মুনিয়া সকাল থেকে সেই যে বালিশে মুখ ডুবিয়ে আছে এখনও তোলেনি একবারের জন্যও। আসিফ কিছুক্ষন পরপর একবার রুমে আসছে, আবার বাইরের ব্যালকনিতে গিয়ে কিছু সময় কাটিয়ে আসছে। সে ঠিক বুঝতে পারছেনা মুনিয়া কি কাঁদছে , নাকি কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে । ডাকারও সাহস পাচ্ছেনা । মেয়েটাও যে কার কোলে কোথায় ঘুরে বেড়াচ্ছে কে জানে, সে থাকলেও মাকে জাগানোর একটা চেস্টা নিশ্চয় করত ।
গতকাল রাতে শ্বশুর বাড়ীতে ঢোকার সাথে সাথেই সে বুঝে গিয়েছিল পরিস্হিতি ভয়াবহ, কিন্তু সেটা যে কি কেউ তাকে খুলে বলছেনা । কাউকে জিজ্ঞাসা করবে কিনা ,সেটা ঠিক হবে কিনা এই নিয়ে ভাবতে ভাবতে শ্বশুর মশায় তাকে ডেকে বসলেন।
খাওয়া দাওয়া হয়েছে কিনা, চাকরি কেমন চলছে, নানা কুশলাদি জেনে তারপর তিনি শুরু করলেন মূল কথা। শুরুতেই তার শ্বাশুড়ির একগাদা প্রশংসা করে তিনি বলা শুরু করলেন, ভদ্রমহিলা গত হওয়ার পর থেকে তিনি কতটা নিঃস্বঙ্গ হয়ে পড়েছেন, গত দু বছর কতটা কস্টে কাটিয়েছেন, একটু কথা বলবেন , তার জন্য একটা মানুষ ও খুজে পাচ্ছিলেন না।
বন্ধুমহল থেকে শুরু করে আত্মীয় স্বজন সবার একটাই পরামর্শ আবার একটা বিয়ে করেন, এই শেষ বয়সে একা একা থাকাটা অনেক কস্টের। আত্মীয়স্বজনরা অনেকে নানান পাত্রীর খবরাখবরও নিয়ে আসত প্রায়ই। এতদিন আমি কোন আগ্রহ দেখাই নাই। ব্যাপারটা তোমাদের জন্য সুখকর হবেনা সেটা আমিও জানি। কিন্তু বাবা, শ্বশুর সাহেব একটু দম নেন !!!
আবার বলা শুরু করেন, সময় কাটানো আসলে অনেক কস্টের। তোমরাত আর আমার সাথে থাকনা, এত বড় ঘর পুরাই খালি, একটা কথা বলার মানুষ নাই। তাই শেষমেষ তোমার ফুফা শ্বশুর যে প্রস্তাবটা নিয়ে আসল আর না করতে পারলামনা। সবদিক জেনে শুনে ভালই মনে হল । এখন বল বাবা তোমার কি মত ।
আসিফ মনে মনে ভাবে, আবার বিয়ে করবেন ডিসিশান যখন নিয়েই ফেলেছেন, এখন আর আমার ভাবাভাবিতে কাজ কি । আমি কিছু না বলাই ভাল, আপনারা বাপ আর মেয়ে বুঝেন ব্যাপারটা । নতুন শ্বাশুড়ি ভাল হলেই আমার লাভ, আবার শ্বশুর বাড়ীতে একটু বেশী ভাল মন্দ খাওয়া যাবে, শ্বশুর বাড়ীতে এসেও যদি নিজের বউ এর রান্না খাইতে হয় তাহলে আর শ্বশুর বাড়ী আসার মানে কি ? এই কথা ভেবে সে নিজেই মনে মনে হেসে ফেলে।
আসিফ অনেকক্ষন চুপ করে আছে দেখে শ্বশুর আবার বলেন, আমি জানি ব্যাপারটা তোমাদের পছন্দ হবেনা আমি জানি, কিন্তু তুমি বল আমি কি করতে পারি। এই বলে শ্বশুর উঠে চলে যান।
সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে আসিফ ভাবে এই কি গ্যাড়াকলে পড়লাম। একটা শালা অথবা সম্বন্ধী থাকলে এই গ্যাড়াকলে তাকে পড়তে হতনা এইটা ভেবে শালা অথবা সম্বন্ধী না থাকার জন্য তার কিয়ৎ আফসোস হল। রুমে গিয়ে সোজা শুয়ে পড়ল মেয়েটাকে কাছে টেনে নিয়ে। মুনিয়ার দিকে তাকিয়েই বুঝল এখন কথা বলা মানে একটা বিস্ফোরন হবে, তার চেয়ে চুপ থাকা ভাল।
সকালেই বাসায় এসে হাজির হয়েছেন তার ফুফু আর ফুফা শ্বশুড়। তারাই এই আয়োজনের মূল উদ্দেক্তা। সাথে আছেন শ্বশুরের এক বন্ধু । আর মজার বিষয় হচ্ছে তার মরহুম শ্বাশুড়ির ভাই আর তার বউ ও এ শ্বশুরের আবার বিয়ে করার বিষয়ে সম্মত, এমন না যে এতে তাদের কোন জাগতিক লাভ লসের বিষয় আছে, তারা প্রবল বাস্তববাদী রুপ নিয়ে হাজির হয়েছেন। সকাল থেকে দফায় দফায় প্রত্যেকে মুনিয়াকে নানা পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ব্যাপারটা যে তার বাবার জন্য মঙ্গলকর এই বিসয়ে নানা পরামর্শ দিচ্ছেন, আর প্রতিবারই মুনিয়ার কান্নার বেগ দ্বিগুন আকার ধারন করছে, যদিও এখন সেটা ম্রিয়মান হয়ে সম্ভবত সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে । আসিফের ও ইচ্ছা করছে ঘুমিয়ে পড়তে। ঘুম কি যে নেয়ামত বিধাতরা সে ভেবে অবাক হয়, কি সুন্দর জাগতিক ঝামেলা থেকে এক ঝটকায় দুরে চলে যাওয়া যায়। ব্যাপারটা শোভন হবেনা ভেবে এই ইচ্ছা সে বাদ দেয়। সবচেয়ে অবাককর বিষয় হচ্ছে মুরুব্বীদের নানা পরামর্শ শুনে মনে মনে সেও শ্বশড়ের দ্বিতীয় বিয়েতে সম্মত হয়ে বসে আছে। ব্যাপারটার ভাল মন্দের বিবেচনার চেয়ে বিষয়টাতে সে কেমন যেন আনন্দ অনুভব করছে। শ্বশুড়ের বিয়ে খাওয়া ব্যাপারটা কেমন , সে এই নিয়ে ভাবার চেস্টা করছে। যদিও এই বিয়ের ব্যাপারে তার কোন মতামত দেয়া চলবেনা এইটা সে ভাল করেই জানে, মুনিয়া যা মেনে নিবে সেটাই তার মতামত, সো এইখানে হালকা বিনোদন খুজে নেয়াটাই বুদ্ধীমানের কাজ।
বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একবার সে ভেবেছিল মুনিয়াকে বলবে বিষয়টা স্বাভাবিক ভাবে মেনে নাও । যেহেতু বাবাকে সময় দেয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব না, তাই তিনি থাকুননা তার নিজের মত করে, একটু যদি ভাল থাকেন, তার নিঃসঙ্গতা কমে মন্দ কি। আবার পরক্ষনে এও ভাবে নিজের মায়ের সংসারে অন্যকাউকে মেনে নেয়া চাট্টিখানি কথা না। নিজের সাথে এই যুদ্ধে মুনিয়াকে নিজে নিজেই জিততে হবে, যেহেতু আর অন্য কোন উপায় আছে বলে তার মনে হয়না, সবাই যেহেতু বিয়ের ব্যাপারে মনস্হির করে ফেলেছেন।
