সাল- ২০০২, ১৪ই ফেব্রুয়ারী
আগের পর্বের লিঙ্ক: Click This Link
৩.
সেইদিন সকালের গল্প : কুইক সাভিসে মিরপুর থেকে এলিফ্যান্ট রোড যাচ্ছিলাম। কন্ট্রাকটার ভাড়া নেয়ায় ব্যাস্ত ছিল, সেই ফাকে কলেজ গেটের কাছে রোড জ্যামের জন্য বসটা একটু স্লো হতেই খোলা গেট দিয়ে একজন লোক উঠে পড়ল।
বাস কন্ট্রাকটার চিৎকার করে লোকটাকে নেমে যাবার জন্য বলতে গিয়েও থেমে গেল। বাসের যাত্রীরাও বিরক্তিতে উসখুস করছিল কেননা এবাসে রাস্তা থেকে লোক উঠানো কিংবা লোক দাড়িয়ে নেয়া নিষেধ। কিন্তু সদ্য আরোহনরত যাত্রীটির দিকে তাকিয়ে উচ্চস্বরে কেউ কিছু বলছে না। সবাই একদৃস্টিতে বুঝে গেছে লোকটি অপ্রকৃতস্ত। মুখভর্তি কাচাপাকা দাড়ি।পরনে খাকি রঙ্গের মোটামুটি পরিচ্ছন্ন একটা প্যান্ট সঙ্গে লাল কালো স্ট্য্রাইপের একটা শার্ট পিছনে অনেকখানি ছেড়া। হাতে তছবিহ'র মত কিছু একটা, গলায় সেরকম অনেকগুলো মালা আর বুক ও গলার কাছে সার্টে পিন দিয়ে সাটা কিছু প্লাস্টিকের প্রতিকৃতি।
সে বাসে উঠেই প্রথমে সব যাত্রীদের পর্যবেক্ষন করল, পরক্ষনেই হেসে ফেলল।
বলল, আমি হলাম খালেকের খুবঘনিষ্ঠজন খালেকের বৌ আমারে খুব স্নেহ
করেন। খালেকের সব বাস আমার জন্য ফ্রি।' ততক্ষনে সবাই নিশ্চই বুঝতে পেরেছে সে কোন খালেকের কথা বলছে। ভদ্রলোক মিরপুরের নির্বাচিত এমপি যিনি খালেক এন্টার প্রাইজ নামে একটা পরিবহন সংস্থার মালিক।
আমাদের দেশের সংখ্যা গরিষ্ঠ লোক পাগলকে ভয় পায় কিন্তু একবার যদি বুঝতে পারে সে ভয়ঙ্কর নয় তখন সবাই তাকে বিভিন্ন উপহাস কটুক্তি করে সেই সঙ্গে
নিঃসংশের মত আঘাত করতেও দ্বীধাবোধ করেনা। এই বাসে গমনরত বেশীরভাগ যাত্রীও প্রথমে ভয়ে কিছুটা সংকুচিত ছিল। সবাই একটু চেপে চুপে বসছিল কি জানি ভাই কখন কার ঘাড়ের উপর এসে চেপে বসে। কিন্তু যখন সবাই বুঝতে পারল সে আদপে ভয়ঙ্কর কেউ নয় তখন সবার ধীরে ধীরে সহজ হবার চেস্টা। হঠাৎ একজন উক্তি করল 'লোকটার সবগুলা তার ছিড়া।'
লোকটি সদ্য কটুক্তি করা সেই ভদ্রলোকের দিকে চেয়ে স্মিত হেসে বলল,' তার আমার ছিড়া না। তাড় ছিড়া হাসিনা খালেদার নাইলে কি তারা দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়! দামী দামী গাড়িতে চড়ে আর আমি বাসের রড ধইরা ঝুলতে ঝুলতে যাই।
এক যাত্রী তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,'আপনি তাইলে কে ভাই।'
'আমি আমি হইলাম বহুরুপী! আমি কখনো হিটলার কখনো খাজা মইনুদ্দিন চিশতি কখনো হাতেমতাই আমার কাছে যা চাইবি তাই পাইবি। নে নে 'দুই হাত দিয়ে কিছু ছুড়ে দেয়ার ভঙ্গি করল।
অন্যান্য যাত্রী তখন তার কথায় মজা পেয়ে গেছে। একজন হাসতে হাসতে বলল,
‘আজকে ভালবাসা দিবসে আপনে এইখানে ক্যান ? আপনের তো টি এস সিতে থাকার কথা ?'
সে তখন উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠল। সব যাত্রীদের উদ্দেশ্যে বলল,’হ হ ভাইজানরা আইজকে ভালবাসা দিবস। আসেন সবাই মিইল্যা ভালবাসি। কেউ ভালবাসবে কেউবাসবে না তাহবেনা তাহবেনা। আইজক্যা আমি বলবই 'আই লাভ ইউ' হা হা হা আমি তোমাকে ভালবাসি!
সেই রাতের আরেকটা গল্প : ‘হ্যালো'
'হ্যা তপু ! কেমন আছো?
'এই আছি। একটা করে দিন চলে যাচ্ছে আর বয়সটা একটু করে বাড়ছে।
তুমি কেমন আছো?'
'ভালো। (সাবলীল কন্ঠ) সময় কিভাবে কেটে যায় টেরই পাই না।'
'বাহ্ বেশতো। কি নিয়ে এত ব্যাস্ত থাকো যে সময় এত দ্রুত চলে যায় ?'
