somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই তুমি, সেই তুমি

২৫ শে জুলাই, ২০১১ রাত ১০:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



অনেকদিন পর ঢাকার বাইরে যাচ্ছি। মা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন অনেক আগেই, তারপর বাবা। বাবার মৃত্যুর পর মাকড়সার জালের মত ছড়িয়ে থাকা আত্নীয়তার সুতোগুলোতে টান পড়ে খুব দ্রুতই। আমিও গুটিয়ে যাই, তাই ইট-পাথরের নগরীকে ছেড়ে আর বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি খুব একটা।


এবারের ট্রিপটা মজার হবে সন্দেহ নেই। আমার সংগে আমার স্ত্রী ছাড়াও বাল্যবন্ধু সাজিদ আছে সস্ত্রীক। অনেকদিন সাজিদের সংগে মন খুলে কথা হয়না। গন্তব্য ময়মনসিংহ, সাজিদের শ্বশুর বাড়ী। লং জার্নি বরাবরই নস্টালজিক আমর ক্ষেত্রে। যাত্রার সময় যত দীর্ঘতর হয়, মনের মধ্যে এক ধরণের স্বস্তিকর অনুভূতি হয়, শরীরে ভর করে আলস্য। জ্যাম কাটিয়ে প্যাঁ-পুঁ শব্দ করে গাড়ি এগিয়ে চলে সামনের দিকে, আর আমি চোখ বন্ধ করে হাঁটা দেই উল্টো পথে, স্মৃতির রথে।


পেছনের গাড়িতেই আছে সাজিদ। ওকে আমার হিংসে হয় মাঝে মাঝে। হারতে হারতেও কেমন করে যেন জিতে যায় সব সময়। জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাই হয়ে আসছে। কাকতাল এবং কোকিতাল দুটোই ওকে খুব ফেভার করে। একবার এক মজার ঘটনা ঘটলো। সাজিদ, আমি আর আরেক স্কুল ফ্রেন্ড তাসনিম শপিং করতে গিয়েছি এ্যালিফ্যান্ট রোড। রোজার মাস। কেনাকাটা করতে করতে ইফতারের সময় হয়ে গেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে ইফতার করলাম তিনজন। সিগারেট কিনতে গিয়ে ৫ টাকায় মেন্টোস চকোলেট কিনলাম ৫ টা। তাসনিমের ২ টা, আমার ২ টা আর সাজিদের ১ টা! আদর্শ বন্টন বিধি। আমি আর তাসনিম মিলে সারাদিনই ওকে নানা প্রসংগে ক্ষেপিয়েছিলাম। চকলেটের এই ষড়যন্ত্রপূর্ণ অসম বন্টনে স্বাভাবিকভাবেই সে খুব নাখোশ হলো। অবাক করার ব্যাপার হলো, সাজিদ যখন চকোলেটের প্যাকেট ছিঁড়লো, তখন দেখা গেল ওর এক প্যাকেটেই ২ টা মেন্টোস!! বীর দর্পে সে ঘোষণা দিল, তোরা আমারে ঠকাইলেও আল্লাহ্ ঠকায় নাই!! আসলেই তাই, আল্লাহ্ ওকে ঠকান নাই কখনো, অন্তত আমার বিবেচনা তাই বলে।


রওয়ানা দিয়েছিলাম রাত সাড়ে আটটার দিকে। অথচ এখন বাজে রাত প্রায় বারোটা। কিন্তু চোখ খুলে দেখি গাড়ি গাজীপুর চৌরাস্তায়! বোমা হাতে উদ্যত বাংলার দামাল ছেলে। জাগ্রত চৌরংগী দেখে একটা হাসির কথা মনে হলো, জীবন বাজি রেখে বাঙ্গালী দেশ স্বাধীন করলেও বিবেক বাজী রেখে অর্জিত স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারলোনা। আফসোস!!


