অফারটা পাওয়ার সাথে সাথে ছুটে গেলাম বসের টেবিলে। ভাইয়া এই এই হচ্ছে, ঐ দশ প্রতিযোগীর সাথে আমি ও বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জায়গা ঘুরে দেখার আমন্ত্রন পেয়েছি !!! ভাইয়া হাসি মুখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন কংগ্র্যাটস !!! তুমিত সব জায়গা ঘুরে দেখেছ, সো তোমারত আর যাবার দরকার নেই । পরে বললেন কতদিনের ব্যাপার। জানালাম মোটামুটি নয় দিন হলে ঢাকার বাইরের জায়গা গুলো ঘুরে আসা যাবে।একটা হাসি দিয়ে বললেন ওকে যাও ঘুরে আস। ফ্লোরে সবার সামনে তোলার পর সবাই বলল আরে যাও এইটা একটা দারুন চান্স। আমিও ব্যাপক উৎসাহিত, এমন একটা রিয়েলিটি শো টীম এর সাথে ঘুরার সুযোগ পেয়ে, যেটা অন্য বারের ঘোরাঘুরির চেয়ে আলাদা।
চ্যানেল আই অফিসে পরিচয় হল বিচারকদের সাথে । ব্লগ ব্যাপারটা নিয়ে দেখলাম তারা বেশ উৎসাহী এবং এটা যে একটা প্যারালাল মিডিয়া হয়ে উঠছে আলোচনায় তা উঠে এল বেশ কয়েকবার। নিজের ব্লগার পরিচয়টাকে বেশ উপভোগ করলাম।
১৮ই মার্চ নির্বাচিত দশ প্রতিযোগীর সাথে যাত্রা শুরু হল কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। ব্যাপক স্বপ্ন তাদের চোখে মুখে, স্বপ্নকে সাথী করে এই যাত্রা। হাতে পাওয়া লুমিক্স এর ক্যামেরা নিয়ে নানা গবেষনায় ব্যস্ত সবাই।
তবে প্রথম ট্যুরের পর যে বিষয়টা আমার মাথায় ঘুরতে লাগল তা হচ্ছে প্রফেশনালী ফটোগ্রাফীকে নিয়ে চিন্তা করা, প্রতিযোগীদের দু একজন ছাড়া বাকী সবার মাঝে এই চিন্তা অনুপস্হিত। এখানে সুযোগ না পেলে তারা ফটোগ্রাফীকে সবাই হৃদয় দিয়ে ধারন করত কিনা আমার সন্দেহ আছে। ডিজিটাল ক্যামেরার সহজ লভ্যতার সুযোগে এখন কোন কোন অনুস্ঠানে দর্শকের চেয়ে ফটোগ্রাফারের সংখ্যা বেশী পরিলক্ষিত হয়। অবশ্য বিপরীত ভাবনাও আছে আমার- শার্টার চাপতে চাপতে অনেকের আগ্রহ ঠিকই হয়ত বেড়ে যাবে একদিন, যেদিন সে অন্তর থেকে এটা নিয়ে ভাববে, প্যাশনে পরিনত হবে। প্রতিযোগীতার মাধ্যমে লুমিক্স এর প্রতিযোগীদেরও তা প্যাশনে পরিনত হবে এটাই কামনা।
অন্তত ফটোগ্রাফী ব্যাপারটা যে একটা ক্রিয়েটিভ আর্ট দেশে যদি এই ব্যাপারটা একটুও প্রতিস্ঠিত হয় তাহলেই আমি খুশী হব। কথা প্রসঙ্গে বিচারকদের একজন চন্দন ভাই জানালেন এই কয়দিন আগেও নাকি তার বাবার এক বন্ধু তাকে বলেছে এসব ছেড়ে ছুড়ে অন্য কোন ব্যবসায় মনোঃনিবেশ করতে
লুমিক্স যদি রিয়েলিটি শো করে এই ধ্যান ধারনা একটুও বদলাতে পারে সেটাই স্বার্থকতা ।
মানুষ মাত্রেই ভিন্ন বৈশিস্ঠের তা আচরনে হউক আর স্বভাবেই । আমাদের দশ প্রতিযোগীও ব্যতিক্রম নয়। প্রতিযোগীতায় এসেও সবাই যে প্রতিযোগী এই ভাবনার থেকেও ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের পরিচয়টুকু প্রায়ই বের হয়ে আসে।
