আপার বাসা থেকে বের হয়ে বাইকটা নিয়ে একটু সামনে এসেই দাঁড়িয়ে পড়ল রবিন একটা টং দোকানে সামনে। অনেকক্ষন সিগারেট খাওয়া হয়নি। আর যায় হউক আপার বাসা ,তার আশেপাশেও সিগারেট সে টানবেনা, দেখলে আপা ঠিক কি বলবেন এই নিয়ে তার কোন আইডিয়া নেই, তবুও সে রিস্ক নিতে রাজী না । মা-বাবা মারা যাবার পর এই আপায় তার সব। সপ্তাহে একদিন আপার বাসায় এসে দেখা দিয়ে যেতে হয় তাকে।
মেজর রবিন- সেনা বাহিনীর ব্রাইট অফিসারদের একজন সে। শুরু থেকেই ক্যারিয়ার ই তার সব। ইন্টারনাল কোন পরীক্ষায় সে এখনও সেকেন্ড হয়নি। আর এই ক্যারিয়ারের পিছনে ছুটতে ছুটতে সে একটা জিনিস ভুলে গিয়েছিল, আজ আপা তাকে মনে করিয়ে দিলেন।
আপার বলার ভঙ্গী মনে পড়ায় সে মনে মনে একদফা হেসে নিল। পিচ্চীটার সাথে সে খেলছিল, এমন সময় তার প্রিয় গাজরের হালুয়ার প্লেট নিয়ে আপার আগমন।
শোন তোকে বলব বলব করেও বলা হচ্ছেনা। শুরুতে আমার দুঃখ প্রকাশ করা উচিৎ । বাবা মা থাকলে এমনটি তারা আগেই ভাবতেন। আমি আসলে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকাতে তোর এই ব্যাপারটার কথা ভুলেই গেছিলাম। তোর যে সময় হয়ে গেছে সেটা খেয়ালই করিনি। কাল তোর দুলাভাইত আমাকে লজ্জা দিয়ে দিল। বলল ভাইটার প্রতি নাকি আমার কোন নজরই নাই, আমি নাকি খালি নিজেকে নিয়েই থাকি।
রবিন চিন্তা করে পাচ্ছেনা আপা কি বলবেন, সে ও ভাবছে আপা কি বলতে পারেন এই নিয়ে, সে আবার কি করে বসল ।
আপা বলে চলেন তোকে যে বিয়ে করানো দরকার এই বিষয়টাত আমি ভুলেই গেছিলাম। রবিন লজ্জা পেয়ে যায়। তোর কোন পছন্দ থাকলে বল, আর না হলেত আমাকেই খুজতে হবে।
তাড়াহুড়ো করে গাজরের হালুয়াটা শেষ করে হেলমেট হাতে নেয় রবিন, তুমিই খুজে বের কর আমার কোন আপত্তি নেই, বলেই পিচ্চীটাকে একটা চুমু দিয়ে বেরিয়ে আসে।
রবিনের ভাবনার পালে নতুন হাওয়া এসে জড়ো হয়, কেমন যেন অজানা ভাবনায় ভাললাগা ছুয়ে যায় তাকে কোন এক প্রিয়দর্শিনীর জন্য যেন তার নতুন করে অপেক্ষার পালা শুরু হয়।
সিগারেটটা ধরিয়ে বাইকে উঠে বসে স্বভাবশতঃ লুকিং গ্লাসে তাকিয়েই পলক আটকে যায় তার। গ্লাসের গায়ে লেখা " অবজেক্ট ইনদা মিরর আর ক্লোজার দেন দে এ্যাপিয়ার " । সে লেখাকে ছাপিয়ে তার চোখে পড়ে অন্য কিছু, একপলকেই সে যেন গ্লাসের লেখাটাকে সত্য ভেবে নেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকায়, বুকের মাঝে চিনচিন ব্যাথা, গল্প উপন্যাসে পড়া সে ব্যাথা যেন সে টের পায়।
অন্যকোন ভাবনাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তাকে অতিক্রম করে যাওয়া রিক্সাটার পিছু নেই সে । হালকা গতিতে চলতে থাকে, কখন যে হাতের সিগারেট টা ফেলে দিয়েছে খেয়াল নেই। মনে মনে ভাবতে থাকতে এই কি সেই প্রিয়দর্শিনী ।
