ঘুমের ঘোরে বেশ জোরে জোরে চিৎকার করে উঠলেন চেয়ারম্যান সাহেব। তার ঘুম না ভাঙ্গলেও বৃদ্ধা স্ত্রীর ঘুম ভেঙ্গে গেল এতে। তিনি বিছানায় উঠে এক দৃস্টিতে বৃদ্ধ স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছেন, অবশ্য বয়স হলেও চেয়ারম্যান সাহেব এখন সবল স্বাস্হ্যের অধিকারী, দশ গ্রামের মানুষ এখনও তার কথায় উঠে বসে, তার ধমকে চুপ করে থাকে, তার এক কথায় অন্যের পা ধরে মাপ চায়। মনে মনে এই নিয়ে যে তার গর্ব বোধের শেষ নেই তা তিনি ভাল করেই জানেন, দশ গ্রামে তার সন্মান ও কম না, চেয়ারম্যান সাহেবের বউ বলে কথা। তিনি বের হলে ছেলে পেলে রাস্তার এক পাশে দাঁড়িয়ে তাকে জায়গা ছেড়ে সন্মান দেখায়, রিক্সা ডেকে দেয়।
চেয়ারম্যান সাহেব আবার ও চিৎকার দিয়ে উঠলেন- এই সর সর, তোরে কইছিনা আমার সামনে আসবিনা, খুন কইরা ফালামু। এই বলে আবার চুপ করে গেলেন। বৃদ্ধা স্বামীর বুকে একটা হাত রেখে আস্তে আস্তে ডাকলেও তার ঘুম ভাঙ্গেনি।
সকালে এই কথা বললেও চেয়ারম্যান সাহেব ঐ ধরনের কোন ঘটনার কথা মনে না পড়ার ভান করলেন। কি হয়েছে বউ এর কাছে জানতে চাইলেন। শুনে বললেন কে জানে হয়ত কোন দুঃস্বপ্ন দেখছি মনে হয়।
চেয়ারম্যান কবির মোল্লা। টানা পয়ত্রিশ বছর ধরে এই পদে আছেন, তার জীবদ্দশায় অন্যকারো পাবারও কোন সম্ভাবনা নেই, গ্রামের মানুষ ও তা মেনে নিয়েছে। অর্থে- প্রতিপত্তিতে তার সাথে লড়ার মত আসলে কেউ নেই। তার উপর ভোটের সময় এমপিরা সব আইসা এই মোল্লার দোয়া চান, টাকা পয়সা দিয়া যান সবাইরে দেয়ার জন্য। এক নামে সবাই চিনে।
ভালই কাটিয়ে দিলেন জীবনটা কবির মোল্লা, মনে মনে আত্মতৃপ্তি খুজে পান তিনি, একজীবনে আর কি চায়। ছেলে মেয়েরা সব প্রতিস্ঠিত, শহরে থাকে- ঈদে কোরবানে গ্রামে আসে, সবাইরে নিয়া হইহুল্লোড় করে কয়দিন থাকে আবার চলে যায়।
হঠাৎ করে যেন সবকিছু কি থেকে কি হয়ে যাচ্ছে মোল্লা বুঝতে পারছেননা। ইদানিং সারাক্ষন মনে হয় শেফালী যেন তার পছেন পেছন ঘুরছে, এইত ঐদিন সন্ধ্যা রাতে তিনি যখন বাজারের দোকান থেকে ফিরতেছিলেন বাড়ীর রাস্তায় শেফালী তার পথের মাঝখানে আইসা দাঁড়াল। কোন কথা নাই, খালি হাসে , চেয়ারম্যানতো ভুত দেখার মত চমকাইয়া উঠলেন।
তুই !!! তুই !!!! তুই কইথেকে আসলি - বলতে বলতে চেয়ারম্যানের মুখে ভয়ে প্রায় ফেনা এসে গেছে । ভীত অসহায় চোখে তিনি শেফালীর দিকে তাকিয়ে বলেন- তুই, তুই না মইরা গেছস, কই থেকে আইলি আবার , তোর এখনও শিক্ষা হয় নাই !!!!
