
মদীনার জনবসতির ইতিহাস ও ইহুদীদের অপেক্ষাঃ
মদীনার জনবসতী সম্পর্কে বলা হয়েছে, হযরত আব্বাস (রাঃ) এবং অন্যান্য ঐতিহাসিকদের মতে, যখন নূহ (আঃ) এর সময়ে তার অবাধ্য জাতির প্রতি আল্লাহ গযব নাযিল করেছিলেন, মহাপ্লাবন দিয়ে তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, তখন হযরত নূহ (আঃ) এর বংশধর বা এই নৈাকায় আরোহীদের বংশধর থেকেই পরবর্তীতে মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে । কালক্রমে এসব মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে নানা ধরনের মত ও পথের সৃষ্টি হয় । এদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষার সৃষ্টি হয় । হযরত নূহ (আঃ) এর সন্তান শাম এর ভাষা ছিল আরবী এবং তিনি মদীনায় এসে বসতি স্হাপন করেন । তার জনগষ্ঠেীকে ঐতিহাসিকগণ 'আমলেকা সম্প্রদায়' নামে চিহ্নিত করেছে ।
সিরিয়া থেকে মিশর পর্যন্ত এই আমলেকা সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণে ছিল । তারাই ছিল মদীনার বাসিন্দা । হযরত মূসা (আঃ) হজ্ব পালন করতে আসার সময় তার সাথে বণী ইসরাঈলী সম্প্রদায়ের বহু লোক এসেছিল । এই বণি ইসরাঈলীদের মধ্যে যারা তাওরাত কিতাব সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিল, তারা জানত, বিশ্বনবী (সাঃ) মদীনায় আগমণ করবেন এবং বিশাল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষিঠত করবেন । এই মদীনা নগরেই তার পবিত্র রওজা মোবারক হবে । মহান আল্লাহর নাযিল করা কিতাবের মাধ্যমে তারা বিশ্ব নবী (সাঃ) সম্পর্কে অনেক তত্বই জানতে পেরেছিলো । তাদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বনবী-কে দেখার আগ্রহী ছিলেন । হজ্জ্ব আদায় করে প্রত্যাবর্তন করার সময় অনেকেই মদীনার রাস্তা অতিক্রম কালে মদীনায় স্হায়ী ভাবে থেকে গিয়েছেলেন ।
বিভিন্ন ঐতিহাসিক হযরত আবু হোরায়রার বর্ণনা থেকে মন্তব্য করেছেন, বনী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের এ সমস্ত লোকদের মধ্যে যারা বয়সে বৃদ্ধ ছিলেন তারা তাদের বংশধরদের বলতেন, 'আমরা দীর্ঘকালব্যাপী সেই মহামানবের অপেক্ষা করলাম । আজ বয়সের শেষ প্রান্তে এসে পৈাছে গিয়েছি । সেই মহামানবের সাক্ষাৎ আমাদের ভাগ্যে হলো না ।যদি তোমরা সেই মহামানবের সাক্ষাৎ লাভ করো তাহলে তোমরা তার আনুগত্য স্বীকার করবে । তার আদর্শ গ্রহণ করবে । সমস্ত কিছুই বিনিময়ে হলেও তাকে সহযোগিতা করবে । '
মদীনায় আবস্হানরত ইসরাঈলীদের সম্প্রদায়ের মধ্যে এই কথাগুলো তাদের উত্তরাধিকার সুত্রে প্রচারিত হতে থাকে অর্থাৎ বিশ্বনবী (সাঃ) এর আগমন বার্তা এভাবেই ঘোষিত হতে থাকে । তাকে দেখার আপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে মদীনার সে অধিবাসীগণ । কোন শুভ মহুর্তে সে মহামানব জন্ম গ্রহণ করবে এবং সে সময়ে মহাকাশে কোন ধরণের পরিবর্তন সাধিত হবে, আকাশের কোন স্হানে কোন নক্ষত্র উদিত হবে তাও তারা অবগত ছিল । বনী ইসরাঈলীগণ অর্থাৎ ইহুদীরা বিশ্বনবী (সাঃ) এর সম্পর্কে সমস্ত কিছুই পূর্ব হতেই অবগত ছিল । আর তারা মদীনায় নবী (সাঃ) কে দেখার শুভ ইচ্ছাতেই বাসস্হান নির্মাণ করে অপেক্ষা করছিল । কিন্তু যখন নবী (সাঃ) কে সাহায্য সহযোগিতা করার সময় ঘনিয়ে এলো, তখন এই ইহুদীরাই নবী (সাঃ) এর প্রাণের শত্রু হিসাবে দাড়িয়ে গেল । বর্তমান সময় পর্যন্ত ও ইহুদীদের চেয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের বড় শত্রু আর কেউ নেই । এরা গোটা পৃথিবীতে অশূভ শক্তির প্রতীক হিসাবেই চিহ্নিত ।