স্বভাবশতঃই পাশ দিয়ে রিক্সা যাবার সময় রুপার চোখে পড়ে রবিনকে। মনে মনে ভাবে বেশ হ্যান্ডসাম ছেলে, মাথার ছোট করে ছাটা চুল, কালো সানগ্লাস, হাতে সিগারেট- মাসুদ রানা টাইপের একটা ভাব আছে। ভাবনা বেশীক্ষন প্রশ্রয় পাবার আগেই সে অন্যভাবনায় হারিয়ে যায়। কিছুদূর পথ চলার পর হঠাৎ বাইকের হালকা শব্দে সে পিছনে ফিরে তাকায় । একি সেই ছেলেটিইত, বাইক নিয়ে সে তাকে অতিক্রম না করে হালকা গতিতে রিক্সার পিছনে পিছনে আসছে কেন। একটা ভয় রুপাকে ছুয়ে যায়। সে বুঝতে পারেনা ঘটনা কি। এ ছেলে তার পিছনে চলছে কেন। মনে মনে আল্লাহকে ডাকতে থাকে, আর পাঁচটা মিনিট পরেই তার বাসা।
আগেই ব্যাগ থেকে টাকা বের করে রাখা রুপা বাসার গেটের সামনে আসতেই কোনমতে টাকাটা দিয়ে এক দৌড়ে ঘরে ঢুকে যায়। রবিন রিক্সার সামনে এসে বাইক থামিয়ে চালকের কাছে জানতে চায় কোথা থেকে এসেছে। চালক জানায় ভার্সিটি থেকে।
কিছুক্ষান গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সে বাইকটা এক পাশে সাইড করে রেখে নেমে আসে। সোজা এগিয়ে যায় রুপাদের একতালা বাড়ীর দিকে। নিজের রুম থেকে পর্দার আড়ালে দাণনড়িয়ে রুপা দেখছিল রবিনের কর্মকান্ড। গেটের ভিতরে ঢুকতে দেখে সে সত্যিই ভয় পেয়ে যায়।
রুপার বাবা দরজা খুলে দেন। সালাম দিয়ে রবিন নিজের পরিচয় দেয় । ভিতের ঢুকার আমন্ত্রনে সে সোফায় এসে বসে। রুপার বাবাকে কিছুটা উদ্বিগ্ন দেখায়, তিনি বুঝতে পারছেননা তার কাছে এক মেজরের আগমনের হেতু কি।
কিছুক্ষান ভাবে রবিন কি বলে শুরু করা যায়, কি বলা যায়, এভাবে বলাটা ঠিক শোভন কিনা। পরক্ষানে ভাবে তার হাতেত অন্য কোন উপায় ও নেই। লম্বা শ্বাস নিয়ে সে শুরু করে।
আসলে এভাবে আমার আসাটা ঠিক হয়েছে কিনা আমি বুঝতে পারছিনা, আমি অন্য কোন পথ ও দেখছিনা তাই সোজা আপনার বাসায় চলে এসেছি। আপনার মেয়েকে আমার ভাল লেগেছে। এই আমার কার্ড, আমার বোনের বাসার নাম্বারটাও লিখে দিচ্ছি, আপনার খোজ খবর নিয়ে দেখতে পারেন, আপনাদের যদি আপত্তি না থাকে তাহলে আমার আপা আপনাদের সাথে কথা বলবেন।
মনে মনে ছেলেটার সাহসের প্রশংসা করে রুপার বাবা। তবুও মুখে একটা কাঠিন্য ধরে বলেন আচ্ছা ঠিক আছে। নানা প্রশ্ন করে রবিনের কিছু কথা তিনি জেনে নেয়ার চেস্টা করেন, মেয়ে বড় হয়েছে বিয়েত দিতেই হবে, দেখা যাক খোজ নিয়ে, আর্মি অফিসার ছেলে ফিউচার ও খারাপ না।
মেসে ফিরে নানা ভাবনায় ভরে থাকে রবিনের মন। এমন করে আগে কখনও ভাবেনি সে নানা রং এর ভাবনা , আবার ভয়ও যে কাজ করেনা ঠিক তা ও নয়। কোর্সমেট দুজনের সাথে শেয়ার করার পর থেকে শুরু হয়েছে নতুন যন্ত্রনা । নানা ভাবে তার এই ঘটনাকে রং দিতে থাকে, নতুন এই ভীমরতিতে ব্যাপক দুঃখ ও পেতে পারে সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে একজন বলে অত না ভেবে অপেক্ষা কর কি হয় দেখ।
