুঁকি। গত পাঁচ বছরে ছোট বড় শতাধিক গাড়ির সিলিন্ডার বিস্ফোরণে অন্তত ২৫ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অসংখ্য। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানির লি. (আরপিজিসিএল) সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিচ্ছে। বিস্ফোরক পরিদফতরও রিটেস্টের মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার নিয়ে উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, সিএনজি সিলিন্ডারে প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৩২০০ পাউন্ড চাপে যখন গ্যাস ভরা হয় তখন রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির প্রতিটি সিলিন্ডার বোমার মতোই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। গ্যাস ভরার সময় সিলিন্ডার এবং গ্যাস উত্তপ্ত অবস্থায় থাকে। সিলিন্ডার যথাযথ না হলে বড় রকমের অঘটন ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।
আরপিজিসিএল-এর হিসাব অনুযায়ী, গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত সারা দেশে সিএনজিচালিত গাড়ির সংখ্যা ২ লাখ ১ হাজার ৮টি গাড়ি। এর মধ্যে ১ লাখ ৭২ হাজার ৯২০টি গাড়ি দেশের ওয়ার্কশপে সিএনজিতে রূপান্তরিত হয়েছে। বাকি ২৮ হাজার ৮৮টি গাড়ি বিল্ড ইন সিএনজি অবস্থায় আমদানি হয়ে এসেছে। মোট গাড়ির মধ্যে সোয়া লাখের বেশি গাড়িতে সংযোজিত সিলিন্ডারের বয়স পাঁচ বছরের বেশি। ২০০২ সালে রাজধানীতে টু-স্ট্রোক থ্রি হুইলারের বদলে আমদানি করা প্রায় ৩১ হাজার সিএনজি অটোরিকশার বয়স ১০ বছর পেরিয়ে গেছে। গত কয়েক বছরে মাত্র ৫-৬ হাজার সিলিন্ডার রিটেস্ট হয়েছে। আরপিজিসিএল ছাড়াও সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন ও বেসরকারি অপারেটররা পাঁচ বছর বয়সী সিলিন্ডার রিটেস্টের জন্য ব্যবহারকারীদের বারবার তাগাদা দিচ্ছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না।
দেশজুড়ে প্রায় ১২ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান, প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ এবং নাগরিক পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে ৫ হাজার কোটি টাকার জ্বালানি সাশ্রয়ের এই খাত গত কয়েক বছরে ব্যাপক বিকশিত হয়। এর ফলে এই খাতের জন্য সরকার একটি বিধিমালা জারি করে। সিএনজি বিধিমালায় নিরাপত্তার স্বার্থে প্রতি পাঁচ বছর পরপর সিলিন্ডার রিটেস্টিং করার বাধ্যবাধকতা আরোপ হয়। এরপর আরপিজিসিএল, নাভানা, সাউদার্ন, ইন্ট্রাকোসহ ৬-৭টি প্রতিষ্ঠান দেশে সিলিন্ডার টেস্টিং ইউনিট স্থাপন করে।
জনবল সংকটের কারণে সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণ, সিএনজি যন্ত্রপাতির ফিটনেস নিয়ে কোনো ভূমিকাই রাখতে পারছে না আরপিজিসিএল। বিআরটিএ'তে একটি সিএনজি সেল স্থাপনের মধ্য দিয়ে ফিটনেস ও নবায়নের সুযোগ সৃষ্টির প্রস্তাব ছিল। কিন্তু বিষয়টি এখনো সুরাহা হয়নি। এটা সড়ক নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞরা। প্রতিটি সিলিন্ডার রিটেস্টে প্রায় তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। যাত্রীবাহী গাড়ির ক্ষেত্রে সিলিন্ডার রিটেস্টে গেলে যাত্রী সেবা বন্ধ থাকে। এটা অনেক মালিক মানতে চান না।
প্রায় ৬০ হাজার গাড়ি কনভার্সনকারী প্রতিষ্ঠান নাভানা সিএনজির কারিগরি উপদেষ্টা ইঞ্জিনিয়ার নূরুল হক বলেন, আমরা সিএনজি সিলিন্ডার রিটেস্টের জন্য ফিলিং স্টেশনে ব্যানার, সাইনবোর্ড টানিয়েছি। আমাদের স্টেশনগুলোতে 'সিলিন্ডার কালেকশন পয়েন্ট' করেছি। এখন আগের চেয়ে সচেতনতা বেড়েছে। আমাদের দুটি কনভার্সন সেন্টারে মাসে ২৩০-৪০টি সিলিন্ডার রিটেস্ট হয়। তিনি বলেন, আমাদের ডাটা ব্যাংক আছে, তা দেখে পাঁচ বছর আগের কনভার্সন করা গাড়ি মালিকদের রিটেস্ট করতে তাগিদ দেওয়া হয়। মালিকদের সংগঠন সিএনজি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাকির হোসেন নয়ন বলেন, সরকারি মনিটরিং জোরদার করা না হলে গাড়ি মালিকদের সিলিন্ডার রিটেস্টে বাধ্য করা যাবে না। তিনি বলেন, গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার জন্য বিআরটিএ রিটেস্ট বাধ্যতামূলক করলেও গাড়ির মালিকরা রিটেস্ট না করে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সনদ নিয়ে আসেন। মানুষের জানমালের নিরাপত্তার স্বার্থে সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

