আমিনুল হক শান্ত
গত এক দশকের সমকালীন বাংলাদেশের শিল্পচর্চার প্রবণতা লক্ষ্য করলে অন্তত একটা বিষয় চোখ এড়িয়ে যাবার উপায় নেই, আর তা হল এখানে চর্চিত শিল্পের ধীরে ধীরে অধিক মাত্রায় বিমূর্তায়ন (abstract) এবং ধারনা নির্ভরতার (conceptual) দিকে ঝোঁক!
তবে অনেকেই আছেন, এদের মাঝে কিছু তথাকথিত শিল্পীও আছেন, যারা বিমূর্ত শিল্পের চর্চাকে ঠিক মেনে নিতে পারেন না, উপরন্তু ঠাট্টা মশকরার ছলে একে প্রায়শই আক্রমণ করেন। এ নিয়ে এমন রসিকতাও তো বাজারে প্রচলিত আছে যে পিকাসোর এক প্রদর্শনীতে গিয়ে তার তুলি মোছার কাপড়টিকেই বিখ্যাত পেইন্টিংয়ের মর্যাদা দিচ্ছে দর্শক!! এমনকি এ নিয়ে ডিসকভারি চ্যানেলে একবার মজার এক পরীক্ষা চালান হল যেখানে দর্শক শিল্পবোদ্ধাদের একটি পেইন্টিং দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হল এটি কার বা কি হতে পারে । অনেকে অনেক রকম আন্দাজ করলেও প্রকৃত সত্যর কাছাকাছি কেউই যেতে পারলেন না। এমনকি অনেকে একে উঁচুদরের শিল্প কর্ম বলতেও দ্বিধা করলেন না! আদতে সেটি ছিল একটি হাতির আঁকা, শুনতে যত অদ্ভুতই শোনাক না কেন, হাতির শুড়ে তুলি ধরিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং তার ফলাফল সেই শিল্পকর্ম!!
এতে কি প্রমানিত হল যে হাতি খুব উঁচু দরের শিল্পী এবং আমরা সুতরাং হাতিদের আঁকা বিমূর্ত চিত্রকর্ম কিনতে শুরু করব? কিংবা বিমূর্ত শিল্পকর্ম এরকমই হয়?
প্রকৃত প্রস্তাবে, যারা বলে থাকেন “বাস্তবধর্মী অবয়ব” (realistic form) যারা আঁকতে পারে না বা মূর্ত করতে পারে না তারাই বিমূর্ত চিত্র আঁকে এটি খুবই একপেশে এবং ফালতু একটা মন্তব্য কেননা তথাকথিত বাস্তবতার চিত্রগুলোও আসলে কোনক্রমেই বাস্তব নয়।
প্রথমতঃ ধরা যাক আপনি বুড়িগঙ্গার তীরের একটি দৃশ্যের একদম তথাকথিত বাস্তব চিত্র আঁকলেন, তাতে কি সেটি বাস্তব হয়ে গেল? ওটি হচ্ছে প্রকৃতির নকল, সুতরাং বাস্তব নয় কোনক্রমেই। আবার ধরা যাক সদ্যপ্রয়াত কবি শামসুর রাহমানের একটি পোর্ট্রেট আপনি করতে চান সুতরাং আপনাকে তার আলোকচিত্র কিংবা আপনার স্মৃতির উপর নির্ভর করতে হবে। এখন সেই চিত্র কর্ম দেখে যতই লোকে একদম হুবহু শামসুর রাহমানের পোর্ট্রেট বলুক না কেন সেটি আসলে নকলেরও নকল, অর্থাৎ দ্বি-নকল (প্রথমে আলোকচিত্র তার থেকে চিত্রকর্ম)!! একে বলা হয় মিল (resemblance), যেখানে আলোকচিত্রের মাধ্যমেই আপনি এর চাইতে নিখুঁত নকল পাচ্ছেন সেখানে কেন ঐ তথাকথিত নকল? প্রকৃত পক্ষে শামসুর রাহমানের আলোচ্য এই পোর্ট্রেটটি এক্ষেত্রে বাস্তবতো নয়ই বরং একপ্রকারের বিমূর্ততাই প্রকাশ করে।
দ্বিতীয়তঃ এধরনের শিল্পচর্চার সীমাবদ্ধতা প্রবল। যদি ব্যক্তিকে এখানে একক ধরে নেই সেক্ষেত্রেও উক্ত ব্যক্তির ব্যক্তিত্বও তার নকল থেকে আসলে ধরা পড়ে না, বরং তার ব্যক্তিত্বকে ধরতে বিশেষ ভঙ্গি বেশী কার্যকর। এক্ষেত্রে কামরুল হাসানের ‘তুই রাজাকার’ পোর্ট্রেটটি স্মরণ করা যেতে পারে কিংবা শিশির ভট্টাচার্যের করা কার্টুন চরিত্রগুলো। যা ব্যক্তির বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য উন্মোচন করে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তথাকথিত বাস্তবতার ধার না ধরেই। অনেকে এসমস্ত ক্ষেত্রে সৌন্দর্যের(aesthetic), বিষয়টা তুলতে পারেন কিন্তু সৌন্দর্য্য প্রসঙ্গে এটুকু বলাই যথেষ্ট হবে যে সৌন্দর্য্যের কোন সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা সম্ভব নয়, এটি একটি আপেক্ষিক বিষয়ঃ Beauty in the eyes of its beholder.