পরদিন সকাল দশটার দিকে একটা ফোন তার মোবাইলে। ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বলে উঠে, আমি রুপা , গতকাল আপনি আমাদের বাসায় গিয়েছিলেন, বাবার সাথে কথা বলেছেন। আপনি কি আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবেন আজ বিকালেই। সাথে সাথেই রাজী হয়ে যায় রবিন। কাজে আর মন বসাতে পারেনা সে, চারটা বাজার অপেক্ষায় অধীর হয়ে থাকে সে। সত্যি বলতে কি মানুষ মাত্রেই সুখ সুখ কল্পনায় গা ভাসায়, রবিন ও তাই করছে, যদিও নেগেটিভ ভাবনা যে তার মনে আসছেনা তা নয়, তবুও সে সেটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে সুখ ভাবনাটাকেই বেছে নিল।
রবিন পৌঁছানোর আগেই রুপা সেখানে বসেছিল। তার সাথে তার এক বন্ধুও আছে, সে পরিচয় করিয়ে দিল। রুপার পড়ালেখা কেমন চলছে থেকে শুরু করে নানারকম হালকা মেজাজের কথা হল, রবিন বেয়ারাকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিল।
অনেকক্ষন সবাই চুপচাপ , হঠাৎ করে রুপা পাশের বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠে আমি ওকে ভালবাসি । আমাদের রিলেশন অনেক দিনের, আমি বাবাকে কিছু বলতে পারবনা এখনই, আপনি দয়া করে আমার ব্যাপারে আর আগ্রহ দেখাবেননা প্লীজ প্লীজ । বাবা এখনই আমাদের কথা জানলে কিছুতেই মেনে নিবেন না, তিনি আমাকে জোড় করে হয়ত বিয়ে দিতে চাইবেন, এতে আমি আপনি কেউই আসলে সুখী হবনা, আমি ওকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারিনা .........................................নানা সুখের পরিকল্পনা বলে একসময় থামে রুপা।
হঠাৎ আসা ঝড় হঠাৎ করে শুধু শুধুই সব যেন এলোমেলো করে দিল রবিনের। নির্লিপ্ততা ভর করে রবিনের মাঝে, কফির মগে চুমুক দিতে দিতে তাদের শুভ কামনা করে সে, কখনো কোন প্রয়োজন হলে তাকে কল দিতে বলে, তাদের সুখী সুন্দর আগামী কামনা করে সে।
নিপাকে নিয়ে সুখেই আছে রবিন। দুবছর পার হয়ে গেছে তাদের পাশাপাশি কাছাকাছি থাকার । চঞ্চল নিপা রাঙিয়েই রেখেছে রবিনের জীবন, অল্পতেই রাগ করে সে, আর সেটা যেন আরও বেশী করে উপভোগ করে রবিন । সিনেপ্লেক্সে মুভী দেখে নীচে নামছে তারা। হঠাৎ করে রবিনের চোখে পড়ে রুপার সেই বন্ধুটি। রবিন ডাক দেয়। সে ছেলেও চিনতে পারে।
রবিন জানতে চাই রুপা কেমন আছে। সেদিনের রবিনের মতই নির্লিপ্ত হয়ে সেই ছেলে জবাব দেয় জানিনা। ক্যাম্পাস লাইফ শেষ হবার পর আর ওর সাথে যোগাযোগ নেই।
বাইকের পিছনে বসতে বসতে নিপা জানতে চাই রুপা কে । ঘাড় ঘুরিয়ে নিপার দিকে তাকিয়ে রবিন হাসে, রুপা একটা ঝড়ের নাম, মাথায় হেলমেটটা চাপিয়ে দিয়ে সে বাইক স্টার্ট দেয়.........।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



