১৯৪৫ সালের ৫ই ডিসেম্বার বেলা ২টা ১০ মিঃ ফ্লাইট টি ১৯ নামে আমেরিকার বিমানবাহিনীর ৫ টি টর্পেডো নিক্ষেপকারী ‘টি বি এম অ্যাভেন্জার’ বিমান ফ্লরিডা বিমান ঘাটি থেকে উড্ডয়ন করে।এটি ছিল একটি উচ্চতর প্রশিক্ষন মহড়া ।খুব নীচু থেকে বোমা নিক্ষেপ করে ঘাটিতে ফেরত আসবে।মিশনটির সময় ছিল আড়াই ঘন্টা ।মিশনটি পরিচালনায় ছিলেন একজন সিনিয়ার ফ্লাইট প্রশিক্ষক এবং অন্য চারটি বিমান চালাচ্ছিল এমন চার জন পাইলট যাদের গড় উড্ডয়ন সময় ছিল ৩৫০-৪০০ ঘন্টা । অর্থাৎ মোটামোটি ভালই অভিজ্ঞ ।মেঘলা আকাশ এবং বৃস্টিপাতের কারনে বেশি দুরের জিনিস দেখা না গেলেও আবহাওয়া এধরনের মিশনের জন্য ভালই ছিল ।
বিকাল ৪ টা নাগাদ দুজন পাইলটের বেতার বার্তা থেকে প্রথম বোঝা যায় ফ্লাইট টি ১৯ পথ হারিয়েছে ।ফ্লাইট প্রশিক্ষক অন্য একজন পাইলটকে বলেন তিনি তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নন এবং ফ্লোরিডা কোস্ট কোন দিকে বুঝতে পারছেন না । এবং তিনি বলেন তার কম্পাস ঠিক মত কাজ করছে না ।হারিয়ে যাবার মুহূর্তে বৈমানিকদের একজন অতি নিম্ন বেতার তরঙ্গ পাঠাতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার এই বেতার বার্তাতে বারবার একটি কথাই বলা হচ্ছিলো, ‘সামনে প্রচণ্ড কুয়াশা। আমরা কিছু দেখতে পাচ্ছি না। কোথায় যে যাচ্ছি তাও বুঝতে পারছি না। আমাদেরকে উদ্ধার কর।’কন্ট্রল টাওয়ার থেকে তাদের সাথে যোগাযোগের চেস্টা করা হয় কিন্তু আর কোন উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না ।শেষ পর্যন্ত আর কোন যোগাযোগ করা যায় নি ।ধারনা করা হয় বিমান ৫টি ফ্লোরিডা কোস্টে পথ হারিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তেল শেষ হয়ে সাগরে পড়ে গেছে (প্রতিটি বিমানে ৬ ঘন্টা উড়ার মত তেল ছিল)।যদিও বিমান গুলো সাগরে জরুরি অবস্থায় ল্যান্ড করার ব্যবস্থা ছিল । কিন্তু সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কারনে হয়তো ডুবে গিয়েছে । অথবা হঠাত কোন ঝড়ো হাওয়ার কারনে বিমান গুলো ধ্বংস হয়ে গেছে ।তবে ঐ দিনের আবহাওয়ায় এরকম ঝড়ের কোন প্রমান পাওয়া যায় নি ।পাচ পাচটি যুধ্ব বিমান কোন রকম আভাস ছাড়াই গায়েব হয়ে গেল !!!! কারন যাই হোক পাচটি বিমানের একই গতি হবে ভাবতে ক্স্ট হয় ।
সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে একটি পিবিএম পেট্রল বিমান পাঠান হয় ফ্লাইট টি ১৯ এর উদ্ধার কাজের জন্য ।কিন্তু উড্ডয়নের পর থেকেই বিমানটির আর কোন খোজ পাওয়া যায় নি ।হঠাত করেই রাডার থেকে হারিয়ে যায় বিমান টি।টেক অফের পর কোন রকম যোগাযোগ করেনি এবং আর কোন দিন বিমান ও তার ক্রুদের কোন চিহ্ন পাওয়া যায় নি ।একটি বানিজ্যিক জাহাজের ক্রুরা ঐ সময় আকাশে একটি বিস্ফরন দেখে ছিল ।সেখান থেকে ধারনা করা হয় বিমানটি উড্ডয়নের পর বিস্ফরনে ধ্বংস হয়ে যায় এবং সাগরে পতিত হয় ।
পুর ঘটনা টি তখন আমেরিকায় সাড়া পরে যায় ।প্রতিকূল আবহাওয়ায়র মধ্যেই নেভী , এয়ার ফোর্স , কোস্ট গার্ড এবং সিভিল প্রশাসন মিলে যৌথ ভাবে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে ।সম্ভাব্য সকল যায়গায় তন্ন তন্ন করে খোজ করা হয় । কিন্তু পাচটি যুদ্ধ বিমান ও উদ্ধারকারী বিমান এবং বৈমানিকদের কোন হদিস মিলেনি ।সাগরের যে সব সম্ভাব্য স্থানে বিমান গুলো ডুবে যেতে পারে বলে সন্দেহ করা হয় বারবার তল্লাসি চালিয়েও কোন বিমানের ধ্বংসাবশেষ কিংবা ডুবে যাবার কোন ক্লু পাওয়া যায় নি।