আমার পাশেই সুপ্তি, কখন যেন ঘুমিয়ে গেছে! কিছুক্ষণ ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। গা থেকে চাদর সরে গেছে। এই চাদরটা আমার মায়ের। মা’র মৃত্যুর পর আমার ওয়্যার-ড্রোবে অনেকদিন ছিল। আমি কোনদিন ব্যবহার করিনি, তবে খুব যত্ন করে রেখে দিয়েছিলাম। মা ওকে দেখে যেতে পারেন নি।


বিয়ের পর একদিন অফিস থেকে ফিরে দেখি চাদরটা বিছানার উপর রাখা। অবাক ব্যাপার হলো, সুপ্তি আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করেনি চাদরটা কার। আমি এ ব্যাপারে কিছু জিজ্ঞেস না করলেও বিব্রত ভঙ্গীতে ও নিজে থেকেই বলে উঠলো, চাদরটা ড্যাম্প হয়ে যাচ্ছিল দেখে আজকে ধুয়ে রেখেছি, আয়রন করে আবার যেখানে ছিল সেখানে রেখে দেব। ওর উৎসুক চোখ তখন আমার মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে ব্যস্ত।


পরিস্থিতি সহজ করার জন্যই আমিই জিজ্ঞেস করলাম, চাদরটা কেমন? সুন্দর?
ও কিছুটা প্রশ্রয় পেয়েছে মনে হলো, খুব উৎসাহের সংগে বলে উঠল, হ্যাঁ... খুবই সুন্দর।


আমি আর কিছু বলিনি। বেশ বুঝতে পারলাম ও আমাকে ভীষণ ভয় পায়। যে কারণে চাদরটা কার সেকথা জিজ্ঞেস করেনি। যদিও গোলাপী রং দেখে যে কেউই প্রশ্ন করবে, এই চাদর আমার কাছে কেন! পরদিন অফিসে যাওয়ার আগে ওকে বললাম, চাদরটা তুমি ব্যবহার করো, করবে?
ও খুব খুশি হয়ে বললো, সত্যি? তারপর তখনই চাদরটা গায়ে জড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো, মানিয়েছে?
আমি কিছু না বলে মুচকি হাসি দিলাম। সে হাসি ছড়িয়ে পড়লো ওর চোখে-মুখে!


হঠাৎ ওর প্রতি এক ধরণের মায়া অনুভূত হচ্ছে। ঘুমন্ত মানুষের চেহারা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি নিষ্পাপ মনে হয়। ওকে স্পর্শ করতে গিয়েও কেন জানি থমকে গেলাম। কোন কারণ খুঁজে না পেয়ে নিজেকে খানিক অপরাধী লাগছে। বিবেকের তাড়না ভয়ঙ্কর। অপরাধবোধ থেকে মুক্তি পাবার জন্যই কিনা জানিনা, চাদরটা দিয়ে ওকে ভাল করে জড়িয়ে দিলাম।
গাজীপুর চৌরাস্তা পার হয়ে অনেক খানি এগিয়ে গেছি। এই প্রথম লক্ষ্য করলাম, আজ পূর্ণিমা! জানালাটা একটু নামিয়ে দিয়ে বাইরে তাকালাম। দুই পাশেই গজারী বন। কুয়াশা আর জ্যোছনার এক অদ্ভূত সুন্দর কম্বিনেশন খেলা করছে গজারি বনের ভেতর। জ্যোছনা যেন গলে গলে পড়ছে। গজারি পাতায় জমে থাকা কুয়াশায় ঝিকমিক করছে বিন্দু বিন্দু জ্যোছনার কণা। যেন রাশি রাশি জ্যোছনার ফুল।


গজারী বনে জ্যোছনা বিহার ভিন্ন রকম। জ্যোছনা দেখারও কিছু কৌশল আছে। শীতকালে জ্যোছনা ভাল লাগে খোলা মাঠে। বর্ষায় ভরা নদীতে। কলেজ লাইফের কথা মনে পড়ে গেল। গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ঠিক পেছনেই ছিল বিশাল গজারি বন। কলেজের পাঁচিল ডিঙ্গিয়ে অনেকবার হারিয়ে গেছি জ্যোছনা ধরার নেশায়। হুমায়ূন আহমেদের ভাষায়, জ্যোছনার প্রেমে যে পড়ে তার মুক্তি নেই। আমারও মুক্তি পেতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। হঠাত করেই নিজেকে বেশ বয়স্ক মনে হলো। নিশ্চিত হবার জন্য রিয়ার ভিউ মিররে লজ্জিত মুখে নিজেকে দেখে নিলাম।! মনে মনে জন্ম সালটার সংগে চলতি বছরের হিসেব মিলিয়ে নিলাম, ধুর! মাত্র ৩৫+। আহামরি কিছু বয়স নয়।


