সাজানো এ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি গণতন্ত্রের স্বপ্নকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। একটি সুষ্ঠ, অবাধ নির্বাচন দেশের জনগণ দেখতে চেয়েছিলো। কিন্তু সরকারের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের যোগসাজশে সে স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেলো। এই নির্বাচন কমিশনারদের এখনি পদত্যাগ করা উচিত। একটি স্বাধীন, স্বতন্ত্র নির্বাচন কমিশন গণতন্ত্রের জন্য খুবই জরুরী।
সরকারের দেড় বছরের মাথায় দেশের মানুষ গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন উর্দ্ধগতি, ছাত্রলীগের ক্রমাগত টেন্ডারবাজি, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানিতে ত্যাক্ত বিরক্ত। পত্রিকার পাতায়, ব্লগে সচেতন মানুষের মন্তব্য, অভিমত লক্ষ্য করলেই দেখা যায় সরকার সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে নাই। নির্বাচন কমিশন ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের জন্য শতভাগ প্রস্তুতির কথা জানালেও সরকারের অনিচ্ছায় তা এখন আর হচ্ছেনা। তাতেও সরকারের দুশ্চিন্তা অনুভব হয়।
এই অবস্থায় আজকে হয়ে গেলো ভোলায় উপনির্বাচন। যেটার সর্বশেষ ফলাফলে দেখা যায় নূরনবী চৌধুরী ৯৩ হাজার ২১০; হাফিজ উদ্দিন আহমেদ ৩০ হাজার ১২৫ ভোট পেয়েছেন। এ নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ৩৪ হাজার ৯২৬। এর মধ্যে পুরুষ এক লাখ ১৪ হাজার ৮৮০ জন এবং মহিলা এক লাখ ২০ হাজার ৪৬ জন।
এবার আমরা ফিরে তাকায় ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে ভোটার ছিলো ২ লাখ ১৫ হাজার ৪ জন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের মো. জসিমউদ্দিন ৯৬ হাজার ৪৮৪ ভোট এবং বিএনপির হাফিজউদ্দিন আহমেদ ৮৩ হাজার ১২৭ ভোট পান। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর নুরুল ইসলাম পেয়েছিলেন ১৬৩৯ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী সিদ্দিকুর রহমান মান্না পান ১২০৭ ভোট। আর 'না' ভোট পড়েছিলো ৪৯০টি।
লক্ষ্য করুন ২০০৮ সালের ২৯ শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে সারা বাংলাদেশে যেখানে বিএনপির চরম পরাজয় ঘটেছে সেখানেও ভোলার চার বারের এমপি হাফিজউদ্দিন আহমেদ ৮৩ হাজার ১২৭ ভোট পেয়ে মাত্র ১৩৩৫৭ ভোটে পরাজয় বরণ করেন। তখনকার বেশ কিছু অবস্থার কথা আমরা চিন্তা করিঃ
১। সংস্কারপন্থী বলে হাফিজউদ্দিন তখন কেন্দ্রীয়ভাবে কোণঠাসা ছিলো
২। সংস্কারপন্থী বলে হাফিজ বিরোধী গ্রুপ নিষ্কিয় ছিলো
৩। সারা বাংলাদেশেই বিএনপির অবস্থা খারাপ ছিলো
অথচ এবারের নির্বাচন উপলক্ষে দলের কেন্দ্রীয় নেতারা হাফিজউদ্দিনের পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছে। দলের চেয়ারম্যান দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া খোলা চিঠির মাধ্যমে ভোলার মানুষদেরকে হাফিজউদ্দিনকে নির্বাচিত করার আহবান জানিয়েছিলো। তাতে স্পষ্ট বুঝা গিয়েছিলো যে, হাফিজউদ্দিন তার সংস্কারপন্থী ভাবমূর্তির খোলস ভেঙ্গে দলে একটা অবস্থান তৈরী করতে পেরেছিলো। যেখানে সারা বাংলাদেশে সরকারের ভিবিন্ন কার্যক্রমে দেশের মানুষ দিনকে দিন হতাশায় নিমগ্ন হচ্ছে সেখানে একজন সন্ত্রাসী আওয়ামী প্রার্থীর সাথে চারবারের এমপি হাফিজউদ্দিন সাহেবের ভোটের ব্যবধান চিন্তা করলেই ব্যাপারটা সাবোটাজ বলে মনে হওয়া স্বাভাবিক।
এবার আসি আজকের নির্বাচন পরিস্থিতি নিয়েঃ
১। শুক্রবার দিবাগত মধ্যরাতে বেলায়েত ভুঁইয়ার নেতৃত্বে গজারিয়া ইউপি সদস্য এবং বিএনপির ওয়ার্ড সভাপতি মোঃ নান্নু হোসেনের বাড়িতে লুটপাট করে। সেই সময় ঐ এলাকায় বিএনপির প্রায় দুইশত কর্মীর ভোটার আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
