এক সময়ের কোটিপতি শেয়ার ব্যবসায়ী লিয়াকত হোসেনের পরিবার আজ নিঃস্ব। স্ত্রী ও শিশু সন্তানের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। শেষ সঞ্চয়, আবাদি জমি বিক্রি-বন্ধক রেখে সর্বনাশা শেয়ারবাজারে ৭৫ লাখ টাকা হারিয়ে গত সোমবার তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা ছেড়ে তিনি ৩ বছর আগে সব টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন শেয়ার মার্কেটে। নিঃস্ব হয়ে যাবেন তা পরিবারের সদস্যরা কোনদিন ভাবেননি। নিহতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার সাথী বলেন, কয়েকদিন ধরে টানা দরপতনের জন্য ও শেয়ারবাজারে যাচ্ছিল না। শেয়ারবাজারে কি হচ্ছে না হচ্ছে, এসব নিয়ে কোনদিনই বাড়িতে কারও সঙ্গে আলোচনা করত না। কিন্তু রোববার রাতে হঠাৎ আমাকে ডেকে বলে, শেয়ারবাজারের লাগানো সব টাকা আমার শেষ। আমার বিনিয়োগের ৭৫ লাখ টাকাই শেষ হয়ে গেছে। ফেরত পাওয়ার আর কোন সম্ভাবনা নেই। সেদিন থেকেই সে অসম্ভব রকম চুপচাপ ছিল। আমি তাকে বুঝিয়েছি, বলেছি, আমি তো একটা চাকরি করছি। না খেয়ে থাকতে হবে না। কিন্তু ওকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। পিতার ঝুলন্ত লাশ প্রথম দেখে ৪ বছর বয়সের একমাত্র মেয়ে মনীষা মল্লিকা। স্কুল থেকে ফিরেই প্রতিদিনের মতো বাবার ঘরে ঢুকে সে। বাবার ঝুলন্ত লাশ দেখার পর তার চিৎকারেই অন্যরা ওর ঘরে ছুটে যায়। গতকাল মনিষা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে বাবার জিব বেরিয়ে ছিল। মুখটা বাঁকা হয়েছিল। আমি বাবাকে চিনতে পারছিলাম না। কেন বাবা মরে গেল? তার এ প্রশ্নে উপস্থিত স্বজনরা কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। লিয়াকতের শাশুড়ি মমতাজ বেগম বলেন, বাবার ঝুলন্ত লাশ দেখার পর মনীষা কিছুটা অস্বাভাবিক আচরণ করছে। তার বাবার না খাওয়া নাস্তা কোন ভাবেই তার সামনে থেকে সরানো যাচ্ছে না। মেয়েকে মাত্র ২০ দিন আগে স্থানীয় একটি স্কুলে ভর্তি করেছিলেন লিয়াকত। প্রতিদিন নিজেই তাকে স্কুলে দিয়ে আসতেন। নিয়ে আসতেন। মমতাজ বেগম বলেন, সকালে রুটি আর ডিম ভাজি করে দিলাম। না খেয়েই আমাকে বলল মা আপনি আজ মনিষাকে স্কুলে দিয়ে আসেন। আমি নাস্তা খেয়ে একটু পরে বাইরে বের হব। কান্নাজড়িত কণ্ঠে মমতাজ বলেন, সে নাস্তা এখনও টেবিলেই পড়ে আছে। নাস্তা খাওয়ার মানুষটা নেই। লিয়াকতের স্ত্রী তাহমিনা আক্তার সাথী স্থানীয় শহীদ নবী হাইস্কুলের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষিকা। সকাল ৭টায় বেরিয়ে যান তিনি। ফেরেন স্বামীর মৃত্যু সংবাদ পেয়ে। ২৫ না পেরেনো এই নারী শুধু বুক চাপড়ে কেঁদে চলেছেন। বলছেন, কেন তুমি চলে গেলে। না হয় আধপেটা খেয়ে থাকতাম। না হয় না খেয়ে থাকতাম। গতকাল লিয়াকতের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় বাকরুদ্ধ পরিবারের সদস্যরা। নিহত লিয়াকত হোসেনের শ্বশুর শামসুল হক মল্লিক জানান, তার মেয়ের সঙ্গে লিয়াকতের পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে বিয়ে দেয়া হয়। তখন লিয়াকত প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা করত। ২০০৯ সালের শুরুতে সে শেয়ার ব্যবসা শুরু করে। প্রথম দিকে ব্যবসায় ভাল লাভ হলেও বছরখানেক পরই আস্তে আস্তে সে পুঁজি হারাতে থাকে। আরামবাগে ফেয়ার প্রিন্টিং প্রেস নামে তার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। বছর দুয়েক আগে ওই ব্যবসা কিছুটা গুটিয়ে শেয়ার ব্যবসায় পুঁজি বিনিয়োগ করেছিল। কিন্তু ব্যাপক লোকসানের মুখে সর্বশেষ গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জের কিছু আবাদি জমি বিক্রি করা হয়েছে। এছাড়া কিছু জমি বন্ধক রেখে ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করেছিল লিয়াকত। রোববার বড় ধরনের পতনের পর তার সব পুঁজি শেষ হয়ে যায়। এরপর সে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে। আর কে মিশন রোডের জিয়া মাঠ সংলগ্ন ৬ তলা বাড়ির ৫ তলায় সপরিবারে থাকতেন লিয়াকত। বাড়িটি তার মামার। এখানেই বড় হয়েছেন তিনি। আশপাশের বাসিন্দারা বলছেন, বড় ভাল ছেলে ছিল সে। পাড়ায় কত ঝুট ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু কখনই এসবে জড়ায়নি। সোমবার সন্ধ্যায় লিয়াকতকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। লিয়াকতের বড় ভাই কাজী লুৎফর রহমান বাদী হয়ে সূত্রাপুর থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। মামলার বাদী এসআই হেকমত আলী বলেন, এখন পর্যন্ত আমাদের মনে হচ্ছে শেয়ারবাজারে টাকা হারানোর কারণেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন। তবে ঘটনার সঙ্গে অন্য কিছু আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহত লিয়াকতের গ্রামের বাড়ি মানিকগঞ্জে হরিরামপুর থানার আজিমনগর গ্রামে। তার বাবার নাম কাজী মোকছেদ আলী। তিন ভাই তিন বোনের মধ্যে লিয়াকত ছিলেন চতুর্থ। তার বড় ভাই কাজী লুৎফর রহমান একটি বেসরকারি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। ছোট ভাই শওকত হোসেন ফকিরাপুলে প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসা করেন।
কোটিপতি লিয়াকতের পরিবার এখন নিঃস্ব ও স্ত্রীর আহাজারি না হয় আধাপেটা হয়েই বেঁচে থাকতাম। এই কি জীবন!!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।