বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুবিধাবাদ
[একটি পোষ্টের কমেন্টে কুলদা রায় আমাকে প্রশ্ন করেছেন, “ভাসানী ন্যাপের লোকজন বিএনপি-জামাতে গেছেন বা যাবে কেন?” কমেন্টে জবাব না দিয়ে এই নোটটি আপনাদের সবার সাথে শেয়ার করলাম।]
নড়াইলের ধীরেন সাহা ও শরীফ খমরুজ্জামান এক রাতে বিএনপি হয়ে যাওয়া, নোয়াখালীর আব্দুর রব চৌধুরীর এক রাতে আওয়ামী লীগ হয়ে যাওয়া এবং মোযাফ্ফর ন্যাপের নেতা ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর দলবল নিয়ে বিএনপিতে যোদানের ঘটনা সামনে থাকতে তিনি এই প্রশ্নটি কেন করলেন জানি না।
যাহোক, ভারতবর্ষে বৃটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন থেকে শুরু করে অনুশীলন আন্দোলন, কমিউনিষ্ট আন্দালন, পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, ভাষা অন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সর্বত্র নেতৃস্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সব সময় সামন্ত পরিবার (জমিদার, গাতীদার, ব্যবসায়ী) এবং আমলা পরিবারের সন্তান বা সদস্যদের বেশ বড় একটা উপস্থিতি ছিল। এরা প্রথমে রাজনীতিতে আসতো আদর্শের বা মানুষের কল্যাণের জন্য নয়। বরং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারের জন্য সামাজিক মর্যাদা এ সম্মান অর্জন করাটাই ছিল মূল লক্ষ্য। বাবা-মা এবং অভিভাবকরা রাজনীতিতে যেতে তাদের উৎসাহিত করতেন।
বৃটিশ বিরোধী অন্দোলনের নেতা, ভাষা আন্দোলনের নেতা, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে সমসাময়িক সমাজে সামাজিক বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি কারো কি চোখ এড়ায়? তাই সমাজের সুবিধাবাদী অনেকে বৃটিশ আমলে চাইতেন যে তার সন্তান স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হোক। এভাবে পঞ্চাশ দশকে ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্র রাজনীতিতে, ষাটের দশকে বাম রাজনীতিতে, ইত্যাদি। এই জন্য বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে বাম ডান নির্বিশেষে রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতিতে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। তাদের বলয়ের বাইরে থেকে এসে কেউ সাময়িক অবস্থান তৈরী করতে পারলেও দীর্ঘ দিন টিকে থেকে অবস্থান ধরে রাখতে পারে নি। ব্যাতিক্রম হিসেবে খুবই নগন্য সংখ্যক যারা অর্থ-বিত্ত সংগ্রহ করে নিজের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়ে প্রভাবশালীদের কাছাকাছি আসতে পেরেছে তারাই টিকতে পেরেছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই ধারায় একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটে। এই সময় আদর্শবাদীতার কদর কমে সুযোগ-সুবিধা বা বৈষয়িক প্রাপ্তির বিষয়টা মূখ্য হয়ে দাড়ায়। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে পারমিটবাজী আর রেশন কার্ডের ব্যবসার মধ্য দিয়ে এটা শুরু হয়েছিল। মনে রাখা দরকার তখন কঠিন বাস্তবতার কারণে একটি শার্টের কাপড়, এক কেজি চিনি, একটি সাইকেল টায়ার, ইত্যাদি কসকর থেকে ক্রয়ের জন্য পারমিট সংগ্রহ করতে হতো।
এই প্রবণতায় ১৯৭৫ সালে অনেকে নিজের দল বিলুপ্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে থাকার জন্য নবগঠিত বাকশালে যোগ দিয়েছিল। আবার ১৫ আগষ্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের লোকেরাই মোস্তাকের নেতৃত্বে ডেমোক্রাটিক লীগ গঠন করেছিল। অন্যান্য দল থেকে যারা বাকশালে গিয়েছিল তারা বাকশালকে ডিজওন করে, বাকশালের জামা খুলে নিজ নিজ পুরাতন রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে যুক্ত হবার এই প্রবণতার ফলে ধারাবাহিক ভাবে জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদের জন্য রাজনৈতিক দল গঠন সহজ হয়েছিল।
