১
আচ্ছা আপনি নিজের কোন গল্প লেখেন না কেন? এয়ারপোর্টের গন্ডি পেরুবার আগেই এমন একটা প্রশ্নের সম্মুক্ষীণ হতে হবে আমার কল্পনাতেও আসেনি। আমি একজন লেখক, তবে পুরোপুরি পেশাদার লেখক নই। একটা পুরুস্কার নিতে প্রথমবারের মত প্রকাশক সহ দেশের বাইরে এসেছি। লেখক হিসেবে এখন আমাকে মোটামুটি পরিচিত বলা যায়। তবে বেশিদিন ধরে নয় বিশেষ করে এই পুরুষ্কারটা এবং বন্ধুদের নিয়ে লেখাগুলোর আগে তো নয়ই। তবে আমি লিখি; দীর্ঘদিন ধরেই লিখি। মহিলার প্রশ্নের উত্তরে একটা বিনয়ী জবাব দিতে গিয়েও আটকে গেলাম, বললাম আমার নিজের কোন গল্প নেই বোধহয় এই জন্যই। উত্তরটা তার মন:পুত হল না; বাক্যের মধ্যে, ‘বোধহয়’ শব্দটার ব্যবহার তাকে কিছুটা ধোঁয়াশাচ্ছন্ন করে দিল। আমি নানাভাবে তাকে বিষয়টা বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু এর মধ্যে তিনি এড়িয়ে যাওয়া বিনয় ছাড়া অন্য কিছুই দেখতে পেলেন না। এবার আমি অন্য রাস্তা ধরলাম, যেটাকে অনেকে বুদ্ধিবৃত্তিক চালাকিও মনে করতে পারেন। আমি বললাম, আসলে বন্ধুদের গল্প বলার মধ্যেই তো আমার গল্প বলা হয়ে যায়। কিন্তু এতেও তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। আমার জিদ চেপে গেল, আমি নানা যুক্তি দেখিয়ে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করতে চাইলাম। প্রকাশক সেই মহিলার কাছ থেকে আমাকে প্রায় ছুটিয়ে নিয়ে সরাসরি গাড়ীতে নিয়ে যেয়ে বসালেন এবং সতর্ক করে দিলেন যে এজাতীয় অনেক প্রশ্নের সম্মুক্ষীণ আমার হতে পারে। সবগুলোকে এত সিরিয়াসলি নেবার কিছু নেই।
২
বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসে আছি। দেশে ফেরার পর পুরুস্কারের আনন্দে ঘরোয়া পার্টি হচ্ছে। বইটির প্রধান চরিত্র, আমার শৈশবের বন্ধুটি অনেকক্ষণ ধরে আমার গতিবিধি লক্ষ্য করছে খেয়াল করলাম। আমি তার দিকে একটা ভর্তি গ্লাস নিয়ে এগিয়ে গেলাম। লেখালেখির নানা পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আমাদের দীর্ঘক্ষণ কথা হয়েছে। মদের নেশায় কিনা জানিনা, হঠাৎ করে আমার জানতে ইচ্ছে করল একজন পাঠক হিসেবে সে পুরো বইটাকে কিভাবে মূল্যায়ণ করে। বই নিয়ে আমার প্রশ্নটাকে ও এক হাসিতে উড়িয়ে দিল, বলল ‘ভাগ্য ভাল আমার যৌণ জীবন নিয়ে বেশি ডিটেইলে যাস নাই, আমার বউ জানলে খবর আছিল।’ আমি বললাম, ‘ঐটা করলে হয়ত আমরা বইয়ের কাটতি আরো বাড়ত’। কথা বলা শেষ করামাত্র আমরা একসাথে খ্যাকখ্যাক করে হেসে উঠলাম। হাসিটা হয়ত বেশি জোরেই হয়ে গিয়েছিল; পার্টিতে আসা সবচেয়ে আবেদনময়ী মহিলাটি আমাদের দিকে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। আমার কোমরে গুতো দিয়ে বন্ধুটি বলল,‘দেরী করস ক্যান, আগায়া যা বেটা, বুঝসনা সেই কখন থেইক্কা মহিলা তোরে একলা পাওনের সুযোগ খুঁজতাসে।’ আমি এগিয়ে গেলাম।
