ঈসা ইবনে মূসা হাশেমী খলীফা আবু-জাফর মনসূরের একজন সভাসদ ছিলেন । তিনি তার সুন্দরী স্ত্রীকে অত্যধিক ভালোবাসতেন । একদিন জোসনা রাতে স্ত্রীর সাথে বসে হাসি তামাসার ছলে বলে ফেললেনঃ তুমি তিন তালাক, যদি তুমি চাদ অপক্ষো অধিক সুন্দরী না হও । একথা বলতেই স্ত্রী পর্দায় চলে গেল এবং বললঃ আপনি আমাকে তালাক দিয়েছেন । এরপর ঈসা ইবনে মূসা চরম অস্হিরতার মধ্যে রাত্রি অতিবাহিত করলেন । আসলেই কি বউ তালাক হয়ে গিয়েছে ? হায় হায় ! আমি হাসি ঠাট্রার ছলে কি বলতে কি বলে ফেললাম ।
প্রত্যুষ্যে উঠে খলিফা আবু জাফর মনসূরের কাছে উপস্হিত হয়ে গতরাতের সমস্ত বৃত্তান্ত জানালেন । খলিফা তখন ফতোয়াবিদ আলেমগণকে ডেকে মাসাআলা জিজ্ঞেস করলেন । আসেলই বউ তালাক হয়েছে কিনা ? প্রায় সবাই এক উত্তরে জানালেন যে, বউ তালাক হয়ে গিয়েছে । কেননা তাদের মতে, চন্দ্র অপক্ষো সুন্দর হওয়া কোন মানুষের পক্ষেই সম্ভবপর নয় । কিন্তু ইমাম আবু-হানীফার জনৈক শিষ্য চুপ চাপ বসে ছিলেন । খলিফা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি নিশ্চুপ কেন ? তিনি বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম পাঠ করে সূরা আত-ত্বীন তেলাওয়াত করলেন ।
১. শপথ আন্জীর ও যয়তুন ফলের ।
ওয়াত্ব তীনি ওয়াজ- যাইতুনি ।
২. এবং তুরে সিনীনের (সিনাই পর্বতের )
ওয়া তুরে সিনীইনা
৩. এবং এই নিরাপদ নগরীর ।
ওয়া হাযাল বালদিল আমিন ।
৪. আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সর্বোত্তম কাঠামোয় (অবয়বে )
লাক্কাদ খালাক-নাল ইনসানা ফি আহসানি তাকউইম ।
৫. অতঃপর তাকে পরিণত করি নীচতমদের নীচে ।
ছুম্মা রাদাদ নাহু আছ-ফালা ছাফিলীন
৬. তারা ব্যতীত যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে ,
ইল্লাল লাজীনা আমানু ওয়া আমিলুস ছোয়ালিহাতি
৭. তাদের জন্য রয়েছে সীমাহীন পুরস্কার ।
ফালাহুম আজরুন গায়রু মামনুন ।
৮. অতঃপর (হে নবী) , বিচারদিবস (শাস্তি ও পুরস্কার) সম্মন্ধে কে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলতে পারে ?
ফামা ইয়ুকাজ্জিবুকা বায়দু বিদ্দীইন ।
৯. আল্লাহ কি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক নন ?
আলাইসাল্লাহু বি আহকামিল হাকীমিন ।
অতঃপর বললেন, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন যে, মানুষ মাত্রেরই অবয়ব সুন্দরতম । কোন কিছুই মানুষ অপেক্ষা সুন্দর নয় । একথা শুনে উপস্হিত আলিম গণ বিস্ময়াভূত হয়ে গেলেন এবং কেউ বিরোধিতা করলেন না । সেমতে খলিফা তালাক হয় নি বলে রায় দিলেন ।
( এ ঘটনা থেকে জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান আলেমদের মধ্যে পার্থক্য বুঝা যায় । পড়লেই এবং সার্টিফিকেট থাকলেই জ্ঞানী হয় না - জ্ঞানের মর্ম বুঝতে হয়। সময় মত সঠিক স্হানে সঠিকভাবে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা ব্যবহার করা গেলে দুনিয়া ও আখেরাতের প্রভূত ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায় । তাই সঠিক ও জ্ঞানী আলেম নির্বাচন খুব জরুরী । )
মানুষের থেকে সুন্দর ও উত্তম সৃষ্টি কিছু নাইঃ
