আমি তখনও ক্লাশ টুতে পড়ি। আব্বুর এক জেঠাত ভাই এর মেয়ে আসল আমাদের বাসায়, কিছুদিন থাকবে, কারন তাদের বাড়ী থেকে কলেজ ওনেক দূরে , উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা সে আমাদের বাসায় থেকে দিবে।
ছোট বেলা থেকেই আমি একটা অভাব বোধ নিয়ে বড় হয়েছি- সেটা হল আমার কোন দুলা ভাই হবেনা, কোন ভাবী পাবনা। আব্বু আম্মু দুজনেই পরিবারের বড় ছিলেন ফলে চৌদ্দগুষ্ঠীতে আমিও সবার বড়। সে ছোটবেলা থেকে এখনও দেখি বন্ধুরা কিছু হলে বড় ভাই-বোনের কাছে ছুটে যায়, কতনা আব্দার নিয়ে। আমি দেখি- আর বিষন্ন একটা সুর বেজে চলে। প্রায় মনে হত ইস আমার যদি একটা বড় বোন থাকত, একটা বড় ভাই থাকত।
এই আপু আসার পর থেকে সব কিছু কেমন বদলে যেতে লাগল। আমি বলতে গেলে বাইরে গিয়ে খেলা ধুলা বাদ দিয়ে দিলাম। সারাদিন আপুর চারপাশে ঘুরাঘুরি করি। আপু দেখতেও অনেক সুন্দরী ছিল। বিকাল হলে আমি তার হাত ধরে আমরা ছাদে ঘুরতে যায়, হাঁটাহাঁটি করি, সে কতশত গল্প করে যায় আমার সাথে, আমি মুগ্ধ হয়ে শুনি। দিন চলে যেতে থাকে, পরীক্ষার সময় আম্মু আমাকে নিষেধ করে আপুকে যেন বিরক্ত না করি। কে শুনে কার কথা। আমি যে তখন অন্য রকম ভাল লাগায় জড়িয়ে গেছি। সারাক্ষন তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করি, তার সাথে আমার সব গল্প, হাজারো কথা।
এই ভাল লাগা , তার চারপাশে ঘুরঘুর করা হঠাৎ থেমে গেলে পরীক্ষা শেষ করে তার চলে যাবার মধ্য দিয়ে। প্রথম ভাল লাগার ও পরিসমাপ্তি ঘটল।
ক্লাশ সিক্সে পড়ি, আমাদের পাশের বাসায় আসলেন কাঁকন আপুরা। উনি তখন নাইনে পড়েন, তার ছোট এক ভাই ফাইভে আরেকজন থ্রীতে। আমরা বাসার সামনে ক্রিকেট খেলী, কাঁকন আপু দরজায় দাঁড়িয়ে দেখেন। মিষ্টি মুখের সে হাসিটার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে থাকা যায়, সদ্য কিশোর জীবনে পা দেয়া আমার তখন সে হাসি মুগ্ধ হয়ে দেখতে ভাল লাগে, ভাল লাগে আকাশী নীলের স্কুল ড্রেসে দুপাশে বেনী দুলিয়ে আপু যখন স্কুল থেকে ফিরেন , সে ফিরে আসা দেখতে।নচিকেতার - লাল ফিতে সাদা মোজা শু স্কুল ইউনিফরমের সে সময়। সিগারেটের প্যাকেটের কার্ডের উল্টা পিঠে এ বি সি ডি লিখে তাসের কি যেন একটা খেলা খেলতাম আমরা, বিশেষ করে বৃষ্টির দিনে বাইরে বের হতে না পারলে , আপু আর তার ছোট ভাইটি এক দলে, আমরা বাকী দুজন এক দলে , আমরা হারতাম, সে হেরে যাওয়ায়ই মজা ছিল। মুগ্ধতা ক্লাশ সেভেনে উঠে থেমে গেল, আমরা বাসা বদল করে অন্যত্র চলে এলাম।
