ব্যাপারটা আমাদের কাছে একদম নতুন ছিল! রাস্তা ঘাটে অচেনা নারী পুরুষ বৃদ্ধ কি অবলীলায় সিগারেট চাইছে দেখে প্রথম প্রথম খটকা লাগলেও এক সময় আমরাও চেয়ে খাইতাম।অচেনা কারো কাছে সিগারেট চাওয়া কিংবা নিজের সিগারেটে আগুন ধরানোর জন্য আগুন ধার করতে ওদের কোন কুন্ঠাবোধ ছিলনা। তবে দিয়াশলাই,লাইটার কিংবা প্রজ্বলিত সিগারেট কখনো নিজের হাতে নিত না। নিজের সিগারেটটা ঠোটে গুজে মাথা নুইয়ে দিত আর আমরা সেই দিয়াশলাই বা প্রজ্বলিত সিগারেট দিয়ে তাদের সিগারেটখানা ধরিয়ে দিতাম। সিগারোট ধরানো শেষে কেউবা আমাদের পরিচয় জানতে চাইত কেউবা বেশ মোলায়েম করে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিত।তারা শুধু নেবার ব্যাপারে নয় দেয়ার ব্যাপারেও দারুন উদার ছিল। আমরা যেমন প্যাকেট এগিয়ে দিলে একটার জায়গায় দু-তিনখানাও সিগারেট নিত তেমনি তাদের কাছে চাইলে পকেটে না থাকলেও নিজের হাতের খানা দিয়ে দিত।
পথ চলতি এক সুন্দরী তন্বি আমার কাছ থেকে চেয়ে সিগারেট খাইছে –ব্যাপারটা কল্পনা করতে ভালই লাগে।
রুশীয়দের একটা বড় আংশ ধুমপায়ী হলেও সম্ভবত ওরা মদের থেকে ধুমপানটাকে খারাপ নজরে দেখে।
আমাদের প্রিয় আন্দ্রের আঠরোতম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে ওর বাবা সবার সামনে ওর হাতে এক গ্লাস ভদকা তুলে দিয়ে বলেছিলেন’ আজ থেকে তুমি আমার সামনে মদ খেতে পারবে – কিন্তু সিগারেট খাওয়া চলবে না।‘
আন্দ্রের বাবা নিজে সিগারেট খেলেও অন্য রাশান গুরুজনদের মত ধুমপানকে ভাল দৃষ্টিতে দেখতেননা।
ওদের সবচেয়ে বেশী বিক্রিত সিগারেট ছিল ‘কসমস’ আর ‘বেলোমোর বা বেলোমোরকানাল’ আর প্রিমা।
কসমস দেখতে আমাদের সাধারন ফিল্টার বিহিন সিগারেটের মত (যথাসম্ভব ফিল্টাবিহীন-ই হবে)হলেও বেশ কড়া খটমটে নিন্মমানের তামাক দিয়ে তৈরি। আর ‘বেলামোর’ সিগারেটের অর্ধেকটা ছিল তামাক ভর্তি আর অর্ধেকটা ছিল শক্ত কাগজ দিয়ে বানানো পাইপের মত। সেই কাগজের ফাপা পাইপটা বিশেষ কায়দায় দুবার চাপ দিয়ে চ্যাপ্টা করে ওরে ধুমপান করত।
সেলোফিন আর কাগজে মোড়া সিগারেটের প্যাকেট থেকে খুব সহজে সিগারেট বের করা আর কড়া সিগারেটকে হালকা করার জন্য এক হাতের মুঠোয় সিগারেট রেখে অন্য হাতেল তালুর চাটি দিয়ে সিগারেট বের করার কৌশলটা শিখেছিলাম তাদের কাছ থেকে।
ফুটনোটঃ ‘বেলামোর কানাল’ সিগারেট শ্বেত সাগরের ‘বালটিক ক্যানালের’ নামানুসারে নামকরন করা হয়েছিল(মুলত বালটিক ক্যানালকে স্বরণীয় করে রাখার জন্য এই নামকরন হয়-এই ক্যানাল তৈরি করতে গিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের গুলাং জেলখানার বহু সহস্র হতভাগ্য কয়েদী প্রান হারায়।)।বেইলী বা ‘বেলা’ অর্থ সাদা বা শ্বেত আর ‘মোর’ অর্থ সাগর।১৯৩২ সালে এই সিগারেট সর্বপ্রথম বাজারে আসে।বেলামোর এর স্পেশাল এই স্টাইলকে রুশ ভাষায় বলা হয়‘পাপিরোসা’। এই ইউনিক স্টাইলটা অন্য যেকোন সিগারেট থেকে একে সতন্ত্র করেছিল।
দামে সস্তা আর পূর্ব ইউরোপের সব’চে কড়া সিগারেট এই ‘বালামোর কানেল’ খুব সহজেই দারুন জনপ্রিয়তা পায়।আর গাঁজাখোরদের কাছেও এর ছিল বিশেষ কদর! খুব সহজেই তামাক ফেলে দিয়ে গাঁজা পুরে,দম দেয়া সহজ হত বলে!
