somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুবিধাবাদ

০২ রা জুলাই, ২০১০ সকাল ১১:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুবিধাবাদ

[একটি পোষ্টের কমেন্টে কুলদা রায় আমাকে প্রশ্ন করেছেন, “ভাসানী ন্যাপের লোকজন বিএনপি-জামাতে গেছেন বা যাবে কেন?” কমেন্টে জবাব না দিয়ে এই নোটটি আপনাদের সবার সাথে শেয়ার করলাম।]

নড়াইলের ধীরেন সাহা ও শরীফ খমরুজ্জামান এক রাতে বিএনপি হয়ে যাওয়া, নোয়াখালীর আব্দুর রব চৌধুরীর এক রাতে আওয়ামী লীগ হয়ে যাওয়া এবং মোযাফ্ফর ন্যাপের নেতা ক্যাপ্টেন আব্দুল হালিম চৌধুরীর দলবল নিয়ে বিএনপিতে যোদানের ঘটনা সামনে থাকতে তিনি এই প্রশ্নটি কেন করলেন জানি না।

যাহোক, ভারতবর্ষে বৃটিশ বিরোধী স্বদেশী আন্দোলন থেকে শুরু করে অনুশীলন আন্দোলন, কমিউনিষ্ট আন্দালন, পাকিস্তান আন্দোলন, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, ভাষা অন্দোলন, আইয়ুব বিরোধী ছাত্র আন্দোলন, সর্বত্র নেতৃস্থানীয় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সব সময় সামন্ত পরিবার (জমিদার, গাতীদার, ব্যবসায়ী) এবং আমলা পরিবারের সন্তান বা সদস্যদের বেশ বড় একটা উপস্থিতি ছিল। এরা প্রথমে রাজনীতিতে আসতো আদর্শের বা মানুষের কল্যাণের জন্য নয়। বরং রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের পরিবারের জন্য সামাজিক মর্যাদা এ সম্মান অর্জন করাটাই ছিল মূল লক্ষ্য। বাবা-মা এবং অভিভাবকরা রাজনীতিতে যেতে তাদের উৎসাহিত করতেন।

বৃটিশ বিরোধী অন্দোলনের নেতা, ভাষা আন্দোলনের নেতা, আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের নেতা, মুক্তিযোদ্ধা, ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে সমসাময়িক সমাজে সামাজিক বিশেষ মর্যাদার বিষয়টি কারো কি চোখ এড়ায়? তাই সমাজের সুবিধাবাদী অনেকে বৃটিশ আমলে চাইতেন যে তার সন্তান স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হোক। এভাবে পঞ্চাশ দশকে ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্র রাজনীতিতে, ষাটের দশকে বাম রাজনীতিতে, ইত্যাদি। এই জন্য বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে বাম ডান নির্বিশেষে রাজনীতি বা ছাত্র রাজনীতিতে প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যদের প্রাধান্য লক্ষ্যণীয়। তাদের বলয়ের বাইরে থেকে এসে কেউ সাময়িক অবস্থান তৈরী করতে পারলেও দীর্ঘ দিন টিকে থেকে অবস্থান ধরে রাখতে পারে নি। ব্যাতিক্রম হিসেবে খুবই নগন্য সংখ্যক যারা অর্থ-বিত্ত সংগ্রহ করে নিজের সামাজিক অবস্থান পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়ে প্রভাবশালীদের কাছাকাছি আসতে পেরেছে তারাই টিকতে পেরেছে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর এই ধারায় একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটে। এই সময় আদর্শবাদীতার কদর কমে সুযোগ-সুবিধা বা বৈষয়িক প্রাপ্তির বিষয়টা মূখ্য হয়ে দাড়ায়। স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুতে পারমিটবাজী আর রেশন কার্ডের ব্যবসার মধ্য দিয়ে এটা শুরু হয়েছিল। মনে রাখা দরকার তখন কঠিন বাস্তবতার কারণে একটি শার্টের কাপড়, এক কেজি চিনি, একটি সাইকেল টায়ার, ইত্যাদি কসকর থেকে ক্রয়ের জন্য পারমিট সংগ্রহ করতে হতো।

এই প্রবণতায় ১৯৭৫ সালে অনেকে নিজের দল বিলুপ্ত করে ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে থাকার জন্য নবগঠিত বাকশালে যোগ দিয়েছিল। আবার ১৫ আগষ্টের মর্মান্তিক ঘটনার পর ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে থাকার জন্য আওয়ামী লীগের লোকেরাই মোস্তাকের নেতৃত্বে ডেমোক্রাটিক লীগ গঠন করেছিল। অন্যান্য দল থেকে যারা বাকশালে গিয়েছিল তারা বাকশালকে ডিজওন করে, বাকশালের জামা খুলে নিজ নিজ পুরাতন রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিলেন। ক্ষমতার কেন্দ্রে যুক্ত হবার এই প্রবণতার ফলে ধারাবাহিক ভাবে জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদের জন্য রাজনৈতিক দল গঠন সহজ হয়েছিল।

