জাতীয় চেতনা বলে কোন একটা কিছু আছে কিনা সেটা নিয়ে হয়ত দীর্ঘ তর্ক হতে পারে। নৃবিজ্ঞানের ট্রেনিং এর কারণে “ জাতি”, “জাতীয়তাবাদ”, “রাষ্ট্র” এই প্রত্যয়গুলোকে সমস্যাহীন/ বিতর্কহীনভাবে দেখার সুযোগ কমে এসেছে। যে রাষ্ট্র নিয়ে আমাদের নিরন্তর মাতামাতি সেটাকে “ইমাজিনড কমিউনিটি” হিসেবে মোকাবিলা করার রাস্তাও তৈরি হয়েছে। এই বিশদ প্রকল্প নিয়ে আলাপের পথ উন্মুক্ত রইল।
তবে আজ যে বিষয় নিয়ে গল্পের/তর্কের প্রস্তাবনা পেশ করতে যাচ্ছি সেটির জন্য উপরের ভূমিকা দেয়াটা একটু প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। প্রথমেই পরিষ্কার করে নেয়া দরকার যে কোন জাতীয় ইস্যুকে নানান দিক থেকে দেখার, বোঝার, প্রশ্ন করার রাস্তা কতটুকু পর্যন্ত আমাদের সমাজ মানে আমাদের রাষ্ট্রও অনুমোদন করে। সেটা খুব মোটা দাগে কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায়, একনায়ক বা সামরিক শাসনে আছি কিনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার কিনা, রাষ্ট্র কতটুকু ফ্যাসিষ্ট ইত্যাদি অনেক কিছুর উপর নির্ভর করে। যেমন বিএনপির কালে আমরা ধরেই নিতে পারি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ (যদিও কিসে কিসে এই পদার্থ হয় তা জানি না) বেশি শুনবো, জিয়ার মাযার বেশি দেখবো, ১৫ই আগষ্টে নেত্রীকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা কারা কারা দিলেন সেটা প্রচারিত হতে দেখবো। আবার ঠিক একইভাবে আওয়ামী আমলে বাঙালী জাতীয়তাবাদের (যদিও কিসে কিসে এই পদার্থ হয় তাও জানি না) শোরগোল বেশি শোনা যাবে, টুংগী পাড়া দেখা যাবে, ১৫ ই আগষ্ট পুরো রাষ্ট্রকে শোকের মোড়কে বেশি বেশি করে দেখা যাবে। এভাবে ক্ষমতার পালা বদলে বিশেষ দিবস, বিশেষ স্থান, বিশেষ রঙ, বিশেষ গান, বিশেষ স্মারক, বিশেষ ভাষ্কর্য প্রভৃতির উত্থান এবং পতনও দেখব আমরা। দেখব নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়াও।
মানুষ ইতিহাসের কাছে ফিরে যায় বর্তমানের তাগিদেই, ইতিহাসকে পুন:নির্মাণ করে, বিকৃত করে, ভিন্ন পরিবেশন করে। একেবারে গড় মধ্যপন্থী দল হিসেবে দেশের দুই প্রধান দল বরাবরই তাদের নির্বোধ মধ্যপন্থা বহাল রেখেছেন। বিশেষত নীচুতায় ও রাজনৈতিক অদূরদর্শিতায় এরা একে অপরকে ছাড়িয়ে যাবার প্রতিযোগীতায় নিয়ত লড়াইরত। এই নীচুতারই সবচেয়ে বড় প্রকাশ সম্ভবত বেগম জিয়ার জন্মদিন ১৫ ই আগস্টে পুন:আবিষ্কার করার। এটার দৃশ্যমান রাজনৈতিক লক্ষ সম্ভবত বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসের শোককে (মানে গুরুত্বকে) লঘু করা। আর বাকী পরিণামগুলো হল, “দেখলা আওয়ামীলীগ ১৫ ই আগস্টকে কেমন নিজেগো বানায়া ফেললাম, তোমরা শোক কর আর আমরা সুখ”। ১৫ই আগস্টকে কেবলমাত্র দুটো দলের পাল্টাপাল্টি দিবসে পরিণত করার যে ঐতিহাসিক ক্যারিশমা এর কৃতিত্ব সমানভাবে উভয় দলের। আর এটার মধ্যে দিয়েই প্রমাণিত হয় যে জাতীয় চেতনা উভয় দলের কাছেই কতটা গুরুত্বহীন। নাকি এই ক্ষমতাও যে জাতীয় চেতনা তারা ইচ্ছামত তৈরি করতে পারে বা ভাঙ্গতে পারে?