ধুমপান নিয়ে আমার লেখা একটা গল্প দিলাম সংযুক্ত করে। গল্পটা এখানে দেবার উদ্দেশ্যটা পাঠক নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন;
তরুণী শুনুন ? দু'বার ডাকতেই তিনি আমার কাছে এসে ঝুকে জিজ্ঞেস করলেন,’ জ্বী বলুন ?’
‘আমি কি একটা সিগারেট খেতে পারি?’ কন্ঠস্বরটা যথাসম্ভব মোলায়েম করে তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
এয়ার হোস্টেস দুপাশে মাথা দুলিয়ে মিস্টি হেসে জানালেন,- এটা ‘অভ্যান্তরিন ফ্লাইট’ এখানে সিগারেট খাওয়া নিষেধ। আমি বিদেশী হওয়াতে সে আমার অবগতির জন্য আরো জানাল যে ,-এই এয়ারলাইন্সের শুধুমাত্র আর্ন্তজাতিক রুটে
ধুমপান এলাউড ।
‘আমি জানি।কিন্তু এই মুহুর্ত আমার একটা সিগারেট খেতেই হবে। প্লিজ খেতে দাও? তাছাড়া প্যাসেঞ্জারও মাত্র গুটিকতক। পিছনে গিয়ে ধুমপান করলে কারো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
‘স্যরি! ইয়াংম্যান, সম্ভব নয়।’
গোমড়া মুখে আমি হাঁসফাঁস করছি। ক’মাস আগেও সিগারেটের নেশাটা এভাবে আমায় পেয়ে বসেনি। দিনে রাতে দু’তিনখানা হলেই চলে যেত! আর এখন একদম এডিক্টেট হয়ে গেছি। একবার যখন সিগারেট খেতে মন চেয়েছে যতক্ষন পর্যন্ত এই ইচ্ছেটা পুরণ করতে পারছি ততক্ষন কোন কিছুতেই সস্তি পাবনা। আর যেখানে নিষেধের বেড়াজাল যত বেশী সেখানেই সেটা অতিক্রম করার দুরুহ প্রচেস্টা!
‘দোস্ত তোর কাছে সিগারেট আছে?’
‘না নেই।’ কথাটা বলেই সে সিগারেটের প্যাকেট কের করে একটা সিগারেট ধরাল।
-আরে! অপমানে আমার চোখমুখ লাল হয়ে গেল। আমি এক প্যাকেট সিগারেট কিনলে নিজে খাই বড়জোড় খান পাচেক আর বাকিটা ও সাবাড় করে। শালা কি রকম নিমক হারাম!
‘তোর কাছে সিগারেট থাকা সত্বেও তুই না করলি কেন?’ থমথমে চেহারায় জিজ্ঞেস করলাম।
প্রতিউত্তরে আমার দিকে তাকিয়ে একটা ফিচেল হাসি দিল । তারপর তার হাতে
ধরা সিগারেটে একটা কষে দম দিয়ে বলল,’ আগে সিগারেট খাওয়া শিখ তারপর চাইস ।’
‘মানে? তুই কি বলতে চাস আমি সিগারেট খেতে পারিনা?’
