somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জইক্কা "

৩০ শে মে, ২০১১ সকাল ১১:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমি ডুবে যাচ্ছি, আসলে বলা যায় ডুবেই গেছি। পানির উপর থেকে আমাকে এখন আর দেখা যাচ্ছেনা। আমি যে এই অবস্হায় আছি সেটাও কেউ জানেনা। স্কুল থেকে দুপুরে ফিরে কোন মতে ব্যাগটা ছুড়ে ফেলেই দৌড়ে এসেছি পুকুরে। মা কি যেন বলছিল, কে শুনে কার কথা। অন্যদিন এমনটা হয়না, পুকুরে কেউ না কেউ থাকে, আজ কেউ নেই। আরও কিছুদিন আগে হলে হয়ত ভয় পেতাম, এখন যেহেতু একটু একটু সাঁতার পারি, তাই নেমেই গেলাম। কতটুকু শিখলাম তা যাচাই করতে গিয়েই আমি এখন ডুবে যাচ্ছি !!!!

পানির প্রায় এক হাত নীচে চলে গেছি এখন আমি। উপরে কেমন যেন সবুজ রঙ এর আলোর মত মনে হচ্ছে, আরেকটু ভাল করে তাকাতেই সূর্যটাকে দেখা যাচ্ছে, কেমন যেন দুলছে আর ঘোলা ঘোলা। কিছু একটা ধরতে চাচ্ছি কিন্তু হাতের কাছে কিছুই পাচ্ছিনা।কেমন যেন ভয় ভয় লাগছে, চোখ বের হয়ে আসতে চাইছে, অংক স্যারের কথা ভেবে ভয়টা আরেকটু বেড়ে গেল, বাড়ির কাজ করি নাই, ক্লাশে গেলেই মাইর দিবেন ।

পায়ের সাথে কি যেন একটা লাগল। পানির নীচেও আমি চমকে উঠলাম। একেত ডুবে যাচ্ছি বলে আমার কান্না পাচ্ছে, তার উপর পায়ে দড়ির মতন কিছু একটা লাগায় আরো বেশী ভয় লাগছে। আমি মনে হয় একটু একটু করে দড়ির মধ্যে পেচিয়ে যাচ্ছি । দড়িটা চারপাশ থেকে আমাকে ঘিরে ধরছে। ভয়ে চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। " জইক্কা " নাত। মা বলেছিলেন জইক্কার শিকল থাকে, পানিতে বাচ্চারা একা নামলে সে শিকল দিয়ে জড়িয়ে ধরে পানির নিচে টেনে নিয়ে যায়, তারপর মেরে ফেলে, এরপর লাশটা ভাসিয়ে দেয়। এই ভয়ে কতদিন গরমের মাঝেও একা একা পানিতে নামি নাই ।কেউ থাকলে তারপর নামতাম। আজকে কেন যে সাহস করে নেমে গেলাম। দড়ির মাঝে আমি ঢুকে যাচ্ছি, চারপাশ থেকে দড়িগুলো আমাকে আঁটকিয়ে ফেলছে। মনে হয়না এইটা জইক্কা, জইক্কার তো শিকল থাকে , কিন্তু এটারতো শিকল নাই। আমি আরো তলিয়ে যাচ্ছি, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । সাহস করে হাত দিয়ে একটা দড়ি ধরে ফেললাম। একি , এটাত পুকুড়ের কিনারে যে লাতানো দল গাছ আছে, ঐ গাছেরই মত। খালি অনেক মোটা আর আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে ধরছে। আমি ছুটতে পারছিনা কেন। আমার হাত পা সব আঁটকে যাচ্ছে।

মার চেহারাটা দেখতে পারছি, নিশ্চয় এতক্ষনে ভাত রান্না শেষ করে ফেলেছেন। মাকে খুব বলতে ইচ্ছা করছে মাগো জইক্কা বলেত কিছু নাই, পানির নীচে শিকলও থাকেনা, আমি যে লতা গাছে আঁটকে গেছি, শক্তি থাকলে ঠিকই ছুটে যেতাম, এখন আর পারছিনা। মাগো, মা আমি মনে হয় আর কোনদিন ভাত খাইতে পারুমনা, আমি মইরা যাইতেছি।