৩
বক্তৃতা দিতে আমার সবসময়ই বিরক্ত লাগে, বিশেষ করে অনেক মানুষের সামনে। দেশের প্রথিতযশ কবি সাহিত্যিকদের জ্ঞান গর্ভ আলোচনা গুলোর পর বলার প্রায় কিছুই থাকেনা। তবুও আমাকে কিছু বলতে হবে। আমি বললাম, ‘ এই বইয়ের সবই আমার বন্ধুদের কথা, যারা এখনো বহাল তবিয়তে বেঁচে রয়েছেন এবং বইয়ে যা লেখা হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি বৈচিত্রপূর্ণ জীবন যাপণ করে চলেছেন।’ জানি না লোকে কি বুঝল তবে কথা শেষ হওয়া মাত্রই সবাই সোল্লাসে হাততালি দিয়ে উঠল। আলোচকবৃন্দও বুঝদারদের মত সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে উঠলেন। সামনের সারির একজন তরূণ বলে উঠল, ‘আপনার এরকম বন্ধুদের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারলে আরো মজা হোত’। আলোচনা সভার সভাপতি তার বক্তৃতায় বইটির মধ্যে কি কি নতুন বিষয় নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে সেগুলির একটা ফিরিস্তি দিলেন। স্টেজ থেকে নামার সময় প্রকাশক কানের কাছে মুখ নামিয়ে এনে বললেন, ‘ অবস্থা কি বুঝলেন; কয় দিনের মধ্যেই আপনি দেশের জনপ্রিয় লেখক হতে যাচ্ছেন, এরপর থেকে, স্টেজে তখনো আসিন কয়েকজনের দিকে উদ্দেশ্য করে বলল, তাঁদের লেখাটেখার কথাও বক্তৃতার মধ্যে ঢুকায়া দিবেন, আখেরে লাভ হবে।’
৪
যতটা কাটতি হবে ভেবেছিলাম পরবর্তী বইটা সেভাবে পাঠক পায়নি। বইটা ছিল আমার জীবনের নানা সময়ে আগত নারীদের নিয়ে লেখা। এরমধ্যে একজন আবার বইয়ে উল্লিখিত ঘটনার প্রতিবাদ করে মানহানির মামলা ঠুকে দিয়েছে। একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি। তারপরও আমার প্রকাশক খুশি। সে জানায়, বইটা সেভাবে ব্যবসা না করলেও এটা নাকি আমার লেখালেখিকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে। আমি ততটা নিশ্চিত হতে পারি না, দীর্ঘদিন পর আমি বন্ধুদের সাথে দেখা করতে যাই। অনেকদিন পর আমার শৈশবের বন্ধুটিকে কাছে পেয়ে জড়িয়ে ধরি। বারবার মনে করার চেষ্টা করি কিভাবে বন্ধুটির সাথে কাটানো সময় আমাকে জনপ্রিয় বইটি লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে। আমি সিদ্ধান্ত নেই যে আমার পরবর্তী বইটি হবে বন্ধুদের পরিবার ও স্ত্রীদের জীবনকে নিয়ে, তাদের দৈনন্দিনতাকে আবর্ত করে। আকন্ঠ পান করতে করতে আমার সিদ্ধান্তের কথা বন্ধুটিকে জানাই। সে সোল্লাসে বলে ওঠে,‘ এইবার আমারে নিয়া তুই যা ইচ্ছা লিখতে পারস, এহন আর কাউরে ডরানের নাই, শালীর লগে আমার ডিভোর্স হইয়া গেছে।’ হঠাৎ খুব বিষণœ হয়ে পড়লেও বন্ধুটি নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘ঐ....টারে আমি বুঝাইতে চাই.....আমার কখনো মাইয়ার অভাব আছিল না।’ বন্ধুর কষ্টে আমার খারাপ লাগে, আরো খারাপ লাগে এই কথা ভেবে যে আমার গল্পের প্রধান চরিত্র স্ত্রী ছাড়া হল।
