somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার :: ন্যাংটা, কালী এবং লক্ষীর বানর

০৮ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৩:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মানুষের বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার
ন্যাংটা, কালী এবং লক্ষীর বানর

আমার গ্রামের বাড়ী, অর্থাৎ আমার দাদার বাড়ী নড়াইলে। গ্রামের নাম কামালপ্রতাপ। আমাদের গ্রামে একটি পীরের মাজার আছে। পীরের নাম ন্যাংটা শাহ ফকির। উনার কবরটাই মাজার। মজিরিটি বাঁধানো, ঘেরা বা সাজানো নিষেধ। তবে মাজারের কবরটি তিন মাস পর পর মাটি দিয়ে ভরাট করে দিতে হয়। কারণ শত শত মানুষ ফকিরের মাজারের মাটি পবিত্র ধুলি হিসেবে নিয়ে যায।

তাদের বিশ্বাস এই ধুলিতে মিলবে মুক্তি। রোগ থেকে মুক্তি, বালা মসিবৎ থেকে মুক্তি, অস্বচ্ছলতা থেকে মুক্তি, বেকারত্ব থেকে মুক্তি, পরীক্ষা ফেলের আশঙ্কা থেকে মুক্তি, অনুঢ়া জীবন থেকে মুক্তি, বন্ধ্যাত্য থেকে মুক্তি, স্বামীর অমনোযোগ থেকে মুক্তি, মামলা থেকে মুক্তি, শত্রু থেকে মুক্তি, আরও কত কি!

অন্ধ বিশ্বাস হলেও এ তাদের সংস্কার! তারা তাদের বিশ্বাস ও সংস্কার মনের গভীরে দৃঢ় ভাবে লালন করে, আমি করি বা না করি।

তবে যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি বিশ্বাস হ’ল, এই গ্রামে ও আশ পাশের কোন গ্রামে কারো নবজাতক বা শিশু সন্তানের কোন রকম অসুখ হলে এবং সে যদি পুরুষ হয়, তাহলে তার নাম রাখা হয় “ন্যাংটা”। যে কারণে আমাদের গ্রামে দাদা ন্যাংটা, বাবা ন্যাংটা, চাচা ন্যাংটা, মামা ন্যাংটা, ভাই ন্যাংটা, ছেলে ন্যাংটা, বিভিন্ন ম্রেণীর ন্যাংটা আছে।

আবার এত ন্যাংটার পরিচয় ঠিক রাখা একটি ঝক্কির ব্যাপার। তাই ন্যাংটার সাথে নানা বিশেষণ যুক্ত করা হয়। যেমন, ভইদো (মোটা) ন্যাংটা, কাজী ন্যাংটা, খোড়া ন্যাংটা, মোল্লা ন্যাংটা, হাফেজ ন্যাংটা, মাষ্টার ন্যাংটা, দারোগা ন্যাংটা, আরো এই রকম অনেক ন্যাংটা আছে।

ঐ যে দারোগা ন্যাংটার কথা বললাম, তার বাড়ীর পর থেকে হিন্দু পাড়া শুরু। সেখানে আবার সব “কালী”। ভাল কালী, খোঁড়া কালী, জয় কালী, বৈদ্য কালী, বাড়ৈ কালী, মাইনক্যা কালী, এই ভাবে গ্রামের উত্তরে যতীন কাকার বাড়ীর পাশে সত্য কালী-তে গিয়ে শেষ। এরা সবাই ছেলে, ছোট বেলায় রোগ বালাইতে আক্রান্ত হয়ে নিজের নামের সাথে “মা” কালীর নাম ধারণ করতে হয়েছে।

যতীন কাকার বাড়ীর উত্তরে একটি গ্রামের একটি কোনা পার হলে উতোস পাড়া। সেটা গ্রাম না পাড়া, বুঝা মুশকিল। সেখানে যতীন কাকার শ্বশুর বাড়ী। যতীন কাকার শ্বাশুড়ী লক্ষী পূঁজা করেন। তাই তাঁর ঘরে লক্ষী দেবীর বড় একটি বিগ্রহ। তবে তিনি শুধু লক্ষী পূঁজা করেন না। উনি শিশুদের একটি রোগের চিকিৎসাও করে থাকেন। রোগটির নাম--“পেঁচো-পাচিতেঁ ধরা”। এই চিকিৎসা কার্যের জন্য, লক্ষীর বিগ্রহের এক পাশে একটি লক্ষী প্যাঁচা এবং অপর পাশে একটি বানরের মূর্তি রাখা আছে। লক্ষী প্যাঁচা ও বানরের মূর্তি তাদের নিজ নিজ সাইজের হলেও, বানরের পুরুষ অঙ্গটি স্বাভাবিক মাপের তুলনায় ঈষৎ বৃহৎ এবং খাতনা দেয়া মুসলিম বালকের ন্যায় পুরুষ অঙ্গটি প্রষ্ফূটিত।

যতীন কাকার শ্বাশুড়ী কোন শিশুর পেঁচো-পাঁচি ছাড়ানোর মন্ত্র পাঠ করার সময় শিশুটিকে দুই হাতের তালুর উপর লম্বা করে রেখে, তার মাথাটি মা লক্ষীর পায়ে, লক্ষী প্যাঁচার ঠোটে এবং বানরের পুরুষ অঙ্গে তিন বার ছোঁয়াতেন। আমরা ঐসব দেখে হেসে কুটি কুটি হয়ে যেতাম। যতীন কাকার ম্বাশুড়ী মাঝে মাঝে আমাদের ধমক দিতেন।

তবে আমরা যতই হাসাহাসি করি না কেন, মানুষ পরম ভক্তি ভরে বিশ্বাস করতো, হয়তো এখনও করে, এই মন্ত্র পাঠ এবং বিচিত্র আচার, শিশুদের পেঁচো-পাঁচি থেঁকে মুক্ত করে, সুস্থ করে, তাদের রক্ষা করে।

এই এতক্ষণ যাদের কথা বললাম, সেই সব সাধারণ মানুষ ছেলের নাম ন্যাংটা রাখুক, কালী রাখুক আর যতীন কাকার শ্বাশুড়ীর লক্ষীকে দেখাক, ডাক্তার দেখিয়ে এ্যালোপ্যাথি বা হেমিওপ্যাথী, আবার কখনও কবিরাজ দেখিয়ে কবিরাজী ঔষধ নিতে ভুল করতেন না।

তাদের মনে অন্ধ বিশ্বাস, সংস্কার, কুসংস্কার যাই থাক, বিজ্ঞানের প্রতি তাদের আস্থার উত্তরণ কিন্তু পাশা পাশি অগ্রসরমান ছিল।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই আগস্ট, ২০১০ দুপুর ১২:৩৩
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

×