উভয় মেয়াদে আওয়ামীলীগের বঙ্গবন্ধু প্রচার প্রক্রিয়া জাতির জনককে এমন জায়গায় এনে নামিয়েছে সেটি গোটা জাতির জন্যই লজ্জাজনক। জাতির জনকের গুরুত্ব এবং তাঁকে ঘিরে চেতনা তো কেবল কালো কাপড়ে সারা দেশ ছেয়ে ফেললে হয় না, দেশের সকল স্মারক, ভাষ্কর্জ, দালান বঙ্গবন্ধুর নামাকরণে ভাসিয়ে ফেললে হয় না। এতে বরং সন্দেহ তৈরি হয়। এতে সেই মহৎ প্রাণ ব্যক্তির গুরুত্ব হ্রাস হয়। যেমন হ্রাস হয় জাতীয় পতাকার মর্যাদাও সেটাকে আইন করে সম্মান জানানোর প্রক্রিয়া তৈরি করলে, সেটাও এতদিন পরে। মানুষজনের স্বতস্ফূর্ততাকে উৎসাহিত না করে তাকে উদ্বুদ্ধু না করে আইন করে সম্মান আর শ্রদ্ধা গেলানো কখনই সম্ভব হয় না।
এই রাস্তা সবসময় বিরোধী পক্ষকে আরো নীচু রাস্তা বেছে নেবার পথ তৈরি করে দেয়। যেমনটা করেছেন বেগম জিয়া আর তার দল। সম্ভবত এটি তার ৪র্থ লব্ধ জন্মদিন। বাঙলাদেশের রাজনীতি অনেক আগে থেকেই পিতৃ হত্যাকারী তাই একই শিশুর নব নব জন্মদিনে অবাক হই না। কয়দিন পর হয়ত সাইদী, নিজামী ফাঁসি বা মুক্তির দিবস হিসেবে জামাত ১৫ আগস্টকে বেছে নেবে। আর আমরা ম্যাঙ্গো পাবলিক সেটা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে দেখবো। চিৎকার করে ভাষণ দেবার রাজনীতিতে কি আওয়ামী কি বিএনপি ১৫ ই আগস্টকে এমন দূর্বল জায়গায় নিয়ে গেছে সেটাকে উচ্চকন্ঠ, তারস্বর, অতি প্রচারে পুন:প্রতিষ্ঠা করা মোটেই সহজ হবে না। নির্বোধ জাতীয়তাবাদী রাজনীতি সত্যিকার শোককে এমনভাবে রূপান্তরিত করেছে যাতে মনে হচ্ছে আওয়ামীলীগ উপায়ন্তর না দেখে বঙ্গবন্ধুকে মাইকে মাইকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আর কেউ নয় খাদেলার সাথে বাকযুদ্ধ করার জন্য। আর এটাই বিএনপির কাম্য ছিল।
আবারো জাতীয়তাবাদ প্রসঙ্গে ফিরে আসি। আগস্ট চেতনা বলাৎকারের মাসে রূপান্তরিত হয়েছে। কোন মহৎ বিষয়কে যত্ন না নিলে এই পরিণতি প্রত্যাশিত। পুরো প্রকল্প একটি নির্মিয়মান বিষয় হলে আমাদের সিদ্ধান্ত নেবার সময় হয়েছে আমরা কি এখনো নির্বোধ কলতলার জাতীয়তাবাদের উত্তরাধিকার বহন করবো নাকি চেতনার নতুন বিন্যাসের দিকে অগ্রসর হব?
খালেদার জন্মদিন সমূহ

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