এই ভাবে ক্ষমতার রাজনীতির যে ধারা সৃষ্টি হয় সেই ধারায় আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগে যুক্ত হওয়া, বিএনপিতে যোগ দেয়া, এরশাদের দলে যোগ দেয়া, এমন কি বৈষয়িক সুযোগ সুবিধার জন্য জামাত বা শিবিরে যোগদান ধারাবাহিক ভাবে ঘটে চলেছে এক আমল থেকে আর এক আমলে।
যারা নিজেদের পরিবারের জন্য সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান অর্জন করাটা মূখ্য লক্ষ্য ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন, তারাই দল পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ডিগবজীতে সবার আগে ছিলেন। কারণ তাদের তো সাত্যিকার অর্থে কোন আদর্শ বা কমিটমেন্ট ছিল না। যা যা করলে সুযোগ সুবিধা বেশী পাওয়া যাবে, পরিবারের বিকাশ ও উন্নতি হবে, সামাজিক মর্যাদা বাড়বে বা সংহত হবে, তাই তাই তারা করেছেন। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যারা বৈধ পথে সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছেন না, ভাগ্য বদলাতে পারছেন না, তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত থাকার সুযোগ নিয়ে, ক্ষমতা অপব্যবহার করে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, ছিনতাই, মাদক এবং ক্ষেত্র বিশেষে নারী ব্যবসায লিপ্ত হচ্ছেন। এখনকার রাজনীতিতে এই পরিবেশের কারণে ক্ষমতার রাজনীতি করার লোকের অভাব নাই, কিন্তু আদর্শের রাজনীতি করার লোক খুঁজে পাওয়া খানিকটা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।
ডিগবাজী দিয়ে দিয়ে এই যে দল পরিবর্তনের কালচার, এর ফলে বহু আগের থেকে ডিগবাজী খাওয়া রাজাকারদের সাথে ইন্টারমিংঙ্গলিংয়ের অভ্যাস তাদের ভাল করেই রপ্ত হয়েছে। হয়তো ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তাও হয়েছে। ফলে বিএনপি যখন জামাতের সাথে চারদলীয় জোট করেছে তখন তারা আপত্তির কিছু দেখেনি। তাছাড়া বিএনপি ও জামাতের পিছনের চালিকা শক্তির আধাঁর সম্ভবতঃ একটাই। ভাসানী ন্যাপ থেকে ডিগবাজী দিয়ে যারা বিএনপি বা জামাতে যোগ দিয়েছে, তারা কি এখনও ভা-ন্যাপ আছে? তাদের নিয়ে এত বিস্মিত হবার কি আছে? এ প্রসঙ্গে ডিগবাজী দেয়া একজন নেতার একটি উদ্ধৃতি আপনাদের সামনে পেশ করি। ১৯৮৮ সালে নড়াইলের লোহাগাড়ায় ক্ষেতমজুরদের মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে জাতীয় পার্টির ক্যাডাররা হাফিজুর রহমান মোল্লা নামে একজন ক্ষেত মজুর নেতাকে (যিনি আবার পাটকল শ্রমিকও ছিলেন) হত্যা করে। তারপর আবার উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ৪ দিনের দিন হাফিজুর রহমান মোল্লার কুলখানির মিলাদে হামলা করা হয় এবং তাবারক বিনষ্ট করে দেয়া হয়। তো এই উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব প্রথম ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের নেতা ছিলেন, তারপর পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি (এম. এল.) এর স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, তার পর ইউপিপি-র নেতা, সেখান থেকে কাজী জাফর সাহেবের হাত ধরে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে (বর্তমানে বোধ হয় তিনি আওয়ামী লীগ করেন)। তো এই চেয়ারম্যান সাহেবের আগ্রাসী কাজকর্ম বন্ধ করা যায় কিনা তা আলোচনার জন্য কয়েকজনের অনুরোধে তার বাসায় গেলাম। তিনি আমাকে যা বল্লেন তা এখানে হুবহু কোট করে দিলাম, “মানুষ বেশ্যা পাড়ায় নামাজ পড়তে যায় না। সেখানে যা করতে যায় তাই করে। আমি এখন এরশাদের দল করি। এটা নামাজ পড়গার দল না। এখানে থাকতে হলে যা করা দরকার আমি তাই করছি। ওদের যদি ক্ষমতা থাকে আমার কিছু করুক। কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না।“
নাম ধরে কাউকে ছোট বা হেয় করতে চাই না। পাঠক, আপনার চার দিকে তাকালে এই রকম অনেক লোক দেখতে পাবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