হাসিটা তার আরো বিস্তৃত হল-’ওরে সিগারেট খাওয়া কয়? ধোয়া গিলিস না,
ছেমড়ি মাইনষের মতন মুখে নিয়ে পস্ কইরা ছাইরা দিস।দ্যাখ সিগারেট খাইতে হয় অ্যামনে’-বলেই, সিগারেটটা ঠোটের ফাকে গুজে একটানে ফুঁলকি ছড়িয়ে ধোয়াটা অনেক্ষন বুকের মাঝে রেখে পরে ধীরে ধীরে নাক মুখ দিয়ে ছাড়ল। ফাকে দু’চারটা রিংও বানাল।
আমি তৎক্ষনাৎ তার হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিয়ে লম্বা এক টান দিয়ে যেই ধোয়াটা গিলেছি, অমনি শুরু হল কাশ! কাশির দমকে আমার আর হাসির দমকে ওর দম আটকে যাবার যোগার। হাসতে হাসতে পেটে হাত দিয়ে ও বসে পড়ল।
আর আমি চোখ ভরা জল নিয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম ,ওকে দেখাব কিভাবে সিগারেট খেতে হয়।
সেদিন বিকালেই দু’প্যাকেট সিগারেট এনে রাত দুটো পর্যন্ত এক নাগাড়ে টানলাম। গলার কাছটা শুকিয়ে খট খট মুখ তেতো হয়ে গেছে । সেই সঙ্গে শুকনো কফের আন গোনা।
একটু অভ্যাস্ত হতেই তার মুখের সামনে দিয়ে বুক ফুলিয়ে টেনে টেনে দেখাই। আর সেও নিত্য নতুন কুখ্যাত সব ব্রান্ডের সিগারেট এনে আমাকে খেতে দেয় বলে ’এটা খা । দেখি তোর কতটুক ইমপ্র“ভ হোল?’
আমি দুটান দিয়ে চোখে অন্ধকার দেখি আর খক খক করে কাশি। কাশি আটকানোর প্রচেষ্টায় সেটা আরো দ্বীগুন জোড়ে বেরিয়ে আসে মুফতে মিলে চোখের পানি।
তিনটে সিগারেট খাওয়া সেই ছেলের এখন তিন প্যাকেটও নেহায়েত কম মনে হয়!
এয়ার হোস্টেজটি আবার ফিরে আসছে। আমি করুন চোখে তার দিকে চাইলাম। আই কন্ট্যাক্ট হতেই সে আমাকে ইশারা করল তার পিছু পিছু যেতে। আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে তাকে অনুসরন করলাম। বিমানের একদম লেজের কাছে আধো অন্ধকার রুমে সে আমাকে নিয়ে গেল। চোখে আলো সয়ে এলে বুঝতে পারলাম এটা একটা স্টোর রুম। মেয়েটি আমার হাতে একটা বমির প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বলল,এখানে বসে খাও। আর কাউকে খবরদার বোলনা তুমি এখানে সিগারেট খেয়েছ।
আমি আকর্ন হেসে তাকে লক্ষ কোটি ধন্যবাদ দিয়ে কসম কেটে বললাম একথা বিমানের বাতাসও টের পাবেনা।‘
কথা বলতে বলতে ততক্ষনে প্যাকেটটা পকেট থেকে বের করে সিগারেট ঠোটে গুজে দিয়েছি। ম্যাচের খোজে পকেটে ফের হাত বাড়াতেই ,
সে আমার হাতে ধরা প্যাকেটের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, তুমি কি ব্রান্ডের সিগারেট খাও ?
আমি তাকে সিগারেটের প্যাকেঁটি দেখিয়ে বললাম ,-মার্লবোরো!কেনো তুমি এই ব্রান্ড দ্যাখোনি?
সে ঘাড় নেড়ে জানাল দেখেনি ! পরক্ষনেই রক্তিম মুখে বলল। আমাকে একটা সিগারেট দিবে ?
অবশ্যই। খুশী মনে তার দিকে সিগারেটের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিলাম,
সে একখানা সিগারেট হাতে নিয়ে বেশ লাজুক ভঙ্গীতে আমার দিকে তাকি অনুরোধ করল’ আমি কি আরেকটা সিগারেট নিতে পারি?’ আমি কিছু বলার আগেই সে বলে চলল, একটা আমি খাব আরেকখানা আমার বয়ফ্রেন্ডের জন্য- ওর খুব সখ ‘মার্লবোরো’ সিগারেট খাবার!
তাই নাকি? তাহলে তুমি পুরো সিগারেটের প্যাকেটটাই রেখে দিতে পার।
সে প্যাকেটটা খুলে আরো একটা সিগারেট হাতে নিয়ে-সেটা আবার আমাকে ফিরিয়ে দিতে দিতে বলল,অনেক ধন্যবাদ। ম্যাচটা দাও!
সেদিন ‘ধুমপান নিষেধ’ লেখা সোভিয়েত ইউনিয়নের আকাশ দিয়ে উড়ে চলা এক বিমানের প্রায় অন্ধরাচ্ছন্ন গুদাম ঘরে অপরিচিত কোন এক রুশ বিমানবালার সাথে সিগারেট খাওয়ার ব্যাপারটা বেশ উপভোগ্যই ছিল! ...চলবে
আগের পর্বের লিঙ্কঃ
Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১২:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