পাশের ফ্ল্যাটে এবার আর কোন আপু ছিলনা, অবশ্য এ অবস্হাও বেশীদিন থাকলনা। পাশের ফ্ল্যাটের ওরা কিছুদিন পর অন্যত্র চলে যাওয়ায়। কাঁকন আপুর মা এসে ছিলেন এই ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেয়ার জন্য। কিন্তু বাড়ী ওয়ালা জানালেন এটা আগেরদিন ভাড়া হয়ে গেছে।
নতুন যারা আসলেন শুনলাম তাদেরও একটা বড় মেয়ে আছে। আরও জানলাম নানার বাড়ী বেড়াতে যাওয়াই সে এখন নাই। কিছুদিন পর তিনি আসলেন, কিন্তু এই আপু আসলেই বড় বোন টাইপ। আমার সমবয়সী তার ছোট ভাই দুটাকে নিয়মিত ঝাড়ি দেয়াই কাজ, আমার সামনে তারা নিয়মিত কান মলা টলা খেয়ে যেত। কিছুদিন যেতেই আপু অনেক ফ্রী হয়ে গেলেন। আমরা তখন কলব্রীজ খেলা শিখছি মাত্র, আপুও যোগ দিলেন আমাদের সাথে, হইহল্লা করে দারুন জমত সে খেলা, আপু খেলার মাঝে চা বানিয়ে আনতেন, খেলা শেষ হত তিনি ছোট কোন একটা কে মার দিয়েছেন এই ঘটনার মধ্য দিয়ে, কারন সে কাগজে লিখার সময় চুরি করেছে।
আপুর কাছে গল্পের বই এর ভাল একটা কালেকশন ছিল। তার সাথে আমার সখ্যতা গড়তেই হল বই পড়ার লোভে। একটা একটা করে বই নিয়ে আসতাম, সবই ইন্ডিয়ান লেখকদের- সমরেশ, বুদ্ধদেব। সমরেশের কালবেলা বইটা দেখতাম, কিন্তু কেন জানি নেয়ার সাহস পেতামনা, এত মোটা বই পড়ে শেষ করব কেমনে সেটা নিয়ে চিন্তা করে। এসএসসি শেষ করে একদিন সাহস করে সে বই নিলাম- ধৈর্য্য ধরে পরতে পারব কিনা আপু সংশয় প্রকাশ করলেও নিলাম।হলও তাই বইটা শুরু করে অল্প কয়েক পৃষ্ঠা পড়ার পর আমি একগাদা মাসুদ রানা পড়ে শেষ করলেও এটা আর ধরা হয়না। একদিন কোন বই না পেয়ে এটা আবার পড়া শুরু করলাম। মাধবীলতার আগমনে সবই যেন ওলট পালট হয়ে গেল। একটানে শেষ করলাম। সেই যে আমি মাধবীলতার প্রেমে পড়ে গেলাম, শয়নে স্বপনে মাধবীলতা।
এর আগে অষ্টম শ্রেনীতে যখন পড়ি স্কুলে নতুন এক আপা জয়েন করলেন।
তিনি আমাদের কৃষি শিক্ষা পড়াবেন। ইনি স্কুলের অন্যসব আপাদের মত নন, বাকীরা সব ছিল ভীসনমাত্রার বদরাগী, কথায় কথায় মার লাগান। আর এই আপা কি মিস্টি করে কথা বলেন, ভাল না লেগে উপায় নেই। আপার ক্লাশে পরা শিখে যাবনা এমনটি কোনদিন হতনা। অন্য কোন আপার হাতে মার খেলেও আর যায় হউক এই আপার হাতে মার খাওয়া যাবেনা। সন্ধ্যায় পড়তে বসে সবার আগে কৃষি শিক্ষা বই নিয়ে বসতাম। আমি যেন কাগজে কলমে আস্ত কৃষক হয়ে উঠছি- কোন জমিতে কি ফসল ভাল হবে থেকে শুরু করে, কোন ফসলের শত্রু কে, কি তার দমনের উপায়, সমন্বিত মৎস্য খামার- আরও কত কি , এক সময় স্কুল জীবন শেস হয়ে গেল !!!!
