২.
সাল ২০০২, পহেলা ফেব্রুয়ারীর বিকেলে ;
আমার দুই চরমপ্রকৃতি প্রেমী ডাইলখোর বন্ধু জোর করে দক্ষিন পাইকপাড়া নিয়ে গেল।ওদের মধ্যেযে পালের গোঁদা তার বড় ভাই নাকি একখন্ড জমি কিনেছে সেটা দেখাতে।বলল চল-শহরের মাঝে ছোট্টএকটা গ্রাম দেখে আসি।
কাজকর্ম নাই-কি আর করার, এমন ভাবে বলল যে না করতে পারলামনা, গেলাম ওদের সাথে। দশ কাঠা জমির উপর ছোট্র একটা জীর্ন টিনের ঘর। প্রচুর গাছপালা ঘেরা নির্জন ঘরে ঢুকে আসলেই ভাল লাগছিল।ওরা এসেই ডাইলের ফিলিংস-এ ডুব দিয়েছে।।
হঠাৎ বাইরে শেরগোল কারা এসে যেন দরজা পেটাচ্ছে। বন্ধু দুজন বাইরে যেতেই শুরু হল উচ্চস্বরে চেঁচামেচি।ব্যাপার বুঝতে দেরি হল- কিছু উটকো ছেলে এসে বড় অংকের চাদা দাবি করেছিল নাকি।এই নিয়ে চরম অবস্থা- খুনোখুনির পর্যায়ে যায় প্রায়। আমি পড়লাম কোন ফ্যাসাদে!
ওই মাসে তিন তিনটে বিয়ে ছিল বন্ধু আর আত্মীয়ের। একটায় গেলাম বাধ্য হয়ে-অন্যগুলোয় বিরাট কর্মব্যাস্ততা দেখিয়ে সটকে গেলাম!
অনেক টাকা দেনা হয়ে গেছি। টেনশনে ইদানিং মাথার চুল পরে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে হাই প্রেশারও হয়েছে।
আজ এমির(আমার তিনি) সাথে দেখা করার কথা ছিল। পকেটে টাকা নেই। ও ফোন করেছিল অসুখের অজুহাতে এড়িয়ে গেলাম।
সেদিন কাট দিলেই দুদিন বাদে ঠিকই তার সাথে দেখা করতে বের হলাম। যদিও খুব একটা ইচ্ছে করছিল না।প্রচন্ড মানসিক টেনশন।মাঝপথে ও ফোন করল। বলল বিশেষ কাজে আটকে গেছে জানাল কাল দেখা করবে।উফ বাচলাম!
মোবাইলের আউটগোয়িং বন্ধ। কিছু মানুষের টাকা দেবার কথা।টাকা দিতে ক’দিন দেরি হবে সামনাসামনি বলতে লজ্জা লাগে – টেলিফোনে একটু সহজ।দেনার ভার কখোনো আমাকে এতটা চেপে বসেনি। পথেই একজন ফোন করল। আমি খুব দুঃখ প্রকাশ করলাম। জানালাম যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওর টাকা দিয়ে দিব।নিজের আত্ম মর্যাদায় ভীষন আঘাত লাগছিল।
মাসের দশম দিনে মোবাইলের ইনকামিংও গন। দুইদিন ঝিম মেরে থাকলাম। লাইন চালু করার কোন উদ্যোগ নিলাম না ।
১২ তারিখ সকালে বড় বোনের কাছে মোবাইল বিল দেয়ার জন্য টাকা ধার চাইলাম। খুব সহজেই দিয়ে দিল। গুলশানে গেলাম বিল দিতে।
এমি ঠিক দু-দিন ধরে চেস্টা করছে,স্বভাবতই আমাকে পাচ্ছে না! মজাই লাগছে! দুপুরের দিকে লাইন চালু হল। কিছুক্ষন পরেই ও ফোন করল। আমি বিনিত ভাবে স্যরি বললাম। সে জানাল মোবাইল বন্ধ দেখে খুব টেনশনে ছিল। সেটাই স্বাভাবিক- মনে মনে হাসলাম! বলল কাল দেখা করবে। আচমকা কিছু ধার দেয়া টাকা ফেরৎ পেলাম।যাক আগামী কয়েকদিনের জন্য নিশ্চিন্ত।
১৩ ফেব্রুয়ারী -পয়লা ফাল্গুন। এমির সাথে আজকে হয়ত দেখা করতেই হবে। সেজন্য একবারে প্রিপারেশন নিয়ে বের হওয়ার উদ্যোগ নিলাম। বের হওয়ার কিছুক্ষন আগে ও ফোন করল। জানাল জরুরি মিটিং-এর জন্য আজ বের হতে পারবে না।
প্রতিদিনই দেখা করার সময় কেন যে একটা সমস্যা হয়ে যাচ্ছে, বিষয়টা নিয়ে সে বেশ চিন্তিত মনে হল।আমি ফের হাঁফ ছেড়ে বাচলাম!
আজকের পোগ্রাম ক্যানসেল অগত্যা বাসা থেকে বের হলাম বই মেলার উদ্যেশ্যে। বাসে ওঠার মুখে বেশ ডাকসাইটে এ্যাড এজেন্সীতে কর্মরত আমার এক সাথে দেখা। তারও সপ্ন প্রোডাকসনে যাবার- কিন্তু ভীষন ঢিলা টাইপের মানুষ সে। একসাথে গল্প করতে করতে প্রেসক্লাব পর্যন্ত গেলাম।ওকে বললাম এখনই কোন প্রোগ্রাম প্রোডাকসন করার জন্য।সময়টা ভাল যাচ্ছে- অযথা কেন সময় ক্ষেপন করছে?
