শিরোনামের উক্তিটি ভারত তথা উপমহাদেশের বিখ্যাত আলেম সাঈদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) এর । যে কথার সত্যতা বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে ঠিকই স্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে ।
বাংলাদেশের সামনে আজ অশনি সংকেত ।বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলাম ধর্মের ব্যাপক অবমাননা চলছে । সংবিধান সংশোধন করে আল্লাহর উপর থেকে আস্হা ও বিশ্বাস উঠিয়ে নেয়া হয়েছে । আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে ইসলাম এর বিরোধীতা করা হচ্ছে । দেশের তেল, গ্যাস, জায়গা জমি, মিডিয়া সব অন্যের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে । দেশের মানুষ বুঝতে পারছেনা কি বিপদ তাদের উপর ঘনিয়ে আসছে । সুশীল সমাজ বুঝতে পারছেনা কেন কিভাবে সব জোট পাকিয়ে যাচ্ছে ।
একাত্তরে পাকিস্তানী সামরিক শাসকদের অত্যাচার আর জামাতী ইসলামীর পাকিস্তানের দালালী এসব-ই ইসলামের বিরুদ্ধে মানুষকে বিষিয়ে তুলতে একশ্রেনীর মানুষের অজুহাত হিসেবে দাড় করিয়ে দিয়েছে । আমরা পরিস্কারভাবে বলতে চাই, ইসলামের পরিচয় কোন দল নয়। আর পাকিস্তান, জামাত ইসলামী বা সৈাদী আরব ইসলামের প্রতীক নয় । ইসলাম হলো আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস, আল-কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সুন্নাহ । ইসলাম হলো সমগ্র বিশ্বের জন্য এবং মহানবী (সাঃ) হলেন বিশ্বনবী । এটা নিয়ে কোন মতভেদ নেই ।
যাক, আসুন জেনে নেই সেই ১৯৮৪ সালে উপমাহদেশের আলেম দূরদর্শীভাবে বাংলাদেশে কয়দিনের জন্য বেড়াতে এসে কি সেই মূল্যবান কথাগুলো বলে গিয়েছিলেন । যা আজ অক্ষরে অক্ষরে সত্যে পরিণত হচ্ছে ।
'আমার প্রিয় বাংলাদেশি ভাই ও বন্ধুগণ । আপনারা আমার সালাম ও মোবারকবাদ গ্রহণ করুন । প্রথমেই আমি আল্লাহপাকের দরবারে নিজের এই ত্রুটি ও অপরাধ স্বীকার করছি যে, উপমহাদেশীয় মুসলমানদের বৃহত্তম আবাসভূমি বাংলাদেশে আমার দ্বীনি ভাইদের খেদমতে জীবনের প্রায় সায়ান্হকালে উপস্হিত হয়েছি । এজন্য আমি আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থী । উপস্হিত সূধীবৃন্দ পবিত্র কুরআনে আল্লাহপাক ইরশাদ করেছেন,
'যখন তোমাদের প্রতিপালক তোমাদেরকে এই বলে সতর্ক করে দিলেন যে , যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো তবে তোমাদেরকে আমি আরো প্রাচুর্য দান করবো । আর যদি কৃতঘ্ন হও তবে মনে রেখো; আমার শাস্তি ভীষণ কঠিন ।' (সূরা ইব্রাহীম-৭)