তৃতীয়ত এবং খুবই গুরুত্বপূর্ণ, চিত্রকলা যদি কোন ধারণা বা বক্তব্য তুলে ধরতে চায় তা হলে তথাকথিত বাস্তব চিত্রে তা একপ্রকার অসম্ভব। আর পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় যেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি, টেকনোলজি, জ্ঞান, বিজ্ঞান, পারস্পরিক সম্পর্ক, দ্বন্দ্ব, জীবন চর্চা ক্রমাগত জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠছে তখন শিল্পচর্চার প্রকাশও কোন সরল সহজ পথে হওয়া জটিল থেকে জটিলতর হয়ে পড়াটাই অবশ্যম্ভাবী নিয়তি।
আর এসমস্ত কারণেই গত বছর অনুষ্ঠিত দ্বি-বার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের শিল্পচর্চায় ইন্সটলেশন প্রবণতা এবং নানামুখী নীরিক্ষাধর্মী মিশ্র মাধ্যমের কাজের প্রবণতা প্রবল হয়ে উঠতে দেখি আমরা। বক্তব্যকে সুসংহত আর স্পষ্ট করে দেখানোর তাগিদ থেকেই এমন প্রকাশের প্রয়োজন হয়ে উঠেছিল।
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে বিমূর্ত শিল্প কি? আদতে বাস্তবতার প্রকাশধর্মী চিত্রকলা একধরনের ডকুমেন্টেশন। যা যেভাবে আছে তাকে সেভাবেই প্রকাশ করা। অন্যদিকে বিমূর্ত চিত্রকলা অনেকটাই ইম্প্রেশেনিস্ট, এটি কোন বস্তুর স্বরূপ শিল্পী কিভাবে দেখছে তার উপর নির্ভর করে। ফলে শিল্পী এখানে একই সাথে একাধিক বিষয়কে সম্পর্কিত করতে পারে। ধরা যাক, শিল্পী এস এম সুলতানের 'প্রথম রোপন' (First Plantation) যেখানে বাংলাদেশের কৃষক প্রবল বলশালী এবং শক্তির আধার হিসেবে এসেছে । বাস্তবে এদেশের কৃষকের আদল এমন নয় মোটেই বরং অনেক ক্ষেত্রেই হাড় জিরজিরে ও ন্যুজ, তবে শিল্পী এমন প্রবল শক্তিমত্তার প্রতীক হিসেবে কী করে এবং কিভাবেই বা এই কৃষককে দেখলেন? আসলে সুলতান কৃষকের সংগ্রামী চেতনা, বিরূদ্ধ পরিস্থিতিতে তার যুদ্ধ, তার ভিতরকার অদম্য কর্মস্পৃহা, ইতিহাসের কালপর্বে এবং বিভিন্ন প্রতিকূল বাস্তবতায় তার বিদ্রোহ ইত্যাদি সব মিলিয়ে যে বলিষ্ঠ কৃষককে তিনি দেখেছেন তাকেই দেখালেন । আর সুলতানের দেখা তো আর আমার শহুরে দেখা নয় বরং খুব কাছ থেকে কৃষকের নিবিঢ় পাঠ, এ একদম ভিতর থেকে দেখা!! এখানে অন্য কোন ভাবেই এই কৃষককে এভাবে দেখানো সম্ভব ছিল না আদৌ, তথাকথিত বাস্তবসম্মতভাবে তো নয়ই।
কিংবা ধরা যেতে পারে শিল্পী সাহাবুদ্দিনের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আঁকা চিত্র, সেখানেও ফিগারগুলো যেন শক্তিতে আর উন্মাতাল সময়ের চাপে আর বিদ্রোহে এমন প্রবল গতিময়, যেন এইমাত্র ভেঙ্গে-চুরে ক্যানভাস থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসবে, আসতে চায়!! শিল্পী স্ট্রোকের আঁচড়ে সেই অসম্ভব সময়কে ধরতে যেয়ে নিজের অনুভব, অনুভূতিকে যেন সপাটে ক্যানভাসে প্রতিস্থাপন করেছেন, যার অনুরণন আমরা দর্শক হিসেবেও নিজের অস্তিত্তে টের পাই সে ছবির সামনে দাঁড়ালেই! রঙগুলোও তেমনি লাল, নীল, কালো আর সবুজে যেন বাংলাদেশেরই অবয়ব।