সেদিনের একটা টুকরো গল্পো : রশিদ। আমার সেই পার্টনারশীপ ব্যাবসার অফিস বয়। দারুন বিশ্বস্ত।কালো বেটে মত গোলগাল টাইপ। একটু ধীর। কথা খুব কম বলে,মুখ বুজে কাজ করে কোন কিছুতেই না করে না।সেই সঙ্গে খুব মিতব্যায়িও।
প্রচন্ড কর্মঠ হলেও বাইরে কোন কিছু আনতে পাঠালে প্রায়শই উধাও হয়ে যায়। এক আধ ঘন্টা থেকে কয়েক ঘন্টা এমনকি কয়েকদিনও উধাও থাকার নজির আছে। তবে যেটা আনতে দিয়েছি সেটা ঠিকই পৌছে যেত। যখন সে ফিরে আসত তখন দেরীর কারন জানতে চাইলে লাজুক হেসে মাথা নিচু করে বলে(বেশীর ভাগ সময়),ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলাম।
ব্যাস ওইটুকুই,যতই রাগারাগী করা হোক মুখ বুজে থাকে টু শব্দটি করে না।
মাঝে মাঝে অবশ্য খুব মজার মজার কথা বলে।যেমন আজ :
দুপুরে আমি একা ছিলাম। বন্ধু কাম পার্টনার অসুস্থ!
টেলিফোনে এক বন্ধুর সাথে কথা শেষে ক্যাডেলে রিসিভার নামিয়ে রাখতেই হঠাৎ ও প্রশ্ন করল, আচ্ছা ... ভাই বইমেলা কই হয়?
আমি বললাম বাংলা একাডেমিতে, এত কাছে থাক জাননা ? বলেই একটু বিব্রত বোধ করলাম। ভাবলাম ওরতো জানার কথা নয়। আমরা তথাকথিত শিক্ষিতরাই কজন এর খবর রাখি।
ও দ্বীতিয় প্রশ্ন করল, বাংলা একাডেমি কই?
আমি তার কাছে জানতে চাইলাম টি এস সি চেনে কিনা?
ও সঙ্গে সঙ্গে বলল, ও বুচ্ছি আর কইতে হবে না। চিনতে পারছি।
আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ওখানে বই কিনতে যাবা।
সে একটু লাজুক হেসে(তার চিরাচরিত ভঙ্গী) বলল, না,সোহাগরে চিংড়ি খাওয়াইতে নিয়া যাব।
আমি বিস্ময়ের দৃস্টিতে তার দিকে চেয়ে বললাম, কি চিংড়ি খাইতে মেলায় যাবা?
সে আবার হেসে বলল, হ্যা, শুনছি বইমেলার সামনে চিংড়ি(মানে চিংড়ির মাথা বেসন দিয়ে ভাজে)ভাজা বিক্রি হয়। সোহাগ মানে আমার সেই বন্ধুর( তার সে বন্ধু আমাদের এখানে প্রায়ই আসে। বয়সে রশিদের অর্ধেক হবে। সাইজে বার তেরোর বেশী মনে হয় না। রশিদের কথায় সে খুব শিক্ষিত। এই বয়সে ক্লাস সেভেনে পড়ে ! বন্ধুর প্রতি তার দারুন শ্রদ্ধাবোধ। ছেলেটি আসলেই বিভিন্ন জায়গা থেকে সে বইপত্র পত্রিকা এনে দেয়। যতক্ষন এখানে থাকে ততক্ষন জ্ঞানী জ্ঞানী মুখখ ভঙ্গী করে সে পত্রিকা বা বইয়ের পাতায় দৃস্টি নিবদ্ধ রাখে।) চিংড়ি ভাজা খাওয়ার খুব শখ। আমি তারে কইছি বইমেলায় নিয়া খাওয়াব।
১৪ই ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালবাসা দিবস।
সকালে একটু তাড়া তাড়ি অফিসে গেলাম।আমার পার্টনার বন্ধুর অনুরোধে তৎকালীন ডি এম পির ডিসি সাহেবের কম্পিউটারের সাথে চেয়ার টেবিল কিনতে গেলাম। প্রায় বেকার মানুষরে নিকটজন সুযোগ পেলেই তাদের ভাষায় ‘চরম গুরুত্বপূর্ন’ কিছু কাজ দেয়।
পুলিশের পিক আপে দুইজন রক্ষী সহ পান্থপথ চষে ফিরলাম কিন্তু কোনটাই পছন্দ হচ্ছিল না। এই প্রথম পুলিশভ্যানে চড়ার অভিজ্ঞতা! লোকজন যেভাবে তাকাচ্ছিল তাতে নিজেদেরকে অপরাধী বলে মনে হচ্ছিল।হায়রে কপাল ! কই আমি এমন দিনে প্রেমিকার সাথে রিক্সায় ঘুরে বাদাম চিবাবো-না তার বদলে পুলিশ ভ্যানে অপরাধীর মত ঘুরে বেড়াচ্ছি।
সেই পরিবারে এমনিতেই আমার ভয়াবহ সুনাম! তাদের কেউ যদি দেখে ফেলে আমাকে এই অবস্থায় তাহলে পুরা ফাইনাল!
ক্রমশ...
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুলাই, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