এই ভাবে ক্ষমতার রাজনীতির যে ধারা সৃষ্টি হয় সেই ধারায় আওয়ামী লীগ, ছাত্র লীগে যুক্ত হওয়া, বিএনপিতে যোগ দেয়া, এরশাদের দলে যোগ দেয়া, এমন কি বৈষয়িক সুযোগ সুবিধার জন্য জামাত বা শিবিরে যোগদান ধারাবাহিক ভাবে ঘটে চলেছে এক আমল থেকে আর এক আমলে।

যারা নিজেদের পরিবারের জন্য সামাজিক মর্যাদা ও সম্মান অর্জন করাটা মূখ্য লক্ষ্য ধরে রাজনীতিতে এসেছিলেন, তারাই দল পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক ডিগবজীতে সবার আগে ছিলেন। কারণ তাদের তো সাত্যিকার অর্থে কোন আদর্শ বা কমিটমেন্ট ছিল না। যা যা করলে সুযোগ সুবিধা বেশী পাওয়া যাবে, পরিবারের বিকাশ ও উন্নতি হবে, সামাজিক মর্যাদা বাড়বে বা সংহত হবে, তাই তাই তারা করেছেন। প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যারা বৈধ পথে সুযোগ-সুবিধা নিতে পারছেন না, ভাগ্য বদলাতে পারছেন না, তারা ক্ষমতার কেন্দ্রের সাথে যুক্ত থাকার সুযোগ নিয়ে, ক্ষমতা অপব্যবহার করে চাঁদাবাজী, টেন্ডারবাজী, ছিনতাই, মাদক এবং ক্ষেত্র বিশেষে নারী ব্যবসায লিপ্ত হচ্ছেন। এখনকার রাজনীতিতে এই পরিবেশের কারণে ক্ষমতার রাজনীতি করার লোকের অভাব নাই, কিন্তু আদর্শের রাজনীতি করার লোক খুঁজে পাওয়া খানিকটা কষ্টকর হয়ে পড়েছে।

ডিগবাজী দিয়ে দিয়ে এই যে দল পরিবর্তনের কালচার, এর ফলে বহু আগের থেকে ডিগবাজী খাওয়া রাজাকারদের সাথে ইন্টারমিংঙ্গলিংয়ের অভ্যাস তাদের ভাল করেই রপ্ত হয়েছে। হয়তো ছেলে মেয়ে বিয়ে দিয়ে আত্মীয়তাও হয়েছে। ফলে বিএনপি যখন জামাতের সাথে চারদলীয় জোট করেছে তখন তারা আপত্তির কিছু দেখেনি। তাছাড়া বিএনপি ও জামাতের পিছনের চালিকা শক্তির আধাঁর সম্ভবতঃ একটাই। ভাসানী ন্যাপ থেকে ডিগবাজী দিয়ে যারা বিএনপি বা জামাতে যোগ দিয়েছে, তারা কি এখনও ভা-ন্যাপ আছে? তাদের নিয়ে এত বিস্মিত হবার কি আছে? এ প্রসঙ্গে ডিগবাজী দেয়া একজন নেতার একটি উদ্ধৃতি আপনাদের সামনে পেশ করি। ১৯৮৮ সালে নড়াইলের লোহাগাড়ায় ক্ষেতমজুরদের মিছিলের উপর গুলি চালিয়ে জাতীয় পার্টির ক্যাডাররা হাফিজুর রহমান মোল্লা নামে একজন ক্ষেত মজুর নেতাকে (যিনি আবার পাটকল শ্রমিকও ছিলেন) হত্যা করে। তারপর আবার উপজেলা চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ৪ দিনের দিন হাফিজুর রহমান মোল্লার কুলখানির মিলাদে হামলা করা হয় এবং তাবারক বিনষ্ট করে দেয়া হয়। তো এই উপজেলা চেয়ারম্যান সাহেব প্রথম ছাত্র ইউনিয়ন মেনন গ্রুপের নেতা ছিলেন, তারপর পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিষ্ট পার্টি (এম. এল.) এর স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা, তার পর ইউপিপি-র নেতা, সেখান থেকে কাজী জাফর সাহেবের হাত ধরে এরশাদের জাতীয় পার্টিতে (বর্তমানে বোধ হয় তিনি আওয়ামী লীগ করেন)। তো এই চেয়ারম্যান সাহেবের আগ্রাসী কাজকর্ম বন্ধ করা যায় কিনা তা আলোচনার জন্য কয়েকজনের অনুরোধে তার বাসায় গেলাম। তিনি আমাকে যা বল্লেন তা এখানে হুবহু কোট করে দিলাম, “মানুষ বেশ্যা পাড়ায় নামাজ পড়তে যায় না। সেখানে যা করতে যায় তাই করে। আমি এখন এরশাদের দল করি। এটা নামাজ পড়গার দল না। এখানে থাকতে হলে যা করা দরকার আমি তাই করছি। ওদের যদি ক্ষমতা থাকে আমার কিছু করুক। কান্নাকাটি করে কোন লাভ হবে না।“

নাম ধরে কাউকে ছোট বা হেয় করতে চাই না। পাঠক, আপনার চার দিকে তাকালে এই রকম অনেক লোক দেখতে পাবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০১০ সন্ধ্যা ৭:৩১
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×