সকালে ফুফা শ্বশুর তাকে ডেকে নিয়ে যখন বললেন মুনিয়াকে বাবা তুমি একটু বুঝাও তখন সে নিশ্চুপ ছিল , অনেক গুলো যুক্তিও তিনি দিয়ে গেলেন। আসিফ ব্যাপারটা নিয়ে ঠান্ডা মাথায় অনেকক্ষন ভেবেছে।
বিষয়টা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে নানামুখী বাস্তবতার মুখোমুখী দাঁড়াতে হল আসিফ কে। সুখের সংসারই ছিল সবদিক থেকে তার শ্বশুরের। হঠাৎ করে শ্বাশুড়ী মারা গিয়ে সবকিছু কেমন ছন্নছাড়া হয়ে গেল। সত্যি বলতে কি গত বছর খানেক ধরে শ্বশুরকে দেখলে তারও ভীষন মায়া হত । কিন্তু তাই বলে আজকের এই পরিস্হিতির মুখোমুখী হতে হবে সেটা তার মনে আসেনি। একদিক থেকে চিন্তা করলে সে তার শ্বশুরের দ্বিতীয় বিয়ের পক্ষপাতী। এই ভাবনার সাথে সাথে তার মনে নিজেকে তীব্র ভাবে পুরুষবাদী মনে হল, যে কিনা কেবল পুরুষেরই সুখ দুঃখের বিষয়টাকেই বড় করে দেখছে। পশ্চিমা দেশে হলে হয়ত এটা কোন বিষয়ই ছিলনা, কিন্তু আমাদের সমাজ বাস্তবতাত ভিন্ন। একই ব্যাপার যদি উল্টা হয়ে তার শ্বাশুড়ির ক্ষেত্রে হত তাহলে সে নিশ্চয় এত সহজে স্বাভাবিক ভাবতে পারত কিনা সন্দেহ আছে, কিংবা বিষয়টা তার পরিবারের হলে, সে এত নির্বিকার থাকতে পারত কিনা সন্দেহ।
পক্ষে বিপক্ষে নানা যুক্তিই তার মনে খেলা করে যাচ্ছে। স্হির কোন ডিসিশানে সে আসলে পৌঁছাতে পারছেনা, আবার ভাবছে এত ডিসিশানে গিয়ে কাজ কি, যা হবার তাত হবেই । এমন সব ভাবতে ভাবতে রুমে ঢুকে মুনিয়ার ঘুমন্ত করুন মুখ খানা চোখে পড়তেই আসিফের মনটা খারাপ হয়ে গেল। নিজের মায়ের সংসার অন্য কারো দখলে যাবে এটা মেনে নেয়া আসলেই কস্টের ।
এমন সময় মেয়েটা এসে আসিফের কোলে চেপে বসে। আসিফ একবার মেয়ের দিকে , আরেকবার মুনিয়ার বিষন্নতা মাখা ঘুমন্ত করুন মুখের দিকে তাকায় ।
গভীর বিষন্নতা আসিফকেও পেয়ে বসে...........
[পরিশিষ্ট : বিকেল নাগাদ পরিস্হিতি অনেকটাই বদলে গেল। আসিফ বুঝতে পারে পুরোটাই বড় ফুফুর অবদান। তিনি এসেই মুনিয়ার সাথে রুদ্ঢদ্বার বৈঠক করলেন। সেখান থেকে বের হবার পর তার থমথমে ভাবটাও চেহারা থেকে কমে গেল। হালকা বিষন্নতার ছোঁয়া থাকলেও সে বেশ খোশ মেজাজেই একবার আসিফের দিকে তাকাল, তারপর একটা কাগজ নিয়ে লিস্ট করা শুরু করল কি কি নতুন জিনিস কিনতে হবে বাসার জন্য ........। আসিফ যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল.............যাক বেশ ভাল খাবার দাবাড়ের আয়োজন হবে এই ভেবে সে বেশ পরিতৃপ্তি বোধ করা শুরু করল........]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