মরে গিয়ে একটা জিনিস জানলাম, জইক্কা বলে আসলে কিছু নাই, মা ভয় দেখানোর জন্য এই কথা বলত, যাতে পানিতে না নামি। অবশ্য কথাটা শুনলে আজকে আমারে আর মরতে হইতনা , স্কুল এ না যাইয়া খেলতে পারতাম। আইচ্ছা বড় শুকনা দীঘি নিয়া যে গল্প আছে সেইটা ও কি এমনই কাহিনী। মা ঐ দীঘির কাছে যাইতে মানা করত, যদিও ঐটাতে কোন পানি নাই, খালি একটা পাড় ভাঙ্গা। ঐ দীঘিতে নাকি পরীরা থাকত, তাদের একটা নৌকা ছিল। গ্রামের বিয়ে শাদীর জন্য নাকি ঐ নৌকার কাছে গিয়ে চাইলে তারা সোনা রুপার প্লেট দিত, বাটি দিত, বড় বড় ডেকচি দিত। নিয়ম ছিল সব কিছুই ফেরত দিতে হবে। একবার নাকি এক লোভী একটা সোনার প্লেট রেখে দিয়েছিল। তারপর থেকে নাকি পরীরা তাদের নৌকা নিয়ে চলে গেছে। যেদিক দিয়ে গেছে দীঘির সে পাড়টা ভাঙ্গা । আচ্ছা এই গল্পটাও কি জইক্কার গল্পের মত, যাতে কারো জিনিস নিলে ফেরত দিয়ে দিই এই জন্যই বানানো। ঠিক বুঝতে পারছিনা, অবশ্য আমার বোঝা না বুঝায় কিছু আসে যায়না, আমিত এখন মরে গেছি।

পুকর পারে হইচই শোনা যাচ্ছে, আমার মা চিৎকার করতেছেন, আমাকে পাওয়া যাচ্ছেনা । কেউ একজন চিৎকার দিয়ে কি যেন বলল, অমনি হুড়মুড় করে কয়েকজন পানিতে নেমে গেল। মতি চাচা, শফিক ভাই, বোরহান কাকা আরোও কে কে যেন আছেন, বিদেশে না গেলে আমার বাবাও হয়ত থাকতেন। বোরহান কাকা আমার দিকে এগিয়ে আসতেছেন। আর একটু সামনে আসলেই ওনার পা আমার গায়ে লাগবে। চাচা একটা চিৎকার দিলেন, তারপর এক ডুবে আমারে তুলে আনলেন। দড়িরমত লতা ছাড়াইতে ওনার বেশ কস্ট হইছে। কয়েকটাত আমার সাথে ছিড়ে চলে এসেছে। পারে আনতে না আনতেই আমার মা ফিট হয়ে গেছে। পিচ্চি বোনটা মার উপর পড়ে কাঁনতেছে, আমার কি হইছে তা নিয়ে ওর অবশ্য মাথা ব্যথা নেই। লোকজন জড়ো হয়ে যাচ্ছে। কেউ একজন আমার বুকে চাপ দিচ্ছে , ভ্যানে শুইয়ে নেয়া হল বাজারে। আমিত আগেই বুঝেছি মরে গেছি, ডাক্তার আবার বললেন আমি মরে গেছি।

বিকেল নাগাদ আত্মীয় স্বজন সবাই চলে এল। তারা যে কি নিয়ে কথা বলছে ঠিক বুঝতেছিনা, আমাকে উঠানে শুইয়ে রাখা হয়েছে। দুরে কেউ একজন আমার মায়ের মাথায় পানি ঢালছে, মাও শুয়ে আছেন , মাথার পানি আর চোখের পানি আলাদা করা যাচ্ছেনা। মতি চাচা কাকে কাকে যেন বললেন কবর খোড়া শুরু করতে।