ইসলাম কোন স্বতন্ত্র বৈশিষ্টের বিষয় নয় । মুসলমানতো সকলেই ।ভৈাগলিক সীমারেখা, ভাষা, বর্ণ কিংবা জাতীয়তা আমাদের পার্থক্য করে না । কিন্তু শয়তান অত্যন্ত সুকৈাশলে এগুলো প্রয়োগ করে আমাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে । ইসলামী উম্মাহর মাঝে ফাটল ও বিভেদ সৃষ্টির অশুভ উদ্দেশ্যে নিয়েই শয়তান জাতীয়তাবাদ, বস্তুবাদ, বর্ণবাদ ও ভাষাগত সাম্প্রদায়িকতা সহ বিভিন্ন রকমের শয়তানী জাল বিছিয়ে দেয় । তাওহীদবাদী উম্মাহ সে ইন্দ্রজালে এমনভাবে ফেসে যায় এবং আপাত মধুর স্লোগানে এতই মোহগ্রস্ত ও বিভোর হয়ে পড়ে যে, তখন এক মুসলমান অন্য মুসলমানের খুন প্রয়াসী হয়ে উঠে । মুসলমানের হাতে মুসলমানের আবাদ ঘর বিরান হয় । মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠিত হয় । অসহায় বৃদ্ধ মুখ থুবড়ে পড়ে । নিষ্পাপ কচি শিশুর চাদ-মুখ নিষ্ঠুর পদাগঘাতে থেতলে যায় , তবু হায়েনার উম্মত্ত জিঘাংসা এতটুকু প্রশমিত হয় না ।
বন্ধুগণ ! এ শয়তানী জাল আমাদের ছিন্ন করতে হবে । ইসলামের উপরই আমাদের গর্ব করা উচিত । ইসলামের সাথে সম্পর্কযুক্ত বিষয়ের সাথেই আমাদের ভালোবাসা থাকা উচিত । হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে ,
' আল্লাহপাকের দরবারে এক হাবশী গোলামের মর্যাদা অভিজাত বংশীয় একজন সুখী সুন্দর মানুষের চেয়ে অধিক হতে পারে ।'
'অনারবের উপর আরবের কিংবা আরবের উপর অনারবের, তদ্রুপ কালোর উপর সাদার কিংবা সাদার উপর কালোর কোন শ্রেষ্ঠত্ব নাই ।'
'তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে শক্তভাবে আকড়ে ধর এবং পরষ্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না ।' (সূরা আল-ইমরানঃ ১০৩)
ভাষা ও বর্ণ শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয় । তাকওয়ার ভিত্তিতেই কেবল আল্লাহর মর্যাদা লাভ করা যেতে পারে । প্রিয় বন্ধু গণ ! আমার এ দুটি কথা মনে রেখো । প্রথম কথা হলো, ইসলামের সাথে এদেশের সম্পর্ক কোন অবস্হাতেই যেন শিথিল হতে না পারে । অন্যথায় তোমাদের শত শত মকতব মাদ্রাসা মূল্যহীন হয়ে পড়বে । আমি বলছি - আল্লাহ না করুন ইসলামই যদি এদেশে বিপন্ন হলো তবে মকতব মাদ্রাসার কোন যৈাক্তিকতা নেই । আমি সুষ্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই , আমার কথায় দোষ ধরবেন না । আমি মাদ্রাসারই মানুষ । মাদ্রাসার চৈাহদ্দিতেই আমার জীবন কেটেছে । তোমাদের পয়লা নম্বরের কাজ হচ্ছে এদেশে ইসলামের অস্তিত্ব রক্ষা করা । ইসলামের সাথে জাতির সম্পর্ক অটুট রাখা ।
দ্বিতীয় কথা হলো , যে কোন মূল্যে দেশ ও জাতির নেতৃত্ব এবং সঠিক পথ নির্দেশনা নিজেদের হাতে নিতে হবে । আর তা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণের মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাধান্য অর্জন ছাড়া কখনো সম্ভব নয় । দেশের ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি যদি উদাসীন ও নির্লিপ্ত থাকি তবে তা স্বাভাবিকভাবেই অনৈসলামিক শক্তির হাতে চলে যাবে । ফলে যে ভাষা ও সাহিত্য হতো পারতো ইসলাম প্রচারের কার্যকর মাধ্যম তা হয়ে দাড়াবে শয়তানের শক্তিশালী বাহন । আপনাদের এখানে কলকাতা থেকে অশ্লীল সাহিত্য আসছে । সাহিত্যের ছদ্দাবরণে কমিউনিজমের প্রচার চলছে । ইসলামী মূল্যবোধ ধ্বংসের মাল মশলা তাতে মিশানো হচ্ছে । আর সরলমনা তরুণ সমাজ গোগ্রাসে তাই গিলছে । এর পরিণতি কখানো শুভ হতে পারে না ।
