গল্পের শুরু-পর্ব ১
সাল ২০০২ জানুয়ারি মাসের কোন একদিন;
ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডের এক চাইনিজ রেস্টরেন্টে সদ্য বিদেশ প্রত্যাগত বন্ধুর বদান্যতায় এক গুস্টি বন্ধু মিলে আড্ডা আর খাওয়া চলল রাত দশটা অব্দি!
ফেরার পথে ওখানে কোন ট্যাকসি ক্যাব না পেয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম হেটে গিয়ে খেজুর বাগান মোড় থেকে গাড়িতে উঠব। আড়ং এর সামনে দিয়ে রাস্তা পার হতে গিয়ে দেখি দুজন সার্জেন্ট একটা ট্রাফিক পুলিশ আড্ডা দিছে সাধারন দৃশ্য তাদেরকে অতিক্রম করতে গিয়েই ঘটল ঘটনাটা। হঠাৎ একটা মাল বোঝাই ট্রাক দেখে তারা অতিদ্রুত রাস্তার মাঝে গিয়ে দাড়াল। প্রথমে সার্জেনটি হাত উচু করে ট্রাকটি থামানোর ব্যার্থ চেস্টা করল ট্রাকটি তাকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত এগিয়ে গেল। ট্রাফিক পুলিশটি বেশী সাহসিকতার পরিচয় দিতে গিয়ে রাস্তার মাঝখানে দুহাত প্রসারিত করে ট্রাকটি রুখবার চেস্টা করল। কিন্তু সে যখন লক্ষ্য করল যন্ত্র দানবটি তাকে লক্ষ্য করে ধেয়ে আসছে তখন জীবন বাচানোর তাগিদে তার উর্ধ্ব শ্বাস দৌড় ছিল দেখার মত!
আমরা এ দৃশ্য দেখে হাসতে হাসতে তাদেরকে বললাম 'কি ভাই।ইস অল্পের জন্য কালকের পত্রিকার হেডলাইন হলেন না।'সার্জেন্ট দুজন একটু লাজুক হেসে মাথা নিচু করল। আর ট্রাফিক পুলিশটি হেহে করে ক্যাবলার মত হাসছিল যেন ব্যপারটা তার জন্য খুবই উপভোগ্য।
তিরিশ বছর বয়সে আধাআধি বেকার আমি(বয়স ত্রিশ পেরিয়ে গেছে বছর খানেক আগে)। এই বয়সে সকার থেকে আচমকা বেকার হয়ে গেলে জীবনে যে কি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেমে আসে সেটা শুধু ভুক্তভোগীরাই বোঝে। পুরোপুরি বেকার বললে ভুল হবে –ব্যাবসা বানিজ্য আছে এদিক ওদিক কিন্তু কোনখানেই সুবিধে করতে পারছিনা। একটা ব্যাবসা পার্টনার দেখে যেখানে তার খরচ-ই ওঠাতে হিমসিম খায়, আমার ভাগ্যে লবডংকা! মাঝে মধ্যে গেলে দুপুরে তার সাথে লাঞ্চ ভাগাভাগি করি।
আরেকটা ব্যবসার গলায় ফাঁস আটকে মরমর অবস্থা!
মাঝে রমরমা অবস্থা ছিল,তখন টাকারে টাকা মনে করিনাই।এখন অর্থনৈতিক টানাপোড়েন সব্বোচ্চ সীমায়।ফাও কামে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরি।
ছোট বেলা থেকেই ইচ্ছে ছিল মিডিয়াতে কাজ করার-উমহু মিথ্যে বললাম। নায়ক হবার ইচ্ছে ছিল খুব! তখন রমরমা বাজার নায়ক রাজ রাজ্জাকের। মনে সুপ্ত বাসনা ছিল একদিন তার মত নায়ক হব।
খুব ছোট বেলায় আমার বাবা আমাকে সাথে করে ফরিদপুরে তার এক বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন। মুজিব তখন বেঁচে ছিলেন। মুজিব কোটের হেভী চল তখন।আমার পরনে তার ক্ষুদে সংস্করন। ভদ্রলোকের বিশাল বপু জাদরেল চেহারা- নামরা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। কট্টর মুজিব ভক্ত! তাকে দেখেই হাড়ে কাপুনি ধরে। তার পরনেও পাঞ্জাবীর উপরে মুজিবকোট। আমার বাবাকে দেখে দারুন খুশি।
আমাকে কাছে টেনে গায় মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বাবা তুমি পরাশুনা শুরু করেছ? আমি ঘাড় নেড়ে জানালাম হ্যা করেছি।
বাহ বেশ তো! তা তোমার বড় হয়ে কি হবার ইচ্ছে বলতো?