শেফালী খিলখিল করে হাসে, কবির মোল্লার দিকে এক দৃস্টে তাকিয়ে আছে সে । এমন সময় কে যেন পেছন থেকে টর্চ মেরে বলে উঠে কি ব্যাপার চেয়ারম্যান চাচা, কার লগে কথা কন, কাউরেত দেখিনা ।শেফালী যেন হঠাৎ করে মিলিয়ে যায়, আর মোল্লা কিছু না কিছু না বলে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।
বাড়ি ফিরে তিনি ঝিম মেরে বসে থাকেন অনেকক্ষন , কোন হিসেব মিলাতে পারেন না, এটা কি করে সম্ভব। এই শেফালীরে তো তার সামনে গুলি করে মারা হয়, তিনি নিজে লাশ দেখেছেন, গোরখাদক গফুর নিজ হাতে ওরে কবর দিছে। গফুর ও আজ বেঁচে নেয়, নাহলে তিনি এখন তার কাছে ছুটে যেতেন।
৭০ এর প্রলয়ংকরী ঝড়ের পর পর, তীব্র খাদ্য সংকট, সরকারের যে রিলিফ আসে তাও গ্রামের চেয়ারম্যান মেম্বররা নিজেরাই মেরে দেন, অভাবী মানুষের কাছে তা পৌঁছায়না। টগবগে জোয়ান কবির মোল্লা তখনকার চেয়ারম্যানের সাথে সাথে থাকে, দরকার পড়লে মারামারিও করে তার জন্য। মানুষজন দুমুঠো চালের জন্য আসে, কবির মোল্লা তাদের প্রতিহত করে সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে । শেফালীর ভাই রমিজ তার প্রতিবাদ করে মার খায়, অভাব অনটনে পুরো গ্রাম ।
কবির মোল্লার চোখ পড়ে শেফালীর উপর। চেয়ারম্যানের ক্ষমতার বলে সে শেফালীর বাবাকে গিয়ে বলে তার সঙ্গে মেয়ের বিয়ে দেবার জন্য, লাভ হিসেবে রিলিফের চালের লোভ দেখিয়ে আসে, অভাব দূর হয়ে যাবে প্রবোধ দেয়। মোল্লার কথা শেষ হবার আগেই রমিজ পাকেরঘর থেকে দা নিয়ে ছুটে আসে। মাথা নিচু করে যেতে যেতে সে বলতে থাকে কামটা ভালা করলিনা, কবির মোল্লা কোনদিন কাউরে ছাইড়া দেয় নায় ।
স্বাধীন বাংলার স্বপ্নে, নিজের একটা দেশ, অভাবহীন জীবনের প্রত্যাশায় বিনাদ্বিধায় প্রথম সুযোগেই রমিজ ঝাপিয়ে পড়ে সংগ্রামী যুদ্ধে, বাড়ি ছেড়ে অনেক দূরে। সুযোগ সন্ধানী কবির মোল্লাও ঝাপিয়ে পড়ে আখের গোছানোর লোভে, চেয়ারম্যানের হাত ধরে পাকসেনাদের আপ্যায়নে হাজির হয় মোল্লা, সেনাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, চেয়ারম্যানের বাড়ীতে রান্না খাওয়া নিয়ে যায় স্কুল ঘরে, আর সৈনিকদের সামনে বিশ্বস্ততা প্রমানের জন্য সে খাবার আগে নিজে খেয়ে দেখায় কোন বিষ মেশানো নেই।
মোল্লার ও সাঙ্গপাঙ্গ একে একে যোগ দেয় তার সাথে। কে কে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে তার তালিকা করে পাক সেনাদের নিয়ে সেসব বাড়ীতে হামলে পড়ে। সুযোগ বুঝে শেফালীর বাবাকে ভয় দেখায় মোল্লা, তার সাথে মেয়ে বিয়ে দেবার জন্য। প্রস্তাব প্রত্যাখান হবার পর শেফালীর পথ রোধ করে সে একই প্রস্তাব দেয়। একদলা থুথু দিয়ে শেফালীও তাকে প্রত্যাখান করে।
প্রতিশোধের আগুনে জ্বলতে থাকা মোল্লা রাতের আঁধারে ঝাপিয়ে পরে শেফালীদের বাড়ীতে। বাবা মার সামনে তাকে তুলে নিয়ে আসে চেয়ারম্যানের কাচারি ঘরে। নিজের জিঘাংসা মেটানোর পর শেফালীকে তুলে দেয় পাকি দের হাতে । পাকি সেনাদের আস্হাভাজন মোল্লা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে চারদিকে। লুটপাট আর অত্যাচারই তার কাজ, আর ক্ষমতালোভী মোল্লা একদিন সুযোগ বুঝে চেয়ারম্যানকে হত্যা করে মুক্তিসেনাদের কাজ বলে চালিয়ে দেয়। সেনার আগুন দেয় রমিজের ঘরে, বদ্ধ বাবা মা এই শোকে দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নেন।