অংশগ্রহনকারীর একজন ঢাবি শিক্ষক তরুণ মনির কোন মতেই তার শিক্ষক ইমেজ টুকু ভুলতে পারছেন না, যেটা একটা রিয়রলিটি শো এর সাথে আসলে যায়না । সম্ভবত টিভিতে দেখানোর পর ছাত্র ছাত্রী মহলে কি প্রতিক্রিয়া হবে এই নিয়ে সদা চিন্তিত মাইক্রোবায়োলজির মত জটিল বিষয়ের এই শিক্ষক।যদিও প্রায়শই মনের গহীনে তিনি যে একজন আমুদে মানুষ সেটা ঠিকি বের হয়ে আসে। পথ চলতে চলতে ফটোগ্রাফার হয়ে উঠা ,তিনি স্বপ্ন বুনে চলেছেন সেরা হয়ে লুমিক্স এর ব্র্যান্ড এম্বাসেডর হওয়ার পথে। সাফল্য কামনা করছি তার জন্য।
রিয়েলিটি শো- বাস্তবতার সাথে কে কতটুকু খাপ খাওয়াতে পারে এখানে এটাও একটা গুরুত্বপূর্ন্ বিষয়। ফটোগ্রাফার হলে কটু অনেক কথায় শুনতে হতে পারে বিভিন্ন সময়ে, সো সেটার মানসিক প্রিপারেশন থাকাটা জরুরী সবার জন্য। আর আরেকটি বিষয় খেয়াল রাখা উচিৎ আমার কোন কাজ যেন অন্যের কাজে বাঁধা না হয়ে দাঁড়ায়। চলন্ত বাসে আমার স্বপ্ন নিয়ে আমি সপ্রতিভ হতেই পারি তবে তা যেন অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটায় সেটাও খেয়াল রাখা উচিৎ, ঘুম কারো কারো কাছে স্বপ্নের চেয়েও দামী হতেই পারে !!!
তানিয়া শর্ট ফ্লীম নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন নিয়ে সে ছুটে বেড়াচ্ছে লুমিক্স এর সাথে। তবে যেহেতু প্রতিযোগী ফটোগ্রাফী কনটেস্টের তাই ফটোগ্রাফী নিয়ে আরেকটু বেশী ভাবলে আরও ভাল করার সম্ভাবনা রয়েই গেছে সামনে।
সবচেয়ে কমবয়সী তরুন তামিম- মনে একটা চাপা ক্ষোভ নিয়ে চলেছে স্বপ্ন ছুয়ে দেখার প্রত্যাশায়। ভার্সিটির ফটোগ্রাফী ক্লাব থেকে রিজেক্টেড হলেও লুমিক্স তার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। দেখা যাক কতটুকু পথ পাড়ি দিতে পারে তামিম ।
তামিম কে বাদ দেয়া ফটোগ্রাফী ক্লাবেরই সভাপতি মাইনুর, দুজনের একটা চমৎকার দ্বৈরৎ দেখার প্রত্যাশা করছি। দেখা যাক কে কাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে। মাইনুরের আরেকটু বেশী মনোযোগী হওয়া দরকার , ভুলে যেতে হবে আগে কি করেছি না করেছি সে সব।প্রতিযোগীতা হবে তাৎক্ষনিক তোলা ছবি নিয়ে, আগের ছবি আর পারফরমেন্স দিয়ে নয়। এখন কে কতটুকু সেন্স কাজে লাগিয়ে ছবি তুলছে তার উপর।
ফটোগ্রাফার মামার সহচর্য লাভ করা ফয়সালের কাছে এখনও স্বপ্নই মনে হচ্ছে এ সুযোগ পাওয়া। মামার কাছ থেকে টুংটাং করে শিখে নেয়া ফটোগ্রাফীকে তিনি কতটুকু ধারন করতে পেরেছেন সময়ই বলে দিবে সে কথা।
প্রথম দৃস্টিতেই শুধু নয়, সব সময়ের জন্যই নিতান্ত সুবোধ বালক ফরহাদ। যে কোন কিছুই করা সম্ভব- এই প্রত্যয় নিয়ে সামনে তাকিয়ে থাকতে আর হঠাৎ করে ভাবনার জগতে হারিয়ে যেতেই মনে হয় তার পছন্দ।
আর ছবি দেখতে দেখতে ফটোগ্রাফীকে ভালবেসে ফেলা আফজাল চোখে মুখে দীপ্তি নিয়ে পথ চলছে, এখনো দ্বিধান্বিত, যদি সেরা হয়েই যান, তবে কোনটাকে প্রফেশন হিসেবে বেছে নিবেন । আড্ডায় বেশ পটু এন্ড সাবলীল।
