আজ যে বাংলাদেশ ক্রিকেটার জাগরণ, একটি টিকেটের জন্য ঘুমহীন, খাদ্যহীন, ক্লান্তিকর রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা ও আত্মত্যাগ। ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের প্রতি ভালবাসা সব কিছুর জন্য সবচে বড় অবদান অবশ্যই আমাদের সাবে ক্রিকেটারদের। তারাই যুগযুগ ধরে ধীরে ধীরে শত প্রতিবন্ধকতার মধ্যে আমাদের ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে গেছে অন্তর্জাতিক পর্যায়ে। ক্রিকেট আমাদের আন্তর্জাতিক ভাবে যত উঁচুতে নিয়ে গিয়েছে বোধ করি এর ধারের কাছেও আমরা আর কোন দিক দিয়ে পৌছাতে পারিনি। অথচ এই পথ চলা মোটেই কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। এখনো বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যখন হারে অনেক মন খারাপ হয়। অনেক সময় ক্রিকেটারদের গালি দিতেও দ্বিধা করি না। কিন্তু ক্রিকেট ও ক্রিকেটারদের প্রতি ভালবাসা সবসময় অটুট থাকে। সন্তান পরীক্ষায় ফেল করলে মা-বাবা যেমন বকাঝকা করে এটা তেমনই। বকাঝকা করি ঠিকই কিন্তু ভালবাসা থাকে অটুট।
কোন ম্যাচ হারার পর মনখারাপ করে যখন তাদের মনে মনে দুটো গালি দিয়ে ফেলি এরপর মুহুর্তে আবার নিজেদের অনেক গর্বিতও মনে হয়। মনে হয় এত অপ্রতুল ব্যবস্থাপনা নিয়ে তাদের তো এতদূর আসারই কথা ছিল না। বাংলাদেশ বিশ্বের অনেক বড় বড় দলগুলোর সাথে খেলছে এটাই তো অনেক বড় গর্বের বিষয়। হার জিত পরে, যদি খেলারই সুযোগ না পেত তখন কি হতো!
আবার মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের ক্রিকেটারেরা বিশ্বের সবচে সেরা ক্রিকেটার। কারণ তারা তাদের সীমিত সুযোগ সুবিধা নিয়ে যেভাবে অন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধীরে ধীরে নিজেদের ও বাংলাদেশের ক্রিকেটকে মেলে ধরছে এর কোন তুলনা হয় না। আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটারেরা তাদের নিজেদের গড়ে তোলার যে সুযোগ সুবিধা গুলো পায় অন্য দেশের ক্রিকেট ক্লাব গুলোও তার থেকে ঢের বেশী সুবিধা পেয়ে থাকে। আমাদের ক্রিকেটারেরা আন্তজার্তিক পর্যায়ে মেলে ধরার মতো প্র্যাকটিসের সুবিধা জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার আগে পায় না। কারণ আমাদের ক্লাব পর্যায়ের ক্রিকেট এখনো ডাইনোসর যুগে পড়ে আছে। তাদের না আছে কোন আর্ন্তজাতিক মানের জিম না আছে আন্তর্জাতিক মানের মাঠ। আমাদের ক্রিকেটাররা কখনোই ঘরোয়া পর্যায়ের খেলাগুলো খেলে নিজেকে আন্তজার্তিক পর্যায়ের জন্য গড়ে তুলতে পারে না। জাতীয় দলে এসে জাতীয় দলের জন্য নিজেকে গড়ে তুলতে হয়। আমাদের মাশরাফি যখন আর্ন্তজাতিক ম্যাচ খেলেতে নামে তখন তার নামের পাশে প্রথম শ্রেণীর ম্যাচের সংখ্যা থাকে শূণ্য। অথচ অন্য দেশের ক্রিকেটারেরা আগে ঘরোয়া ক্রিকেট খেলে আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে নিজেকে খেলার উপযুক্ত প্রমান করে আসতে হয়।
অথচ এত অপ্রতুল সুযোগ সুবিধাকে জয় করে যারা আমাদের আর্ন্তজাতিক পর্যয়ে তুলে ধরেছে, নিয়ে গেছে উচ্চতার শিখরে তাদের বিসিবি যে ভাবে অপমান করল তা অকল্পনীয়, অবিশ্বাস! মানি, বিশ্বকাপের মতো বড় আসরে সকল সাবেক ক্রিকেটারকে মাঠে বসে খেলা দেখার ব্যবস্থা করে দেয়া বিসিবির জন্য সহজ ছিল না, কিন্তু তাই বলে মাত্র কয়েকজন সাবেক অধিনায়ককে তারা অন্তত একটি ম্যাচের টিকেট দিতে পারল না!! বাংলাদেশের ক্রিকেটকে তারা এই পর্যায়ে নিয়ে গেল যে নায়কেরা তাদের বিসিবি এতবড় অপমান করতে পারল? হাবিবুল বাসার, খালেদ মাসুদ, খালেদ মাহমুদদের মাঠে বসে খেলা দেখার কোন অধিকার নাই অথচ জেলা পর্যায়ের নামসর্বস্ব ক্রিকেট সংগঠকেরা স্ত্রী সন্তান নিয়ে পা ছড়ি মাঠে বসে খেলা দেখছে এটা আমাদের সাবেক ক্রিকেটারদের দেখতে হবে, আমাদের দেখতে হবে?? অবিশ্বাস্য!!