এ সূরায় চারটি বস্তুর শপথ করা হয়েছে । এক, ত্বীন অর্থাৎ আন্জীর তথা ডুমুর ফল বা বৃক্ষের । দুই, যয়তুন ফল বৃক্ষের । তিন, সিনাই পর্বতের । এটা এ কারণে হতে পারে যে এই দুটি ফল যেমন উপকারী তেমনি সিনাই পর্বত ও মক্কা নগরী তেমনি স্হানের দিক থেকে পবিত্র স্হান । আবার এমনও হতে পারে যে, ত্বীন ও যয়তুন উল্লেখ করে এ দুটি বৃক্ষ যে স্হানে বেশী হয় সে স্হান তথা শাম (ইরাক) দেশের দিকে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে । যা নবী-রাসূলদের আবাসভূমি । হযরত ইব্রাহীম (আঃ) সে দেশে বাস করতেন । তুর পাহাড়ে মূসা (আঃ) আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন । সিনাই -এ তূর পর্বত অবস্হিত । নিরাপদ শহর হলো মক্কা - যা শেষ নবীর জন্মস্হান ও কাবার অব্স্হান ।
শপথের পর আল্লাহ বলছেন, তিনি মানুষকে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে সুন্দর করেছেন । ইবনে আরাবী বলেন, আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে মানুষের থেকে সুন্দর আর কেউ নেই । এছাড়াও আল্লাহতায়ালা মানুষকে জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, কুশলী ও শক্তিমান করেছেন । যা আর কোন সৃষ্টিকেই দেয়া হইনি । মানুষ-ই মানুষের প্রতিদ্বন্দি অন্য আর কোন প্রাণী নয় । কিন্তু অন্য প্রাণীদের বেলায় তা খাটে না ।
আবার এ মানুষ-ই হয়ে সব থেকে নীচ ও অধমঃ
আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন,
আবার এই অপূর্ব সুন্দর সৃষ্ট মানুষ-ই হয়ে যায় সব থেকে নীচ ও খারাপ, যখন সে পাপাচারে লিপ্ত হয় । তার বাহ্যিক রূপ ও সৈান্দর্য্য যতই আকর্ষণীয় হউক না কেন তার খারাপ স্বভাব চরিত্র ও কর্ম এর কারণে সে সকলের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয় । তখন তার বহ্যিক সৈান্দর্য্য গৈাণ হয়ে যায় । সমাজে অশান্তিু ও বিশৃংখলা তৈরীর কারণে সে হয় লান্ছিত ও অপমানিত ।
কিন্তু সব মানুষ এরকম হয় না , তারা কারা ?
তাদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, তারা ব্যতীত যারা ঈমান আনে অর্থাৎ আল্লাহর উপর বিশ্বাস রাখে, সৎ কাজ করে । আল্লাহ তাদের ঈমান ও সৎকাজের পুরস্কার স্বরূপ এই দুনিয়াতে-ই তাদের সম্মান বৃদ্ধি করে দেন । আর পরকালে তো তাদের জন্য রয়েছে অশেষ পুরস্কার ও প্রতিদান ।
মহানবী (সাঃ) বলেছেন, "উত্তম লোক সে, যার বয়স হয় দীর্ঘ আর কর্ম হয় সুন্দর । (তিরমিযী)
এসব বর্ণনা করে আল্লাহ নবীকে বলছেন এসব দৃশ্যমান হওয়ার পরেও কে আপনাকে বলছে যে , কিয়ামত হবে না ? এই যে ঈমান আনা ও ভালো কাজ করার ফলস্বরূপ মানুষের ভালো হওয়া এবং খারাপ কাজ করার দরুণ খারাপ পরিণতি ভোগ এটাইতো প্রমাণ করে যে আল্লাহ মানুষকে তার যথাযথ কর্মের ফল দান করেন । যা সমাজের দিকে তাকালেই দেখা যায় ও বুঝা যায় । তারপরও এটা অবিশ্বাস করার কি আছে যে বিচার হবে না - মানুষ কর্মফল পায় না ?
সবশেষে আল্লাহ প্রশ্ন করেছেন, তিনি কি সর্বশ্রেষ্ঠ বিচারক নন ?
কত অল্প কথায় আল্লাহ কত কিছু-ই না বুঝিয়ে দিলেন ।
----------------------------------------------------------------------------
সম্মানিত পাঠকবৃন্দ, এটি অত্যন্তু ছোট ও সুমধূর সুরা । যা মুখস্ত করা খুব-ই সহজ । অনুগ্রহ করে একটু সময় নিয়ে এটা মুখস্ত করে ফেলুন । অবশ্যই আল্লাহ এতে সন্তুষ্ট হবেন এবং উত্তম প্রতিদান দান করবেন । ধন্যবাদ সবাইকে ।
-----
সূত্রঃ তফসীরে মারেফূল কুরআন । হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী (রঃ), অনুবাদ- মাওলানা মহিউদ্দিন খান । ইসলামিক ফাউন্ডেসন, বাংলাদেশ ।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১২ বিকাল ৩:৪৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