আমি ফট করে বললাম, আমি বড় হয়ে রাজ্জাক হব।
সঙ্গে সঙ্গে বিরাশি সিক্কার ধমক! এক ধমকে আমি প্রায় আধমরা!
-কেন তুমি রাজ্জাক হবে। তুমি হবে বঙ্গবন্ধুর মত একজন বড় মাপের নেতা!
তখন আমি বুঝলাম। আমি ইচ্ছে করলে একজন নেতাও হতে পারি। নেতা হওয়া ও মানুষের সপ্নের মধ্যে পড়ে।
তবে ধমক দিলেই কি আর না দিলেই কি আমার দৃঢ় সংকল্প ছিল আমি নায়ক হব।
বয়সের সাথে সাথে ইচ্ছে গুলোও পাল্টায়।
এটিএন তখন টপ টেন আর আবুল বিড়ির খোলস থেকে বের হতে ব্যাস্ত। চ্যানেল আই তখনো আধা মিউজিক চ্যানেল। একুশের বাজার রমরমা! আরো দু-চারখান চ্যানেল আসার পায়তারা করছে। চলচ্চিত্র তখন অশ্লীলতার তকমা এটে হাঁসফাঁস করছে। নাটক আর বিজ্ঞাপনের বাজার হেভী হিট!
নায়ক হবার ইচ্ছেগুলো উবে গেছে কবে! এখন ইচ্ছে পর্দার পিছনে কাজ করার।এই লাইনে দু-চারজন বন্ধু বান্ধব খুজে বের করেছি।এদের সাথে মাঝে মধে আড্ডা চলে।
গল্প লিখে তার নাট্যরুপ দেবার চেষ্টা চালাচ্ছি-সাথে ক্যামেরা লাইট এডিটিং অল্প বিস্তর বোঝার চেস্টা করছি।
পকেটের অবস্থা এত করুন যে প্রেমিকার জন্মদিনও ইচ্ছে করে ভুলে যাই। প্রায় রাতেই খাবার টেবিলে চলে বাবা মার সাথে ঝগড়া। আর ভাল লাগেনা। বাসার কেউ আমার মত করে বোঝার চেস্টা করে না। কেউ কেউ বেশী মাত্রায় স্বার্থপরের মত ব্যাবহার করে। সোজা কথা বললে সেটাকে বাঁকা ভাবে নেয়। সবার কাছে টাকাটাই মুখ্য। সফলতা অর্থ্যই অর্থ অন্যকিছু নয়।
ফেব্রুয়ারীর কোন এক দুপুরে;
বড় ভাইয়ের এক জাপানীজ ক্লায়েন্টের দুজন প্রতিনিধি দারুন সুদর্শন মি.কাজী ও তার কলিগ মিস ফুনিও বাংলাদেশে আসলে আমার দায়িত্ব পড়ল ইপিজেড ঘুরিয়ে স্মৃতিসৌধ দেখিয়ে আনা। আশুলিয়া হয়ে ই পি জেড এ
গেলাম এই প্রথমবার- বড় ভাইয়ের ড্রাইভার আমার থেকে ভাল রাস্তা চেনে। অনেক দিন পর আশুলিয়ার দুপাশের দৃশ্য ভাল লাগল। কিন্তু হাউজিং কোম্পানীর আগ্রাসনে হয়তো এ সৌন্দর্য আর বেশীদিন উপভোগ করা যাবে না। দুর থেকে দেখলাম 'ফ্যান্টাসী কিংডম' আন্ডার কনস্টাকশন।
ফেরার পথে সাভার স্মৃতি সৌধে।আচমকা ফুনিও অসুস্থ হয়ে পড়ল।অগত্যা কাজী কে স্মৃতি সৌধে ঘুরিয়ে দেখালাম। ছবি তুলছিলাম।
আচমকা কয়েকটা কলেজ পড়ুয়া মেয়ে আমার কাছে অনুরোধ করল বিদেশী ভদ্রলোকের সাথে ছবি তুলবে। আমি টাসকি খাইলাম! কাজী'কে সেই কথা বলতেই কাজী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সেই প্রথম ও শেষ বার, এমন সুদর্শন (জাপানিজদের মধ্যে বিরল) দুর্দান্ত স্মার্ট পেশীবহুল কাজিকে আমি এতটা বিচলিত দেখেছিলাম।
এতগুলো ভিন দেশী মেয়েদের মাঝখানে সে পোজ দিতে গিয়ে পুরো দৃশ্যটাই চরম হাস্যকর করে ফেলল!