গাড়ির গতি কমতে কমতে এক সময় থেমেই গেল। এবং থেমেই রইলো। এত রাতে গাড়ি থামার কথা নয়। জায়গাটা ঠিক কোথায় বোঝা যাচ্ছে না। এ পথ আমার চেনা। অনেক বার এসেছি আগে। স্কুল-কলেজের অনেক বন্ধুর বাড়ি এই পথে। তবু লোকেট করা গেল না কোথায় আছি। ড্রাইভার নেমে গেছে পরিস্থিতি জানার জন্য। সু্প্তি এখনো ঘুমুচ্ছে। গাড়ির হেডলাইটে আলোকিত হয়ে আছে পুরো হাইওয়ে। মুহুর্মুহু হর্ণে বিব্রত হচ্ছে রাতের নিস্তব্ধতা।


তীব্র হর্ণের শব্দে সুপ্তির ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে ভেবে গ্লাস উঠিয়ে দিলাম। এতক্ষণ গাড়ির ভেতর বসে থাকতেও অস্বস্তি লাগছে। সাজিদকে ফোন করার জন্য পকেটে হাত দিতেই ওর ফোন বেজে উঠল।
- কিরে কিয়ারছ?
: হুটবল খেলি।
- এলকাই না ট্রাকের হেল্পার জুটাইছস? যাই করস, সুপ্তিরে দেইখ্যা রাখ। গ্যাদারিং এর ভিত্তে কেউ লইয়া যাইতে পারে!
: ধুর ব্যাটা ফাউল, তুই কই?
- আমি সাদ্দুর লগে চা খাইতাছি।
: সাদ্দুরে পাইলি কই?
- আরে কইস না। মজার কাহিনী। ও নাকি হারাদিন কপি-পেস্ট নিয়া এতই বিজি থাকে যে, বউরে সময় দিতে পারে নাই। ওর বউ রাগ কইরা ভাইয়ের বাড়িত গ্যাসেগা। ১৫ দিন ইইছে কোন খবর নাই। বাধ্য হয়া সাদ্দু আনতে যাইতাছে। সে এক বিরাট ইতিহাস!!

: সাদ্ রে দে তো দেহি। অনেকদিন কথা হয়না।
- হ্যালো বন্ধু....
: বল শালা, বন্ধু মারাও। একটা ফোন করার সময় পাও না আবার বন্ধু!!
- নারে দোশ্‌ত শোন। তুই তো জানিস, নতুন ফার্মটা নিয়া খুব ঝামেলায় ছিলাম লাস্ট ৬ টা মাস। গাধার মত খাইটাও কোন কূল কিনারা করতে পারি নাই।
: ক্যান? সমস্যা কি?
- আরে কইছ না। প্রেমিক পোলাপাইন দিয়া সফট্‌ওয়্যার ফার্ম চলেনা দোস্ত। প্রোগ্রামার সিলেকশানে বিরাট মিস্‌টেক হইছে। পোলাপাইন সবগুলাই বিশ্বপ্রেমিক। প্রোগ্রামিং করবো কি? ভিডিও চ্যাট আর টেক্সট মেসেজিং কইরাই কূল পায় না। একেকটার ৪-৫ টা কইরা লাইন।

: কাম তো ভালাই করছস। লাখ লাখ টাকা খরচ কইরা ফার্ম খুইলা বৃন্দাবন বানাইছস। তা তুইও কি এইসব করছ নাকি? নইলে বউ গেল ক্যান? হাছা কথা ক তো... ডরাইস না। আমার পরিচিত ভালো ডাক্তার আছে...


কথাটা আর শেষ করা গেল না। সাদ্দু ক্ষেপে গিয়ে গালাগালি শুরু করছে। হর্ণের শব্দে ওর ব্রিটিশ এ্যাকসেন্টর গালি ভাল করে ধরতে পারছি না।


: দোস্ত শোন, ময়মনসিংহ দেখা করিস। আড্ডা দিমুনে...
- ওকে...। সাজুর লগে কথা ক।
: জ্যাম লাগলো ক্যান?
- শুনলাম সামনে নাকি এ্যাক্সিডেন্ট হইছে। বেশিক্ষণ লাগার কথা না। যাই হোক গাড়ির দরজা খুলিস না। লক করে বইসা থাক। আর বেশি দরকার হইলে তুই একা নামিছ। সুপ্তি যেন না নামে, জায়গা সেইফ না।
: ওকে, ফোন দিস। বাই...
- বাই...