প্রবীণ ও নবীনদের মাঝে এবং আলেম সমাজ ও আধুনিক শিক্ষিত সমাজের আজ যে ব্যবধান পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং ক্রমশ যে ব্যবধান বিস্তৃত হচ্ছে যত দ্রুত সম্ভব তা অপনোদন করুন । উভয়ের মাঝে সেতু বন্ধন রচনা করুন এবং পরষ্পর পরিচিত হোন এবং আলিঙ্গনাবদ্ধ হোন । উভয়ের সম্মিলিত প্রচষ্টোই কেবল এদেশকে , এ জাতিকে অফুরন্ত ঈমানী শক্তির আধার এবং ইসলাম ও ইসলামী উম্মাহর পতাকা উচুতে তুলে ধরতে পারে । আপনারা ইসলামী উম্মাহার দ্বিতীয় বৃহত্তম পরিবার । এ পরিবারের প্রতিটি সদস্যকেই স্ব স্ব দায়িত্ব, শক্তি ও যোগ্যতা সম্পর্কে পূর্ণ মাত্রায় সচেতন থাকতে হবে ।
ভাই ও বন্ধুগণ ! আল্লাহর শোকর আদায় করুন । কতবড় দেশ আপনাদেরকে আল্লাহ দান করেছেন । এদেশ সম্পর্কে কুদরতের ফয়সালা এইযে , ইসলামের মাধ্যমেই এদেশ সম্মান ও গৈারব লাভ করবে , কল্যাণ ও নিরাপত্তা লাভ করবে । মসজিদে নববীর প্রতিনিধিত্বকারী আপনাদের এ মসজিদ মিম্বরে বসে বলছি , এদেশের সুখ-শান্তি , মর্যাদা ও নিরাপত্তা ইসলামের সাথেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত । আল্লাহ না করুন , যদি এদেশ কখনো আল্লাহর নেয়ামতের ব্যাপারে কৃতঘ্ন প্রমাণিত হয়, ইসলামের সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে পড়ে কিংবা এদেশের মানুষ আল্লাহর রজ্জুকে ছেড়ে অন্য কোন রজ্জু আকড়ে ধরতে চায় তবে এদেশের ধ্বংস অনিবার্য । কোন পরিকল্পণা ও প্রকল্প এবং বাইরের কোন সাহায্য ও ছ্ত্রছায়াই এ দেশকে আল্লাহর প্রতিশোধ থেকে রক্ষা করতে পারবেনা ।
বন্ধুগণ , পরদেশী মুসাফির ভাইয়ের কথা যদি স্মরণ থাকে তবে একদিন না একদিন তার গুরুত্ব আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন । 'তোমাদের যে কথাগুলো বলছি তা অদূর ভবিষ্যতে তোমরা স্মরণ করবে ; আমি আমার যাবতীয় বিষয় আল্লাহর হাতে সোপর্দ করছি । নিশ্চয় আল্লাহ তার বান্দাদের সব কিছু দেখেন । "
আকাশের ফেরেশ্তারা শুনে রাখুক এবং কিরামান কাতেবিন লিখে রাখুক যে, প্রতিবেশী ভাইদের প্রতি আমি আমার দায়িত্ব পূর্ণ করেছি । আমি আবার বলছি - শেষ বারের মত বলছি ,তোমরা যদি এদেশের মাটিতে বাচতে চাও ; তবে ইসলামের আস্তিত্ব রক্ষা করো । এটাই হচ্ছে একমাত্র উপায় । আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন ।
সূত্রঃ প্রাচ্যের উপহার । সাঈদ আবুল হাসান আলী নদভী ।
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০১১ রাত ২:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