আবারও বাসা বদল। পাশের বাসায় থাকতেন তানিয়া আপুরা। কলেজে পড়ি তখন, বড় হয়ে গেছি, আপু ডিগ্রীতে পড়েন। মাঝে মাঝে হাই হ্যালো হয় অতটুকুই।
ভার্সিটিতে এক বড় ভাই এর মাধ্যমে পরিচয় হল তারই ক্লাশমেট লোপা আপুর সাথে। আপু এত সুইট বলার বাইরে , কি মজা করে কথা বলেন, আড্ডা দেন, মাঝে মাঝে বিকালে আমরা আড্ডা দিতাম, ব্যাচমেট হলে নিশ্চিত বলে ফেলতাম
সবচেয়ে মজার ঘটনা ঘটে যাকে বলে সোজা বাংলায় প্রেমে পড়া সেটা হল পর্ণা আপুর বেলায়।
ভার্সিটির ভর্তির সাক্ষাৎকারের আগেরদিন আমি আর আরজু গেলাম এমনি ঘুরতে। লাইব্রেরীর সামনে গিয়ে থেমে গেলাম, চার পাঁচটা মেয়ে হইহল্লা করছে, তাদের মধ্যমনির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকলাম। আমিত পুরা ফিদা হয়ে গেলাম, সে কি ভর্তি হতে এসেছে নাকি অলরেডী স্টুডেন্ট, যায় হউক পরে দেখা যাবে। ক্লাশ শুরুর পর প্রতিডিনই তাকে দেখি, কেমিক্যাল ইন্জিনিয়ারিং এ পরেন। কেমিক্যালের সিনিয়র মিঠু ভাই এর সাথে আমাদের ব্যাপক ঘনিস্ঠতা, ভাইয়ার সাথে ও আপুর বেশ ভাল সম্পর্ক। ভাইয়াকে একদিন বললাম ইস এই আপু যে কেন আমাদের সিনিয়র হল, পুরা ডানাকাটা পরী। তখনও বুঝি নাই কি ঘটনা অপেক্ষা করছে।
একদিন লাইব্রেরীর সামনে আমরা মিঠু ভাই সহ আড্ডা দিচ্ছি। এমন সময় আপু সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন, আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। অবাক করে দিয়ে মিঠু ভাই আপুকে ডাক দিলেন, আপুও আমাদের কাছে আসলেন। আমাকে মোটামুটি আকাশ থেকে আছাড় দিয়ে মাটিতে ফেললেন মিঠু ভাই- শোন ,ও হচ্ছে শামসীর, আর শামসীর ও হচ্ছে পর্ণা। পর্ণা, শামসীর না তোকে অনেক পছন্দ করে।
আমিত পুরাই শেষ , মিঠু ভাই কয় কি, এমন সামনাসামনি কেউ গুলি চালায় নাকি। কিছটা থতমত খাইয়া বলে বসলাম- হ্যাঁ আপু, ক্যাম্পাসে ঢুকে আমি প্রথম যে মেয়েটাকে দেখি সেটা হচ্ছেন আপনি । আপু একটা হাসি দিলেন .........................।
তারপর থেকে আপু অনেক ভাল বন্ধু হয়ে গেলেন। সবচেয়ে বেশী জমত আমি আপু আর রনি ভাই (এখন তার স্বামী) এক সাথে থাকলে। রনি ভাই আমাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য সবসময় বলত কি হে শালা বাবু কি খবর। আমিও ক্ষেপে তাকে একই সম্বোধন করি এখনও ,শালাবাবু ।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



