ভাইয়া, কেমন আছো? এতদিন ফোন করলাম কেন তুমি একবারের জন্যও ফোন ধরোনি, কেন তুমি একবারও বলনি আমার উপর কেন তোমার এত রাগ? জানো আমি এখন অনেক ভালো হয়ে গেছি, আগের মত আর অস্থির নেই। সত্যি করে বলতো ভাইয়া কেন তুমি ফোন ধরনি? আমি কি কোন খারাপ কাজ করেছি? তুমি যেমনটা বলেছিলে আমি ঠিক সেইভাবে চলতে চেষ্টা করেছি। জানো ভাইয়া, আমি এখন অনেক স্থির, বয়স হয়েছে না? তুমি যেভাবে বলেছিলে সত্যি আমি এসএসসি পাশ করেছি। আর এখন লালমাটিয়া কলেজে পড়ছি, বিষয়:বানিজ্য। এছাড়া গুলশানের একটা শপে সেলস গার্লের চাকরী করছি। এছাড়া আমাদের ক্রিশ্চিয়ান চার্চ আমার পড়ালেখার সব দ্বায়িত্ব নিয়েছে, বাবাও এখন অনেক ভালো, মা ও। ভাইয়া এখনো পুরোনো মোবাইলের দোকানে চাকুরী করছে। ভাইয়া আমি আর অস্থির নেই, আমি মাঝে মাঝে ফোন করব, প্লিজ তুমি ফোন ধোরো।
এতটা আনন্দ নিয়ে আমি এখন পর্যন্ত কোন ফোন ধরেছি বলে মনে পড়ে না এতটা আনন্দ নিয়ে পোষ্টও লিখিনি। আজ সেই আনন্দের দিন। ১৯শে সেপ্টেম্বর ২০০৮ একটা পোষ্ট লিখেছিলাম, মুখ ও মুখোশ আর একজন বিক্রয়কারী তরুণী । যারা আজ এই পোষ্ট পড়ছেন তাদের অনেকেই সেই ঘটনা জানেন না বলেই আন্দাজ করি, ক্রমটা বোঝানোর জন্যই উপরের লিংক। তাদের জন্যই বলা, একদিন ঘটনাক্রমে রাতের বাসে পরিচয় হয়েছিল ও’র সাথে। এই পোষ্টের পূর্ব পর্যন্ত সে ও ই ছিল। একটি কৈশোর পেরুনো তরুনী, যে জীবনের বিভীষিকায় পথ হারাতে বসেছিল। দেয়ালের পর দেয়াল তাকে চেপে পিষ্টে মুহুমুহু আঘাতে ছিন্নভিন্ন করেছিল। জীবনের সেই নৃশংসতা পুরোপুরি উবে গেছে সে কথা দাবী করি না আমি। এতটা রোমান্টিক আমি নই। কিন্তু সেই ছিন্নভিন্ন তরুনী এখন নিজের পথের দেখা পেয়েছে সেটাই সবচেয়ে আনন্দের কথা। সেই পোষ্টের মানবীয় প্রতিক্রিয়ায় অনেক ব্লগারই এগিয়ে এসেছিলেন অন্তত এগিয়ে আসতে চেয়েছিলেন। তবে এদের মধ্যে দু জনার কথা এই মুহুর্তে বলতে ইচ্ছে করছে খুব, একজন রাসেল........ ও আরেকজন আইরিন। কেবলমাত্র একটা ফোন কলের উপর ভিত্তি করে এরা দুজনাই ও র এসএসসি র ফর্ম ফিলাপের টাকাটা নিজে উদ্যোগী হয়ে দিয়েছিলেন। বোকা অস্থির মেয়েটা ফর্ম ফিলাপের একদম শেষদিনে শেষ ঘন্টায় তার সমস্যার কথা জানিয়েছিল। আর রাসেলের কমেন্টেই পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে সাহায্যকে একটা গঠনমূলক টেকশই পথে নেবার জন্য শিক্ষাই সবচেয়ে ভালো রাস্তা। রাসেল ও আইরিন দুজনাই তাদের কথা রেখেছেন একদম প্রয়োজনীয় মুহুর্তে।