ওহ্ হো -কাজী'কে নিয়ে আর হয়ত কিছু বলা হবেনা-তাই এইখানে বলে নিচ্ছি। চাকুরী ও ব্যাবসায় চরম সফর এই মানুষটা- বিশ বছর বয়সে তার ডায়েরিতে লিখেছিল, বয়স তার চল্লিশ হলেই সব কিছু ছেড়ে দিবে। অর্থের পিছনে আর ছুটবে না শুধু দেশ ভ্রমন করে বাকি জীবনটা কাটাবে।
সম্ভবত, দু হাজার এগার সালের এপ্রিলে তার চল্লিশ পূর্ণ হল। সে চল্লিশতম জন্মদিনে সত্যিকারেই সবকিছু থেকে অবসর নিয়েছে- স্ত্রীর চোখের জল, কোম্পানীর মালিকের অনুরোধ, কলিগ আর বন্ধুদের অনুনয় বিনয় কিছুই তাকে ঠেকাতে পারেনি।
দুদিন বাদে;
ফাঁসে আটকে যাওয়া ব্যাবসায় আরেকটা লস! দুশ্চিন্তা শুরু হয়ে গেল। যত ভাবি যা হয় হোক আর দুশ্চিন্তা করব না- তবুও পারিনা। ‘কম্বল তো ম্যায় ছোড় দিয়া- লেকিন কম্বল মুঝে নেহি ছোড়তা।'
এইটা একটা জোকস থেকে নেয়া-
জোকসটা দুই আফগানস্থানী কাবুলীওয়ালা কে নিয়ে(আফগান যেহেতু সেহেতু যথাসম্ভব ওরা পুশতু ভাষায় কথা বলছিল-কিন্তু এখানে বাংলা ও হিন্দির সংমিশ্রন হয়েছে);
হতদরিদ্র ভীষন কৃপন দুই কাবুলীওয়ালা, প্রমত্তা পদ্মার মত বিশাল এক নদীর পাড় দিয়ে যাচ্ছিল- আচমকা একজনের নজরে পড়ল নদীর মাঝখানে কালোমত কি যেন একটা ভাসছে। সে তার বন্ধুর দৃষ্টি আকর্ষন করে অনেক চিন্তা ভাবনার পরে দুজনে একমত হল যে, ভাষতে থাকা কালো বস্তুটা আর কিছু নয় নির্ঘাৎ কম্বল হবে।
দুজনের মধ্যে যে ভাল সাতার জানে সে বলল তুই একটু অপেক্ষা কর আমি সাতরে গিয়ে কম্বলটা নিয়ে আসি।
গেল সে সাতরে কম্বল আনতে অনেক্ষন ধরে টানাটানি করল কম্বলটা কিন্তু কম্বর একচুলও নড়ে না।
ওদিকে পাড়ে দাড়িয়ে থাকা অন্য বন্ধু টেনশনে পড়ে গেল কি ব্যাপার কম্বল আনতে এত কষ্ট হচ্ছে কেন?
সে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, কিরে কি ব্যপার কম্বল আনতে এত দেরী হচ্ছে কেন?
প্রতি উত্তরে ওই বন্ধু বলল, আরে ভাই টানাটানিতো করতেছি কিন্তু কম্বলতো আসে না।
খানিক বাদে সেইখানটায় একটু আলোড়ন।মনে হচ্ছে বন্ধুটা কম্বলের সাথে ধস্তাধ্বস্তি করছে। সে তখন ভয় পেয়ে বলল,
কিরে কি হইল? না পারলে থাক তুই কম্বল ফেলে দিয়ে চলে আয়।
(জোকসটা যিনি বলেছেন তার ভাষায় ওইটা ছিল একটা জলহস্তি। শান্ত স্বভাবের প্রাণীটি প্রথমে গা করেনি , পরে যখন তাকে ধরে চরম টানাটানি শুরু হল তখন সে রেগে গিয়ে কাবুলীওয়ালাকে জাপটে ধরল। শুরু হল ধস্তাধ্বস্তি!তখন সে কম্বল ছেড়ে বাচার আশায় ছটফট করছে।এশিয়ার কোন নদীতে জলহস্তি আছে কলে আমার জানা নেই।তবে জোকস এর খাতিরে মেনে নেয়া যায়।)
প্রতিউত্তরে ডুবে যেতে যেতে কোন মতে তার বন্ধু চিৎকার করে বলল, ইয়ার, কম্বলতো ম্যায়নে ছোড় দিয়া লেকিন কম্বল মুঝে নেহি ছোড়তা!
(উর্দু আর হিন্দিতে আমার সাংঘাতিক রকমের দখল! তাই ভাষাগত ভুলভ্রান্তি মার্জনীয়)
ক্রমশ...
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০১১ রাত ৮:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