২। লালমোহন, ধলিনগর, চরকামলা ইউনিয়ন সহ বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ, যুবলীগের নেতারা হামলা, লুটপাট করে এবং বিএনপির প্রায় দুইশত কর্মীর ভোটার আইডি কার্ড ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
৩। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে লালমোহন মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে হাফিজ জানান চারটি কেন্দ্র থেকে বিএনপির এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম প্রতিনিধি সকালে লালমোহনের মহেশখালী প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কিশোরগঞ্জ প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর কোনো এজেন্ট দেখেননি। তবে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন। বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট নেই কেন- জানতে চাওয়া হলে কেন্দ্র দুটির প্রিজাইডিং কর্মকর্তা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি।
৪। আজকে সকাল সাড়ে এগারটার দিকে যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক কিরণের নেত্বত্বে যুবলীগের একটি গ্রুপ হাফিজউদ্দিনের প্রধান নির্বাচন সমন্বয়কারী আমানের উপর হামলা করেন।
৫। লালমোহনের মুচির বাড়ীর কেন্দ্রে আওয়ামীলীগের কর্মীরা মহিলাদের ভোটদানে বাধাঁ সহ শাড়ী ধরে টানাটানি করেছেন। এসপিকে জানানো হলে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিলেও কার্যত তিনি চুপ ছিলেন।
৬। ভোলার ৮৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ৫৭টি থেকে হাফিজের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়েছে।
৭। এটা প্রথম আলোর একটি রিপোর্টঃ
ভোলা-৩ আসনের উপনির্বাচনে সকালের দিকে ভোটারদের উপস্থিতি বেশ ভালো থাকলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপস্থিতি কমতে শুরু করেছে। বিশেষত, বিএনপির সমর্থক-অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিত ভোটকেন্দ্রগুলোতে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভোটার উপস্থিতি কমে যায়। কিছু কিছু ভোটকেন্দ্র দুপুরের দিকে একেবারে ভোটারশূন্য ছিল।
ফরাশগঞ্জ ইউনিয়নের কিশোরগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে কানু, মুসা, লিটন, রতন ও মতলব নামের পাঁচজন হামলায় আহত হন। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার পথে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা তাঁদের ওপর হামলা চালিয়েছে বলে আহত ব্যক্তিরা দাবি করেছেন। বর্তমানে তাঁরা লালমোহন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিত্সাধীন। দুপুর ১২টার দিকে ওই কেন্দ্রে গিয়ে এই প্রতিবেদকেরা দেখতে পান, কেন্দ্রটি ভোটারশূন্য। বিভিন্নভাবে ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে।
ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সেলিম আহমেদ জানান, এখানকার ভোটার সংখ্যা চার হাজার। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এখানে প্রায় ৩৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে পর্যবেক্ষকেরা এত পরিমাণ ভোট পড়ার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
এ ছাড়া দক্ষিণ সাতানি এলাকার গ্রামে গিয়ে অভিযোগ পাওয়া গেছে যে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা বিএনপির সমর্থকদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দিয়েছে। ঢলি গৌরনগরের বেদুরিয়া শেরাজিয়া সিনিয়র মাদ্রাসা ভোটকেন্দ্রটি দুপুর ১২টার সময় ভোটারশূন্য ছিল।
বদরপুর ইউনিয়নের আটটি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, বিএনপির কোনো এজেন্ট নেই। আওয়ামী লীগ-সমর্থিতরা তাদের বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এবার কিন্তু নির্বাচন কমিশনারদের বেতন বাড়ানো সহ আগামী নির্বাচন পর্যন্ত চাকুরী স্থায়ী করণের বিশেষ অনুরোধ রইলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