এরপর? এরপর সাহায্য সহযোগীতা, সামান্য ঈদ উপহার , মুখ মুখোশ একাকার, বাস্তবতার গল্প। মানুষ হিসেবে সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা, অনুদান নির্ভর হওয়া, শংকা, বিশ্বাস, অবিশ্বাস কত কিছুই, আমার জন্যও সমানভাবে কিন্তু। পথটা সহজ ছিলো না মোটেই। কখনো আমি ও র উপর আস্থা হারিয়েছি, বিরক্ত হয়েছি; ও দীর্ঘ সময় অস্থির থেকেছে, দেখানো পথে চলতে চায় নি, বারবার শুধু পিছলে যাওয়ার পথে এগিয়েছে। শুধু খুশি করা কথা বলতে চেয়েছে, এমন কতকিছুই। ওকে কঠিন পথে ঠেলে দিয়েছি সচেতন ভাবেই, নিজেকে আমি মহৎ মনে করি না এ কারণেই। জীবন সরল উপন্যাসের মত রোমান্টিক নয়। এ প্রসেঙ্গে রাসেল আর আইরিনের সাথে কথা হয়েছে আমরা বিষণ্ন হয়েছি, শংকিত হয়েছি। যদিও একটা বিষয়ে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল অনড়, আমরা কোনভাবেই চাইনি ও পরনির্ভরশীল হয়ে উঠুক। আমরা চেয়েছি ও র মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্যপ্রত্যয়ের জন্ম নিক। এত ছোট কাঁধে খুব ভারী চাপ নিশ্চয়ই। যদিও একটা বিষয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম সবসময়ই, যদি ও সাহায্য সহযোগীতাকে ঠিকভাবে কাজে লাগানোর ক্ষমতা অর্জন করে সেটাই ওর মুক্তির পথ খুলে দেবে। ভীষণ নিষ্ঠুর আমি, এই মুহুর্তে আমার নিষ্ঠুরতার জন্য ও র কাছে ক্ষমা চাই। হয়তো মাঝে মাঝে নিষ্ঠুরতাই একমাত্র উপায়। আমি সটিক জানি না আসলে...জানলে তো মহৎ হয়ে যেতাম।
তবে তেতো ঔষুধের মত, আমার শেষ চালাকী কাজে এসেছে....হয়ত খুব নিষ্ঠুরভাবে হলেও ও বুঝতে পেরেছে জীবনের সম্মানের শর্ত। তাই ঠিক যা যা আমরা প্রত্যাশা করি, যেভাবে করতে পারি তা অনুমান করে দীর্ঘদিন ফোন করেনি। করেছে তখনি যখন সে সবগুলো পরীক্ষা নিজে নিজে পার করে এসেছে। এখন ও আর ও নেই, ও এখন জয়ন্তী। যাকে সবচেয়ে দূর্বল মুহর্তে সাহায্য করেছে কিছু হৃদয়বান মানুষ, আগুপিছু না ভেবেই। আর সবচেয়ে খুশীর খবর মুখ ও মুখোশের সেই জয়ন্তীর এখন আর শরৎ এর দরকার নেই। এটাই চেয়েছিলাম, ঠিক এইটাই। জয় মানুষের জয়। জয় জয়ন্তীর জয়।
ফোনালাপে আমার উত্তর (ভারী, আবেগ না প্রকাশ করা গলায়): হুম ফোন করতে পার তবে মাঝে মাঝে, আমি সময় বুঝে ধরব। আর ভালো খবর দেবে শুধু, আমি এখন থেকে তোমার কাছে থেকে শুধু ভালো খবর শুনতে চাই। ঠিক আছে?
এত মূল্যবান কাউকে নিয়ে দরদ প্রকাশের, বাঁধভাঙ্গা আনন্দ প্রকাশের ঝুঁকি আমি কিভাবে নেই।!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