কথার শব্দে সুপ্তি জেগে গেছে।
- কি হয়েছে জানো কিছু?
: সামনে এ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে মনে হয়। তোমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
- নাহ্। একটু মাথা ব্যাথা করছে। সমস্যা নাই।


আমি ওর কপালে হাত রাখলাম। জ্বর নেই। হাত সরাতে যাবো, এমন সময় আমার হাতের উপর হাত রাখলো ও। কিছু বুঝে উঠার আগেই শব্দ করে কেঁদে উঠল। আমি পুরোপুরি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।


: এই কি হলো? সুপ্তি... খারাপ লাগছে?
- না কিছু না। ও খুব শক্ত করে আমায় হাত দু’হাত দিয়ে ধরে থাকলো। নিজেকে আমার খুব বেশি অপরাধী মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে। এটা নতুন নয়। এর আগেও এমনটি হয়েছে অনেক বার। সুপ্তি খুব চাপা স্বভাবের। ওর প্রতি আরো বেশি কেয়ারিং হওয়া দরকার ছিল। কোন এক অজানা কারণে আমি তা পারিনি।


সুপ্তিকে নিয়ে আমার কোন অপূর্ণতা নেই। আমার প্রতি ও খুবই কেয়ারিং। বরং বলা যায় একটু বেশিই কেয়ারিং। সারাটা জীবন বউ হিসেবে একজন নারীর কাছে যতটুকু প্রত্যাশার জাল বুনেছিলাম মনে মনে, তার সবটুকুই আছে সুপ্তির মাঝে। বেশ সুন্দরী। শিক্ষিতা। গ্রামের আর দশটা সাধারণ মেয়ের মধ্যে যে স্বভাবসুলব সারল্য থাকে, ওর মাঝেও তা আছে। ব্যতিক্রম হলো, খুব বেশি মাত্রায় চাপা স্বভাবের। কিন্তু স্বামী হিসেবে আমার উচিত ছিল ওর এই অন্তর্মুখীতা কাটিয়ে তোলা। আমি তা পারিনি। নিশ্চিতভাবেই পারিনি।


নিজের অস্বস্তি বোধটা কমিয়ে আনার জন্যই গাড়ি থেকে নামলাম। সুপ্তি আবারো চোখ বন্ধ করে সীটে হেলান দিয়ে আছে। ওর ডাস্ট এ্যালার্জি আছে, গাড়ি থেকে নামানো ঠিক হবেনা। প্রচুর ধুলোবালি। গাড়ি থেকে নেমে একটা সিগারেট ধরালাম।

- ফ্ল্যাক্সে চা আছে, খাবে?
: হুমমম... দাও।


ও জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে চা দিল। চায়ে চুমুক দিতেই কিছুটা ফ্রেশ লাগছে। চা শেষ করে কাপটা ফেরত দিতে ওকে ডাকলাম, ঘুমিয়ে গেছে। ভালই হয়েছে। এদিক সেদিক হাঁটাহাঁটি করছি। হঠাৎ করেই খুব অস্থির লাগছে। থেমে থাকতে ভাল লাগছে না মোটেও। গতির নামই জীবন। থেমে যাওয়া মানেই শীতল মৃত্যু। ফ্ল্যাক্স থেকে আরেক কাপ চা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম খানিকটা। একটা গাছের সংগে হেলান দিয়ে আরেকটা সিগারেট ধরালাম। হঠাৎ করেই কেউ একজন নাম ধরে ডাকলো, রিশাদ...


কিছুটা চমকে উঠে এদিক-সেদিক তাকালাম, তেমন কাউকে চোখে পড়ল না। ভুল শুনছি কি? মাথা নিচু করে চায়ে চুমুক দিতেই আবারো একই ডাক। এবার চোখ পড়ল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা কালো রংগের পাজেরোর জানালায়। হাতের ইশারায় ফিরে গেলাম ৭-৮ বছর আগের জীবনে।
নিশাত!!


হতবিহ্বলের মত এগিয়ে গেলাম গাড়ির দিকে। বুঝতে পারছি পা কাঁপছে।
- কেমন আছো?
আমি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি। বিস্ময়ের ঘোর এখনো কাটেনি। সিগারেটের তাপ আংগুলে লাগতেই বাস্তবতায় ফিরে এলাম।
: তুমি? এখানে?

ও কিছুই বললো না। রহস্যমাখা হাসি নিয়ে মর্মভেদী দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। বোধহয় এত বছর পর মাপার চেষ্টা করছে, কতটুকু বড় হয়েছি। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমার হাত থেকে চায়ের কাপটা নিয়ে চুমুক দিল!!