' গল্পের বই পড়ে। আর জানো ..আমার একটা র্যাবিট আছে, এত দুস্টুমী
করে ! ওকে নিয়ে আর পারিনা।'
"আর?' (আমি আরো কিছু শুনতে চাইছি )
একটু লাজুক হেসে ' ও হ্যা -- টেলিফোন তো আছেই।'
(এইটেই শুনতে চাচ্ছিলাম। কথা লুফে নিয়ে বললাম।) 'প্রতিদিন কতগুলো ছেলে তোমাকে টেলিফোন করে।'
'হিসেব করে বলা সম্ভব না। এই জানো ..আজকে না একটা ছেলে ফোন করেছিল
কি সব আবোল তাবোল যে বকছিল। আমাকে নিয়ে নাকি বৃষ্টির দিনে কদম ফুলের বনে ভেজা ঘাসের উপর হাটতে চায় ..আর কি কি যেন বলছিল।হঠাৎ শুরু করল কবিতা .. হাজার বছর ধরে আমি পথ হাটিতেছি পৃথিবীর পথে .. হা হা। আমার না এ্যাতো ঘুম পাচ্ছিল সেই অবস্থায় আমি মোবাইল সেট বালিশের নিচে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম থেকে উঠে দেখি, ওমা সে তখনো লাইনে।'
'হুম আসলেই তুমি দারুন ভাগ্যবতী। তোমাকে হিংসে হয়।'
'হাঃ সবাই ই আমাকে কেন যেন ঈর্ষা করে।'(আহ্লাদী কন্ঠ)
আমার নিজেকে নিজেরও হিংসে করতে ইচ্ছে করে।'
কেন?'
‘এইযে তুমি আমার সাথে কথা বল। ইস্ কি ভাগ্যবান আমি !'
'হুম তাইতো তোমাকে আমি এত পছন্দ করি।(সাংঘাতিক আপ্লুত)
'গতকাল ছিল পয়লা ফাগুন।আর আজ ভ্যালেন্টাইন ডে। বিশেষ কোন প্রোগ্রামকি ছিল এদুদিন?'(আমার জিজ্ঞাসা)
'কাল বিকেলে জানলাম যে সেদিন পহেলা ফাল্গুন। আর ভ্যালেন্টাইন ডে। ফুঃ ভাল্লাগে না লোক দেখানো এসব ন্যাকামী করতে। আচ্ছা বল ভালোবাসার কি কোন বিশেষ দিন আছে? যারা ভালবাসে তাদেও প্রতিদিনই ভ্যালেনটাইন্স ডে।'
' হু ঠিকই বলেছ। তার মানে আজ কোথাও বের হওনি ?'
'হ্যা গিয়েছিলাম আমার কলেজে। কলেজ থেকে বের হয়ে ভাবলাম তোমাকে একটা ফোন করি, কিন্তু কিভেবে যেন করলাম না। দিনটা এত খারাপ গিয়েছে আজ ।(ভাবলাম আমার জন্যই হয়তোবা।)
..অনেকদিন পরে সালওয়ার কামিজ পরলাম। রিক্সায় উঠতে গিয়ে চাকায় বেধে ওড়নাটা ছিড়ে গেল! অভ্যেস নেইতো সামলাতে পারিনা। সেই ড্রেসটা আমার এত পছন্দের।(মেয়েদের যে পোষাকটা নষ্ট হয় সেটাই সবচেয়ে প্রিয় থাকে।) আর বাসায় ঢোকার মুখে সিড়িতে হোচট খেলাম ..
(আমি তার কথা শেষ করতে না দিয়েই বললাম,)' তোমার ড্রেসটার বর্ননা দিও আমি ডুপ্লিকেট একটা কিনে দিব। (বলেই ভাবলাম,এই সেরেছে রে এদের সবচেয়ে পছন্দের কিছুই তো মার্কেটে ডুপ্লিকেট থাকতেই পারেনা।)
'হা আ তার আর দরকার হবেনা। আমি মার্কেটে গিয়ে আরেকটা কিনে এনেছি।তবে ও রঙটা পাইনি।(আমার ধারনাটা ভুল প্রমানিত হতে হতে বেঁচে গেল।)
ওটা ছিল ষ্ট্রবেরী কালারের। '
'ভ্যালেনটাইন ডেতে বুঝি লাল (ষ্ট্রবেরী কালার এক অর্থে লাল ই)পোষাক পরে বের হতে হয়-এটাই নিয়ম নাকি?'
'হ্যা। ভালবাসার রঙ হল লা.. ল।'(একটু টেনে টেনে আবেগ দিয়ে বলল।)
(মনে মনে ভাবলাম সেন্ট ভ্যালেনটাইন সাহেবতো পাদ্রী ছিলেন। তখনকি পাদ্রীদের লাল পোষাক পরার প্রচলন ছিল? নাকি তিনি জেল খেটেছিলেন লাল পোষাক পরে ? কিংবা তার প্রেমিকাকে লাল কালিতে চিঠি লিখে লাল খামে পুরে লাল গোলাপ সেঁটে পাঠাতেন? কে জানে? ভালবাসার রঙটা নীল সবুজ বা হলুদ হলে অসুবিধা কি ছিল। তাতে ভালবাসার জৌলুস কি কমে যেত ? )
....বাকি অংশ আগামী পর্বে
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০১১ দুপুর ১২:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


