শাহ আবদুল করিমের একমাত্র পুত্র শাহ নূর জালাল জানান, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই বাউল সম্রাট বার্ধক্যজনিত কারণে ভোগছেন। ওই সিময় তিনি নিজে নিজে কিছুটা চলাফেরা করতে পারলেও ওই বছরের শেষ দিকে থেকে তিনি রোগের কাছে কাবু হয়ে বিছানায়ই দিন কাটাচ্ছেন। তারপর থেকে অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারছেন না। বেশি অসুস্থ হলেই তিনি সিলেটের নূরজাহান হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
শাহ নূর জালাল জানান, গত ৩ সেপ্টেম্বর বাউল সম্রাটের অসুস্থতা বেশি দেখা দিলে ওই দিনই তিনি পিতাকে নিয়ে সিলেটের নূরজাহান ক্লিনিকে ভর্তি করান। প্রথম দিকে অবস্থা কিছু ভালো হলেও গতকাল শুক্রবার থেকে তার শারিরিক অবস্থা খারাপ হতে থাকে। তাই শুক্রবার দুপুর ১ ঘটিকা থেকেই তাকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে রাখা হয়েছে।
শাহ আবদুল করিমকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে এই খবর ছড়িয়ে পড়লে সিলেটের মেয়র বদর উদ্দিন কামরানসহ স্থানীয় সাংবাদিক, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্নশ্রেণীপেশার লোকজন তাকে এক নজর দেখার জন্য হাসপাতালে ভীড় জমান। এখনো হাসপাতালে ভীড় লেগে আছে। স্বজনদের ভীড় বাড়ছে হাসপাতাল এলাকায়।
চ্যানেল আই টেলিভিশনের সিলেট ব্যুরো প্রধান সাংবাদিক আল-আজাদ জানান, শাহ আবদুল করিমের অবস্থা খুবই সংকটাপন্ন। তাকে একনজর দেখার জন্য হাসপাতালে ভীড় লেগেই আছে। পাশাপাশি দেশ বিদেশের বাইরে থেকেও অনেকে মোবাইল ফানে তার খোঁজ খবর নিচ্ছেন।
১৯১৬ সনের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যঞ্চা বিক্ষুব্দ সময়ে সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার হাওরবেষ্টিত গ্রাম উজানধলে শাহ আবদুল করিম জন্মগ্রহণ করেন অতি সাধারণ এক দরিদ্র পরিবারে। তার পিতার নাম ইব্রাহিম আলী। মাতার নাম নাইওরজান বিবি। তার স্ত্রী সরলার মৃত্যুর পর বাউল কবি মুষড়ে পরেন। ১৯৫৭সাল থেকে তিনি স্থায়ীভাবে নিজ গ্রামে বাস করছেন। তার একমাত্র পুত্রের নাম শাহ নূরজালাল।
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিম দেহতত্ব, নিগূরতত্ব, বাউল তত্ব, মুর্শিদী গানসহ অসংখ্য গণসঙ্গীত রচনা করেছেন। তিনি কাগমারী সম্মেলনে গান করে মাওলানা ভাসানী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাদের শ্রদ্ধা আদায় করে নেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়াদীসহ অসংখ্য জাতীয় নেতা তার গানে বিমোহিত ছিলেন।
বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১৩৫৫ বঙ্গাব্দে প্রথম বই আফতাব সঙ্গীত বের হয়। গণসঙ্গীত ১৯৫৭, কালনীর ঢেউ ১৯৮১, ধলমেলা ১৯৯০, ভাটির চিঠি ১৯৯৮ ও কালনীর কূলে ২০০১ সালে বের হয়। চলতি বছরের মে মাসে তার রচনা সমগ্র বের করে সিলেটের খান বাহাদুর এহিয়া ওয়াকফ এস্টেট। ২০০১ সনে তাকে তার কালজয়ী সৃষ্টির স্বীকৃতির জন্য রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার একুশে পদক প্রদান করা হয়। এছাড়াও ২০০৪ সনে মেরিল প্রথম আজীবন আলো সম্মাননা, ২০০৫ সনে সিটিসেল চ্যানেল আই মিউজিক এওয়ার্ড, ২০০৬ সনে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সম্মাননা, ২০০৬ সনে অভিমত সম্মাননা, ২০০৮ সনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী সম্মাননা, ২০০৮ সনে খান বাহাদুর এহিয়া এস্টেট সম্মাননাসহ দেশ বিদেশে অসঙখ্য সংবর্ধনা দেওয়া হয় তাকে। এছাড়া তিনি ১৯৪৬, ১৯৮৫ ও ২০০৭ সনে বিলাত ভ্রমণ করেন।
নগরিক মরিচীকা শাহ আবদুল করিমকে কখনো আটকাতে পারেনি। তাই নানা হাতছানি থাকলেও তিনি সব সময় পড়ে রয়েছেন তার ধ্যানের নীলাআকাশ হাওর-বাওর, নদী বেষ্টিত উজানধল গ্রামে। বরং মেকি নগারিকরাই যখন হাপিয়ে উঠে তখন তার সৃষ্টি গিলে তৃপ্তির ঢেকুর তোলতে হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের নাগরিক অনেক শিল্পিই অনেক ঘাটের পানি খেয়ে শেষমেষে শাহ আবদুল করিমের গান গেয়েই (অনমতি নিয়ে না নিয়ে) স্টার হতে হয়েছে তাদেরকে। তার গানকে বিকৃতি করায় অনেকের প্রতিই তিনি বিক্ষুব্দ ছিলেন।
##
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ৮:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