দুতিনটা বাচ্চা বলাবলি করছে জইক্কা মাইরা ফেলছে। আমার হাসি পাচ্ছে, তোরা না মরা পর্যন্ত বুঝবিনারে জইক্কা বলে কিছু নাই । আমাকে কবরে রেখে আসার সব আয়োজন হয়ে গেছে। বাড়িটে শুধু কান্নাকাটি আর চিৎকার। সবাই সুর তুলে কানছে। বোরহান কাকা কি যেন বলার পর আমার খাটিয়া তোলা হল। দরুদ আর কলেমা পড়ছে সবাই। সবাই মিলে মসজিদের দিকে ছুটে চলেছে। এক বাড়ির পাশ দিয়ে যাবার সময় বাচ্চাটাকে মা বলছে একা একা পুকুরে যাইসনা কখনো, গেলে জইক্কা মাইরা ফেলব, ঐ পোলাটারেও জইক্কা মাইরা ফেলছে। বাচ্চাটি গভীর আগ্রহ নিয়ে খাটিয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

সবাই মিলে এখন আমাকে কবর দেবার জন্য নিয়ে চলেছে। এইবার আমার খারাপ লাগছে। আমিত আর কাউকে দেখতে পাবনা, কাউকে না , আমার যেতে ইচ্ছা করছেনা। ইস আমি যদি আবার বেঁচে উঠতাম, কবরে আমি থাকব কেমনে। এমন কিছু কি নাই আমাকে বাঁচিয়ে তুলবে।

গতবছর যখন জন্ডিস হল মাত কি ভয়টাই না পেয়েছিল। শেষে এক কবিরাজ আমাকে ভাল করে দিছিল। ঐ কবিরাজ বাড়ীতে আসার পরত বোরহান কাকা মাকে ডেকে বলছিল, ভাবী তোমার মাথা খারাপ হইছেনি, লতাপাতার মালা দিয়া কি জন্ডিস নামে, তাইলে আর দুনিয়াতে ডাক্তারের কোন কাম থাকতনা। মা কি আর শোনে সেই কথা ।

কাবিরাজ সুতা দিয়ে শক্ত করে কি একটা গাছের ডাল একটা একটা করে বেঁধে মালা বানিয়েছে। আমাকে উঠানে বসানো হল। তারপর কবিরাজ এই চুড়িরমত গোল মালাটা আমার মাথায় বসিয়ে দিয়ে টাকা নিয়ে চলে গেল।। নড়াচড়া করা যাবেনা, বাথরুমে যেতে হলে কেউ মালাটা ধরে রাখবে, মাথা থেকে নামানো যাবেনা। এই মালাটা নাকি ধীরে ধীরে বড় হবে, মাথা থেকে গলায় , গলা থেকে আস্তে আস্তে গা বেয়ে নীচে পড়ে যাবে, সেই সাথে নাকি জন্ডিস ও চলে যাবে। জন্ডিস যাবে কি যাবেনা এটার চেয়ে আমার কাছে মজা লাগছিল উঠানে আমাকে স্হির করে বসিয়ে রাখা হয়েছে আর সবাই গোল হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, কখন মালাটা বড় হয়ে গা বেয়ে পড়ে যাবে।

আমি বুঝতেছি মালাটা ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে, মাথা থেকে নীচে নামছে, কানে এসে আঁটকে যাবার পর মা একটু আলগা করে দিল, যাতে নেমে যেতে পারে। সবার চোখের সামনে একসময় মালাটা আমার গা বেয়ে নেমে গেল। এর পর দিন থেকে আমি আবার হইচই লাফালাফি শুরু করে দিলাম।

এমন একটা মালা কই পাই যেটা আমাকে আবার বাঁচিয়ে তুলবে !!!!

৩২টি মন্তব্য ৩২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×