আমার মাথার ভেতরটা খুব ফাঁকা মনে হলো। কিছুই মাথায় আসছে না। ও চা খাচ্ছে, আমি তাকিয়ে দেখছি। যখন একসাথে ছিলাম, ও প্রায়ই এমন করতো। একই কাপে চা খেতাম দুজন। চা শেষ করে কাপটা আমায় ফেরত দিল। আবার গাড়ির হর্ণ বাজতে শুরু করছে। সবাই গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে। বুঝলাম জ্যাম ছুটে যাচ্ছে। ওর চোখে চোখ রাখলাম, কিছুটা বিষন্ন মনে হলো । ও আর কিছুই বললো না। শুধু চুল থেকে ব্যান্ডটা খুলে আমার হাতে দিয়ে কিছু বুঝে উঠার আগেই গ্লাস উঠিয়ে দিল। গাড়ি চলতে শুরু করেছে!!


ড্রাইভারের ডাকে পেছনে ফিরলাম। সুপ্তি গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে। দ্রুত গাড়িতে উঠে চুপচাপ বসে আছি জানালায় চোখ রেখে। ব্যান্ডটি হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা, নিশাতকে কিনে দেয়া এটিই আমার প্রথম উপহার। পেছনের দিনগুলোর কথা মনে পড়তে লাগলো এলোমেলোভাবে।

এখনো বুঝতে পারছিনা লাস্ট কয়েকটা মুহূর্তে কি ঘটে গেল। হঠাৎ করেই খুব মন খারাপ লাগছে। ভীষণ রকম কান্না পাচ্ছে। সুপ্তি আমার দিকে তাকিয়ে আছে বুঝতে পারছি।


হাত বাড়িয়ে ব্যান্ডটা নিতেই ওর দিকে তাকালাম। আমাকে চমকে দিয়ে ও ব্যান্ডটা চুলে পরলো।
- দ্যাখো তো, আমাকে নিশাতের মতো লাগে কিনা? মুখে স্বভাবসুলব আহ্লাদি হাসি।
বলে কি এই মেয়ে! তার মানে ও সব দেখেছে!
: তুমি নিশাতকে চেনো? তুমি সব দেখেছো?
- হ্যাঁ চিনি। বাবা আমাকে সব বলেছে।
: মানে?
- মানে হলো, ভার্সিটিতে পড়ার সময় নিশাতের সংগে তোমার একটা সম্পর্ক ছিল। তোমরা এক সময় পালিয়ে বিয়ে করেছিলে। পরে কোন কারণে নিশাত খুব বড়লোকের এক ছেলের সংগে পালিয়ে যায়। বিয়ের এক বছরের মধ্যেই তোমাদের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এজন্যই তো তুমি বিয়ের আগে আমাকে দেখতে যাওনি। আমার সংগে তোমার বিয়ের ব্যাপারে তোমার বাবার আগ্রহই বেশি কাজ করেছে। এ জন্যই তো তুমি আমাকে...

ও এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে হঠাৎ থমকে গেল। কথাটুকু শেষ না করলেও বুঝতে পারছি শেষে কি আছে। ওর অভিযোগ মিথ্যে নয়। এসব বলার অধিকার ওর আছে, অবশ্যই আছে। নিজেক খুব অসহায় মনে হলো। বসে রইলাম চুপচাপ।

- আচ্ছা, আমি দেখতে কি খুব বেশি পঁচা? আমি কি খুব আনস্মার্ট?

ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি। বিয়ের প্রায় আড়াই বছর কেটে গেছে, সম্ভবত এই প্রথম আমি ওকে ভাল করে দেখলাম। এবং এই প্রথম দেখলাম পৃথিবীর প্রগাঢ়তম মমতাময়ীর সুন্দরতম মুখ।

জ্যাম কাটিয়ে গাড়ি চলতে শুরু করেছে। সুপ্তি আবার ঘুমিয়ে গেছে, আমার আংগুলের মাঝে ওর আংগুলগুলো শক্ত করে ধরা। আমি খুব সন্তর্পনে ওর চুল থেকে ব্যান্ডটি খুলে বাইরে ফেলে দিলাম। মন খারাপ ভাবটা আর নেই। এখন আর কেন জানি চোখ বন্ধ করে থাকতে ইচ্ছে করছে না।।



উৎসর্গ: অবশ্যই জনি’কে...



(শিরোণামটা নিয়ে একটু কনফিউজড ছিলাম এবং এখনো আছি। আগের শিরোণামটি ছিল "এইসব দিন-রাত্রি", এখন চেন্জ করে দিলাম "এই তুমি, সেই তুমি"। এখনো কনফিউজড, কোনটা ফাইনাল করবো বুঝতে পারছি না।)
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জুলাই, ২০১১ রাত ১০:২৬
১১টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৬


শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৪৫



যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×