ফটোগ্রাফীর সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত এবং এটাকে ধারন করেন এমন প্রতিযোগী হচ্ছেন শাওন। ব্যক্তিজীবনে তার সহচররা বেশ নাম করা ফটোগ্রাফারই, সো তার জন্য এটা একটা চ্যালেন্জই বটে। অফিস থেকে বিনা বেতনে ছুটি নিয়ে শাওন ছুটে চলেছে স্বপ্ন পূরনের দিকে- শুভ কামনা রইল।
জীবনে প্রথমবার কক্সবাজারে গিয়ে ঠিক কি করবে বুঝতে পারছিলনা নার্গিস । দুঘন্টার মাঝে মেমোরি কার্ড ফুল করে ফেলল যা দেখছে তাই তুলতে গিয়ে । কিন্তু আরেকটি কার্ড যে আর দেয়া হবেনা !!! মন খারাপ করে নিজের তোলা ছবি গুলোকে নিজের হাতেই মুছে ফেলতে হল। মন খারাপ করার উপায় নেই, এটাই ছিল নিয়ম। সদা উচ্ছসিত, তবে দেখার চোখটাকে আরও সতর্ক করার প্রয়োজন, যায় দেখি তা ধারন করা যাবে পরে অন্য কোন সময়, প্রতিযোগীতা চলাকালীন নয়। এখন দরকার একটু ভীন্ন ভাবে, ভীন্ন দৃষ্টিকোন থেকে দেখার। অবশ্য সে চেস্টা যে তার আছে তা সে করেই দেখিয়েছে। আরেকটু সচেতন হলে, আর সবাই যে ছবির পেছনে ছুটছে শুধু তাই নয় একটু অন্যকিছু ধারন করার প্রবনতাটুকু যদি অব্যাহত থাকে সাফল্য পেতে মাত্র দুমাস অপেক্ষা করলেই চলবে !!!!!
সবার দৃস্টি কেড়ে নিবেন যে প্রতিযোগী তিনি হলেন নাইমা। পঞ্চাশে পা দেয়া এই তরুনী বাকী সবার সাথে সমান পদক্ষেপে এগিয়ে চলেছেন। পেশায় ব্যাংকার হলেও তার চোখে এখন খেলা করছে আলোকে বন্দী করে কি করে নতুন ভাবে উপস্হাপন করা যায়, দুমাসের ছুটি নিয়ে নিতে তাই দ্বিতীয়বার চিন্তা করেননি। দেখা যাক তারুণ্যের জয়গান তিনি কতটুকু গাইতে পারেন !!!
লুমিক্স ক্লিক টু ফেইম এর প্রতিযোগীদের সবসময় যে জিনিসটি ভুলে থাকতে হবে সেটা হল তাদের পেছনে একটা টিভি ক্যামেরা আছে। অনেককেই এই নিয়ে বেশ চিন্তিত ও মনে হল। টোটালী ইগনোর করে নিজের মত করে কাজ করে যাওয়াই বুদ্ধীমানের কাজ হবে। আর সবাই যে দিকে , যে বিষয়ের ছবি তুলছে সেটা না করে নিজের ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে , নিজের কম্পোজিশন সেন্স এপ্লাই করা বেটার ।
দশ জন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও কস্টের বিষয় হবে আগামী এক তারিখে সুন্দরবন ট্যুরে এখান থেকে দুজন বাদ পড়ে যাবে। চ্যানেল আই টীম, দশ প্রতিযোগী, আয়োজকদের একটা গ্রুপ- চমৎকার কেটে যাওয়া কয়টি দিন। প্রতিযোগীতা আগাবে আর প্রতিযোগীর সংখ্যা কমতে থাকবে, এটাই নিয়ম !!!
তবুও স্বল্প সময়ে, আড্ডায়- ঘোরাঘুরিতে সবাই যেন অনেকটা কাছের মানুষ হয়ে গিয়েছিল , অল্প সময় হলেও জীবনের ফেলে আসা সময়ের একটা অংশ হয়ে গিয়েছিল সবাই।
নিয়ম মেনে এক পর্বে এক একজন বিদায় নিবে , সাময়িক বিষাদ হয়ত ছুঁয়ে যাবে বাকীদের, স্মৃতিটুকু সাথে রেখে বাকীরা সামনে এগিয়ে যাবে- এগিয়ে যেতে হবে । এমনটিই হয় সবসময়...............
[ সুন্দরবন ট্যুরে প্রতিযোগীরা সবাই মিলে আমারে মাইর না দিলেই হয় - ]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