এটিএন বাংলায় যখন খালেদ মাহমুদ ও হাবিবুল বাসারকে এই নিয়ে প্রশ্ন করা হলো তখন তাদের দুচোখে টলটলে পানি আমি কোনদিন ভুলতে পারব না। খালেদ মাহমুদ বলল তাঁকে তার পরিচিত অনেকেই টিকেটের জন্য ফোন করেছে। কিন্তু তিনি কাউকে কিছুতেই বুঝাতে পারেননি যে তিনি নিজেই কোন টিকেট পাননি। একজন সাবেক অধিনায়ক খেলা দেখার টিকেট পাননি এটা আসলেই বিশ্বাস করার মতো কথা নয়।
আমাদের মহানায়কদের এভাবে অপমান করা মানে আমাদের ক্রিকেটকে অপমান করা, চৌদ্দ কোটি মানুষকে অপমান করা। এ অপমান আমাদের সকলের। আমাদের মহানায়কদের কাছে আমরা লজ্জিত। সমবেদনা জানানোর ভাষাও আমাদের নাই। হে মহানায়কেরা, তোমরা আমাদের এই সংকীর্ণতাকে ক্ষমা করো। আমাদের মাথামোটা ক্রিকেট কর্তারা তোমাদের মনে না রাখুক, আমাদের মনের মনি কোঠায় তোমরা চিরকাল থাকবে। আমাদের ১৪ কোটি মানুষের ভালবাসা তোমাদের সাথে সব সময় আছে, থাকবে।
যেখানে আমাদের গর্ব, আমাদের অহংকার হাবিবুল বাসারেরা মাঠে বসে খেলা দেখতে পারে না তখন আমাদের নিজেদের মাঠে বসে খেলা দেখতে না পারার গল্প বলা অবান্তর। ২০০৪ সালে একটি মাটির ব্যাংক কিনেছিলাম। উদ্দেশ্য এই টাকা দিয়ে বিশ্বকাপের খেলা দেখবো। এটা ছিল শুধুই একটি প্রতীকি ব্যপার। বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষায় ছিলাম বিশ্বকাপ খেলা মাঠে বসে দেখব বলে। আশায় গুড়েবালি। প্রথমদিন লাইনে দাঁড়াতে পারিনি শারিরিক অসুস্থতার কারণে। পরের দিন দীর্ঘ প্রায় ৩০ ঘন্টা নির্ঘুম, খাদ্যহীন দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে থেকে ব্যর্থ মনোরথে ফিরে আসার গল্প নাহয় নাই বললাম। অথচ চোখের সামনে দেখতে পেয়েছি কোন কষ্ট ছাড়া টিকেট পাওয়া কিছু মানুষের উল্লাস। শুনেছি অনেক হোমরাচোমরার বাসায় টিকেট পৌছে গেছে। টিকেটের পা গজিয়েছে!
শেষ মুর্হূতের ধস্তাধস্তি খেয়ে বাসায় আশার পর কেন জানি খুব শ্বাস কষ্টে ভুগছি। মনে হচ্ছে ফুসফুস ঠিক মতো বাতাস পাচ্ছে না। অনেক কষ্ট। কিন্তু মনকে কে তো বুঝাতে পারবো যে, আমি চেষ্টা করেছি, পারিনি। হয়তো এ জীবনে দেশের মাটিতে আর বিশ্বকাপ দেখা হবে না। মানুষ কদিন বাঁচে?
নাই পারলাম মাঠে বসে আমাদের সোনার ছেলেদের উৎসাহ যোগাতে। তাদের জন্য দূর থেকে আশির্বাদ। তোমরাই পারো আমাদের গৌরবান্বিত করতে।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১১ রাত ১২:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