অত্যাচারে জর্জরিত শেফালী, আর পারছেনা সে, একদিন খবর পায় তার বাবা মার পরনিণতির। দুর্বল শেফালী , একসময় যে ছিল উচ্ছলতার প্রতিমূর্তি , সুযোগ বুঝে বেয়নেট দিয়ে আঘাত করে এক সেনাকে। মেয়েলী শরীরে আর কতটুকুই বা জোড় অবশিস্ট আছে তখন, ক্ষুব্দ পাকি ক্যাপ্টেন শেফালীকে গুলি করে মারার আদেশ দেয়, যাতে বাকিদেরও একটা শিক্ষা হয়। আর সুযোগসন্ধানী মোল্লা এই সুযোগে চেয়ারম্যানের স্ত্রীকে পটিয়ে , পাকি সেনাদের ভয় দেখিয়ে তার কিশোরি মেয়েকে বিয়ে করে চেয়ারম্যানের বাড়ীতে আসন গাড়ে।
রমিজের আর ফেরা হয়না, পুরো একটি পরিবারই হারিয়ে যায় অনুপম স্বাধীনতার জন্য। সুযোগসন্ধানী মোল্লা হাতিয়ে নেয়া অর্থ আর বাহুবলে একসময় ক্ষমতার মুলধারায় ফিরে আসে , হয়ে যায় চেয়ারম্যান।
আরেকসন্ধ্যায় সে আবিস্কার করে শেফালী লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে। ভীত মোল্লা আবার বাজারে ফিরে গিয়ে সঙ্গে করে একজনকে নিয়ে আসে। তখনও সে দেখতে পায় গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে শেফালী হাসছে। মোল্লার অবস্হা খারাপ হতে থাকে। ঘুমের ঘোরে তার চিৎকারের পরিমান বাড়তে থাকে, দিনের বেলা যেটা সে অস্বীকার করে।
কোন উপায় না দেখে মোল্লার স্ত্রী এক কবিরাজের স্মরনাপন্ন হন। সে হাজিরা দেখে জানায় মোল্লার উপর খারাপ জ্বীন ভর করেছে। ঝাড়ফুক করলে ভাল হয়ে যাবে। ভীত কন্ঠে একথা জানানোর পর মোল্লা উড়িয়ে দেন কবিরাজের কথা।
বাধ্য হয়ে ছেলেদের খবর দেন মোল্লার স্ত্রী। একরকম জোড় করেই তাকে শহরে নেয়া হয়। নানা পরীক্ষা নিরিক্ষার পরও ডাক্তার কোন রোগ খুজে পেলেননা, শেষে এক মানসিক রোগের ডাক্তারকে দেখানো হলে ধুরন্ধর মোল্লা তার অতীতের কোন কথায় তাকে বলেনি। ঘুমের ঔষধ নিয়ে সে গ্রামে ফিরে আসে।
শেফালীর সাথে তার সাক্ষাৎ এর পরিমান বাড়তে থাকে, ইদানিং দিনের বেলায় কাছারি বসা অবস্হায়ও সে দেখে দুর থেকে তার দিকে তাকিয়ে শেফালী হাসছে। সামনে নির্বাচন, সরকারি দল, বিরোধী দলের সবাই তার কাছে আসে দোয়ার জন্য, মোল্লার সেদিকে মন নেই, অন্যান্য বার হলে এই নির্বাচন নিয়ে তার উত্তেজনা আর দরকষাকষির আয়োজনে বাড়িতে সাজসাজ রব পড়ে যেত। মোল্লা উদাস চোখে চেয়ে দেখে তার স্ত্রী হুজুর ডেকে বাড়ী বন করছে, মাটির ঢাকনায় দোয়া দরুদ লিখে ঘরের কোনে কোনে ঝুকিয়ে দিচ্ছে। সব কিছু ছাপিয়ে তার চোখে পরে শেফালী দূর থেকে তাকিয়ে হাসছে। মোল্লার ভয় বাড়তে থাকে , কি করবে বুঝতে পারেনা।
পরিস্হিতি আরো খারাপ আকার ধারন করে যখন সে স্ত্রীকে খাবার নিয়ে আসতে দেখে শেফালী শেফালী বলে চিৎকার করে উঠে তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। কাজের লোকজন এসে তাকে ধরে শুইয়ে দেয়, ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দেয়া হয়।
মাঝ রাত্তিরে সবার অলক্ষ্যে কবির মোল্লা ঘর থেকে বের হয়ে আসে। শেফালী হাঁটে তার সমনে সামনে। পরদিন সকালে পুকুরে পুতে রাখা বাঁশ বিদ্ধ অবস্হায় মোল্লার নিথর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১১ দুপুর ২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