এতো গেল বিমূর্ততার একদিক। উচ্চাঙ্গের যে কোন শিল্পের প্রকাশই মূলত বিমূর্ততার দিকেই ঝোঁক। সঙ্গীতের রাগের আদতে কি কোন বাস্তব অর্থ আছে? ধরা যাক রাগ ভৈর `সা নি ধা পা মা গা মা গা রে সা.............' কিংবা
`নি রে গা পা রে রে সা সা, গা রে গা গা পা পা রে সা, পা পা পা পা মা ধা পা পা, নি রে গা রে ........'। অথচ এই সাতটি স্বর বা `সারগাম' দিয়ে যখন কোন ওস্তাদ শিল্পী একটি বা কয়েকটি রাগে সমুদ্রের সিম্ফনী করেন তখন কিন্তু তা আর তথাকথিত বাস্তব নয় বরং অনুভবের আরও গভীরতর প্রকাশ!!
তাছাড়া, সমগ্র প্রকৃতিতেই ছড়িয়ে আছে নানা রকমের ফর্ম। এবং প্রকৃতিতে কোন ফর্মই নিখুঁত নয়, বরং প্রায় নিখুঁত। এগুলোর আকার, আকৃতি, রঙ এবং বিন্যাস দেখলে ঠিক বোঝা যায় যে এগুলো আদতে একপ্রকারের অবিন্যস্ত সমগ্রের অংশ হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে চারপাশে। গভীরভাবে দেখলে এসমস্তও আসলে এক বিমূর্ততাই নির্দেশ করে!!
তাহলে আর কেন এই অনুকরণ? দেখে দেখে আঁকাআঁকি? পাখিকে পাখির মত আঁক, মানুষকে মানুষের মত! অনুশীলনের জন্য ঠিক আছে, কিংবা কেউ আঁকতে চাইলেও কারও কোন আপত্তি নেই, সেও ঠিক আছে। কিন্তু যারা অহেতুক বিমূর্ত শিল্পকলাকে আক্রমন করার চেষ্টা করেন তারা বিষয়টা বোঝেন না বলেই তা করেন। আদতে, আমি ব্যক্তিগতভাবে শিল্পের কোন মূর্ত বা বিমূর্ততায় বিশ্বাসী নই। অন্য সমস্ত কিছুর মতই শিল্পকে সংজ্ঞায়িত করার পক্ষপাতি নই আমি, কেননা এতে খন্ডিত হয় ভাবনা আর চিত্রকলাও।
চিত্রকলা এখন আর সে অর্থে কোন বিভাজন মানে না, কখনই ছিল না আদতে। কেবল বিভিন্ন কালপর্বকে সনাক্ত করার সুবিধার্থে একং বিবিধ আন্দোলনকে চিহ্নিত করতে ইম্প্রেশেনিজম, এক্সপ্রেশেনিজম, কিউবিজম, দাদাইজম, ফোবিজম, রিয়েলিজম ইত্যাদি ইত্যাদি নানান অবিধায় অবিহিত করা হয়ে থাকে। এখন চিত্রকলার মাঝে আলোকচিত্র, চলচ্চিত্র, ভাস্কর্য, ইত্যাদির পাশাপাশি নাটক, কবিতা, রাজনীতি সহ নানান মাধ্যমের উপকরণ একিভূত হয়ে ক্রমান্বয়ে জটিলতর এক শিল্পভাষার জন্ম দিচ্ছে, যা যুগেধর্মকেই প্রকাশ করছে প্রকারান্তরে। তাএছাড়া পৃথিবীব্যাপি বিমূর্ত শিল্পের চর্চার অপ্রতিরোধ্য জোয়ার থেকে বাংলাদেশের শিল্প চর্চাও আলাদা হয়ে থাকতে পারছে না, যার প্রকাশ আমরা সকল ক্ষেত্রেই দেখতে পাচ্ছি।
প্রথম প্রকাশ-অদ্বৈত, ডিসেম্বর ২০০৬ সংখ্যা, পত্রিকার সম্পাদক অকালপ্রয়াত কবি, সম্পাদক সাইফুজ্জামান সোহাগ ।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১:২৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