৫
সকালে ঘুম থেকে উঠেই পত্রিকায় একটা লেখা পড়ে ভীষণ মন খারাপ হল। বন্ধুদের নিয়ে লেখা বইটির একটা কড়া সমালোচনা ছাপা হয়েছে এবং পরবর্তী বইটারও কিছু কিছু অংশের বিশ্লেষণ। একেবারে সরাসরি আক্রমণ। বিশ্লেষক লিখেছেন, ‘যদি কেবল ঘটনা বর্ননা করা কোন লেখকের উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে তিনি (আমাকে উদ্দেশ্য করেই) নিশ্চিতভাবেই সার্থক, তবে তিনি একজন ভাল ক্যানভাসারের মানেও নিজেকে নিয়ে যেতে পারেন নি। কেননা জাতি হিসেবে আমাদের স্বভাবগত মাতামাতি কেটে যাবার পর বইটি যে কেউ দ্বিতীয়বার পড়ার কষ্টের মধ্যে দিয়ে যাবে, আমার তা মনে হয় না.......আসলে কর্পোরেট বলয়ের মধ্যে থেকে কতটা নিজের কথা বলতে পারা যায় সেটা নিয়ে আমার প্রান্তিক মনন সবসময়ই সন্দিহান হয়ে ওঠে....... । তার লেখায় নারী যেভাবে উপস্থাপিত তাতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে লৈঙ্গিক রাজনীতিতে তিনি ’বেটাগিরি’ ফলানোর সুযোগটা সচেতনভাবেই গ্রহণ করেছেন। জেন্ডার অসচেতনতা যে আসলে পিতৃতন্ত্রেরই একটা নগ্ন হাতিয়ার.......।’
৬
কোন কাজেই ঠিকমত মন বসাতে পারছিনা। হঠাৎ করেই বন্ধুর ফোন। একথা সেকথা নানান প্রসঙ্গ ঘুরে তার কাছ থেকে জানতে পারলাম যে সে আবার প্রেমে পড়েছে এবং এটাই নাকি তার জীবনের আসল প্রেম। মেয়েটি আর কেউ নয় পার্টিতে পরিচয় হওয়া সেই কমলা রংয়ের শাড়ি পড়া আবেদনময়ী সুন্দরী। মহিলার সাথে রাত্রিযাপণের স্মৃতি আমাকে কিছুটা অন্যমনস্ক করে দিল। তবে খবরটা আমাকে সুখী করল। প্রিয় বন্ধুর কন্ঠে পুরোনো দিনের উত্তেজনা আর প্রাণময়তা ফিরে এসেছে। আমার মনে পড়ল, কিভাবে সে জীবনের একঘেয়ে অবস্থাকে দূর করার জন্য নতুন নতুন বিষয় আর ঘটনার মধ্যে নিজেকে সঁপে দিত। তার ভাষাতেই ‘ক্যারেক্টার চেঞ্জের খেলাতে’ যে সে আবার ফিরে আসতে পেরেছে সেটা ভেবে আমার ভালো লাগল। বুঝতে পারলাম নিজেকে আরেকবার একটা নতুন নাটকের চরিত্র হিসেবে দাঁড় করাতে পেরে সে আগের মত আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। কথা শেষ করে ফোন রাখার পরপরই আমার মনে হল যে বন্ধুর তুলনায় আমার জীবনটা আসলে বর্ণহীন, একেবারেই নাটকীয়তা বিহীন।
৭
প্রকাশক বা সাহিত্যিক বন্ধু কারো সাথেই আগের মত যোগাযোগ নেই। অনেকদিন ধরেই নতুন কিছু লিখছি না।
৮