নরপতি তুব্বাঃ
সে সময় ইয়েমেনে তুব্বা নামে একজন লোক বাস করত । তদানীন্তন ইয়েমেনে অর্থ সম্পদে সে ছিল অতুলনীয় শক্তির অধিকারী । মদীনার কোন এক লোক নাকি তার সন্তানকে হত্যা করেছিলো । এ কারণে সে অঙ্গীকার ব্যাক্ত করেছিলো , মদীনা নগরী ধ্বংস করে সমস্ত জনবসতি নিশ্চিহ্ন করে দেবে । তার এ প্রতীজ্ঞার কথা একজন জ্ঞানবৃদ্ধ আলেম জানতে পেরে তাকে গিয়ে বলেছিলো , 'আপনি আপনার এ অঙ্গীকার থেকে সরে আসুন । কারণ আপনার পক্ষে মদীনা ধ্বংস করা সম্ভব নয় । এই মদীনা নগরীতে একজন মহামানব আগমণ করবেন, যার নাম হবে আহমদ । তিনি হবেন আল্লাহর নবী । তিনি বিশাল উম্মতের অধিকারী হবেন এবং তার রওজা মোবারক হবে এই মদীনায় ।'
ধর্ম নেতার মুখে বিশ্বনবী (সাঃ) সম্পর্কে এ সমস্ত কথা জানতে পেরে তুব্বা নামক সেই ক্ষমতাধর লোকটির মন-মানসিকতা পরিবর্তন হয়ে গেল । মহানবীর প্রতি তার অন্তরে জান্নাতি ভাব সৃষ্টি হলো । তিনি প্রায় চারশত আলেম সহ মদীনায় আগমণ করলেন । সেখানে তিনি ঐ আলেমদের জন্য বাসস্হান নির্মাণ করে দিলেন এবং তাদের জীবন-যাপনের যাবতীয় ব্যাবস্হা সু-সম্পন্ন করলেন । তিনি নিজেও মদীনায় স্হায়ী ভাবে বসবাস করতে লাগলেন এবং বিশ্বনবী (সাঃ) এর জন্য একটা বাসস্হান নির্মাণ করলেন । তার মনে বড় আশা ছিল , তিনি নবীর সাক্ষাৎ লাভ করবেন । কিন্তু জীবনের শেষ মহুর্ত পর্যন্তও যখন সেই মহা-মানবের দেখা পেলেন না, তখন তিনি সেই নবীর উদ্দেশ্যে একটা পত্র লিখলেন ।
বিশ্বনবী (সাঃ) এর উদ্দেশ্যে তিনি লিখলেন,-'আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এর প্রতি যিনি আল্লাহর প্রেরিত পুরূষ । যদি আমি তার আগমণ কাল পর্যন্ত জীবিত থাকি তাহলে আমি তার সহযোগি হব এবং তিনি হবেন আমার ভাই ।' তিনি এই পত্র লিখে তার আলেমদের হাতে দিয়ে আবেদেন করেছিলেন ,'যদি আপনার ভাগ্যে সেই মহাপুরূষের দর্শন না ঘটে তাহলে আপনি আপনার সন্তানদের এ পত্র দিয়ে তাদেরকে আমার অনূরোধ জানিয়ে দিবেন । তাদেরকে বলবেন, তাদের ভাগ্যেও যদি তাকে দর্শন করার সুযোগ না হয় , তাহলে তারা যেন তাদের বংশধরদের কাছে আমার আবেদন জানায় এবং এই পত্র সেই মহামানবের হাতে পৈাছে দেয় ।'
এ ভাবেই তুব্বা নবী (সাঃ) এর আগমণের পূর্বেই তার প্রতি বিশ্বাস স্হাপন করে নিজেকে মুসলমান হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন । তার সে পত্র হাত বদল হতে হতে বিশ্বনবী (সাঃ) হাতে পৈাছেছিল । হযরত আবু আইউব আনসারী (রাঃ) এর বাড়ী-ই ছিল সে তুব্বার বাড়ী । তুব্বার সময় থেকে তার সময় পর্যন্ত বংশানুক্রমে ২১ যুগ অতিবাহিত হবার পরে সে বাড়ির তত্বাবধায়ক হযরত আবু আইউব আনসারী (রাঃ) নিযুক্ত হয়েছিলেন । তিনি-ই নবী (সাঃ) এর হাতে তুব্বার সে পত্র দিয়েছিলেন । মদীনায় যারা বিশ্বনবী (সাঃ) এর সহযোগিতায় এগিয়ে এসেছিল, তারা ছিল ঐ তুব্বা এবং তার সাথের সম্মানিত আলেমদের বংশধরগণ । তুব্বা যে আলেমের হাতে পত্র দিয়াছিলেন সে আলেমের নাম 'শামুল' বলে উল্লেখ করা হয়েছে । (ইবনে ইসহাক)
সূত্রঃ- হিজরতুন নবী বা বিশ্বনবীর হিজরত , মাওলানা আবু আইউব আনসারী, সালাউদ্দিন বইঘর, ৩৬, বাংলাবাজার , ঢাকা-১১০০, ৩৮, বাংলা বাজার, তয় তলা, ঢাকা-১১০০।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ সকাল ৯:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