উদ্ধার কাজে যথেস্ট পরিমানে বিমান , হেলিকপ্টার এবং প্রচুর পরিমানে নৌযান ব্যাবহার করা হয় । সাগরের সম্ভাব্য কোন স্থান তল্লাসি বাকি রাখা হয়নি ।টানা ৫ দিন ধরে উদ্ধার কাজ পরিচালনা করে ১০ই ডিসেম্বার মুলতবি করা হয়।আর এভাবেই আমেরিকাসহ সারা বিশ্বে পরিচিত হয়ে উঠে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নামে আটলান্টিক সাগরের বিশেষ এলাকায় ।রহস্যজনক অন্তর্ধানের কথা উঠলেই শুরুতেই চলে আসে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নাম ।বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে রহস্যজনক ভাবে পাচটি ‘টি বি এম অ্যাভেন্জার’ বিমান এবং একটি পিবিএম পেট্রল বিমান অন্তর্ধান নিয়ে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন ।বিশেষ করে তাদের অন্তর্ধানের প্যাটার্ন এবং বছরের পর বছর খুজেও কোন ধ্বংসাবশেষ খুজে না পাওয়া ।
১৯৫০ সালে অ্যাসোসিয়েট প্রেসের এক প্রবন্ধে সাংবাদিক ই ভি ডাবলিউ জোনস প্রথম বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের অস্বাভাবিক ঘটনার কথা লিখে একে নজরে আনেন।এর পর জর্জ এক্স সান্ড লিখেন “সি মিসট্রি অ্যাট আওয়ার ব্যাক ডোর”। এ প্রবন্ধে তিনি ফ্লাইট নাইনটিন এর নিরুদ্দেশের কাহিনী বর্ণনা করেন এবং তিনিই প্রথম এই অপরিচিত ত্রিভুজাকার (যা থেকে “ট্রায়াঙ্গল” শব্দটির উতপত্তি) অঞ্চলের কথা সবার সামনে তুলে ধরেন।
ফ্লাইট নাইনটিনের দূর্ঘটনাকে আমেরিকান লিজান ম্যগাজিনে ১৯৬২ সালে সর্বপ্রথম অতিপ্রাকৃতিক ঘটনা হিসেবে দেখানো হয় ।সেসময়ে এই রহস্যময় ঘটনা নিয়ে প্রচুর আলোড়ন সৃষ্টি হয়।১৯৬৩ সালে এস এস মেরিন সালফার কুইন নামে আর একটি বানিজ্যিক জাহাজের অন্তর্ধানে আবার বিষয়টি লাইম লাইটে চলে আসে। ১৯৬৪ সালে 'The Deadly Bermuda Triangle' নামের আরেকটি কাহিনী ছাপিয়ে এই আলোড়নে আরো মশলা যুক্ত করার দায়িত্ব পালন করেন ভিনসেন্ট গডিস নামের এক লেখক। এর উপরেই আরো রং চড়িয়ে 'Invisible Horizons' নামের বিখ্যাত বইটি লেখা হয় যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলকে আরো রহস্যাবৃত করে তোলে।
১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর “ উইচক্রাফট” নামের একটি প্রমোদতরীতে, মিয়ামি তীর হতে মাত্র এক মাইল দূরে ইঞ্জিনে সমস্যা দেখা দেয়। ক্যাপ্টেন তাদের অবস্থান কোস্ট গার্ডকে জানিয়ে সাহায্যের জন্য আবেদন জানায়। জাহাজের ক্যাপ্টেনের পাঠান বার্তা থেকে জানা যায়, জাহাজের ইঞ্জিন হঠাত করেই অজ্ঞত কারনে বন্ধ হয়ে যায়।এবং অনেক চেস্টা করেও তা সচল করা যাচ্ছে না। কোস্ট গার্ডরা খুব দ্রুত উদ্ধার করতে গিয়ে ঐ নির্দিষ্ট স্থানে কোন জাহাজ পায়নি।
১৯৬৮ সালের মে মাসে হারিয়ে যাওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক ডুবোজাহাজের (স্কোরপিয়ান) ঘটনাটি সারা বিশ্বে সবচাইতে বেশি আলোড়ন তুলে।কারন আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা সম্পন্ন এবং ইউ এস নেভির চৌকস অফিসার দ্বারা পরিচালিত জাহাজটির রহস্যজনক অন্তর্ধান হিউমান এরর বা মানব ঘটিত দূর্ঘটনা কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটি বলে চালিয়ে দেয়া সহজ ছিল না ।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্যের সুত্রপাত হয় মুলত ১৪৯২ সালে । ক্রিস্টোফার কলম্বাস সর্বপ্রথম এই ত্রিভূজ বিষয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথা লিখেন। তিনি জাহাজের লগ বইতে লিখেছিলেন যে তাঁর জাহাজের নবিকেরা এ অঞ্চলের দিগন্তে আলোর নাচানাচি, আকাশে ধোঁয়া দেখেছেন। এছাড়া তিনি এখানে কম্পাসের উল্টাপাল্টা দিক নির্দেশনার কথাও বর্ণনা করেছেন। ঠিক একই কথা শোনা গেসে ফ্লাইট টি ১৯ এর পাইলটের কথোপকথনে ।