চাকরি নিয়ে খুব ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে ইদানিং। সামনে একটা প্রমোশনের সম্ভাবনা আছে। বিয়ে করব বলে ভাবছি।
৯
কিছুই ভালো লাগছে না। রেজিগনেশন লেটারটা বসের টেবিলে দিতেই তিনি একবার তাকিয়ে সরাসরি নাকচ করে দিলেন। আমি তাকে কিছু বলতে পারলাম না। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাবার সময় তিনি পেছন থেকে ডেকে বললেন, ‘লেখালেখির জন্য চাকরি ছাড়ার দরকার নেই। আপনি যতদিন ইচ্ছা ছুটিতে থাকতে পারেন।’ প্রিয় বন্ধটির মত একটা নাটক করা; একটা নতুন চরিত্রে যাবার চেষ্টা ব্যার্থ হল।
১০
ক’দিন ধরে অনেক চেষ্টা করছি কিন্তু কিছুই লিখতে পারছিনা। জমানো কিছু টাকা নিয়ে রাজধানীর বাইরে একটা নিরিবিলি শহরে এসেছি। আমার সাথে পুরুষ্কার পাওয়া নিজের বইটা ছাড়া আর একটা বইও নেই। যদিও বইটা আমার একবারের জন্যও খুলে দেখতে ইচ্ছে করছেনা।
১১
ছুটি কাটিয়ে ট্রেনে চেপে রাজধানীতে ফিরছি। একটা পাতাও লেখা হয়নি। প্রকাশকও বেশ হতাশ। আসলে লেখার মত কোন বিষয়ই খুঁজে পাচ্ছিনা। পুরো ব্যাপারটা এখন অনেকটা সম্মানের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। অন্তত আর একটা বই আমার লিখতে পারা উচিৎ। না লেখতে পারার তীব্র হতাশায় আমি বন্ধুকে ফোন দিলাম। বরাবরের মত সে যেভাবে আমার কথাতে হেসে ওঠে, এবার তা ঘটল না। যেন পরামর্শ দিচ্ছে এমনভাবে বলল,‘মনে হচ্ছে এখন তুই আসলেই লেখক হয়ে উঠছিস। ঠিকমত ভেবে সিদ্ধান্ত নে তুই লিখবি নাকি লেখাগুলোকে যাপণ করবি। দুইটাই অবশ্য ঝামেলার।’ আমি আর কিছু বললাম না, বিদায় না জানিয়ে সরাসরি মোবাইলের লাইনটা কেটে দিলাম।
১২
আমার দ্বিতীয় বিদেশ ভ্রমণ। অনেকদিন পর আবারো প্রকাশককে সঙ্গে নিয়ে এয়ারপোটের্র সামনে দাঁড়িয়ে আছি আর এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। প্রকাশক আমার অস্থির অবস্থাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বেশি দেরি হবার তো কথা না, তাছাড়া এমন একটা সেমিনারে নিশ্চয়ই প্রত্যেক গেস্টের জন্য ওদের আলাদা আলাদা গাড়ীর ব্যবস্থা আছে।’ প্রকাশকের কথা শেষ হবার আগেই আমাদের সামনে একটা গাড়ী এসে থামল। আমি তখনো এদিকে সেদিক তাকাচ্ছি কিন্তু গাড়ীতে উঠছি না দেখে প্রকাশক প্রশ্নবোধক চোখে আমার দিকে তাকালো, কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমি বললাম, ‘গতবারের সেই মহিলাকে খুঁজছি। এবার দেখা হলে নিশ্চয়ই আমি তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিতাম আর বলতাম শেষ বয়সে হলেও নিজের গল্প লেখার রসদ আমি খুঁজে পেতে শুরু করেছি।’

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