সংশয়বাদী গবেষকগণ বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্যজনক অন্তর্ধানের যৌক্তিক বা জাগতিক ব্যাখ্যা দেবার চেস্টা করেছেন।অন্তর্ধানের কারন হিসাবে ঝড়ো হাওয়া,মিথেন হাইড্রেটস উদগীরন , হারিকেন( শক্তিশালী ঝড়), গলফ স্ট্রিম , দৈত্যাকার ঢেউ , হিউমান এরর বা মানব ঘটিত দূর্ঘটনা কিংবা যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করেছেন।বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের নিচে ম্যাগনেটিক ফিল্ড এবং জলদস্যুদের আক্রমণকে অনেকে জাহাজ ডুবির জন্য দায়ী বলে দাবী করেন।কিন্তু জলদস্যুরা কিভাবে একটি জাহাজকে চিরতরে গায়েব করে দেয় তা উল্লেখ করেন নি। আর উড়োজাহাজ লাপাত্তা হবার বেপারে অনেকেই সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের আকাশ নিয়ে ড. জেসাপ বলেছেন, ‘আইনস্টাইনের ইউনিফাইড ফিল্ড থিয়োরি নিয়ে আরও ভালো করে গবেষণা করতে হবে, গবেষণা করতে হবে মহাকর্ষ নিয়ে৷
আবার অনেকেই বলে থাকেন যুদ্ধের সময় অনেক জাহাজ শত্রু পক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ডুবে গিয়েছে যা বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের রহস্যের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। বিশ্বযুদ্ধের সময় বেশ কিছু জাহাজ, যাদের মনে করা হত শত্রু পক্ষের অতর্কিত আক্রমণে ডুবেছে, তাদের উপর অনুসন্ধান করা হয়। যেমন- ১৯১৮ সালে ইউ এস এস সাইক্লপস( USS Cyclops) এবং ২য় বিশ্বযুদ্ধে এর সিস্টার শিপ প্রোটিয়াস(Proteu) এবং নিরিয়াস( Nereus) কে জার্মান ডুবোজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে বলে ধারনা করা হত।।কিন্তু পরবর্তীতে জার্মান পক্ষের নথিপত্র, নির্দেশনার লগ বই ইত্যাদি পরীক্ষা করে তেমন কিছু প্রমান করা যায়নি।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলকে রহস্যজনক হতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে যে ঘটনাটি তাহল দিনে দুপুরে কোন ধরনের বিপদ সংকেত ছাড়াই হঠাত করে হারিয়ে যাওয়া এবং হারিয়ে যাওয়া যানের ধ্বংসাবশেষ না পাওয়া।গবেষকরা হারিয়ে যাওয়া যানের ধ্বংসাবশেষ না পাওয়ার বেপারে যা বলেন তা হলো, আটলান্টিক মহাসাগরের মধ্যে একটি অন্যতম গভীর স্থান হচ্ছে । আধুনিক ও প্রশিক্ষিত ডুবুরি সরঞ্জাম দিয়ে এই অঞ্চলে উদ্ধার কাজ চালানো এখনো দুরূহ। এবং প্রচন্ড স্রোতের কারনে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।তাই বলে কিছুই পাওয়া যাবে না? কিন্তু ফ্লাইট টি ১৯র জন্য পরিচালিত উদ্ধার কাজের সময় কিছু বিমান এবং জাহজের ধ্বসাবশেষ পাওয়া যায় । গবেষকরা অনেক চেস্টা করেও তার পরিচয় বের করতে পারে নি এবং অতিতে যে সব যান নিখোজ হয়েছে তার সাথে সামঞ্জাস্য পান নি।যেটা মানুষকে বিশ্বাস করতে সাহায্য করেছে জানার বাইরে আরো অনেক বিমান এবং নৌযান নিখোজ হয়েছে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে !!!!!!!
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০১১ রাত ১১:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


